নিঃশব্দ অনুশীলন
আমরা শিখেছি কান্নাকে বর্ণমালা বানাতে,
রক্ত হয়ে গেছে জল
মৃত্যু এক নিঃশব্দ অনুশীলন।
সীমানা পেরিয়ে
চলে যায় মুখহীন মানুষের সারি।
সে পথেই ছড়িয়ে থাকে অনাহার আর ধুলো।
শব্দ এখন অপরাধ—
পিঠে ইতিহাসের ক্ষত নিয়ে
শিশুর কণ্ঠে জাগে পুরনো এক সুর।
তারা জানে না, কেন বেঁচে আছে—
মনে হয় জীবন এখনো একটু বাকি।
শব্দের আগে
সব কথা শেষ হলে
যে নীরবতা বেঁচে থাকে—
সেটাই আমার নাম।
আমি বহুদিন শব্দের ওপারে,
নিজেকে ফেলে এসেছি নিঃশব্দ ঘরে।
একি কেবল হারিয়ে যাওয়া?
নীরবতার মর্মর ছিঁড়ে
একটা বক উড়ে যায় ধীরে
তার ডানার নিচে সময়ের ধুলা।
আমার হৃদয় নেই
যা ভেঙে যায় প্রতিদিন—
শব্দের আগে জন্ম নেওয়া নিঃশ্বাসে
জমা ছিল আমার সমস্ত ভাষা।
তুমি কিছু বলোনি
তবু আমি শুনেছি।
সবচেয়ে গভীর ডাক শব্দহীন!
ফিরে আসা
মেঘভেজা সন্ধ্যায়
জবা গোপন করে তার রক্ত
একটা মৃত ফুলের পাশে।
কোনো আহবান নেই
তবু ভাঙা ঘড়ির মত দিনগুলো অর্ধেক রাস্তায় স্থির–
শুকনো মুখের মধ্যে জমে থাকে নীলের ক্ষত,
অথচ সামান্য বৃষ্টির জন্য ভিখারির মতো অপেক্ষা করে একটা একাকি বীজ।
তুমি ভাবো এই শূন্যতা কেবল দুঃখের ঢেউ
আর আমি জেনেছি–
ঢেউ মানে ফিরে আসা–তোমার!
বিস্মৃতির কফিন
তোমার কাছে পাঠানো কয়েকটি শব্দ
মৃত পাতার মতো পড়ে রইল অচেনা উঠোনে।
এলো না কোনো প্রতিধ্বনি।
শূন্য বারান্দায় দাঁড়িয়ে মনে হলো
হয়তো তুমি অন্য কোনো ঘরে,
যেখানে আমার কণ্ঠ পৌঁছায় না।
স্বল্পালোকে গেঁথেছিলে দুটো শূন্য দড়ি, বানিয়েছিলে বাঁধন।
অথচ ঝোঁপে আটকে থাকলো সেসব স্মৃতি,
গত শরতের মতো অচল।
তোমার অনুপস্থিতির ছায়া
শরীরে লেগে থাকা ধুলো।
ডাকঘরের অন্ধকারে থেমে যাওয়া কাগজগুলোতে
সব জানিয়েছি তোমাকে।
যতবার শূন্যতা সরিয়ে
তোমার দিকে যাই
অপরিচিত স্রোত ভাসিয়ে নেয়
অদৃশ্য তীরের ওপারে।
আমি আজও অবিচল স্থবিরতায়—
শুধু তোমার বিস্মৃতির কফিন
রয়ে গেছে আমার কাঁধে।
আত্মশূন্য
ভেঙে পড়ে একটুকরো শব্দ—
বেজে ওঠে ভেতরে দীর্ঘ বৃষ্টির সুর।
শুকনো চোখ,
তবু জমে ওঠে পাতাহীন গাছের দোল।
দুপুরের সোনালি নিস্তব্ধতায় ঘুমিয়ে থাকা উঠোনে,
ছুটে চলে এক রঙিন প্রাণী
সময়কে বয়ে নিয়ে যায় পেছন-পেছন।
নীরবতার কোলে জমে একাকিত্বের আশ্রয়,
গলে মিশে যায় সব আলো-ছায়া
অচেনা এক শূন্যতায়,
যে আসে শামুক-ছন্দে।
তার কাঁধে হাত রাখতেই
বুঝতে পারে সে—
হাতটা তার নিজেরই।
আনিকা নাওয়ার। কবি, প্রচ্ছদশিল্পী ও আবৃত্তিশিল্পী। জন্ম ও স্থায়ী নিবাস চট্টগ্রাম। বর্তমানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর শ্রেণিতে অধ্যয়নরত। তার কবিতা দৈনিক পত্রিকা ও অনলাইনে নিয়মিত প্রকাশিত হয়। ইতোমধ্যে আনিকার কবিতা পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে। আনিকা নাওয়ারের কিছু কবিতার সঙ্গীত-রূপ সুইজারল্যান্ড থেকে সুরারোপিত হয়ে প্রচারিত হয়েছে এবং বোদ্ধা মহলে প্রশংসা কুড়িয়েছে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।