সকল মেনু

আলেয়া আরমিন আলোর ৫ কবিতা

স্বীকারোক্তি

বহুকাল ধরে সবুজ সুন্দর একটি পথের সন্ধানে হাঁটছি
নীড়হারা শালিকের মতো হয়েছি পথেরই বিবাগি।
যুগের পর যুগ খুঁজে বেড়িয়েছি
ক্লান্তপ্রায় পদতল এখন ফোসকা শুকিয়ে শক্ত ক্ষতে পরিণত-
তবু থামেনি তল্লাশি, পায়নি কাঙ্ক্ষিত সরণির সন্ধান।
অথচ, পূণ্যময়ী অয়নটি যে নীড়ের সম্মুখেই ছিল!
হয়ত বোধের অবোধ অন্বেষণে
কিংবা অক্ষিবিভ্রমেই গোচরীভূত হয়নি
মোহমায়ায় আবেষ্টিত চিরচেনা পথের সৌন্দর্য!
গহিনের আবেগ মিশ্রিত প্রেমেও কভু সাধা হয়নি
সবুজ পল্লব দোলানো মমতার সুনিবিড় ছায়ায়
বাতাসে বুনো ঘ্রাণে সুবাসিত সেই পূত নিগমকে।
দু পায়ে অবহেলায় মাড়িয়ে হেঁটে গেছি
প্রেমাদক শিশিরে ভেজা দূর্বাঘাসের নিখাদ ভালোবাসা।
যেমনি কিছু মানুষ অবজ্ঞায় বিশুদ্ধ প্রীতির মায়াকে
তুচ্ছ ভেবে অবমূল্যায়নে পেছনে ফেলে
দাম্ভিকতার অহমে কেবল সামনেই এগিয়ে যায়…
খুঁজে বেড়ায় রঙিন অবয়বে মেকি সুবাসে
কোনো সম্মোহনী সুহাসিনী সুনয়নীর মুখ,
তেমনি দৃষ্টিভ্রমে এতটা কাল ধরে অকারণ হেঁটেছি
চেয়েও দেখিনি নীড় ঘেঁষা প্রণয়িনীর তৃষ্ণার্ত চাতকী বুক।

অচেনা অদিতি

অগ্রহায়ণের ঘন কুহেলিকায় জমাটকৃত হীরের দানার মতো বিন্দু বিন্দু শিশিরের সাথে
হেমন্তের শিউলি শাখায় ঝরা ফুলের বৃন্তেই যেন ঝুলে আছে এই বসুধা!
মানুষের পদভারের অভাবে শ্যাওলা পড়ে শ্যাতশ্যাতে হয়ে গেছে একসময়ের সেতার আর ঘুঙুরের সুরোৎসবে জমকালো নান্দনিক জলসাঘর।
কিশোরীর সিঁতির মতো সরু নদীপাড়ের পথও এখন চলাচলহীনতায় ঘাস ও আগাছায় ঝোপেঝাড়ের জঞ্জালে পরিণত হয়েছে।
জরাজীর্ণ পোড়াবাড়ির পলেস্তারা খসে পড়া প্রাচীরের উপরে গম্ভীর মুখে বসে স্বস্তির প্রত্যাশায় বাকুম বাকুম সুর তোলে শান্তির প্রতীক পায়রা যুগল।
পশ্চিমাকাশে কোনো আবিরের আঁচড় ছাড়াই ধূসরতায় গোধূলি সাজে,
কেশবতী রমনীর ঘনকালো কেশগুচ্ছের ছায়ার মতো বাঁশ বাগানে ঝিঁঝিঁর ডাকে আঁধার নেমে-
সাঁজ না হতেই অশনি অন্ধকারে দীর্ঘ রাত নেমে আসে প্রকৃতির শরীরে।
একাকিত্বের তিমিরে তাচ্ছিল্যের হাসিতে ফেটে পড়ে দূর নিখিলের নক্ষত্ররাজি!
আমনের খেতে কাঁচা ধান খুঁটে খেয়ে মিটিমিটি আলোয় দিশেহারা উড়ে তমোমণিদের ঝাঁক!
আলপথ ধরে ক্লান্তিতে জোড়ায় হাঁটে নামহীন আহত হৃদয়ের হতবিহ্বল অচিন পাখি…
পথিমধ্যে মানুষের চেহারার মতো অসংখ্য শূকর দেখে পাখিগুলোও ভীষণ রকম আশ্চর্য হয়ে আঁতকে ওঠে!
শহর, নগর, গ্রাম, গ্রামান্তর, পথঘাট এমনকি সমাজের সুশীলতা দেখে যেন আজকাল পশুজাতিও লজ্জা পায়!
অতঃপর কোলাহল জনারণ্যে ব্যস্ততার দিনশেষে আফসোসের সাথেই বড্ড অচেনা লাগে চিরচেনা এই অদিতিকে,
মানুষের পৃথিবীতে কোথাও যেন এখন আর মানুষরূপী সত্যিকারের মানুষের অস্তিত্বই নেই!

জাদুকর

প্রিয়তম! হয়তো তুমি জানোই না
আমার সাঁজবাতির ক্ষীণ কোমল দীপ্তি তুমি
যে আভায় তোমার সুশ্রী অবয়ব
নৈসর্গিক এক দেবদূতের মতোই !
ধূপগুড়ি পোড়ানো সূচিময় সুগন্ধি তুমি
ধূপছায়া মহামায়া নৈসর্গিক এক সন্ধ্যা।
আমার মন খারাপের ধূসর জন্মদিনেও
তুমি ঝিলমিল আনন্দের ঝিলিক।
রঙিন স্বপ্নের উন্মেষে নিত্য নতুন আবেগে
তুমিই অতলান্তিক প্রেমের জাদুকর।
নিকষ রাতের ঘুটঘুটে শরীরে জুগনু হয়ে
কেবল তুমিই আমায় জীবনের পথ দেখাও।

কৃষ্ণপক্ষের কাল

এখন বুঝি কৃষ্ণপক্ষ, দীর্ঘ অমানিশারই কাল!
রাত্রী হাঁটতে ভুলে গেছে সুবেহ-সাদিকের পথে
কোনো নক্ষত্রেরাও জ্বলে না জ্যোৎস্নার রথে
অন্ধকার থমকে থাকে নৈঃশব্দ্যের প্রশ্বাসে
দলছুট বাদুড়েরা কেবলই শূন্যে ডানা ঝাপটায়
নিশিগন্ধার ডালে বসে হুতোম প্যাঁচা ডেকে উঠে
গোরস্থানের শেয়ালগুলোও ভয়ার্ত স্বরে হাঁকে
উঠোনে নেড়ি কুকুরেরা কাঁদে করুণ বিলাপে
কানপাশার মতো জাফরানি বোটার শিউলি
নিশি জেগে থাকে ভোরে ঝরে পড়ার অপেক্ষায়
রাতের মিহি বাতাসে কনকচাঁপার তীব্র সুবাসে
এঁকেবেঁকে সর্প ধেয়ে উঠে আসে আঙিনায়!
এতকিছুতেও প্রকৃতির শরীরজুড়ে শুধু অন্ধকার
অদিতিতে উদিত হয় না কাঙ্ক্ষিত দীপ্ত রবিকর।

উদ্বাস্তু বেদুঈন

দিশাহীন পথ হাঁটি আমি এক উদ্বাস্তু বেদুঈন
অতীতের নদী সাঁতরেই রাত কাটাই ঘুমহীন।
অম্বরে নক্ষত্র খুঁজি, আঁধারে খুঁজি জোনাকি
নির্জন নৈঃশব্দের অন্ধকারে নিরাশা আঁকি।
চোখ দুটি জলে ভেজা, পোড় খাওয়া অন্তর
ছাইচাপা অনল লুকিয়েই খুঁজে ফিরি ভোর।
জানি না জীবনে আসবে কিনা সুবেহ-সাদিক।
তবু জানালা খুলে চেয়ে থাকি পূর্বগগন দিক।

 

আলেয়া আরমিন আলো কিশোরগঞ্জ জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। স্থানীয় স্কুল ও কলেজেই তিনি পড়াশোনা করেছেন। বাবা মরহুম আব্দুল কাদির ভূইয়া এবং মা শরিফা বেগমের তৃতীয় সন্তান তিনি। ছোটবেলা থেকেই লেখক ভীষণ প্রকৃতিপ্রেমী ও বইপোকা ছিলেন। বইয়ের মধ্যে ডুবে থেকে বিশ্বমণ্ডল ঘুরে বেড়াতেন। তাই কিশোরীবেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি তার প্রবল আকর্ষণ। ২০২২ সালে অমর একুশে বইমেলায় চলন্তিকা প্রকাশনী থেকে কাব্যগ্রন্থ “বোধকাহন” দিয়ে তার মলাটবন্দী বইয়ে যাত্রা শুরু হয়। এর পর গল্পগ্রন্থ “নির্জন দুপুরে”,: কাব্যগ্রন্থ “বসন্ত ছুঁয়ে যায় চৈতি হাওয়ায়”,এবং উপন্যাস খণ্ডিত পাণ্ডুলিপি” তাঁর মোট চারটি বই প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত চারটি বই-ই আশানুরূপ পাঠকপ্রিয় হয়েছে। এছাড়াও লেখকের গল্প, কবিতা, ফিচার ও প্রবন্ধ বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকা, ম্যাগাজিন, ও বিভিন্ন যৌথ সংকলনে প্রকাশিত নিয়মিতই প্রকাশিত হয়ে আসছে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP