নজরুল প্রয়াণ দিবস
মৃত্যু নাই, নাই দুঃখ, আছে শুধু প্রাণ।
অনন্ত আনন্দ হাসি অফুরান।।
নিরাশার বিবর হ’তে
আয় রে বাহির পথে,
দেখ্ নিত্য সেথায় আলোকের অভিযান।।
ভিতর হ’তে দ্বার বন্ধ ক’রে
জীবন থাকিতে কে আছিস্ ম’রে।
ঘুমে যারা অচেতন
দেখে রাতে কু-স্বপন,
প্রভাতে ভয়ের নিশি হয় অবসান।
আজ ১২ ভাদ্র, বাংলা সাহিত্যের সেই প্রাণপুরুষের ৫০তম প্রয়াণবার্ষিকী। ১৩৮৩ বঙ্গাব্দের এই দিনে কবির মহাকাব্যিক জীবনের অবসান ঘটে। দীর্ঘদিন নির্বাক থাকার পর ৭৭ বছর বয়সে ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। কবির প্রতি গভীর সন্মান। অসীম দোয়া-আল্লাহ কবিকে তাঁর সৃষ্টি কর্মের জন্য জান্নাতবাসী করুন। কাজী নজরুল ইসলাম ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দে তার বিখ্যাত গান ‘মৃত্যু নাই, নাই দুঃখ, আছে শুধু প্রাণ’ গানটি রচনা করেন। কবির বয়স তখন ৪০। এ গানের বাণী পাঠ করলে অতি সহজে বোঝা যায় যে, তিনি মৃত্যুকে জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মৃত্যু ভয় তো ছিলই না বরং তার মধ্যে খুঁজে পেয়েছিলেন অফুরন্ত প্রাণ। তিনি লিখেছেন, ‘মৃত্যু নাই, নাই দুঃখ,/ আছে শুধু প্রাণ/ অনন্ত আনন্দ হাসি অফুরান।’
হিন্দু পৌরাণিক কাহিনি অবলম্বনে জগৎঘটক রচিত উদাসী ভৈরব নাটিকায় ব্যবহৃত নজরুলের রচিত সূচনা সঙ্গীত। এই কাহিনি মতে দক্ষ একটি যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন। কিন্তু জামাতা শিবের প্রতি বিদ্বেষবসত, শিব এবং কন্যা সতীকে এই যজ্ঞে আমন্ত্রণ করেন নি। সতী তা জানতে পেরে অযাচিতভাবে এই যজ্ঞে যাওয়ার অনুমতি লাভের জন্য শিবের কাছে যান। এই সময় শিব ধ্যান মগ্ন ছিলেন। তাই তিনি শিবের ধ্যান ভাঙার জন্য যোগিনীদের সাথে নিয়ে ধ্যানমগ্ন শিবের সামনে উপস্থিত হন।

ধ্যানভঙ্গের পর শিব দুর্গাকে অনাহূতভাবে দক্ষযজ্ঞে যেতে নিষেধ করেন। দুর্গা সে নিষেধ উপেক্ষা করে দক্ষযজ্ঞে যান। সতীর অবর্তমানে শিব আকুল হলে, আশা দেবী তাঁকে আশার বাণী শোনান। কবি উদাসী ভৈরব নাটিকায় আশাদেবী একটি পৌরাণিক দেবী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এই দেবী সর্বদা আশার বাণী শোনান বলেই, তিনি আশা দেবী। নাটিকায় শিবের উক্তি থেকে এমন ধারণাই স্পষ্ট হয়ে উঠে। শিব দেবীকে বলেন-
তুমি চির মধুরভাষিণী, আশা। নিরাশার অন্ধকারে যখন সবে হাবুডুবু খায়, অকুল পাথারে যখন কূল কিনারার ক্ষীণ আভাসটুকু পর্যন্ত দৃষ্টি পথে আসে না, জীব যখন একান্ত মনে মৃত্যুর হাতে আপনাকে সঁপে বাঁচতে চায়, তোমার হাসির ক্ষীণ রেখাই তাকে তখন ফিরিয়ে আনে জীবনের উপকূলে। তার আবার বাঁচতে সাধ যায়। তুমি আশা, এই নিরাশার অন্ধকারে, আনো— আনো— নতুন দিনের আলো। তপস্যাক্লিষ্টা নিশীথিনীর ললাটে পরাও নবারুণের চন্দন টিপ।
