সকল মেনু

গল্প: প্রমীলা

গভীর রাত। বাইরে তুমুল ঝড়-বৃষ্টি। ঝড়ের তোড়ে গাছপালা ভেঙে পড়ার শব্দ ভেসে আসছে। কিছু বড় গাছ রাস্তার ওপর আড়াআড়িভাবে পড়ে আছে। মেঘের তর্জন গর্জনে আকাশ যেন ভেঙে পড়ছে! বেপরোয়া বিজলি চমকানিতে আঁতকে ওঠেন কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি আর হাঁটতে পারছেন না। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়াতে শরীরে আর এক রতিও শক্তি নেই। পা যেন আর চলছেই না। হাঁটু ভেঙে আসছে। বৃষ্টিতে ভিজে একেবারে জবুথবু অবস্থা। ঠাণ্ডায় দুই পাটি দাঁত সমানে বাড়ি খাচ্ছে। ঝড়-বৃষ্টিতে নাস্তানাবুদ নজরুলের এখন সম্বল শুধু মনের জোর।

আকাশের ভাব দেখে মনে হচ্ছে, ঝড় সহসাই থামবে না। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া মাথায় নিয়েই নজরুলকে আরো ক্ষাণিকটা পথ হাঁটতে হবে। কিন্তু পথ কিছুতেই ফুরায় না। মুরাদনগরের দৌলতপুর গ্রাম থেকে কুমিল্লা শহরের দূরত্ব পঁয়ত্রিশ কিলোমিটারের কিছু বেশি। ঝড়ের মধ্যেই এই দীর্ঘ পথ পায়ে হেঁটে পাড়ি দেন তিনি। কোথাও বসে যে একটু জিরিয়ে নেবেন তারও কোনো উপায় নেই। কোনো বাড়িঘরও দেখা যাচ্ছে না। রাস্তার দুই পাশে শুধু বন আর বন।

নজরুলের ধারণা, সেন বাড়িতে পৌছতে তার আর বেশি সময় লাগবে না। আর কিছুটা পথ হাঁটলেই পৌঁছে যাবেন। তিনি মনকে সান্তনা দেন। দুর্বল মনকে শক্ত করেন। মনের শক্তি শরীরে সঞ্চারিত করার চেষ্টা করেন। তিনি বুঝতে পারছেন তার শরীরে জ্বর এসে গেছে। মাঝে মধ্যে শরীরটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠছে। তারপরও তার হাঁটা থামে না।

দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে শরীর একেবারে নেতিয়ে গেছে। আর চলতে পারছিলেন না। ঘরের দরজায় এসে আছড়ে পড়লেন কাজী নজরুল। কিছুটা সময় দম নিলেন। ঘন ঘন নিঃশ্বাস তখন একটা ব্যবস্থা হবেই। কিছুক্ষণ তিনি ঘরের দরজায় ঠকঠক করে আওয়াজ করেন। তার ঠকঠকানি বাইরের ঝড়-বৃষ্টির আওয়াজে যেন মিলিয়ে গেল! কেউ কানে পৌঁছল কি না বোঝা গেল না। ঘরের ভেতর থেকে কারো কোনো সাড়াশব্দই গাওয়া গেল না। অতো রাতে কে দরজা খুলবে? কেউ তো তার জন্য জেগে নেই। তিনি আবার ঠকঠক আওয়াজ শুরু করলেন। ঝড়-বাতাসের আওয়াজে এবারও নজরুলের দরজায় ঠকঠকানির শব্দ একাকার হয়ে গেল। কারো কানে আওয়াজ পৌঁছল না। তিনি আর নিজেকে স্থির রাখতে পারছেন না। জ্বর যেন জেঁকে বসেছে। মস্তকের ভেতরে কামরাচ্ছে। ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে তার। তিনি আবারও দরজার কড়া নেড়ে মা মা করে ডাকলেন। অনেকক্ষণ ধরে দরজা ধাক্কানোর পর হঠাৎ ঘরের ভেতর থেকে আওয়াজ আসে, কে? কে?

নজরুল ভাঙা ভাঙা গলায় বললেন, মা আমি: আমি আপনার ছেলে মা।

ঘুমের রেশ তখনো বিরজা দেবীর চোখে। কিন্তু মা মা আওয়াজটাও তার কানে বাজে। তিনি বিছানা থেকে লাফিয়ে উঠলেন। স্বপ্নের ঘোরে মানুষ অনেক সময় এমনটি করে। কিছুক্ষণ বিছানায় বসে থেকে বিরজা দেবী মনে মনে বললেন, এ আমি কি স্বপ্ন দেখলাম! তিনি তার মাথার পাশে রাখা হারিকেন হাতে নিলেন। হারিকেনের আলোটা বাড়িয়ে চারদিকে তাকালেন। সত্যি সত্যি কেউ দরজা ধাক্কাচ্ছে কি না তা কানখাড়া করে বোঝার চেষ্টা করলেন। এবার স্পষ্টই দরজা ধাক্কানোর শব্দ শুনতে পেলেন। তিনি হারিকেন হাতে নিয়ে দরজার সামনে এগিয়ে গেলেন। তারপর আবার জানতে চাইলেন, কে কে ? কে দরজা ধাকাচ্ছে?

কাজী নজরুর জ্বরে কাঁপছেন। ঠিক মতো মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছিল না। তিনি অনেক কষ্ঠে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বললেন, মা, মা আমি নজরুল। আপনার ছেলে। দরজা খোলেন মা। বড় বিপদে পড়ে আপনার কাছে ছুঁটে এসেছি।

এতো রাতে নজরুল আসবে কোথেকে । গত রাতে তার বিয়ের আসরে থাকার কথা। কথাটা ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না বিরজা দেবীর। তারপরও তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, এতো রাতে…

বিরজা দেবী কথা শেষ করার আগেই নজরুল বললেন, মা আগে দরজা খোলেন। তারপর সব খুলে বলছি।

বিরজা দেবী দরজার কাছে দাঁড়িয়ে কান খাড়া করে নজরুলের কথাগুলো বোঝার চেষ্টা করেন। মনে মনে বলেন, আমি কোনো স্বপ্ন দেখছি না তো। সত্যিই নজরুল এসেছে? এতো রাতে ঝড় বৃষ্টি মাথায় নিয়ে সে কেন আসবে? সত্যিই নজরুল এসেছে? আসে। কিন্তু এটা তো নজরুলের কণ্ঠের মতোই মনে হলো। দরজা কি খুলব; নাকি কাউকে ডেকে তুলব?

বিরজা দেবীর মনে সন্দেহ সংশয় কাটল না। ভূত-প্রেতের ভয়ে দরজা খোলার সাহস পাচ্ছেন না। তিনি দরজার সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছেন। এর মধ্যে আবার দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ পেলেন। ভাঙা ভাঙা কন্ঠে ভেসে এলো কয়েকটি শব্দ। মা আমি! আমি আপনার ছেলে নজরুল।

বিরজা দেবী তৎক্ষণাৎ দরজা খুলে বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, নজরুল! বাবা তুমি এতো রাতে! এই ঝড়ের মধ্যে। কোনো সমস্যা! সমস্যা না হলে তুমি এই ঝড়ের মধ্যে কেনই বা আসবে? এসো এসো ভেতরে এসো।

নজরুল কোনো মতে সিঁড়িতে পা রাখলেন। বিরজা দেবী হাত বাড়িয়ে নজরুলের হাতটা শক্ত করে ধরলেন। বিরজা দেবীর শক্তিতে তিনি সিঁড়ি ভাঙতে সক্ষম হলেন। নজরুলকে বসতে দিয়ে বিরজা দেবী ভেতরের ঘরে গেলেন শুকনো কাপড় আনতে। দ্রুতই নিয়ে এলেন। নজরুলের হাতে দিয়ে বললেন, এই ধরো, কাপড় পাল্টে নাও। আর শোন, তাওয়াল দিয়ে শরীর ভালো করে মুছে নেবে। মাথাটা ভালো করে মুছবে। এক ফোঁটাও যেন পানি না থাকে। তাহলে ঠাণ্ডা লেগে যেতে পারে।

বিরজা দেবী আবার ঘরের ভেতরে গেলেন। কী করা যায় এক মুহূর্ত ভেবেই তিনি রান্নাঘরে দৌড়ে গেলেন। দুধের হাঁড়ি চুলায় চাপালেন। হাঁড়ি থেকে গ্লাসে দুধ ঢাললেন। তারপর দুধের গ্লাস নিয়ে আবার সামনের ঘরে এলেন। ততক্ষণে নজরুলের কোঁকানি শুরু হয়ে গেছে। নজরুল বিছানায় শুয়ে কেবল কোঁকাচ্ছে। বিরজা দেবী মনে মনে বললেন, জ্বর বুঝি এসে গেলো। তিনি নজরুলের কপালে হাত রেখে চমকে উঠলেন। ওমা। যা ভাবছিলাম তাই তো। শরীরে জ্বর মনে হচ্ছে। নজরুল, দুধটা খেয়ে নাও তো। তারপর শুয়ে পড়ো।

নজরুল দুধ খাওয়ার ব্যাপারে গড়িমসি করছিল। কিন্তু বিরজা দেবী এক রকম জোর করেই তাকে দুধ খাওয়ালেন। তাকে বিছানায় শোয়ার ব্যবস্থা করলেন। পাতলা কাঁথা গায়ে দিয়ে দিলেন। এতে নজরুল কিছুটা আরামবোধ করছিল। হয়তো গরম দুধ পেটে যাওয়াতে নেতানো শরীরে কিছুটা শক্তি ফিরে পেয়েছে। তিনি বিরজা দেবীকে উদ্দেশ করে বললেন, মা আপনি এখন যান। আমার আর অসুবিধা হবে না। আমি ঠিক সুস্থ হয়ে উঠব।

বিরজা দেবীর মন সায় দিল না। তিনি মনে মনে বললেন, জ্বর আরো বাড়তে পারে। জ্বর নামাতে মাথায় জল দিতে হবে। জল জ্বরের জম। জ্বর নামাতে এর চেয়ে ভালো কোনো টনিক নেই। দেশ-গ্রামে জ্বরজারির একমাত্র ওষুধই হচ্ছে মাথায় জল দেওয়া। অতিরিক্ত জ্বর যাতে মাথায় উঠতে না পারে। সেজন্য প্রতি বাড়িতেই ফুটো করা হাঁড়ি থাকে। বিরজা দেবীর ঘরেও ফুটো কলসি আছে। তিনি দেরি না করে কলসি খুঁজে বের করলেন। বালতিতে জল এনে সামনের ঘরে রাখলেন। জ্বর বাড়লেই কলস টাঙিয়ে জল দেওয়া হবে-সেই প্রস্তুতি নিয়ে রাখলেন। তবে নজরুলের পাশে একজনকে থাকতে হবে। কাকে রাখা যায়-এমন চিন্তা মাথায় আসার সঙ্গে সঙ্গেই আশালতার কথা মনে পড়ল। আশালতা সেনগুপ্ত। বিরজা দেবীর দেবর বসন্ত কুমার সেনগুপ্তের মেয়ে। বসন্ত কুমার অনেক আগেই গত হয়েছেন। স্বামীহারা গিরিবালা সেনগুপ্ত একমাত্র মেয়ে আশালতাকে নিয়ে এই বাড়িতেই থাকেন। আশালতা পাশের ঘরে সে ঘুমিয়ে আছে।

বিরজা দেবী আশালতার ঘরে গেলেন। তাকে ডেকে তুললেন। তাকে নজরুলের কথা খুলে বললেন। আশালতার ঘুমের রেশ তখনো কাটেনি। সে ঘুমঘুম চোখে বারবার হাই তুলছিল। বিরজা দেবী তাকে বললেন, তুই চোখেমুখে একটু জলের ঝাপটা দিয়ে আয়। তা না হলে তোর ঘুমের রেশ কাটবে না।

আশালতা চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিয়ে বিরজা দেবীর কাছে ফিরে এলো। তাকে নিয়ে তিনি সামনের ঘরে গেলেন। তাকে চেয়ার এগিয়ে দিয়ে বললেন, তুই এখানে বসে থাকবি। কিছুক্ষণ পরপর নজরুলের কপালে হাত দিয়ে জ্বর দেখবি। জ্বর বাড়লে মাথায় জল দিতে হবে। সেই সঙ্গে কপালে জলপট্টি দিতে হবে। তা না হলে জ্বর বেড়ে যাবে। জ্বর বেশি বেড়ে গেলে বিপদ হয়ে যাবে। কোনো রকম অবহেলা করা যাবে না। কোনো সমস্যা হলে আমাকে ডাকবি। আমার কথা বুঝতে পেরেছিস তো।

আশালতা মাথা নেড়ে বিরজা দেবীর কথায় সায় দিল।

২.

কাজী নজরুল জ্বরে কাঁপছেন। থরথর করে কাঁপছেন। জ্বরে তিনি প্রলাপ বকছেন। হঠাৎ হঠাৎ ঝুঁকিয়ে উঠছেন। ঝোঁকানির শব্দটা অদ্ভুত ধরনের। হঠাৎ শুনলে যে কোনো মানুষ ভয় পেয়ে যাবে।

জ্বর নামানোর জন্য হাঁড়ি টাঙিয়ে তার মাথায় অনবরত জল দেওয়া হচ্ছে। যে কোনোভাবেই হোক: জুর নামাতে হবে। আর জ্বর নামানোর একমাত্র ওষুধ জল চিকিৎসা। আধাঘন্টা ধরে জল দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু তারপরও মাথা ঠাণ্ডা হচ্ছে না। মাথা দিয়ে যেন আগুন বের হচ্ছে। কপালে জলপট্টি দেওয়া হয়েছে। মহর্তের মধ্যে ভেজা কাপড় শুকিয়ে যাচ্ছে। আশালতা কিছুক্ষণ পরপর জলপট্টি পাল্টে দিচ্ছে।

বিরজা দেবী এর মধ্যে বেশ কয়েকবার নজরুলকে দেখতে এসেছেন। উদ্বিগ্ন হয়ে তিনি নজরুলের মাথা ও কপালে হাত রাখেন। জ্বরের মাত্রা দেখে বিচলিত হয়ে ওঠেন তিনি। নজরুলের প্রতি তার অসম্ভব মায়া তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে মা ডাকার পর থেকে তিনি নজরুলকে নিজের সন্তানের মতোই জানেন।

মাস তিনেক আগে কাজী নজরুল যখন প্রথম এই বাড়িতে আসেন তখন বিরজা দেবীর মাতৃস্নেহ তাকে আবেগাপ্লুত করে। সেই আবেগের মুহূর্তে তিনি তাকে মা বলে সম্বোধন করেন। বিরজা দেবীও মায়ের আঁচলে ঠাঁই দেন তাকে। বিপদে পড়ে সেই মায়ের কাছেই ফিরে এসেছেন তিনি।

বিরজা দেবী আশালতাকে ঘুম থেকে ডেকে তুলে নজরুলের সেবা করার দায়িত্ব দিয়েছেন। আশালতা বিরজা দেবীকে তার মায়ের চেয়েও বেশি মানে। তিনি যা বলেন তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। রাতের ঘুম তুচ্ছ করে সে ছুটে এসেছে নজরুলের কাছে। বিরজা দেবী যে যে নির্দেশনা দিয়েছেন তা সে বেদবাক্যের মতো মান্য করে চলছে।

বিরজা দেবী আশালতাকে কিছু নির্দেশনা দিয়ে ভেতরের ঘরে যান। যেতে যেতে তিনি ভাবেন, গরম দুধ খাওয়াতে পারলে। ভালো হতো। দুর্বল শরীরে জ্বর আরো জেঁকে বসেছে। গরম দুধ পেটে পড়লে জ্বর কিছুটা দমন হতো। কিন্তু নজরুলের যে অবস্থা তাতে দুধ খাওয়ানোর কোনো উপায় নেই। কী করা যায় তা নিয়ে গভীর ভাবনায় ডুবে যায় আশালতা।

বিরজা দেবীর মতো আশালতা উদ্বিগ্ন। তার ভীষণ খারাপ লাগছে। মানুষটা খুব কষ্ট পাচ্ছে। তা সে নিজের চোখে দেখছে। এমন কষ্ট সহ্য করার মতো না। আশালতা উদ্বিগ্ন দৃষ্টিতে নজরুলের দিকে তাকায়। কী করলে জ্বর নামানো যাবে তা নিয়ে ভাবে। এতো রাতে ডাক্তার পাওয়া যাবে না। বিনোদ ডাক্তারের বাড়ি কাছে ধারে হলে তাকে ডেকে আনা যেত। সকাল ছাড়া তাকে পাওয়া যাবে না। এই মুহূর্তে জল চিকিৎসা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। কিন্তু সময়টা পার করা  আশালতার জন্য দুঃসহ হয়ে পড়েছে। এতো মানসিক চাপ সে নিতে পারছেনা।

আশালতা উদ্বিগ্ন হয়ে বিরজা দেবীকে ডাকে। কাকীমা। কাকীমা।

বিরজা দেবী ছুটে আসেন সামনের ঘরে। তিনিও উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চান, কিরে দুলী! কি হয়েছে? অবস্থা কি খুব খারাপ।

আশালতার ডাক নাম দুলী। কেউ কেউ দোলনা বলেও তাকে ডাকে। বিরজা দেবী আদর করে ডাকেন দুলী বলেই। তার ডাক শুনলে আশালতার মন ভরে যায়। এমনভাবে আশালতার যা গিরিবালাও ডাকেন না।

আশালতা উদ্বিগ্ন হয়ে বলল, কাকীমা, উনি কেমন জানি করছেন! ডার অবস্থা খুব খারাপ মনে হচ্ছে। আমার খুব ভয় করছে।

তাই নাকি।

আশালতা কিছু বলার আগেই বিরজা দেবী নজরুলের কপালে রাখলেন। তার হাত যেন পুড়ে যাচ্ছিল। তিনি বিস্ময়ের সাজ বললেন, হায় ভগবান। এতো দেখছি ভয়ানক জ্বর। এতো সময় ধরে জল দেওয়ার পরও জ্বর নামছে না। ভগবান তুমি রক্ষা করো!

আশালতার হাত থেকে ভেজা কাপড় নিয়ে বিরজা দেবী নিজেই জলপট্টি কপালে লাগিয়ে দেন। তারপর তিনি ঘরে গিয়ে জলসিতে করে নতুন জল এনে হাঁড়িতে ঢাললেন। আগের জল বাইরে ফেলে দিলেন। আশালতাকে উদ্দেশ করে বললেন, তুই হাত দিয়ে জলপট্টির ওপর অল্প অল্প করে জল দে তো! আমি দুধ গরম দিয়েছি চুলায়। নিয়ে আসি। যে করেই হোক দুধটা খাওয়াতে হবে।

বিরজা দেবী ভেতরের ঘরে যান। আশালতা নজরুলের কপালে দেওয়া জলপট্টি বারবার বদল করে দেয়। মাঝে মাঝে আঙুল দিয়ে চোখের ভেতরেও জল দেয়। আবার কখনো কখনো মাথ ও চুলগুলোয় আঙুল দিয়ে বিলি কেটে দেয়। যাতে জল মাথার ভেতরে ভালো করে ঢুকতে পারে। টানা প্রায় চার ঘণ্টা জল দেওয়ার পর নজরুল একবার মাত্র নড়েচড়ে উঠলেন। আর তাতেই আশালতার মনে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এলো। সে গভীর মনোযোগে জল চিকিৎসার কাজটা করতে থাকে।

বিরজা দেবী গরম দুধ নিয়ে এসেছেন। এসেই আশালতাকে উদ্দেশ করে বললেন, দুলী দুধটা যে করেই হোক খাওয়াতে হবে। নজরুলের শরীর খুব দুর্বল। জ্বর প্রতিরোধের শক্তি একেবারেই নেই। দুধ খাওয়াতে পারলে শরীর কিছুটা শক্তি সঞ্চয় করতে পারবে। জ্বর নামাতে না পারলে খুব সমস্যা হবে।

দুধের বাটি পাশে রেখে বিরজা দেবী নজরুলের শিয়রের কছে এগিয়ে যান। কপালে হাত রাখেন। আগের চেয়ে জ্বরের উত্তাপটা কম মনে হচ্ছে। তিনি নজরুলকে নিচু গলায় ডাকলেন। নজরুল, বাবা নজরুল।

নজরুলের কোনো সাড়া নেই। বিরজা দেবী আবার ডাকলেন। এবার নজরুল নড়ে উঠলেন। বিরজা দেবী বললেন, আমি তোমার জন্য দুধ গরম করে এনেছি বাবা। দুধটা খাও। তাহলে ভালো লাগবে।

নজরুলের কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। বিরজা দেবী নজরুলের ঘাড়ের নিচে বাঁ হাত দিয়ে একটু উঁচু করে তুললেন। ডান হাতে দুধের বাটি নিয়ে আবার নিচু গলায় বললেন, বাবা একটু হাঁ করো তো।

কিছুক্ষণ পর নজরুল হাঁ করলেন। হাঁ করতেও তার খুব কষ্ট হচ্ছিল। চোয়াল দুটো ব্যথায় জর্জরিত। বিরজা দেবী অল্প করে দুধ মুখে ঢাললেন। নজরুল আস্তে আস্তে দুধ গলাধঃকরণের চেষ্টা করলেন। কিছুক্ষণ পর আবার অল্প করে দুধ মুখে ঢেলে দিলেন তিনি। তারপর তিনি দুলীকে উদ্দেশ করে বললেন, তু যা তো! এবার একটু ঘুমিয়ে নে। তোর অনেক খাটাখাটুনি গেছে। শরীরটাকে একটু রেস্ট দিতে না পারলে রাত জাগতে পারবি না। তুই যা। আমি ওকে দেখছি।

দুলী বলল, কাকীমা আমার অসুবিধা হচ্ছে না। আপনি যান। আপনিও তো সারারাত ঘুমাতে পারেননি। আপনি বরং ঘুমিয়ে নিন। আপনার বিশ্রাম দরকার। সকালে আবার আপনাকেই তো সব ঝামেলা সামলাতে হবে।

ও নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। তুই যা তো!

কাকীমা, বললাম তো আমার অসুবিধা হচ্ছে না। আমি সকালে ঘুমিয়ে নেব। আপনি যান।

সত্যিই তোর অসুবিধা হচ্ছে না?

না কাকীমা।

তাহলে ওর পাশে বসে থাক। এখন ও ঘুমাবে। আমার মনে হয় এখন জ্বরটা নেমে যাবে। পেটে গরম দুধ পড়েছে না।

জি।

দেখিস! কোনো কিছু লাগলে আমাকে বলিস।

বিরজা দেবী চলে গেলেন। আশালতা নজরুলের বিছানার কাছে এগিয়ে বসে। তারপর কপালের জলপট্টি পাল্টে দেয়। হাঁড়ি থেকে মাথায় ঠিকঠাক মতো জল পড়ছে কি না দেখে। কিছুক্ষণ পরপর মাথায় কপালে হাত দিয়ে দেখে জ্বর কমেছে কি না। জ্বর কমছে না বলে তার দুশ্চিন্তায় পড়ে সে। নানা নেতিবাচক ভাবনা তার মাথায় বাসা বাঁধে। টানা এতো সময় ধরে জ্বর! যদি কোনো অঘটন ঘটে। না না। এসব আমি কী ভাবছি।

এভাবেই তার রাত কেটে যায়।

বিরজা দেবী খুব অল্পক্ষণই ঘুমিয়েছেন। বিছানা থেকে উঠে হাতমুখ ধুয়ে তিনি আবার ছুটে আসেন নজরুলের কাছে। এসে দেখেন দুলী একভাবে তার দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে। তিনি অবাক বিস্ময়ে দুলীকে দেখেন আর মনে মনে বলেন, ওতোটুকু মেয়ে। অথচ তার দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ দেখে অভিভূত না হয়ে পারা যায় না।

৩.

টানা তিন দিন জ্বরের ঘোরেই ছিলেন কাজী নজরুল। তিনি মোটেই স্বাভাবিক ছিলেন না। দিন-দুনিয়ার কোনো হুঁশ ছিল না তার। পাশে কে আছে? কে তার সেবা করছে তা তিনি বুঝতেই পারেননি। তার জ্বরের ঘোর কাটার পর তিনি টের পেলেন তার কপালে একটি হাত। আশালতা তখন তার জ্বর দেখছিল। নজরুল হাতটা দুই হাত দিয়ে চেপে ধরলেন। নরম গলায় বললেন, কে?

অপ্রস্তুত হয়ে যায় আশালতা। সে দ্রুত হাত সরিয়ে নিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে, আমি আশালতা। আপনার জ্বর দেখছিলাম। টানা তিন দিন আপনি জ্বরের ঘোরে ছিলেন। কোনো চেতনাই ছিল না আপনার। আজ মনে হয় জ্বরটা ছাড়ল। ঠিক তিন দিন পর..

তাই। টানা তিন দিন। বলো কী। এর মধ্যে তিন দিন কেটে গেল।

আশালতা ইতিবাচক মাথা নাড়ল। নজরুল বললেন, তুমিই আমাকে সেবা দিয়ে সারিয়ে তুলেছ।

না না! এতে আমার কোনো কৃতিত্ব নেই। ভগবান অনেক দয়াবান। তিনি আপনাকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। হয়তো আপনাকে দিয়ে বিশেষ কোনো কাজ করাবেন! তা না হলে আপনার বাঁচারই কথা না! কাকীমার উছিলায় আপনি বেঁচে গেছেন বলতে হবে। তিনি যে কষ্টটা করেছেন!

মা! মানে বিরজা দেবী। বিস্ময়ভরা কণ্ঠে নজরুল বললেন।

হ্যাঁ। উনি না হলে কী যে হতো!

মা কোথায়?

ভেতরের ঘরে। ডেকে আনব?

না না থাক। কিন্তু আমি আরেকটা মানুষের সেবার কথা ভুলব কি করে?

আশালতা বিস্ময়ের দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নজরুলের দিকে। তারপর বলল, কে সে?

সে আমার সামনে বসে আছে।

না না। আমি তেমন কিছুই করিনি।

আমার তো মনে হয় তোমার সেবা পেয়েই আমি সুস্থ হয়ে উঠেছি। টানা তিন দিন তুমি যা করেছ।

আমি কেবল দায়িত্ব পালন করেছি। কাকীমা যে দায়িত্ব দিয়েছিলেন তা ঠিকঠাকভাবে পালন করার চেষ্টা করেছি।

এই মেয়ে। তুমি এতো গুছিয়ে কথা বলো কী করে?

এ সময় কাজী নজরুলকে দেখতে এলেন বিরজা দেবী। নজরুল ততক্ষণে বিছানা থেকে উঠে বসলেন। আশালতার সঙ্গে কথা বলতে বলতে তিনি আরো সুস্থ হয়ে উঠেছেন। কিছুক্ষণের জন্য নজরুল ভুলেই গিয়েছিলেন, তিনি কঠিন জ্বর থেকে সবে উঠেছেন। বিরজা দেবীকে দেখে তিনি আরেকটু চাঙ্গা হলেন। বিরজা দেবীও ভীষণ খুশি। তিনি উচ্ছ্বাসের সঙ্গে বললেন, আরে নজরুল। বাবা আমার একদম সুস্থ। এতো দ্রুত কী করে সম্ভব হলো?

নজরুল আশালতার দিকে ইঙ্গিত করে বললেন, ও সেবা দিয়ে আমাকে সুস্থ করে তুলেছে।

ঠিক ধরেছ। সত্যিই দুলী; তুই যা করেছিস তা কেউ কারো জন্য করবে কি না সন্দেহ। আমি নিজেও দেখেছি, ও রাত জেগে তোমার মাথায় জল দিয়েছে। কপালে জলপট্টি দিয়েছে। জ্বর মোটেই বাড়তে দেয়নি। কী কষ্ট করেছে; তা আমি দেখেছি।

বিরজা দেবীর কথাগুলো শুনে আবেগাপ্লুত হয়ে যান নজরুল। তার দুই চোখে জল আসে। আশালতা মেয়েটির প্রতি অসম্ভব রকম ভালোলাগা কাজ করে তার মধ্যে। তার সমস্ত ভাবনাজুড়ে আশালতা।

8.

আশালতার প্রতি কাজী নজরুলের ভালোলাগা গভীর ভালোবাসায় রূপ নিলো। তাকে নিয়ে তিনি গান লিখছেন, কবিতা লিখছেন। দীর্ঘ সময় ধরে তার সঙ্গে গল্প করছেন। ঘুরে বেড়াচ্ছেন কুমিল্লা শহর ও শহরতলিতে। পাড়ার লোকেরা। তাদের সম্পর্ক নিয়ে কুৎসা রটায়। সেন বাড়িতে নালিশ করে। জনৈক কমলকুমার অভিযোগ করে বললেন, ইন্দ্র কাকা: এসব কি দেখছি বলেন তো? ছি ছি ছি। সেনবাড়ির মেয়েকে এই অবস্থায় দেখব তা স্বপ্নেও কল্পনা করিনি।

ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত বললেন, কি এমন দেখেছ শুনি?

স্ত্রী আর বলব? বলতেও আমার রুচিতে বাধে।

আহা। হয়েছে কি বলবে তো?

বললাম তো আমার রুচিতে বাধে। সেন বাড়ির মেয়েরা যে এতো খারাপ তা তো জানতাম না বাপু! এতোটুকু মেয়ে সে কি না অন্য পুরুষের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়! লাজলজ্জা কি ধুয়ে খেয়েছে নাকি।

আশালতার চাচা ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত বললেন, আচ্ছা কমল, এতো ভণিতা না করে সোজাসজি বলো তো কি হয়েছে?

আপনার ভাইজি দুলীকে দেখলাম, অন্য একটা পুরুষ মানুষের সঙ্গে ঘোরাঘুরি করছে। শুনলাম, লোকটা নাকি মুসলমান। আচ্ছা, এতোই যদি ঘোরার শখ জাগে, হিন্দুর সঙ্গে ঘোর। না, তা ঘুরবে না।

ইন্দ্রকুমার এবার বুঝতে পারলেন। তবু কমলকুমারের কাছে জানতে চাইলেন, আচ্ছা দুলী কোন মুসলমান পুরুষের সঙ্গে ঘুরছে বল তো!

শুনলাম আপনার বাড়িতেই নাকি থাকে!

তুমি কি নজরুলের কথা বলছ?

জি জি কাকা। সে-ই।

হারে ও তো আমার সন্তানতুল্য। শোন শোন, ও খুব অসুস্থ ছিল। ওই ছেলে কলকাতায় থাকে। আমাদের বাড়িতে এসে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আমিই ওকে বলেছি, শহরটাকে একটু ঘুরিয়ে দেখাতে। বুঝতে পারছ?

তাই বলে এমন ঢলাঢলি ফালাফালি করতে হবে।

কমল কুমার কথা শেষ করেই চলে গেলেন। ইন্দ্রকুমার তার চলে যাওয়া দেখলেন। তারপর মুচকি হাসি দিয়ে ঘরের ভেতরে চলে গেলেন।

সন্ধ্যায় ইন্দ্রকুমার খবর পেলেন, পাড়ার একদল যুবক ছেলে নজরুলের ওপর হামলা করেছে। তিনি ধারণা করলেন, এই হামলা নিশ্চয়ই কমল করেছে।

ইন্দ্রকুমার আর দেরি করলেন না। তিনি তখনই কমলকুমারের বাড়ির উদ্দেশে রওয়ানা হলেন। কমলদের বাড়িতে গিয়ে কমল কমল বলে ডাকাডাকি শুরু করলেন। না। কমলকে বাড়িতে পাওয়া গেল না। বাড়িতে তার বাবা বিমল কুমারকে পাওয়া গেল। তিনি অনুযোগের সুরে বিমল কুমারকে উদ্দেশ করে বললেন, বিমলবাবু, আপনার ছেলে কাজটা ঠিক করেনি। ঠিক করেনি বললেন খুব কম করে বলা হবে। বলা উচিত অন্যায় করেছে।

বিমল কুমার কিছুই বুঝতে পারলেন না। বিমল কুমার বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, কোন কাজটা সেনবাবু?

আমার সন্তানতুল্য নজরুলের ওপর সে হামলা করেছে।

কি বলেন সেনবাবু। কমল কেন তার ওপর হামলা করবে?

কারণ আছে। একটা ব্যাপারে সে আমার কাছে অভিযোগ নিয়ে গিয়েছিল। আমি তার অভিযোগের বিষয়ে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া জানাইনি। তাই সে যুবক ছেলেদের নিয়ে নজরুলের ওপর হামলা করেছে।

তাই নাকি! কমল যদি সত্যি সত্যিই হামলা করে থাকে তাহলে আমি ক্ষমাপ্রার্থী সেনবাবু। আপনি কমলকেও ক্ষমা করবেন। ভবিষ্যতে সে আর এই কাজ করবে না। আপনাকে আমি কথা দিচ্ছি। আর আপনি যদি চান, তাহলে আমি ওকে দিয়ে আপনার কাছে ক্ষমা চাওয়াব।

ইন্দ্রকুমার কোনো কথা বললেন না। তিনি আবার নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। বিমল কুমার পেছন থেকে গলা উঁচু করে বললেন, সেনবাবু ক্ষমা করেছেন তো!

ইন্দ্রকুমার হাত নেড়ে ইতিবাচক ইঙ্গিত করলেন। কিন্তু তিনি আর পেছনের দিকে তাকালেন না।

এক সন্ধ্যায় সেন বাড়িতে গানের আসর বসল। বাড়ির সবাই নজরুলের কাছে আবদার করলেন, তারা নজরুলের নিজের লেখা গান তার কণ্ঠে শুনবেন। নজরুল তাদের অনুরোধ ফেলতে পারলেন না। আসরে বসেই তিনি নিজের লেখা গান গাইতে শুরু করলেন। আর সেই গানের সঙ্গে তালমিলিয়ে নাচছে দুলী। দারুণ উপভোগ্য ছিল সেই মুহূর্তটা। বাড়ির সবাই আনন্দ করল। এমন আনন্দেই কেটে যায় নজরুলের দিনগুলো। দিনে দিনে প্রমীলার সঙ্গে সম্পর্ক গভীর থেকে গভীরতর হয় নজরুলের।

নজরুল ভালোবেসে আশালতার নাম দেন প্রমীলা। তিনি নিজে সেই নামে ডাকেন। ধীরে ধীরে ঢাকা পড়ে যায় আশালতার মা বাবার দেওয়া নাম। বাড়ির লোকরাও তাকে প্রমীলা বলেই ডাকতে শুরু করেন।

এক সময় কবির প্রেমের কাছে হার মানে প্রমীলা। মন-প্রাণ উজাড় করে সে ভালোবাসে কবিকে।

প্রমীলার উদ্দেশে কবি লিখলেন,

হে মোর রানী। তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে।

আমার বিজয়-কেতন লুটায় তোমার চরণ-তলে এসে।

লেখক: মোস্তফা কামাল, জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক; সম্পাদক ও প্রকাশক, খবরের কাগজ

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP