কবি আফরোজা হীরা’র পাঁচ কবিতা
তৃষ্ণার্ত পথিক
সতীর্থ, বহু পথ পেরিয়ে এসে একদিন বুঝতে পারলাম!
আমাদের গন্তব্য আসলে এক।
যে ফুলের ঘ্রাণে মাতাল হয়ে তুমি ছেড়েছিলে আবাসভূমি,
সেই একই সুবাস আমাকেও টানে সুতীব্র ভাবে।
তোমারই মতন, সমতালে আমিও ভুলি অস্তিত্ব নিজের…
ঠিক যেনো অগ্নিশিখার পানে ছুটে চলা পতঙ্গের মতন,
পুড়তে পারলেই সুখ।
সেখানেও তোমার আমার গতিবেগ সমান।
একই সৌরজগতের বাসিন্দা হয়েও দুরত্ব যোজন যোজনের,
আমাদের সূর্য এক,
অথচ এক হতে পারিনা আমরা!
শুধু একটিবার তোমাকে ছুঁয়ে দেখার আকাঙ্খায়
আমার আঙ্গুলগুলো ছটফট করেছে তৃষ্ণার্ত পথিকের মত।
আমি বটবৃক্ষের মত ঠায় দাঁড়িয়ে থেকেছি
ক্লান্ত হয়ে একদিন আমার ছায়ায় আশ্রয় নেবে বলে।
কেবল তোমার জন্য বুকের জমিনে আবাদ করেছি সুজলা সুফলা সতেজ ক্ষমা।
বিশ্বাস কে আগলে রেখেছি সুতীব্র ভাবে,
একদিন ফিরবে তুমি এই পথে।
কত-শত পরিবর্তন হয় রোজ চারিদিকে!
প্রতিবেশী দেশ স্বীকৃত বন্ধু থেকে রুপান্তরিত হয় শত্রুতে,
পাকিস্তানকেও ক্ষমা করে বুকে টেনে নেয় বাংলাদেশ,
শুধু তোমার আমার ভালোবাসা হয়না।
প্রত্যাশা
প্রিয়তম বন্ধু আমার,
মধ্য দুপুর, খড়তাপে পুড়ছে চারিধার।
এরই মাঝে দেখি সময়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে
দাউদাউ আগুনে পুড়ছে কৃষ্ণচূড়ার ডালগুলো।
তার আঁচ ছড়িয়ে গেছে প্রতিপক্ষের অন্তঃকরণে।
বিশুদ্ধ অক্সিজেনের বদলে কার্বন ডাই অক্সাইড ধোয়াশা আমাদের আকাশ।
তোমার শহর ছুঁয়ে উড়ে আসা একটুকরো মেঘের আশায়-
আমি চাতক পাখী।
সবার অলক্ষ্যে গভীর টানে বাতাসকে পুরে নিই ফুসফুসের ভিতর।
যদি সেথায় তোমার বুকের গন্ধ মিশে থাকে!
একটা সময় টের পাই, বাতাসে পোড়া বিবেকের গন্ধ!
এখন প্রতিটি ঘটনা যেনো মেট্রোরেলের গতিতে ছুটছে,
প্রচণ্ড গতিতে ধাবমান…
এসো, যার যার অবস্থানে আমরা কেবল ঠায় দাঁড়িয়ে থাকি,
সুদিন ফিরবেই।
কত শত বিপ্লব, আর-
বছরের পর বছর প্রসব যন্ত্রণায় ভুগে, বারবার জন্ম দিয়েছি আমরা রাক্ষস খোক্কসদের।
এই পৃথিবী কেবল সুযোগসন্ধানীদের জন্যই স্বর্গরাজ্য।
বিপ্লবী বন্ধু আমার,
ভুলে যেওনা, দেশপ্রেমের উল্টো পিঠে থাকে বুলেট অথবা ফাঁসির দড়ি।
সিরাজের দীর্ঘশ্বাস আজো মিশে আছে বাংলার মসনদে।
তবু প্রতিটি ভোরে জেগে উঠি আমরা ফুল ফোটানোর প্রত্যাশায়।
আমাদের শিশুরা সেথায় উড়ে বেড়াবে প্রজাপতি হয়ে।
আমাদের মাটিকে আমরা আবার উর্বর করবো।
তোমার আমার যৌথ স্লোগানে কেঁপে কেঁপে উঠবে কালোবাজারির বুক।
ভয়ে কুঁকড়ে যাবে শিশুখাদ্যে বিষ মেশানো হাত,
মসনদ থেকে- চার দেয়ালের লোহার শিক
সব থাকুক আমাদের দখলে…
শেয়ালেরা ভোগ করুক সাময়িক সুবিধা।
সমাজের কন্টকময় পথ আমাদের হোক।
মধ্য দুপুর
এখন আমি একলা থাকি
সকাল হতে সন্ধ্যে বেলা,
হাঁড়িকুঁড়ি সবই আছে আগের মতোই, শুধু-
মাঝ দুপুরে সাঙ্গ হল সকল খেলা…
এখন আমার ছোট্ট ঘরে
চাঁদ ওঠেনা,
নরম নরম ছোট্ট পায়ে
এই ঘর থেকে ওই ঘর পানে, কেউ ছোটেনা।
এখনো ঠিক অনেক কিছু আগের মতই,
সূর্য ডোবে, সকালও হয়।
শুধু কেবল ভোর আসে না,
এমনি করে শীত গ্রীষ্ম পার হয়ে যায়…
এখন আমার আকাশ জুড়ে রোদের খেলা
ডানা মেলে ভরদুপুরে পুড়ছি একা
বাতাস এসে হাত ছুঁয়ে যায়
তবু যেনো দিনের শেষে একলা থাকা!
এখন আমি জানালাগুলোর খিল এঁটে দেই
মাতাল করা বৃষ্টি এলে আষাঢ় মাসে,
চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়াতেই
ভাবনাগুলো উড়ে এসে সেথায় মেশে।
এখন আমার ছুটির বিকেল পার হয়ে যায়-
হিসেব কোষে,
আঁধার এলে জীর্ণ এ নাও
বাঁধবো কিসে!
মেঘের পরে মেঘ
নিখিলেশ, ক্যালেন্ডারের পাতায় শরত এসেছে।
ফেসবুকের হোমপেইজ জুড়ে ফুটেছে থরে থরে কাশ…
কথা ছিলো বর্ষায় স্থগিত নিমন্ত্রণ পত্রটায়- এই শরতেই ঠিকানা লেখার।
কিন্তু, করোনা নামক এক অদৃশ্য জীবাণু কেড়ে নিয়েছে ঘ্রাণশক্তি।
চা, কফির আর ফারাক বুঝিনা এখন।
সন্ধ্যে হলে আমার আঙ্গিনায় আজকাল আর শিউলি ফোঁটে না
তবে, রাত গভীর হলে মাথার ভিতরে শাঁ শাঁ করে অনবরত শব্দ ফোটায় বোমারু বিমান,
নিজেই নিজের মাথায় সান্তনার হাত বুলাই, আর মন্ত্রের মত জঁপি-
যুদ্ধক্ষেত্রে কোনো অভিমান থাকতে নেই, অভিযোগ ও না,
সেখানে কেবল টিকে থাকার জন্য লড়তে হয়।
নিখিলেশ, কেমন আছিস বন্ধু আমার?
এই শরতেও আমার আকাশ প্রতিনিয়ত কালো মেঘেরা ঘিরে থাকে,
সূর্যের প্রত্যাশায় আমি দ্রুত পা চালাই, মেঘও আমার পায়ে পা রেখে পথ চলে,
কখনোবা বাতাসের ধাক্কায় সামান্য সরে যায়,
তখন আবার পিছন থেকে আরো একটা এসে হাজির হয়…
আজকাল আমি আকাশের দিকে মুখ করে পথ চলি,
অপেক্ষা, দূর্যোগের মেঘ সরে যাবার,
তখন আবার মনে পড়ে, অনেকদিন আগে একটা বাংলা সিনেমা দেখেছিলাম,
যার নাম ছিলো- মেঘের পরে মেঘ।
বাহ্যিক
মনের মধ্যে রাশিরাশি মেঘ জমা করে-
বহুদিন ঝিম মেরে বসে থেকে দেখেছি,
আপনজনেরা তা বুঝতেই পারেনি,
একরাশ বিষন্নতা কাঁধে নিয়ে রোজ রাতে শিশুপার্কের ফুটপাথ ধরে একলাই হেঁটে গেছি,
আমার সে ক্লান্ত পায়ের গোড়ালির ফাঁটল কেউ ফিরেও দেখেনি।
তীব্র খরায় বুকের জমিন ফেঁটে চৌচির হয়েছে ভরা চৈত্রের মাঠের মত…
ভালোবাসা নামক একফোঁটা জল কেউ এগিয়ে ধরেনি সামনে।
আমার যখন পুড়েছে দাবানলে এক একটি স্বর্ণালী দিন,
তোমাদের চারপাশ বসন্তে রঙিন..
মাঘের দুঃসময়েও বিবস্ত্র পত্র পল্লবহীন খাঁ খাঁ রোদ্দুরে একলাই দাঁড়িয়ে থেকেছি অর্জুনের মত।
সুযোগ বুঝে তুলে নিয়েছো ছাল বাকল,
ছেঁড়ে গেছো কেবল দগদগে ক্ষত…
আমার এক’শত তিন ডিগ্রী তাপে পুড়ে যাওয়া কপাল,
অন্ধকার রাতে দুঃস্বপ্ন নিয়ে জেগে ওঠার পর শুকিয়ে যাওয়া কণ্ঠনালী,
আর রোজ ভোরে চোখ মেলে শূন্যতার হাহাকার কেউ চেয়ে দেখেনি,
ওরা কেবল লক্ষ্য করেছে-
কখন আমি পায়ে নুপুর পড়েছি !
এড়িয়ে গেছে জল, খুঁজেছে কাজল..
অথবা মনের কোণে জমে থাকা অমাবস্যা ঢেকে দেওয়ার প্রচেষ্টায় কালেভদ্রে ঠোঁটে আঁকা লিপস্টিকের রং..
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।