সতীর বিরহে আকুল শিবকে আশা দেবী সান্ত্বনা দেন এই গানে। তিনি শিবকে শোনান অনন্ত আনন্দের কথা, যেখানে মৃত্যু নাই, নাই দুঃখ। আছে আনন্দময় জীবনের আস্বাদ। দেবী এই গানের মাধ্যমে নিরাশার অন্ধ-গহ্বর থেকে বাইরে এসে আনন্দময় আলোকিত জীবনের পথে চলার আহ্বান করছেন। নিজেকে অবরুদ্ধ করে থাকাটা যে বেঁচে মরে থাকার সামিল-সে কথায় স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তিনি। এই অবরুদ্ধ দশায় যারা অচেতন থাকে, তার দুঃস্বপন্ দেখে। এ অবরুদ্ধ জীবন কাল-রাত্রির মতো। সেখান থেকে বেরিয়ে এলে, সে কালরাত্রির অবসান হয়। শুরু হয় সুপ্রভাত। এ গানের মধ্য দিয়ে মূলত আশা দেবী সতীহীন শিবের মনে আশার সঞ্চার করার চেষ্টা করেছেন গানটির রচনাকাল সম্পর্কে সুনির্দিষ্টভাবে কিছু জানা যায় না। গানটি কাজী নজরুল ইসলাম, জগৎ ঘটক রচিত উদাসী ভৈরব নামক নাটকের জন্য লিখেছিলেন। নাটিকাটি ১৯৩৯ খ্রিষ্টাব্দের ১২ নভেম্বর (রবিবার, ২৬ কার্তিক ১৩৪৬), প্রাতঃকালীন অধিবেশনে ৯.১৫-৯.৫৯ মিনিট পর্যন্ত, কলকাতা বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়েছিল। এই সময় নজরুলের বয়স ছিল ৪০ বৎসর ৫ মাস।
মৃত্যু মানবজীবনের একটি অত্যন্ত করুণতম কষ্টকর অধ্যায়, যা মানুষের জন্য একেবারেই কাম্য থাকে না। এ অধ্যায়টিকে সাবলীলভাবে গ্রহণ করে নেওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক। এই জীবন পরিসমাপ্তিকে কেউ গ্রহণ করতে চায় না। জগত্সংসারে সুফি সাধনার চারটি পথপরিক্রমার কথা সবাই কমবেশি জানি, কিন্তু তা আত্মস্থ করতে পারে কয় জনা। তা বোঝাও কষ্টসাধ্য। স্রষ্টার যারা খুব প্রিয় তাদের জন্য পৃথিবী একটি কঠিন পরীক্ষাগার। এর সর্বোত্কৃষ্ট প্রমাণ আমাদের বিশ্বনবি হজরত মুহম্মদ (স.)। কবি নজরুল বিশ্বনবির গভীর প্রেমিক ছিলেন, তাঁকে নিয়ে রচনা করেছেন অজস্র গান ও কবিতা।
কবি লিখেছেন ‘তোমার নামের একি নেশা, হে প্রিয় হজরত, যত চাহি তত কাঁদি, মেটে না হযরত (আকাঙ্ক্ষা) আবার লিখেছেন, ‘মোহাম্মদ মোর নয়ন মণি, মোহাম্মদ নাম জপমালা’, ‘আমি যদি আরব হতাম মদিনারই পথ, এই পথে মোর চলে যেতেন নূর নবি হজরত’, ‘ঐ নাম জপলেই বুঝতে পারি খোদায়ী কালাম’। খোদার কাছে পৌঁছানোর বিশ্বাস কতটা দৃঢ় ছিল, তিনি লিখেছেন ‘ঐ নামেরি রশি ধরে যাই আল্লার পথে’, ‘ঐ নামের বাতি জ্বেলে দেখি আরশের মোকাম (আবাস, আস্তানা)। আবার লিখেছেন ‘রসুল নামের রশি ধরে যেতে হবে খোদার ঘরে’ অর্থাত্ নবিজির শাফায়েত বিনা কেউ ত্বরান্বিত হতে পারবে না। অন্য একটি গানে কবি লিখেছেন-
সুন্দর বেশে মৃত্যু আমার
আসিলে কি এতদিনে?
বাজালে দুপুরে বিদায় পুরবি
আমার জীবন-বীণে!
ভয় নাই রানি, রেখে গেনু শুধু
চোখের জলের লেখা,
রাতের এ লেখা শুকাবে প্রভাতে;
চলে যাব আমি একা!
গানে গানে কবি তার সমস্ত সত্তাভরে উপলব্ধির বাণী প্রকাশ করে গেছেন, যা যতদিন পৃথিবী বেঁচে থাকবে, বাঙালির অস্তিত্ব থাকবে এ ধারা চলবে। এটিও তার জন্য একটি বড় সাদাকা বটে। তার প্রস্থান দিবসে তার আত্মা প্রশান্তিতে ভরা থাক— এই কামনা রইল। ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ৪১ বছরের, সে সময় তিনি মৃত্যুর পরবর্তী সমাধান দিয়ে গেলেন গানে গানে—‘মসজিদেরই পাশে আমার কবর দিও ভাই’। যদি প্রশ্ন করা হয় কেন? তিনি লিখেছেন, ‘যেন গোরে থেকেও মোয়াজ্জেনের আজান শুনতে পাই’ আজানের ধ্বনির প্রতি কী তৃষ্ণা, কী গভীর প্রেম স্রষ্টার প্রতি! গানটি এইচএমভিতে ১৯৪০ খ্রিষ্টাব্দে মো. কাসেম কণ্ঠ দেন, সুর করেছিলেন কবি নিজেই। তার সে মনোবাসনা পূর্ণ হয়েছে ভাবতে সত্যি ভালো লাগে। বহু বাসনার প্রাপ্তিবঞ্চিত কবির সর্বশেষ বাসনা পূর্ণতা পেয়েছে। করুণাময় আল্লাহ্ তাকে জান্নাতে দাখিল করুন।
২১ বছরের যুবক কীভাবে এক রাতে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনা করে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন? কে ছিলেন তিনি, যিনি ধূমকেতুর মতো এসে আবার মিলিয়ে গেলেন সহসা। স্রষ্টার কতটা সযত্নে গড়া ছিলেন তিনি! আবার স্রষ্টা তার ভরা তরিকে ভরাডুবি করে বাঁচিয়ে রেখেছিলেন দীর্ঘ ৩৪টি বছর। যাকে দেখে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসিয়েছে প্রতিটি বাঙালি। তার সুস্থ ৪২টি বছর, কতটা ভালো কেটেছিল! দুঃখ-দারিদ্র্য, ব্রিটিশ নির্যাতন, সাম্প্রদায়িকতার কতটা কটাক্ষ, লেখক সম্প্রদায়ের হীনম্মন্যতার কশাঘাত। কী ঘটেনি! এত কিছুর পরও কবি তার অফুরান প্রাণশক্তিকে চিরোজ্জীবিত করে লিখেছেন ‘হে দরিদ্র তুমি মোরে করেছ মহান’ মহানুভবতার সূত্রটি কি বিস্ময়কর! সর্বসাধারণ মানুষ ‘দারিদ্র্য’কে অভিশাপ বলে আখ্যায়িত করেন। লক্ষণীয় মহান মানুষের কাছে জীবনের প্রতিটি বাস্তবতা একেকটি মহান শিক্ষা, স্রষ্টা সে অলৌকিক জ্ঞান দিয়েই তাদের পৃথিবীতে পাঠান।
দিনের আলোকে ভুলিয়ো তোমার রাতের দুঃস্বপন,
ঊর্ধ্বে তোমার প্রহরী দেবতা,
মধ্যে দাঁড়ায়ে তুমি ব্যথাহতা,
পায়ের তলার দৈত্যের কথা ভুলিতে কতক্ষণ?
ভুলিতে পারি না। ভুলিতে চাহি না হে প্রিয় কবি। তোমার সৃষ্টি কর্ম তোমাকে সারাটা জীবন আমাদের কাছে বাঁচিয়ে রাখবে। তোমার লেখনি। তোমার চিন্তা। তোমার সাহিত্যে বিচরণ আমাদের জন্য প্ররণা, আমরা তোমাকে বাঁচিয়ে রাখব, ধারণ করব সারাটা জীবন। এই জীবনে তুমি বাংলা সাহিত্য তথা, ইসলামের জাগরণে যেই ভূমিকা রেখেছ তার ঋণ শোধবার ক্ষমতা কারো নাই। ওপারেও তুমি ভালো থেকো প্রিয় কবি। তোমার প্রতিটি চিন্তা লেখনি শক্তি তোমাকে ভালো ও নিরাপদে রাখুক-প্রত্যাশা থাকল।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।