নীলরঙা প্রেমিক
কোনো এক প্রাচীন নগরীর মতো
বিস্মৃতির অতলে তুমি হারিয়ে গেলে
উত্তাল গঙ্গায় ভালোবাসা বিসর্জন দিয়ে
শেষ জামানার নীলরঙা প্রেমিক হলে।
শোষণের ঘেরাটোপে, বিরহের ধিক্কারে
আমি আজ অতন্দ্র বিপ্লবী পাহাড়
বিবর্ণ দিনের শেষে রাত্রির মতই
নিমগ্ন হাহাকারে ভরা গহিন আঁধার।
নীল নিপীড়নের লাল ইতিহাস হয়ে
বুকের মধ্যে আজও তো বিঁধে আছো
সবুজ ঘাসের উপর সেই যে শিশির জল
জানি সেবারের হেমন্তেই সবই ভুলে গেছ।
খুব ছোট এইজীবনে থাকে না কিছুই সতেজ
প্রেম, বিরহ সবই দিনে দিনে হয়ে যায় নিস্তেজ।
তারপরও থেকে যায় কিছু ক্ষত কিছু দীর্ঘশ্বাস
সেটুকু ধারণ করেই আমার গল্প, কবিতা, উপন্যাস।
পথিক হবো
যে পথ গিয়েছে বেঁকে তোমার বাড়ির পাশে
আমি না হয় পথিক হবো সে পথের আশেপাশে।
ক্লান্ত হলে ঘুমিয়ে যাবো নদীর পাড় ঘেঁষে
তুমি না হয় দেখে যেও নিঝুম রাতে এসে।
জোনাকিদের বলে দিও আমার সঙ্গী হতে
ঝিঁঝিঁপোকা গান শুনিয়ে ঘুমায় যেন সাথে।
ভোরবেলাকে বলে যেও আমার দুঃখের কথা
আদরে যেন ভুলিয়ে দেয় সকল বুকের ব্যথা।
ভুল করেও ছুঁতে এসো না আমার এই দেহ
তুমি-আমি কাছাকাছি দেখেনা যেন কেহ।
তোমার বাড়ির পুকুর ঘাটে দুপুরবেলা যাবো
জলপদ্মের সঙ্গী হয়ে মনের কথা কবো।
বিকেলবেলা হাঁটবো গিয়ে বাড়ির পাশের মাঠে
আমার চোখের জলে ভেসে সূর্য যাবে পাটে।
এমনি করেই থাকবো পাশে সারা জনম ধরে
তোমার পাশে কবর হবে যেদিন যাবো মরে।
মনখারাপের ঘরবাড়ি
সেই যে তোমার লেখা পুরনো চিঠিপত্র
এগুলো আর আমার কাছে নেই,
তোমাকে কেন্দ্র করে কোনো স্মৃতি, মায়া
সে-সবও আর অবশিষ্ট নেই কিছুই।
এই সমাজের সভ্যতার ভীরু নগ্ন সমর্পণে
বহুকাল আগেই আমি সব হারিয়ে ফেলেছি।
আমিও তো প্রতিদিন হারিয়ে যাই,
গভীর রাতের গুমোট অন্ধকারে।
তুমিই বলো,
সেই আঁধারে বসবাস করে
পুরনো চিঠিপত্রের কি কোনো প্রয়োজন আছে ?
এক বৈশাখের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে
অতীতের সবকিছুই তো উড়িয়ে দিয়েছি।
কারণ,
একজীবনে কতই বা আর আঘাত ভালো লাগে
একটা বুক কতটুকুই বা কষ্ট ধরে রাখে?
একটা মানুষ, একজীবনে
ক’জনেরই বা হতে পারে?
সেই মানুষটার সহ্য শক্তিই বা কতটুকু থাকে?
আমারও তো ইচ্ছে করে সুখী হতে।
কারো মন ভোলানো কথাবার্তা
এখন আর আমার ভালো লাগেনা।
বহুদিন যাবৎ কারো প্রতিই
কোনো মায়া বা টান অনুভব করি না।
তুমিই বলো,
মনখারাপের ঘর-বাড়িতে
কারই বা এসব ভালো লাগে?
ফিরে আসা
আমি জানি তুমি আসবে,
পূর্ণিমার চাঁদ হয়ে আমায় ছুঁয়ে দিতে
অথবা,
ভোরের কুয়াশা হয়ে আমায় সিক্ত করতে ৷
আমি জানি তুমি আসবে,
বিকেলের রংধনু দিয়ে
আমায় রঙিন করে সাজাতে
অথবা,
শীতের চাঁদর হয়ে আমায় উষ্ণতা দিতে ৷
আমি জানি তুমি আসবে,
শরতের কাশফুল হয়ে
মনটা আমার দোলাতে
অথবা,
বৃষ্টির টুপটাপ শব্দে
আমায় উদাসী করতে ।
আমি জানি তুমি আসবে,
আমি জানি একদিন না একদিন
তুমি আসবেই।
চন্দ্রদেবী
তপ্ত নিঃশ্বাসের প্রবল ঘূর্ণিঝড় মাথায় নিয়ে
অবিরাম আমি দিশেহারা হয়ে ছুটে চলি
কোনো এক অজানার পথে
কখনো একা, কখনো অন্যেকারো সাথে।
হৃদয়ের দুকূল ভেঙে কূলহারা হয়
যে শুভ্র কমল কিশোরী মেয়ে
সেতো জীবনভর কুসুম শয্যার
কালো কেশের ঘ্রাণ খুঁজবেই।
ইলিশ রঙা রোদে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে
বহুকাল ধরে আমি, আমার অতীত দেখি
নিজেকে মিলাতে থাকি,
পৃথিবীর নীলরঙা সব কষ্টের সাথে
তবুও, ভেবে ভেবে
বর্তমান, ভবিষ্যৎ নিয়ে মাতাল মোহে স্বপ্ন বুনি।
পিছনে তাকিয়ে সারাক্ষণ
অদৃশ্য এক তরুণীকে ডেকে বলি
এই যে মেয়ে,
প্রতি পূর্ণিমায় স্বয়ং চন্দ্র
আত্মসমর্পণ করে যার পায়ে
তার কি কোনো দুঃখ থাকে?
তুমিতো চন্দ্রদেবীর ছায়া,
তুমি এক স্বর্গীয় মায়া
তোমার কষ্ট কী?
সামনে তাকাও, ঐ যে আকাশ ,
ওখানে চোখ রাখো, মুগ্ধ হও
দেখো, পুরো পৃথিবী তোমার।
মাধবীলতা
দেখো,
আজ আকাশে ঘোর অন্ধকার ঘনকালো মেঘ
বহুদিন পর আজ ঝুম বৃষ্টিতে ভিজলাম ।
ইদানীং আমি কবিতা লিখি না,
দীর্ঘকাল আর,
তোমাকে খুব একটা মনেও পড়েনা।
সময় আর আগের মতো নেই,
আমিও নেই, আগের সেই।
অনেক অনেক বদলে গেছে সব
দিনে দিনে আমাদেরও বয়স বেড়েছে
কবিতায় আর আগের মতো মন বসে না।
সংসারের ঘেরাটোপ গিলতে গিলতে
দীর্ঘদিন ধরে আমি বড্ড ক্লান্ত।
তীব্র তাপদাহ, বর্ষার ঝুম বৃষ্টি,
নদীনালা, পথঘাট জল থই থই —
দ্রব্যমূল্যর উর্ধগতি, খুন, ছিনতাই
চারিদিকে অনাচার, অবিচার
ইদানীং, সবই আমার ভীষণ অসহ্য লাগে।
আমাদের ভদ্র সমাজে এখন অভদ্রদের বসবাস
ঘুষ, সুদ, অসামাজিক কার্যকলাপ তাদের দুধভাত।
সেই সমাজে আমি, এই আমরা, বড্ড বেমানান।
তাই অমাবস্যা, পূর্ণিমা, তীব্র শীত, ঘন বর্ষা
কোনটাই এখন আর আমাকে টানে না।
দেখো,
আমার মাধবীলতায় কত ফুল ফুটেছে
তোমার দেওয়া শাড়িটা আজ আমি পরেছি।
আমি জানি,
তুমি এখনো আমার লেখা কবিতা পড়ো
আজও প্রতিদিন আমাকে স্মরণ করো
গভীর ভালোবাসার ধরণ বুঝি এমনই, তাইনা?
মানুষ বেঈমান হয়
বদলে যাওয়া মানুষগুলো দেখে
খুব বেশি অবাক হই
সময়ের সাথে সাথে
স্বার্থের কষাঘাতে মানুষ বদলে যায়
হয়ত সময়ই মানুষকে বদলায়।
আজ যে অতি আপন,
কাল সে অনেক পর
আজ যে থাকছে ঘরে,
কাল সে ছাড়ছে ঘর
এ কেমন নিয়ম,
এ কেমন বিচার বিধাতার?
কীভাবে মানুষ সব ভুলে যায়?
ভুলে যাওয়া মানুষগুলো
কতটুকুই বা সুখী হয়
আসলেই কি ভুলে যায়,
নাকি সব অভিনয়?
কতটা বদলে যেতে পারলে,
মানুষ অতীত ভুলতে পারে —-
কতটা বেইমান হলে
মানুষ ভুলে যাওয়ার অভিনয় করে
বেইমান মানুষেরা কি
কোথাও, কখনো সুখী হতে পারে?
দীপান্বিতার দ্বীপমহল
আমি যেন জেগে ওঠা নতুন কোনো দ্বীপ
যার নাম দীপান্বিতার দ্বীপমহল।
এখানে মানুষ না শুধু সর্বহারাদের বসবাস
চারিদিকে থই থই জল
কোথাও কোথাও গভীর অতল।
তবুও আমি বেঁচে থাকার ব্যাকুলতায় আত্মহারা
জানি এখানে কোনো ভালোবাসা নেই
শুধুই ভোগ দখলের প্রচেষ্টা।
এখন আমার খণ্ড খণ্ড শরীর, মন
সবই দখলবাজ, ভূমিদস্যদের দখলে ।
হাজার বছরের তৃষ্ণার্ত আমি
অপেক্ষায় আছি কোনো এক অমাবস্যার রাতে
অঝোরে ঝরে পড়া শ্রাবণ ধারার।
তবুও মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছি
কোনো একদিন বিদ্রোহী হবো বলে।
আমারও যে মুক্ত স্বাধীন হতে ইচ্ছে করে
ইচ্ছে করে
গণতন্ত্রী কোনো রাষ্ট্রের সুনাগরিক হতে ।
একটা নীল চিঠি
সেই কবে আমি রংধনু দেখেছিলাম
প্রেমময় এক মেঘলা পৃথিবীর বুকে।
সেই কবে নীলিমা ছুঁয়ে তোমাকে লিখেছিলাম
ঠিকানাহীন একটা নীল চিঠি ।
সেদিন আমি একাকী খুব গোপনে
অনেক, অনেক কেঁদেছিলাম।
গতকাল মাঝ রাতে অঝোরে বৃষ্টি নামলো
আমার পুরো পৃথিবী যেন ভাসিয়ে দিয়ে গেলো
অনেক দিন পর আবার তোমাকে মনে পড়লো
সুযোগ পেয়ে গোপন কান্নারাও ফিরে এলো,
রাতভর আমি দাঁড়িয়ে ছিলাম বারান্দায়।
বিদ্যুৎ চমকানো গভীর রাতে নীল চিঠি হাতে নিয়ে
শরতের এই ঝুম বৃষ্টিতে একাকী নীরবে ভিজলাম ।
দেখো, আজ আমার বারান্দায় ফুটেছে
অসংখ্য নয়নতারা, বেলী, আর মাধবীলতা
ফুলগুলো মাঝেমাঝেই দুলছে আপন মনে
এই মধ্যরাতে ওরা কি ভাবছে, কে জানে?
মনপবন যেন মিশে যায় এই ফুলের সুবাসে ।
মনে মনে ভাবছি, তুমি ঠিক এমনই একরাতে
আমার আঙিনায় দাঁড়িয়েছিলে
সেই নীল চিঠির উত্তর হাতে
খুব গোপনে স্বর্গসম ভালোবাসা নিয়ে।
আলো ছায়ার মাঝে তোমায় দেখে
ভীষণ ভীষণ অবাক হয়েছিলাম ।
মনে পড়ে তোমার সেই দিনের কথা ?
কুষ্টিয়া জেলার দহকুলা গ্রামের আস্তানাবাড়ির এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ২ ডিসেম্বর হেমন্তকালে ফাতেমা হক মুক্তামনির জন্ম। বাবা খন্দকার সিরাজুল হক, মা সৈয়দা কোহিনুর বেগম। নয় ভাই বোনের মধ্যে ফাতেমা হক মুক্তামনি সবার ছোট। লেখাপড়ার শুরু কুষ্টিয়াতে হলেও শেষ করেন ঢাকায়। পেশায় তিনি একজন ফ্যাশন ডিজাইনার। মাত্র আট বছর বয়স থেকে তিনি লেখালেখির সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন। নিজের জেলা কুষ্টিয়া সহ, দেশ এবং বিদেশের বাংলা পত্রিকা গুলোতে তার লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে প্রায় দুই যুগ ধরে। ফাতেমা হক মুক্তামনির প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে আছে উপন্যাস, ছোট গল্প, কাব্যগ্রন্থ, দিনলিপি ও অনুকাব্যসহ মোট পঁচিশটি গ্রন্থ। কবি ও কথা সাহিত্যিক মুক্তামনির দুই ছেলে-মেয়ে ও অবসরপ্রাপ্ত নৌবাহিনী কর্মকর্তা স্বামীকে নিয়ে ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। ফাতেমা হক মুক্তামনি লেখালেখির পাশাপাশি নিজেকে জড়িয়ে রেখেছেন বিভিন্ন মানবিক কর্মকাণ্ডের সাথে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।