সকল মেনু

এক মেয়ের জন্য সম্পত্তি : ইসলামের আলোকে করণীয়

আমাদের সমাজে প্রায়ই একটি প্রশ্ন উঠে আসে—যদি কারো একমাত্র সন্তান মেয়ে হয়, তবে কি বাবা-মা তাঁদের সব সম্পত্তি সেই মেয়েকে দিতে পারেন? আর যদি দিতে চান, ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী সঠিক পদ্ধতি কী? এই প্রসঙ্গে কুরআন-হাদিস ও ইসলামী উত্তরাধিকার আইন (মিরাস) খুব স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছে।

ইঞ্জিনিয়ার এ কে এম রেজাউল করিম
চেয়ারম্যান, আলহাজ্ব কে. এম. আব্দুল কারীম (রাহিমাহুল্লাহ) ট্রাস্ট

জীবদ্দশায় সম্পত্তি হস্তান্তর (হেবা)

ইসলামে জীবিত অবস্থায় নিজের সম্পত্তি কাউকে উপহার (হেবা) দেওয়া বৈধ। যদি কারো একমাত্র সন্তান মেয়ে হয়, বাবা চাইলে জীবদ্দশায় তাঁর সমস্ত বা আংশিক সম্পত্তি সেই মেয়েকে দিতে পারেন। তবে শর্ত হলো—দান করার সময় তিনি সুস্থ মস্তিষ্ক ও শারীরিকভাবে সক্ষম থাকবেন।

উপহারটি বাস্তব দখলে (কবজা) দিতে হবে, যেন মেয়েটি সেটির মালিকানা ব্যবহারিকভাবে লাভ করে। নিজের বা স্ত্রীর জন্য প্রয়োজনীয় অংশ রেখে দেওয়া উত্তম, যাতে ভবিষ্যতে কষ্টে না পড়েন।

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—

“তোমরা তোমাদের সন্তানদের সমানভাবে দাও।” (সহিহ বুখারি) এই হাদিস একাধিক সন্তান থাকলে প্রযোজ্য। একমাত্র সন্তান হলে এই শর্ত নেই।

 

মৃত্যুর পর সম্পত্তি বণ্টন (মিরাস)

যদি জীবদ্দশায় হেবা না করা হয়, তবে মৃত্যুর পর সম্পত্তি কুরআনের নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী বণ্টিত হবে। কুরআনের সূরা নিসা, আয়াত ১১-তে বলা হয়েছে— “যদি তোমার একটি মাত্র মেয়ে থাকে, তবে তার জন্য অর্ধেক।”

বাকি অর্ধেক যাবে নিকটতম পুরুষ আত্মীয়দের কাছে—যেমন ভাই, ভাতিজা বা চাচা। এই বণ্টন আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত; কেউ তা পরিবর্তন করার অধিকার রাখে না।

 

সঠিক করণীয়

যদি কোনো বাবা চান যে তাঁর মেয়েই সম্পত্তির পূর্ণ মালিক হোক, তবে একমাত্র শরীয়তসম্মত পথ হলো জীবদ্দশায় হেবা করে দেওয়া। এ ক্ষেত্রে সাক্ষী রেখে এবং প্রয়োজন হলে লিখিত দলিল করে দেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ উপায়। এতে ভবিষ্যতে কোনো প্রকার পারিবারিক বিরোধ বা বিভ্রান্তি তৈরি হবে না।

ইসলাম মানুষের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার জন্য স্পষ্ট আইন দিয়েছে। ব্যক্তিগত ইচ্ছা ও ভালোবাসা প্রকাশের ক্ষেত্রেও সেই আইন মানা জরুরি। তাই আমাদের উচিত, সম্পত্তি বণ্টনের আগে ইসলামী নির্দেশনা ভালোভাবে জেনে নেওয়া, যাতে দুনিয়া ও আখিরাত—দুই ক্ষেত্রেই কল্যাণ লাভ করা যায়।

 

ইসলামে উত্তরাধিকার (মিরাস)–সম্পূর্ণ বোঝাপড়া, এবং ‘হেবা বনাম মিরাস’ নিয়ে স্পষ্ট দিকনির্দেশ

ইসলাম সম্পত্তি–বণ্টনে এমন এক নির্ভুল কাঠামো দিয়েছে যা একই সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত, স্বচ্ছ এবং বিবাদের পথ রোধ করে। মূলত এখানে দুটি ভিন্ন ক্ষেত্র আছে—

(ক) জীবদ্দশায় দান/হেবা, এবং (খ) মৃত্যুর পর উত্তরাধিকার (মিরাস)।

এই দুটোকে গুলিয়ে ফেললে ভুল সিদ্ধান্ত, পারিবারিক ক্ষোভ, এমনকি শরীয়তবিরোধী ফলও তৈরি হতে পারে। নিচে ধাপে ধাপে স্পষ্ট করা হলো।

 

১) আপনার উত্থাপিত পার্থক্য: “জীবদ্দশায় হেবা” বনাম “মৃত্যুর পর মিরাস” কুরআনের আয়াত কার প্রসঙ্গে?

সূরা নিসা ১১–১২ নং আয়াতে “ما تَرَك / মা তারাক” (মৃত ব্যক্তি যা রেখে যায়) শব্দটি ব্যবহৃত—অর্থাৎ এই বিধান শুধু মৃত্যুর পর পরিত্যক্ত সম্পত্তির বণ্টনের জন্য প্রযোজ্য। জীবিত অবস্থায় কেউ হেবা দিতে পারেন—এটা শরীয়তেও বৈধ, আইনে–ও বৈধ। তবে শর্ত আছে-

 

সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য হারাম। সহিহ বুখারি–মুসলিমে নু‘মান ইবন বশীর (রা.)–এর ঘটনায় রাসূল ﷺ বলেছেন: “আমি অন্যায়ের সাক্ষী হই না।” (ইঙ্গিত: একাধিক সন্তান থাকলে অন্যায় বৈষম্য নয়, ন্যায্যতা)

হেবার বাস্তবায়ন “দখল/কবজা” দিয়ে। শুধু কাগজে লিখলেই হবে না—প্রাপক বাস্তবে নিয়ন্ত্রণ/উপভোগে যাবেন।

আইনগত বনাম শরীয়তগত পার্থক্য

আইনগতভাবে (বাংলাদেশসহ বহু দেশে) জীবদ্দশায় রেজিস্ট্রি/দখল দিয়ে দিলে পরে দাবি করা যায় না।

শরীয়ত মতে ন্যায়ভিত্তিক বণ্টন জরুরি; কারো হক বঞ্চিত হলে আইনগতভাবে বৈধ হলেও আল্লাহর কাছে জবাবদিহি থাকবে।

 

মূল কথা

মিরাসের বিধান শুধু মৃত্যুর পর প্রযোজ্য। জীবিত অবস্থায় হেবা করা যায়, ন্যায় বজায় রেখে। উইল (ওসিয়ত) সর্বোচ্চ ১/৩, এবং সাধারনত উত্তরাধিকারীর পক্ষে উইল নয়—অন্যান্য উত্তরাধিকারীদের সম্মতি ব্যতীত।

জীবদ্দশায় রেজিস্ট্রি করা উইল নয়, হেবা—তাই তখন কুরআনি মিরাস বিধান কার্যকর হয় না।

 

ফিকহি নোট

অধিকাংশ ফকিহের মতে সন্তানদের মধ্যে হেবায় সমতা রক্ষা করা উচিত; কিছু আলিম “মিরাস অনুপাত (পুত্র=দুই, কন্যা=এক)” অনুসারে দেওয়াকেও বৈধ বলেছেন। ন্যায় ও পারিবারিক সৌহার্দ্য—এটাই মূলনীতি।

 

২) মৃত্যুর পর সম্পত্তি বণ্টনের ধাপ (মিরাসের ক্রম)

মারা যাওয়ার পর সম্পত্তি থেকে—

দাফন–কাফনের খরচ মিটবে। ঋণ শোধ হবে।

বৈধ উইল (ওসিয়ত) কার্যকর হবে—মোট সম্পত্তির সর্বোচ্চ ১/৩, সাধারণত উত্তরাধিকারীর পক্ষে নয়, ক্ষতি–উদ্দেশ্যে নয়। অবশিষ্ট কুরআন–সুন্নাহ নির্ধারিত অনুপাতে বণ্টিত হবে।

 

৩) নির্ধারিত অংশভোগী (أصحابُ الفُرُوض / আসহাবুল ফুরুজ)

কুরআন–সুন্নাহয় যাদের নির্দিষ্ট অংশ স্থির:

স্বামী: স্ত্রী নিঃসন্তান হলে ১/২; সন্তান থাকলে ১/৪। (নিসা ৪ : ১২)

স্ত্রী(রা): স্বামী নিঃসন্তান হলে ১/৪; সন্তান থাকলে ১/৮। (নিসা ৪ : ১২)

এক মেয়ে: ১/২; দুই বা ততোধিক মেয়ে: সম্মিলিত ২/৩। (নিসা ৪ : ১১)

মা: সন্তান/ভাই–বোন থাকলে ১/৬; তা না হলে ১/৩। (নিসা ৪ : ১১)

বাবা: সন্তান থাকলে ১/৬ (এবং কখনো অবশিষ্টের আসাবা হিসেবেও পান); সন্তান না থাকলে অবশিষ্টও তার। (নিসা ৪ : ১১)

কালালাহ (ascendants/descendants নেই): পিতৃ/মাতৃ–সহোদর (উতরাইনে) প্রতিজন ১/৬; একাধিক হলে সম্মিলিত ১/৩। (নিসা ৪ : ১২, ৪ :১৭৬ প্রসঙ্গসাপেক্ষ)

 

৪) অবশিষ্টগ্রহীতা (عَصَبة / আসাবা)

যাদের নির্দিষ্ট ভগ্নাংশ নেই; নির্দিষ্ট–অংশভোগীদের প্রাপ্য দেওয়ার পর যা থাকে, তা পান—যেমন পুত্র, নাতি (পুত্রের পুত্র), ভাই, চাচা ইত্যাদি নিকটতম পুরুষ আত্মীয়রা, ফিকহের নিয়মে অগ্রাধিকার অনুসারে।

 

৫) বাস্তব উদাহরণ (আপনার আলোচনার কেস থেকে) ওয়ারিশ: স্ত্রী আছেন, ৫ মেয়ে আছেন; পুত্র নেই; মৃতের ভাই–বোন জীবিত।

 

বণ্টন (ঐতিহ্যগত হিসাব):

স্ত্রী → ১/৮ (সন্তান আছে বলে)

 

৫ কন্যা → সম্মিলিত ২/৩

অবশিষ্ট → মৃতের ভাইরা (আসাবা হিসেবে) ফিকহের নিয়মে (পুরুষ:নারী=২:১ হলে) ভাগ পাবেন।

এখানে স্ত্রী ও কন্যাদের নির্দিষ্ট অংশ দেওয়ার পরই ভাইদের পালা আসে—এর আগে নয়।

 

৬) একমাত্র কন্যা থাকলে

মৃত্যুর পর (হেবা নয়): এক কন্যা পাবে ১/২; অবশিষ্ট যাবে নিকটতম পুরুষ আসাবার কাছে। (নিসা ৪ : ১১)

জীবদ্দশায় দিতে চাইলে: পুরো সম্পত্তি হেবা করা বৈধ, শর্ত—সুস্থ অবস্থায়, বাস্তব কবজা/দখল, এবং পরিবারের মৌলিক চাহিদা অক্ষুণ্ণ রাখা। সাক্ষী–দলিল নিরাপদ পন্থা।

 

৭) হেবা (জীবদ্দশায় দান)—সুন্নাহসম্মত নীতিমালা

অন্যায় বৈষম্য করবেন না; পরিবারের প্রয়োজন ফাঁকা করবেন না।

কবজা নিশ্চিত করুন (বাস্তব দখল/ভোগে দেওয়া)।

সম্ভাব্য সকল ওয়ারিশকে জানিয়ে/বোঝিয়ে নিন—পরিবারে সৌহার্দ্য বজায় থাকে।

লিখিত নথি/সাক্ষী/রেজিস্ট্রি—ভবিষ্যৎ বিরোধ রোধ করে।

 

৮) উইল (ওসিয়ত)—কখন ও কিভাবে

সীমা: মোট সম্পদের সর্বোচ্চ ১/৩।

সাধারণ নিয়ম: উত্তরাধিকারীর পক্ষে ওসিয়ত নয় (অন্য ওয়ারিশরা স্বেচ্ছায় রাজি হলে ব্যতিক্রম)।

ক্ষতি–উদ্দেশ্যে নয়: কুরআন “গায়রা মুদারর”—কারও ক্ষতি সাধন নয়—বলে সাবধান করেছে। (নিসা ৪ : ১২)

 

৯) আইন (দেশীয়) বনাম শরীয়ত—কী মনে রাখবেন

দেশের দেওয়ানি/রেজিস্ট্রি–আইনে জীবদ্দশায় হস্তান্তর করলে পরে দাবি–দাওয়া সাধারণত চলে না।

শরীয়তে ন্যায় ও হক রক্ষা–ই মাপকাঠি। সুতরাং “আইনগতভাবে পারি” মানে “শরীয়তসম্মত”—এটা সব সময় নয়। ন্যায়ভিত্তিক সিদ্ধান্ত নিন।

 

উপসংহার

ইসলামের মিরাস কাঠামো—স্পষ্ট, শর্তাধীন, সুবিচারপূর্ণ। জীবদ্দশায় দিলে—হেবা; ন্যায় ও কবজা জরুরি।

মৃত্যুর পর—মিরাস; সূরা নিসা ১১–১২ (এবং ১৭৬)–এর বিধান অপরিবর্তনীয়। উইল—১/৩ সীমায়, ক্ষতি–উদ্দেশ্যে নয়, সাধারণত ওয়ারিশের পক্ষে নয়। পরিবারে স্থায়ী শান্তি–সৌহার্দ্য রাখতে হলে আলোচনাই প্রথম ধাপ; দ্বিধা হলে যোগ্য আলেম/মু্ফতির কাছে নথিপত্রসহ রেফার করে নিন।

সংক্ষিপ্ত দলিল–তালিকা (রেফারেন্স)

কুরআন: সূরা নিসা ৪:১১, ৪:১২, ৪:১৭৬

সহিহ বুখারি/মুসলিম: নু‘মান ইবন বশীর (রা.)–এর হেবা সংক্রান্ত হাদিস (সন্তানদের মধ্যে ন্যায়/সমতা)

“গাইরা মুদারর” – ওসিয়তে ক্ষতিকর অনিষ্ট না–করার কুরআনি নিষেধ (নিসা৪ : ১২)

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP