সকল মেনু

সংসদ নির্বাচনের তফসিল : একটি প্রস্তাবনা

বাংলাদেশে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটা দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। এ নির্বাচনে নির্বাচিত সদস্যরা পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য রাষ্ট্রপরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত হন। সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনের মাধ্যমে গণপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দেশের আপামর জনসাধারণের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটে। জনগণের প্রত্যাশার সঠিক প্রতিফলনের জন্য সুষ্ঠু, অবাধ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক, প্রতিনিধিত্বশীল ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের নিশ্চয়তার বিধান একান্ত অপরিহার্য।

সার্বজনীন গ্রহণযোগ্য ও প্রতিনিধিত্বশীল নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সাংবিধানিক দায়িত্ব। জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশন প্রত্যেক নির্বাচনী এলাকা থেকে একজন সংসদ সদস্য নির্বাচনের লক্ষ্যে ভোটারদের আহ্বান জানিয়ে নির্বাচন আয়োজনের জন্য নিম্নরূপভাবে সরকারি গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে নির্বাচনের তফসিল বা সময়সূচি ঘোষণা করে।

১) রিটার্নিং অফিসার/সহকারি রিটার্নিং অফিসারের নিকট মনোনয়নপত্র দাখিলের জন্য শেষ তারিখ।
২) মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের জন্য এক বা একাধিক তারিখ।
৩) মনোনয়নপত্র বা প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সর্বশেষ সময়সীমার একটি তারিখ।
৪) ভোটগ্রহণের জন্য এক বা একাধিক তারিখ, যা মনোনয়নপত্র বা প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সর্বশেষ তারিখের অন্তত পনের দিন পর হতে হবে। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর এ পর্যন্ত ১২ বার জাতীয় সংসদ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

এই ১২টি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে সর্বশেষ ৩টি নির্বাচন অর্থাৎ ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন ব্যতীত ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত ৯টি নির্বাচনের সময়সীমা বা নির্বাচনী তফসিল সংক্রান্ত একটি চিত্র নিম্নে তুলে ধরে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন তথা ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর নির্বাচনের তফসিল জারির সম্ভাব্যতা নিরূপণের চেষ্টা করা যায়-

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময়সূচি সংক্রান্ত তথ্যাদি

জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভোটার সংখ্যা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ তফসিল ঘোষণা থেকে মনোনয়ন দাখিল পর্যন্ত সময়ের ব্যবধান মনোনয়নপত্র দাখিলে শেষ তারিখ মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের তারিখ প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ভোট গ্রহণের তারিখ তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে ভোট গ্রহণের তারিখ পর্যন্ত সময়ের ব্যবধান/প্রার্থিতা প্রত্যাহার থেকে ভোট গ্রহণের দিন পর্যন্ত সময়ের ব্যবধান লক্ষণীয় যে, চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট তিন বার এবং ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মোট চার বার সময়সূচি/তফসিল পুনঃনির্ধারণপূর্বক জারির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক অর্থাৎ সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে বাংলালাদেশ নির্বাচন কমিশন কর্তৃক সময়সূচি/তফসিল পুনঃনির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু বিগত স্বৈরাচারী সরকারের সময়ে অনুষ্ঠিত ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের তিনটি নির্বাচনেই প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল যাতে অংশগ্রহণ করতে না পারে অর্থাৎ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক না হওয়ার জন্য তফসিল অপরিবর্তীত রেখে তড়িঘড়ি করে সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছিল।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল সংক্রান্ত তথ্যাদি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তফসিল ঘোষণা থেকে ভোটগ্রহণের দিন পর্যন্ত সর্বোচ্চ ৮০ দিন এবং ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সর্বনিম্ন ৪২ দিনের ব্যবধানে ভোটগ্রহণের দিন ধার্য করা হয়েছিল। এবারের সম্ভাব্য নির্বাচনেও ৬০ থেকে ৮০ দিনের ব্যবধান রেখে তফসিল ঘোষণা করা যেতে পারে এবং প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সর্বশেষ তারিখ থেকে ভোটগ্রহণের তারিখের মধ্যে ৩০ দিনের ব্যবধান রাখা যেতে পারে, যা নির্বাচনের জন্য একটি আদর্শ তফসিল হতে পারে। ইতোপূর্বে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত প্রথম ৯টি নির্বাচনের তফসিল পর্যালোচনায় প্রতীয়মান হয় যে, ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির দ্বিতীয় সপ্তাহে ভোটগ্রহণের তারিখ নির্ধারণ করা হলে আগামী ডিসেম্বর ২০২৫’-এর প্রথম সপ্তাহে নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার তারিখ নির্ধারণই উপযুক্ত হতে পারে।

একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য গ্রহণযোগ্য তপসিল অপরিহার্য। অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলো যাতে অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি নেয়া, অপরাপর দলগলোর সঙ্গে বোঝাপড়া এবং ভোটযুদ্ধে নামার জন্য পর্যাপ্ত সময় পায়, সেদিকে খেয়াল রেখে মনোনয়নপত্র জমা, প্রতীক বিতরণ, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহর এবং ভোটগ্রহণের দিন ধার্য করা যুক্তিযুক্ত। মনে রাখা দরকার, দীর্ঘ পনের বছর একটি ফ্যাসিস্ট গোষ্ঠি বাংলাদেশের জনসাধারণকে ভোটাধিকার বঞ্চিত রেখেছিল। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থান গণতন্ত্রের দ্বার অবারিত করেছে। একই সঙ্গে এদেশের মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগও উন্মুক্ত করে দিয়েছে। জনগণ যাতে সে সুযোগকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে, নির্বাচন কমিশনকে সে নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP