নিয়তি
জীবনের প্রতিটা পদক্ষেপে হোঁচট খেয়ে পড়ে
কনুই, হাঁটু থ্যাঁতলে গিয়ে রক্তাক্ত হয়েছে বারবার।
হাওয়ায় ভেসে আসা অলৌকিক শব্দ বার্তা দিল
আমাকে জীবন পড়তে হবে।
আমি যেন নিজের পায়ে ভর দিয়ে শক্ত হয়ে
মাটিতে দাঁড়িয়ে হাঁটতে শিখি তাই সামান্য রক্তপাত।
এটা নাকি আমার মঙ্গলের জন্য।
পাগলের মত উথাল পাতাল হয়ে যারে বাসলাম ভালো
অন্তর শূন্য করে সে চলে গেলো।
সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ হয়ে অলৌকিক বার্তা দিল
জীবন আবেগের নয়
এটাও নাকি আমার ভালোর জন্য।
একে একে বন্ধু , বান্ধব , স্বজন
আপনার চেয়ে ছিল যারা আপন
সবাই এক নিমিশে হয়ে গেল হিংস্র , হিংসুক, নিন্দুক , স্বার্থপর
বহু দূরের কেউ যেন তারা শত জনমের অচেনা অতিথির মত পর ।
বিপদ , অসুস্থতা যখন মাছের আঁইশের মত আষ্টেপিষ্টে লেপ্টে গেল
তখনও অলৌকিক বার্তা দিল
এসব নাকি জীবন যাপনের পরীক্ষা
এগুলোতে আছে মঙ্গল।
আমি যখন গভীর শূন্যতায় ডুব দিলাম
যেখানে ভেন্টিলেটর ভেদ করে কোনো আলো প্রবেশ করে না
এমন ঘরে নিজেকে আবদ্ধ করলাম
ঠিক তখনই আবারও অন্ধকারে আবছা আলো হয়ে অলৌকিক বার্তা দিল
যা কিছু ঘটছে জীবনের সাথে তার সবটাই নাকি ভবিষ্যতের জন্য ভালো ।
আমি হেসে উঠলাম হো হো করে।
আমার হাসি প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে গমগম ভয়ার্ত আওয়াজ হয়ে কানে বাজল।
অলৌকিককে বললাম আমার জীবন নিয়ে বড্ড বেশি ভাবনা তোমার।
আমাকে নিসঙ্গ জীবন পথিক করে
আদি পাপের শাস্তি দিচ্ছো
নাকি আমার একাকিত্ব যাপনের দুঃখ ভেবে দুর্গম পথ সৃষ্টি করছো?
অলৌকিক হাওয়ায় মিলিত নিঃশ্বাসের শব্দ হয়ে বার্তা দিল
জীবন উদ্যাপনের নয় বরং যাপনের।
যাপনের পথ কন্টকময়।
এসবই তোমার মঙ্গলের জন্য।
আমি চিৎকার করে বললাম এত মঙ্গল আমার চাই না।
এত ভালো আমার সহ্য হয় না।
আমি আমার ভালো বুঝি না
আর বুঝতেও চাইনা।
এবার লৌকিক এসে বলল এসবই যে তোমার নিয়তি
মেনে নাও, মানিয়ে নাও
জীবন তো এমনই।
হায়রে আমার নিয়তি
ভালো না থাকার অসুখ
হারানো হিয়ায়
হয় যদি শুকনো
ঝরা ফুল ।
সুবাস নাই বা থাকে তাতে ।
এমন ও তো হয়েছে আগে
এ হিয়া ছিল সদ্য ফোটা প্রস্ফুটিত গোলাপ।
অবহেলায় ঝরেছে পাপড়ি
অবেলার আবেগ দিয়েছে ছুটি
নিয়েছে কেড়ে সুখ
আজ হয়েছে তাই
ভালো না থাকার অসুখ ।
মুখোশ মানুষ
আমি তাজ্জব বনে যাই।
মিথ্যা বলে, প্রতারণা করে
কিভাবে সে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়।
বিবেক বুঝি তার নাই।
মনুষ্যত্ব, অনুতপ্ত হওয়া এসব স্বভাবে তার নাই।
সে যে মুখোশ পরা মানুষ রূপি হায়
সুবিধামতো ক্ষণে ক্ষণে সে মুখোশ বদলায়
মুখোশের আড়ালে মুখ তো আদৌ নাই।
ভয়ংকর মুখোশ মানুষ তাকে চেনা দায়
তাকে দেখলেই আঁতকে উঠি তাই।
আমি তাজ্জব বনে যাই।
মুখোশের আড়ালে মানুষ তো নাই।
মুখ আর মুখোশ চেনা বড় দায়।
মুখোশ মানুষ তোমাকে নিয়ে যত সংশয়।
আপন কারে কয় ?
আপন এখন আপন আর নাই
সবাই এখন পর।
স্বার্থ আর টাকায়
সবাই আপন হয়।
আপন যত দুঃখ দেয়
পর ততটা নয়।
এ জগতের নিঠুর মায়ায়
আপন কারে কয়?
ব্যক্তিগত দুঃখ
এতদিন পর ভাবতে হচ্ছে একটি সিন্দুকের কথা।
যেখানে থাকবে একান্তই ব্যক্তিগত কিছু দুঃখ, আনন্দ, সুখ।
ব্যক্তিগত দুঃখগুলো খুব অসহায়
সিন্দুকের চারপাশ থাকবে নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঘেরা।
যেখানে থাকবে সর্বসাধারণের প্রবেশ নিষেধ।
বিশেষ বিশেষ দিনগুলোতে হবে ১৪৪ ধারা জারি।
নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারী অবশ্যই শাস্তি ভোগ করবে।
রাতের আঁধারে তোমরা কোটি টাকা গুনে আনন্দ পাও।
আর আমি রাতের আঁধারে যত্ন করে লুকিয়ে রাখা দুঃখ গুনে অশ্রু ঝরায়।
তাইতো সিন্দুকে লুকিয়ে রাখব আবেগ ,অনুভূতি।
তুমি কি আসবে ভালোবাসা হয়ে?
তুমি আসলে পৃথিবীর সকল গোলক ধাঁধা পরিবর্তন হয়ে যাবে তোমার মায়াময় চাহনিতে।
তোমার ব্যাকুলতার আকুতি ঝরা শব্দগুলো পারে প্রেমবান হয়ে হৃদয় ভেদ করতে।
তোমার পাগলা হাওয়ার মত পাগলামি পারে অন্তরের শান্ত নদীতে ঝড় তুলতে।
তোমার আবেগি পাগলপারা ভালোবাসা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে বুকের কুঠিরেতে।
তোমার এমন প্রেয়ময় সাগরের বেপরোয়া উথালপাথাল ঢেউই পারে
মন পাঁজরের সিন্দুকের তালা খুলতে।
ভালোবাসা আসবে তুমি সিন্দুকের চাবি হয়ে?
আমি শুধু তার
আত্মা যদি হয় শূন্য
শামুকের মত ভেঙে চূর্ণ
তবে আর এ দেহের কি মুল্য ?
প্রেম পেরোনো কতগুলো বছর
আদর মাখা কিছু অভ্যাস
আজ শুধুই দীর্ঘশ্বাস।
খোলা আকাশ পেলে ঘুড়ি হব
পাখা পেলে মুক্ত হয়ে উড়ে যাব ।
পৃথিবীতে কেউ যদি আপন না হয়
অবহেলায় নিঃসঙ্গ হয়ে বনে যাব।
সেখানে অপেক্ষা করব
যদি কেউ কখনো স্মরণ করে
তবে আমি শুধু তার হব।
শূন্য হৃদয়
মনের বনে আগুন জ্বলে
তুষের মত পুড়তে থাকে রোজ
অন্য মনের যত্ন হলেও
নিজের মনের হয় না রাখা খোঁজ।
এভাবেই চলছে বিষাদ মেখে
একাকিত্বের মেকিহাসির শূন্য হৃদয় দেখে।
পুকুর পাড়ে শান্ত জলে
টুপটাপ বৃষ্টি পড়ে
দক্ষিণ হাওয়া ফিশফিশিয়ে বলে
পরাণ পুকুর পাড়ে
দেখ তোমার নিজের অসহায় আদলে
লুকায়িত অযত্নের পাহাড়ে
নিঃসঙ্গ একাকিত্ব।
একান্ত নিজের একটি আকাশ
আমার নিজের বলতে একটি স্বচ্ছ নীলা আকাশ আছে।
যেখানে চাঁদ মায়াবী আলো ছড়িয়ে আবেগের জোয়ারে ভাসিয়ে গল্প বুনে।
নক্ষত্ররাজি প্রেম কাব্যের কথামালা হয়ে
সুনিপুণভাবে কাঁথা সেলাই করে ভালোবেসে আগলে রাখবে বলে ।
সম্মোহনী করে আধ ফালি চাঁদ কবির চোখে চোখ রেখে
জ্যোৎস্না রোজ স্নান করে সমুদ্রের বুকে।
এ আকাশটা আমার, শুধুই আমার
একান্ত নিজের একটি আকাশ।
সেখানে কারো বিচরণ নেই ,কারো অস্তিত্ব নেই।
সেখানে একলা আমি ভাবনায় ডুবি, কল্পনায় ভাসি
ডুব সাঁতারে ভাসায় তরী।
কখনো জলে ডুবে মরি ,কখনো প্রেমের নাওয়ে ভাসি।
কখনো আকাশপথে পরির মত উড়ি
কখনো ডানা জাপটে ছটফটিয়ে মরি।
নিজেকে মায়ার পরশে আদর করি
নিজেই নিজেকে শান্ত করি।
হৃদয় রাজ্য শাসন করি
মন বিণাকে বাজতে বারণ করি।
এ হৃদয় আকাশ আমার
একান্ত নিজের একটি আকাশ।
ক্ষুধার্থ আধ পেট রাজনীতি বোঝে না
ঈশ্বরের কাছে আর্তনাদ করে
গর্ভের শিশুকে হারিয়ে মমতাময়ী ।
শাসক যে স্বার্থান্বেষী
সুবিচার কোথায় পায়?
তবে কার এ দায়?
ক্ষুধার্ত আধ পেট রাজনীতি বোঝেনা ।
জীবনের রঙ কি জানেনা
বারুদের গন্ধে তামাশা করেনা।
কেবল ফুটন্ত গরম ভাতের গন্ধে হয় মাতোয়ারা।
মিথ্যাচারের বাণিজ্য বোঝেনা
দু-মুঠো ভাতের জন্য চায় সৎ রোজগার
মিথ্যা বাহাদুরির করেনা কারবার ।
নিখোঁজ হবো
যেদিন আমি নিখোঁজ হব
ঘুরে বেড়াব রাত প্রহরে।
সড়ক বাতির নিয়ন আবছা আলোয়
সেদিন খুঁজবে না কেউ এই শহরে ।
ততদিন একাই রবো
এখন আমি শুধু আমার হব।
ভুল কুড়ানো জীবন আমার
এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে তাই
নিঃসঙ্গতা নিয়ম করে
সকাল, দুপুর রাত হলে
তৃপ্তি করে কুড়েকুড়ে খাই ।
তোমার পিছু ছেড়ে দেব
নিঃসঙ্গতাকে বরণ করে
আমি শুধু আমার হব।
ঠিক একদিন নিখোঁজ হব।
শারমিন হক। কবি ও কথাসাহিত্যিক। ২০১৯ বইমেলায় শিশুতোষ শিক্ষামূলক দুটি গল্পের বই “ভালো কাজের পুরস্কার” এবং ‘অহংকারী গাছ ও উপকারী মৌমাছি’ প্রকাশিত হয়েছিল “বাংলা প্রকাশ” থেকে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ “অভিমানী” জনতা প্রকাশ থেকে প্রকাশিত হয় ২০২০ বইমেলায়। প্রথম গল্প গ্রন্থ “কোথাও কেউ ভালো নেই” ছায়া প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয় ২০২৪ বইমেলায়।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।