সকল মেনু

প্রাণিজগতের বিস্ময়

জীবজগতকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা যায়- উদ্ভিদ ও প্রাণী। অধিকাংশ প্রাণী চলাফেরা করতে পারে। উদ্ভিদ এক জায়গায় স্থির থাকে। কিছু সামুদ্রিক প্রাণী আছে- কোনোটা তারার মতো, কোনোটা বনফুলের মতো, আবার কোনোটা নলের মতো দেখতে। ওরা নড়াচড়া করে না, এক জায়গাতেই থেকে যায়। আবার কিছু কিছু ক্ষুদ্র উদ্ভিদ আছে, যেমন- শ্যাওলা; ওরা নড়াচড়া করতে পারে।

সবচেয়ে ক্ষুদ্রাকৃতির প্রাণী, যাদের মাইক্রো-অর্গানিজম বলে, কেবল মাইক্রোস্কোপ দিয়েই ওদের দেখা যায়। তাদের একটি বিশাল অংশের নাম প্রোটোজোয়া। এর অর্থ ‘প্রথম প্রাণী’। সবচেয়ে বড় প্রোটোজোয়া হলো অ্যামিবা, যেটা সুইয়ের অগ্রভাগের চাইতেও ছোট। তাদের দেহ কেবল একটি কোষ নিয়ে গঠিত। এ জন্য এদের বলা হয় এককোষী প্রাণী। সম্ভবত এসব ক্ষুদ্র প্রাণী অন্যসব প্রাণীর পূর্বপুরুষ। কোটি কোটি প্রাণী থেকেই সমস্ত উদ্ভিদ ও প্রাণীর উৎপত্তি হয়েছে। সাধারণ মাইক্রোস্কোপ দিয়ে সাগরের পানি, পুকুরের পানি অথবা বৃষ্টির পানিতে প্রোটোজোয়া সহজেই দেখা যায়। পরীক্ষামূলকভাবে গাছের গুঁড়ি কিংবা ঘরের পাশের নালা থেকে এক ফোঁটা পানি নিয়ে মাইক্রোস্কোপের সাহায্যে দেখলে তাদের অস্তিত্ব চোখে পড়ে। একটি কাচের জারে এক টুকরো সামুদ্রিক আগাছা নিলে দেখা যাবে, এর মধ্যে কিছু কিছু ক্ষুদ্র প্রাণী দ্রুত সাঁতার কাটছে। কোনোটা ধীরে ধীরে হামা দিয়ে চলছে, আবার অনেকগুলো এক জায়গায় স্থির। এদের অধিকাংশের শরীরের গঠন খুব অদ্ভুত এবং কিছু কিছু খুবই সুন্দর।

একটা কোষ দিয়ে গঠিত প্রাণীকে প্রোটোজোয়া বলে। আর অনেকগুলো কোষ আছে, এমন প্রাণীকে মেটাজোয়া বলা হয়। মাইক্রোস্কোপ দিয়ে দেখা ক্ষুদ্রতম প্রাণী রটিফারস থেকে শুরু করে সমুদ্রের বিশালাকার নীলতিমি পর্যন্ত এই মেটাজোয়ার অন্তর্ভুক্ত।

দশ লাখেরও বেশি প্রাণীর অস্তিত্ব সম্পর্কে আমরা জানি। তাদের অধিকাংশই পোকামাকড়। পোকামাকড় সম্পর্কে আলাদাভাবে জানা সম্ভব না হলেও তাদের শ্রেণিভাগ করে আমরা তা জানতে পারি। এমনকি নতুন কোনো প্রাণী আবিষ্কার হলেও ওই শ্রেণিভাগের মধ্যে তাদেরও যথাযথভাবে নিরূপণ করা যায়। কোনো না কোনোভাবে তারা আলাদা শ্রেণিভাগের মধ্যে পড়ে। প্রতিটি প্রাণীর আছে স্বাধীনসত্তা। শ্রেণিবদ্ধ পোকামাকড়গুলোর সদস্য প্রায় একই রকমের। গোষ্ঠীভুক্ত যে কোনো প্রাণীই একই রকম হয়ে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, একটি ক্ষুদ্রকায় ঘন লোমওয়ালা কুকুর এবং ডেনমার্কের বিশালাকার কুকুর। তারা উভয়েই কুকুর এবং তাদের মধ্যে সংকরীকরণ ঘটালে দেখা যাবে তাদের আকৃতি ও প্রকৃতি ভিন্ন।

কার্ল ভন লিনিয়াস নামের এক সুইডিশ প্রকৃতিবিদ প্রাণী ও পোকামাকড়ের প্রতিটিরই নামকরণ করে গেছেন। লাতিন ভাষার দুটি শব্দ দিয়ে এই নামকরণ করা হয়েছে। পৃথিবীর সকল বিজ্ঞানী এদের সে নামেই জানেন। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, একটি আমেরিকান মুস (গড়ড়ংব) বা চমরি গাইকে বলা হয় অলকেস অ্যামেরিকানা (অষপবং ধসবৎরপধহধ)।

প্রাণীদের মধ্যে যেগুলোর একে অপরের সঙ্গে অনেকটা মিল আছে, তাদের আলাদা ভাগে ভাগ করা হয়েছে। তাই লাতিন নামের প্রথম অংশ দিয়ে কোন শ্রেণির প্রাণী তা বোঝায়, আর দ্বিতীয় অংশ দিয়ে সেই প্রাণী সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়।

প্রাণিজগতকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেসব প্রাণীর পেছনে হাড় আছে তাদের মেরুদণ্ডী এবং যেসব প্রাণীর পেছনে হাড় নেই সেগুলোকে অমেরুদণ্ডী প্রাণী বলে। মানুষ মেরুদণ্ডী এবং গৃহপালিত অনেক প্রাণী, যেমনÑ গরু, ঘোড়া, কুকুর একই পরিবারভুক্ত বা মেরুদণ্ডী প্রাণী। পাশাপাশি জেলিফিশ, তেলাপোকা, জীবাণু ইত্যাদি অমেরুদণ্ডী। জেনে রাখা ভালো, পৃথিবীর বেশিরভাগ প্রাণীই অমেরুদণ্ডী।

একটি প্রাণীর পারিপার্শ্বিক প্রতিক্রিয়াকে আচরণ বলা যেতে পারে। খাবার ও আশ্রয়ের খোঁজ করা, শত্রুর কাছ থেকে নিজেকে রক্ষা করা এবং তার সঙ্গীকে খুঁজে বের করা- সবই তার আচরণের মধ্যে পড়ে। যখন সে ভয়ানক বিপদ দেখতে পায়, বিশেষ করে অন্য প্রাণীর কাছ থেকে, তখন সেখান থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখা তার প্রধান কাজ। এ ধরনের বিপদ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে অভ্যস্ত হতে হয় জন্মের পর থেকেই। এটাকে প্রাণীর সহজাত প্রক্রিয়া বলা যায়। সহজাত প্রক্রিয়ায় একটি মাছ সাঁতার কাটতে পারে। আবার একটি মানবশিশু চিন্তা করতে পারে।

খাবার গ্রহণের আচরণ দিয়ে প্রাণীর প্রকারভেদ বর্ণনা করা যায়। যেমনÑ তৃণভোজী প্রাণী কেবল উদ্ভিদ জাতীয় খাবার গ্রহণ করে। খরগোশ, বিভিন্ন প্রকার হরিণ, গরু ইত্যাদি তৃণভোজী প্রাণী। তাদের চোয়ালের দাঁত বড় ও মজবুত হয়। এতে করে গাছ, লতাপাতা সহজে চিবাতে পারে। আর তাদের পাকস্থলী ও খাবার হজম করার মতো শরীরের ভেতরের যাবতীয় অঙ্গ সেভাবে গঠিত হয়ে থাকে। মাংসাশী প্রাণী মাংস খায়। বিড়াল, কুকুর, শেয়াল, নেকড়ে, বেজি, সিংহ, সিল ইত্যাদি মাংসাশী প্রাণী। তাদের দাঁতগুলো খাবার উপযোগী হয়ে গঠিত হয়। তাদের ছেদনদন্ত থাকে, যাতে করে তারা খাবার ছিঁড়ে নিতে পারে এবং তীক্ষè কর্তনদন্ত থাকে, যা দিয়ে মাংস ছোট ছোট টুকরো করতে পারে। কিছু প্রাণী আছে মাংস ও উদ্ভিদ খায়। এদের সর্বভুক প্রাণী বলে। মানুষ সর্বভুক প্রাণী। শূকর, ভালুক, ব্যাজার ইত্যাদি প্রাণীও সর্বভুক।

সকল প্রাণীই খাবার প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। যেমনÑ শামুক পাতা খায়, পাখি খায় শামুক, বিড়াল খায় পাখি। প্রত্যেকটা খাবার প্রক্রিয়া শুরু হয় উদ্ভিদ দিয়ে এবং ধাপে ধাপে তা একটি থেকে অপরটিতে খাবারের মাধ্যম হিসেবে চলতে থাকে। এর কারণ কী?

একমাত্র উদ্ভিদ সালোক সংশ্লেষণের মাধ্যমে, বিশেষ করে সূর্যের সাহায্যে খাবার নিজে তৈরি করে তা গ্রহণ করে। অন্য সব প্রাণী খাবারের জন্য উদ্ভিদের ওপর নির্ভরশীল। খাবার প্রক্রিয়াকে শক্তি প্রক্রিয়া হিসেবেও অনেকে মনে করেন। কেননা বিভিন্ন খাদ্য সংযোগের সঙ্গে মানুষসহ অন্য সকল প্রাণী তাদের জীবনীশক্তি সংগ্রহ করে থাকে।

সাধারণত সকল প্রাণীর শত্রু আছে। একটি প্রাণী খাবারের জন্য অন্য প্রাণীকে আক্রমণ করে। একটি প্রাণী যখন অন্য কোনো প্রাণীকে আক্রমণ করে তখন আক্রান্ত প্রাণীকে ‘শিকার’ এবং যে প্রাণী আক্রমণ করে তাকে ‘শিকারি’ বলা যায়।

অনেক প্রাণীরই আত্মরক্ষার নিজস্ব উপায় আছে। যেমন- নিজেকে রক্ষা করার জন্য আমাদের দেশের খাটাস বা বাগডাসের (ইংরেজি নাম ঈরাবঃ) নিজস্ব উপায় আছে। যখন তাকে কোনো শত্রু আক্রমণ করে তখন সে শত্রুর উদ্দেশে দুর্গন্ধযুক্ত তরল পদার্থ ছুড়ে দেয়। এ তরল পদার্থ তার শরীরের লালাগ্রন্থিতে তৈরি হয়। ভিমরুল এবং অন্য আরো কিছু পোকামাকড়ের হুল থাকে। কোনো প্রাণী আক্রমণ করলেই সে হুল ফুটিয়ে দেয়। কোনো কোনো পোকামাকড়ের উজ্জ্বল রঙের হুল থাকে। উজ্জ্বল আলোও অনেকটা তাদের আত্মরক্ষার উপায়। কারণ পাখি বা অন্য কোনো শিকারি প্রাণী এ রকম রঙিন হুল দেখলেই অশুভ কিছু আশঙ্কা করে এবং আক্রমণ করা থেকে বিরত থাকে। সজারু আর পিঁপড়েভুক তাদের কাঁটাযুক্ত আবরণ দিয়ে আত্মরক্ষা করে। যখন তারা আক্রান্ত হয় তখন তারা বলের মতো কুণ্ডলি পাকিয়ে নিজেকে গুটিয়ে ফেলে এবং বাইরের দিক থেকে শুধু কাঁটাগুলোই দেখা যায়। কিছু মাছও এরকম কুণ্ডলি পাকিয়ে শত্রুর হাত থেকে আত্মরক্ষা করে।

সবচেয়ে অবাক করা আত্মরক্ষার পদ্ধতিটি হলো বৈদ্যুতিক মাছের। এ মাছগুলোর এমন মাংসপেশি আছে, যা বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে। তাদের পাশে অন্য কোনো প্রাণী গেলেই তারা বৈদ্যুতিক শক দেয়। কিছু বৈদ্যুতিক মাছ অন্য মাছকে শিকারের জন্য তা ব্যবহার করে।

যখন একটি প্রাণীকে অন্য প্রাণী আক্রমণ করে, তখন কিছু কিছু আক্রান্ত প্রাণী এমন ভান করে, যেন সে আক্রমণকারীর চেয়েও ভয়ঙ্কর। অস্ট্রেলিয়ার এক ধরনের ঝালরওয়ালা টিকটিকি তার ঘাড়ের কোঁচকানো চামড়া চারদিকে ঝালরের মতো ছড়িয়ে দেয়। অনেক দেয়ালি পোকা আলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে প্রধানত রাতে ওড়াউড়ি করে। তাদের অনেকের পালকে দাগ থাকে যা চোখের মতো দেখায়। সেগুলো অন্য অনেক বড় প্রাণীর চোখের চেয়েও বড় দেখায়।

 

 

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP