সকল মেনু

কবি মোহাম্মদ ইকবালের ১০ কবিতা

উত্থিত হবো

আবারও উত্থিত হবো,
উত্থিত হবো হৃদয়ের জমিনে বুনে যাওয়া ভালোবাসায়।
সুবহে সাদিকের আলোর বিচ্ছুরণে
ভোরের স্নিগ্ধ হাওয়ায়।
মানবতার কঙ্কালের করোটি ফুঁড়ে উত্থিত হবো প্রেমহীন পৃথিবীর ধ্বংসস্তূপে,
আকাশে বাসাতে ছড়িয়ে দিতে ভালোবাসার শাখা পল্লব।
আবারও জন্মাবো লোকালয়ে, শহরে গ্রামে বনে বাদাড়ে, সমুদ্রের জলে,
আমার তরঙ্গায়িত ঢেউয়ের প্রতি আঘাতে আবারও উত্থিত হোক ইউসুফ,রোমিও,বহ্মা,শ্রীকৃক্ষ কিংবা কামদেব প্রেমহীন মানুষের অন্তরাত্মায়…

 

রাস্তা

বোধের রেটিনায় উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম ক্রমশই অস্পষ্টতর।
অন্তরদৃষ্টি হাই রেজ্যুলেশন জুম করেও ফলাফল হতাশব্যঞ্জক।
দূর্ঘটনাক্রমে ডিলিট বাটন পুশ হয়ে যাওয়া কম্পিউটারের বোবা স্ক্রিনের মতো পানসে মস্তিস্কের অন্তঃকোষ।
নাম, ঠিকানা, পরিচয়ের অস্তিত্ব হার্ডড্রাইবের গোপন ভাঁজেও অস্তিত্বহীন।
স্ক্রীণের জিরো ল্যাটিটিউডে কবিতার বিধ্বস্ত কঙ্কাল ডেড-পিক্সেলের উজ্জ্বল্যে বিচ্ছুরিত,
তড়িৎ চৌম্বকীয় অনন্ত খেয়ায় ভেসে বিধ্বস্ত কবিতার কঙ্কালে ডুব দিতেই দেখি;
ডিলিটেট সমস্ত রাস্তার অস্তিত্ব জৈব-ভৌগোলিক মানচিত্রে ক্রমেই স্পষ্টতর।
উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম উচ্ছন্নে গেলে কি আসে যায়?
কবিতায় ভর করে পা বাড়ালেই সব পথই উন্মুক্ত।
পথগুলি তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে যায় তোমার দুয়ারে।

 

অভিবাসী

গোধূলির আকাশে একশত আশি ডিগ্রি বাঁক নিয়ে উড়ে যাচ্ছে একঝাঁক অতিথি পাখি,
গন্তব্য শহরের শান্ত স্নিগ্ধ ঝিল,
পালকের আচ্ছাদনে ওরা এক একটি অভিবাসী হৃদয়,
নীড়ের উষ্ণতা তাদের ক্ষনিকের,
সময়ের প্রয়োজনে বারংবার যাযাবর!
মানুষের এক একটি ঘর থাকে থাকে একটি দেশও,
একটি ঘরে অনন্তকাল কাটিয়ে দেয় মানুষ,
কখনও কখনও কেউ ঘর হারিয়ে ফেলে,
কেউ কেউ দেশও!
কেউ কেউ ঘরের রাস্তা কখনোই খুঁজে পায় না।
অতিথি পাখিরা কিন্তু বছরের এই সময় ঠিকই ফিরে শহরের এই স্নিগ্ধ ঝিলে,
ফিরে প্রতি বছরই।

 

সরিষায় ভূত

 

বিকেলটা ঠিকই সেজেছিল গোধূলির রঙে,
সন্ধ্যেটা যথারীতি রঙিন।
হলুদ তোমার পছন্দের রঙ,
সন্ধ্যের সামিয়ানায় তাই এঁটে দিয়েছি হলুদের আলপনায় আঁকা পোষ্টার,
তুমিময় একখণ্ড সন্ধ্যের উঠোনে ভালোবাসার চাষ দেবো,
আঙিনায় যত্নে তুলে রেখেছি হলুদ গাঁদা চন্দ্রমল্লিকা সরিষার ফুল এমন কি হলুদ জবাও।
নেশাগ্রস্ত সময় আমাদের সাথে নেচে গেয়ে রাতও মাতাল।
নেশার রঙ মাথায় চড়লেও চোখের কোণে ঠিকই ঝিলিক দিয়ে নেচে উঠেছিল সরিষা বৃন্তে কৃষ্ণ বরণ ভূতের কেলানো দাঁতের ছায়া।
এখন প্রতি রাতেই আমি ডুবে থাকি অবিশ্বাসের অভিশংঙ্কার গেরুয়া জলে।

 

বাড়ি ফেরার পথ

হারিয়ে ফেলেছি বুক পকেটে যত্নে রাখা প্রিয় নদী,
হৃদয়ে খোদাই প্রিয় শহরের নাম।
নীলকান্ত মৃলুলা কিংবা সেলিম।
ঘুড়ি নাটাই মাজা দেয়া সুতো,
জংধারা সাইকেল,
কলেজ ক্যাম্পাস,
চৌরাস্তার মোড়।
শশীর ছোট্ট চায়ের দোকান।
মার্কশিট শিক্ষা সনদ নিয়োগ পত্র।
প্রথম প্রেম, ঝাউতলা,
মা বাবার প্রিয় মুখচ্ছবি।
হন্যে হয়ে খুঁজে ফিরি,
হাত বাড়ালেই কাঁটার আঘাত,
সাপের ছোবল।
তারপরও খুঁজে ফিরি;
প্রিয় নদী, প্রিয় শহর, নাটাই-ঘুড়ি ভাঙা সাইকেল, মৃদুলা সেলিম নীলকান্ত,
বাবা মায়ের প্রিয় মুখ।
খুঁজে ফিরি খুঁজে ফিরি
হারিয়ে যাওয়া বাড়ি ফেরার পথ,
কষ্ট নীল পাঁজর ভাঙা বুক…

 

ঠোঁট

পুরোটা শরীর জুড়ে ঝুলে আছে সুবাসিত ঠোঁট,
যেখানে যেভাবে যেসময়ই ছুঁয়েছি সেখানে সেসময়েই ফুটেছে ভালোবাসার গোলাপ।
এর কোনো-কোনোটি পাখি হয়ে পাখনা মেলেছে রতি বিলাসী সুখের আকাশে,
কোনোটি ভালোবাসার সংবিধান,
আমাকে অনুশাসনের রীতিনীতি,
কোনোটি প্রণয়ী কাব্যের উপাখ্যান,
আবার কোনো-কোনোটি মলাট বন্দী হওয়ার প্রতিক্ষায় কবিতার পাণ্ডুলিপি।
তোমার পুরোটা শরীর জুড়ে ঝুলে আছে সুবাসিত ঠোঁট,
আমি অনন্ত ডুবছি তার অতলান্ত গভীরতায় মৌন নৈশব্দিক অনুভবের প্রণয়ী বিলাসে..

 

মাটির আয়না

মাটির আয়নায় দেখি হারিয়ে যাওয়া নক্ষত্র বাসি প্রিয় মা বাবার প্রিয় মুখচ্ছবি।
সবুজ শ্যামল সোনালি স্বদেশ,
রক্ত যমুনা শরীরে প্যাঁচিয়ে মাথা উঁচু করা গর্বিত বর্ণমালা,
মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর গাথা,
লাল সবুজ একটি পতাকা!
চলমান সময়ের স্খলিত চেতনা মানবিক মূল্যবোধ মানবতা!
দেখি ঘুঘু ডাকা অলস দুপুর,
পূজা পার্বণ পিঠাপুলি নবান্নের উৎসব।
গ্রন্থিল পেশীর কারুকর্মে বিকশিত শ্রান্ত কৃষান,
হাসির স্নিগ্ধতায় মৌ মৌ সুরভিত কৃষির যৌবনবতী আঙিনা,
মাটির তৈজস সানকি কলস ঘটি বাটি,
পোড়া মাটির নান্দনিক অলংকার,
মাটির ঘর, এবং মাটির বিছানা!
অনেকই তার কিছুই দেখে না।
অবশ্য কেউ কেউ চিরকালই অন্ধ থেকে যায়!

 

স্বীকারোক্তি

আমি এক ধ্রুপদী পৌরাণিক কৃষক
কবিতার নাজুক শরীরে গুঁজে দেই উৎকৃষ্ট শব্দের বীজ
ফলনপ্রত্যাশী চাষীদের মত নির্ঘুম প্রতীক্ষা
ফলবে কি শব্দের কাঙ্ক্ষিত ফষল!
যতবারই শব্দের ক্যালিওগ্রাফিতে নির্মাণ করতে চেয়েছি কবিতার ভাস্কর্য
ভাবনারা হয়েছে দিগম্বরী
উদাম নৃত্যের কোরিওগ্রাফিতে রঙ ছড়িয়েছে ক্যানভাসময়
রঙের ফোঁটায় সিক্ত ক্যানভাস থেকে ঝরে পড়েছে ভালোবাসার বুদবুদ
কবিতা লিখতে হোঁচট খেয়েছি বারংবার শব্দের ফুল কিংবা তার ভাস্কর্য নির্মাণে ব্যর্থ ছিলাম
পরন্তু বারংবার ক্যানভাসে আবির্ভূত হয়েছে অনিন্দ্য সুন্দর একটি মুখচ্ছবি।
রাশি রাশি গোলাপ, ভালোবাসার লাল গোলাপ।
আমার কখনোই কবি হয়ে ওঠা হয়নি
আমি নিতান্তই একজন প্রেমিক,
এবং খুব দাসামাটা একজন প্রেমিক…

 

বিধ্বস্ত নগরী

দৈনন্দিন নাগরিক হালচাল
ন’টা পাঁচটার বৈভবে কেনা পরাধীনতা
সপ্তাহে দুদিনের সীমিত স্বাধীনতা কাড়ে দৈন্যের পরাক্রম
ফটক পেরুলেই ইলেক্ট্রনিক বিলবোর্ড,
মডেল নারীর বিজ্ঞাপনী হাঁসি,
উড়ালপথ, ট্রাফিক জ্যাম, পাশদিয়ে পার হওয়া রেল লকোমোটিভের তীব্র সিটি।
মাথা হীন মুরগীর মতো ভো দৌড়ে ব্যাস্ত মানুষ
কারো জন্য মাথা ঘামাবে কে?
সকাল সন্ধ্যা কেন যে মেয়েটি জানলায় উঁকি দেয়?
জানতে হলে বিলবোর্ডে ভেসে উঠুক তাঁর ছবি
উড়ালপথের গলি বেয়ে তাঁকে নিয়ে হারাও অনন্ত উড়ালে অন্তরিক্ষে
পকেটে রাখা লকোমোটিভের সিটিগুলো ছেড়ে দিলে দুর হয় গ্যালাক্টিক কসমিক ট্রাফিক জ্যাম।
তাঁর ঘূর্ণির টানে ক্রমাগত তলাবে অসীমের অতলে,
যদি ভেসে উঠো কখনও
তোমার মনে হবে পুরো নগরী বিধ্বস্ত।
বিলবোর্ড জীর্ণ মলিন, উড়াল পথের উপর নোঙর করা বুড়িগঙ্গা নদী, ট্রাফিক লাইটের নিচে ঘন জঙ্গল
বিধ্বস্ত নগরীর তুমিই একমাত্র সুখী মানুষ….

 

বৃহন্নলা সময়

বৃহন্নলা সময় যখন ভালোবাসার উদাম বুকে তাচ্ছিল্যের পদচিহ্ন ফেলে হেঁটে যাচ্ছিলো।
আমি তখনই জাপটে ধরি তার রুক্ষ কেশর,
বন্ধ্যা সময়ের পিঠেই দিতে হবে সুফলা ভালোবাসা চাষ।
দুরন্ত এক চাষ উন্মুখ কৃষাণের এটি দৃপ্ত প্রত্যয়,
তরিত লাগামহীন করি আকাঙ্খার সবক’টি মুখ,
তুমিও তাতে কষে চালাও ভালোবাসার চাবুক।
তীরবেগে ছুটে চলে নন্দিত ভালোবাসা,
একের পর এর বাঁধার প্রাচীর টপকায় বল্গাহীন প্রেম,
সময়ের রাস্তা-ঘাট, নদী-নালা, পাগাড়-পর্বত-সমুদ্র, শহর-নগর-গ্রাম সর্বত্র ক্রমাগত ফুটতে থাকে ভালোবাসার লাল গোলাপ রজনীগন্ধার কলি,
রাতের ভাঁজে ভাঁজে বৃষ্টির ফোঁটায় চির স্বাধীন আমরা শুঁকি তাঁর অমিয় সুঘ্রাণ,
আর নতমস্তকে বিনম্র শ্রদ্ধায় স্বরণ করি স্বাধীনতার কারুশিল্পীদের,
বুকের লাল রক্তে যাঁরা এঁকেছিলেন লাল সবুজের একটি পবিত্র পতাকা একটি অনঘ সার্বভৌম ভূখণ্ড….

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP