রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি ও কার্যকর সমাধান হলো স্বেচ্ছাসেবী, মর্যাদাপূর্ণ এবং নিরাপদ প্রত্যাবাসন। বাংলাদেশ উদারতার সঙ্গে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের আশ্রয় দিয়েছে, কিন্তু এই সংকট শুধু বাংলাদেশের নয়; এটি একটি আন্তর্জাতিক সমস্যা। সমস্যা সমাধানে আন্তর্জাতিক মহলের দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বললে চলে।
সর্বশেষ বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে এ পর্যন্ত এক লাখ ৮০ হাজার জনকে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত করেছে দেশটি। তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য উপযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। গত এপ্রিল মাসের শুরুতে থাইল্যান্ডে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার রোহিঙ্গা বিষয়ক হাই রিপ্রেজেন্টেটিভ খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকে বসেন মিয়ানমারের উপপ্রধানমন্ত্রী উ থান শিউ। মি. শিউ দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করছেন। ওই বৈঠকেই তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিকে রোহিঙ্গাদের নিয়ে তথ্যটি জানিয়েছেন। কিন্তু এরপর আর কোন অগ্রগতি আমরা দেখিনি।
জানা গেছে, কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফের ৩৩টি আশ্রয়শিবিরে ১৩ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। প্রতিদিনই সীমান্তের স্থল-জলের কোনো না কোনো পয়েন্ট দিয়ে আসছে রোহিঙ্গা। এমন প্রেক্ষাপটে রোহিঙ্গা ঢলের অষ্টম বর্ষপূর্তির দিনে কক্সবাজারে অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘রোহিঙ্গা বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্মেলন’। কক্সবাজার সাগরপাড়ের ইনানী সেনা রেস্টহাউসে ২৪ আগস্ট কক্সবাজারে শুরু হওয়া এ সম্মেলনে ২৫ আগস্ট যোগ দেবেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
গেল রমজানে জাতিসংঘ মহাসচিব গুতেরেসকে পাশে বসিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূস ঘোষণা দিয়েছিলেন আগামী রমজানের (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) ঈদ রোহিঙ্গারা স্বদেশে (রাখাইন) করবেন। এবারও প্রধান উপদেষ্টার সফর নিয়ে রোহিঙ্গারা নতুন করে আশায় বুক বাঁধছেন। শুধু ক্যাম্প নয়, গোটা কক্সবাজার জেলায় এখন আলোচনা চলছে প্রধান উপদেষ্টার এ সফরের মাধ্যমে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানের কোনো উপায় বের হবে কি না?
এমন বাস্তবতায় মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মি ও সশস্ত্র বাহিনীর মধ্যে সহিংসতায় আবারও বাংলাদেশমুখী হচ্ছে রোহিঙ্গারা। সম্প্রতি কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের আশ্রয়শিবিরে নতুন করে আসা রোহিঙ্গারা আশ্রয় নিয়েছে। সরকারি হিসাবে তাদের নাম নেই।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারে এখন পর্যন্ত অনুপ্রবেশকারী রোহিঙ্গা প্রায় ১৩ লাখ। এর মধ্যে ৮ লাখ এসেছে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পরবর্তী কয়েক মাসে। আট বছরে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। এ অবস্থায় আবার তাদের অনুপ্রবেশ ঘটছে। টেকনাফ রোহিঙ্গা ক্যাম্প সূত্র জানায়, গত এক সপ্তাহে কমপক্ষে ২০০ জনের অধিক রোহিঙ্গা কক্সবাজারে অনুপ্রবেশ করেছে।
প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম জানান, আগামী ২৪, ২৫ ও ২৬ আগস্ট কক্সবাজারে রোহিঙ্গা বিষয়ে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সরকার রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং এ বিষয়ে আমরা বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে কাজ করছি। সেই ধারাবাহিকতায় রোহিঙ্গা সংকটকে আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আনতে তিনটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনের আয়োজনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, তার প্রথমটি ২৪ আগস্ট শুরু হবে, এরপর ৩০ সেপ্টেম্বর সবচেয়ে বড় সম্মেলন হবে জাতিসংঘে। সেখানে আশা করছি ১৭০টি দেশ অংশ নেবে। তারপর আমরা আরেকটা বড় সম্মেলন আশা করছি কাতারের দোহাতে। সরকারের এমন উদ্যোগে আশাবাদী হওয়া যায়?
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বৈশ্বিক ও ভূরাজনৈতিক নানা বাস্তবতায় ঘুরপাক খাচ্ছে। এর আগের ঐতিহাসিক সংকটগুলোর আলোকে বাংলাদেশ কোনো রোহিঙ্গা নীতি বা শরণার্থী নীতি তৈরি করেনি। প্রত্যাবাসন চেষ্টা ব্যর্থ হলে বিকল্প রোডম্যাপ কী হবে, সে পরিকল্পনা বাংলাদেশের নেই। বিষয়গুলো নিয়ে ভাবনায় সময় এসেছে বৈকি।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।