সকল মেনু

কবি ফরিদ আহমদ দুলাল ও একগুচ্ছ প্রেমের কবিতা

একা হতে দাও

অনিবার্য হতে দিও না আমায় তোমার কৃপায়
আশ্রয়ের নামে অবহেলায় করো না অসহায়!
ঘুমাতে দিও না আমায় নিশ্ছিদ্র আদরের ওমে
পৃথিবীর তাপমাত্রা যদি যায় কমে,
একাকী জাগিয়ে রাখো নিরানন্দ রাত
বরাদ্দ দিও না আমায় কখনো কৃপার ‘বরাত’।
জলোচ্ছ্বাসে যদি ভেসে যাই দরিয়ায়
বাতিঘর হয়ে দেখিও না পথ বিপন্ন আমায়,
প্রবল ঢেউয়ের সাথে লড়ে একা বাঁচার সুযোগ দাও
মাথার উপর থেকে তোমার ছায়ার আশ্রয় সরিয়ে নাও।

বর্ণিল আলোয় তোমার উৎসব আলোকিত হোক
অমানিশার আঁধার আমার রাত্রিকে নিঃসঙ্গ করুক।
মদের গেলাস যদি শূন্য হয়ে যায় সাকি হয়ে তুমি কখনো এসো না
মাতালকে ভুলে কখনো ভালোবেসো না;
একা হতে দাও নিঃস্ব হয়ে যেনো মরি
চাঁদ হয়ে আমার আকাশে হইও না কখনো রূপোর তসতরি।

 

স্বপ্নভঙ্গের বেদনা

আমার সমস্ত আয়োজন পলকের তোড়ে ব্যর্থ হয়ে যায়
বিনা মেঘে যখন বিদ্যুৎ চমকিয়া যায় আকাশের আঙিনায়
তোমার প্রবেশ পথ থেকে জঞ্জাল সরিয়ে সাজাই তোরণ
মুখ-গহ্বর সযত্নে ধুয়ে নিঃশ্বাসের মালিন্য তাড়াই
নখ-দাড়ি-গোঁফ ছেঁটে আলিঙ্গন ও চুম্বন নিরাপদ করি
স্বপ্নান্বেষণের সকালে অনন্য কলায় বুকে বিশুদ্ধ নিঃশ্বাস চাই,
বেলি ফুল দিয়ে আনন্দে তোমার ফুলশয্যা সাজাই
তোমার শুভাগমণে রবীন্দ্রসঙ্গীতে আঙিনায় সুরভি ছড়াই।

আমার প্রতিটি উচ্চারণ সতত পবিত্র হবে পাহাড়ি ঝরার জল
বিস্তীর্ণ মাঠের পরে সবুজে সবুজ তুমি ঘন দূর্বাদল
গোধুলির মেঘ তুমি আগামী সকালে এসে ছড়াবে চন্দন
রাত কেন ছিঁড়ে দেয় বিশ্বাসের অনড় বন্ধন;
বজ্র এসে পলকে স্বপ্নের সিঁড়ি ভাঙে, চেয়ে দেখি আলো নাই
আঁধারের নিভৃতিতে ডানাভাঙা দুখী পাখি নিজেকে হারাই!

 

কৈশোরপ্রেম স্মৃতি

তোমার কাছে পৌঁছাতে চাই ফুলের ছোঁয়া ঠোঁটে
শিশিরকণা সূর্যালোকে ঝলমলিয়ে ওঠে
যখন তুমি মুচকি হাসো প্রেমের মায়া মেখে
চাঁদের আলো মলিন হয়ে অবাক চোখে দ্যাখে
যদি তোমার বিষাদ আসে কালো চোখের কোলে
বৃষ্টি ঝরে ঝরঝরিয়ে দু’কূল ভাসে ঢলে
শরৎ এলে শিউলি তুমি রাত্রি শেষে ফোটো
কাশের বনে নৃত্য করো বাতাস হয়ে ছোটো
আমার বুকে প্রণয় দোলা দখিনা বাও তুমি
তোমার প্রেমে রাঙাতে চাই হৃদয় মনভূমি।

তুমি আমার উত্তরীয় তুমি আমার নদী
তুমি আমার দু’চোখে জল কান্না আসে যদি
তুমি আমার সৌরভময় দোলনচাঁপা বাগ
কালো ভ্রমর আমি তোমার বক্ষে অনুরাগ
রাঙাফড়িং তুমি আমার রঙিন প্রজাপতি
মুখ ফিরিয়ে থাকলে দূরে জীবনে দুর্গতি।

 

সূর্যবন্দনা

প্রত্যুষে সকাল থমকে থাকে সূর্যের অপেক্ষা করে
ভোরের পাখির গানে বিষাদের সুর ঝরে পড়ে,
পল্লবিত পাতারা আলোর তৃষ্ণা নিয়ে অপেক্ষায় থাকে
সবুজের আবাহনে প্রকৃতি সূর্যকে গায়ে মেখে নিতে ডাকে,
সূর্যালোকে নিজের সমস্ত বিভা মুহূর্তে মিলায়ে যায়
ঘাসের শিশিরবিন্দু তবু সূর্যালোকস্পর্শী হতে চায়;
জীবনের যত আয়োজন দিয়েছে কিরণ অবারিত উৎসারণে
দিবসের শুরু হোক দৃষ্টি উন্মিলনে মৃত্তিকার আলিঙ্গনে।

মৃত্তিকায় সহিষ্ণুতা খুঁজি আলিঙ্গন-আমন্ত্রণে
পিপাসায় পরিতৃপ্তি পেয়ে যাই প্রেয়সীর অমৃতচুম্বনে
সর্বংসহা মৃত্তিকার গান সকালের সূর্যকে শোনাই তাই
জীবনের সব শূন্যতার ফাঁকে একবিন্দু শান্তি যদি পাই;
ও সকাল, ও সূর্যালোকিত দিন, তুমি মৃত্তিকার পক্ষে থাকো
মৃত্তিকার পাশে ধুলো বলে অযত্নে আমায় দূরে ঠেলে দিও না-কো।

 

প্রণয়সূত্র

দাবানলে যদি পুড়ে যায় বন সে আগুনে আমি পুড়ি মন
মন পুড়ে বুঝে নিই বুকের ভেতর আছে কতটা দহন!
প্রণয় পাঠশালার ছাত্র পৃথিবীর কাছে প্রণয়ের দীক্ষা চাই
জেনে গেছি আমি পৃথিবীতে প্রণয়-শক্তির চেয়ে বড় শক্তি নাই।
পাখিদের সুর শিখে নিলে নিবেদনকলা বুঝি
মেঠোপথ পাশে অচেনা ফুলের হাসিতে আনন্দ খুঁজি,
পাহাড়ের কাছে শিখেছি ধৈর্যের সব অভিজ্ঞান
নদীর স্রোতের কাছে শিখি সমুদ্র-সন্ধান।
আকাশের মেঘ দেখি কী করে রোদের ঢেকে রাখে তাপ
চাঁদের কিরণ কোন্ মহিমায় মুছে দেয় পরকীয়া পাপ!

যে সন্ধ্যাটা অভিসার হয়ে আসে গিট দিয়ে তাকে বেঁধে রাখা যায়?
যে প্রত্যুষ শিহরণ আনে রোজ পাখি গান গায়
সে-কী স্থায়ী হবে ব্রহ্মা-বিষ্ণু-ঈশ্বরের ইশারায়?
অভিসার দীর্ঘ হবে কবে প্রবল বৃষ্টির শুদ্ধ করুনায়?
শ্রাবণের কাছে বৃষ্টি চাই আশ্বিনের কাছে চাই পাহাড়ে শিশির
মৃত্তিকা ফেরালে মুখ বুক ভেঙে যায় উদাসীর;
পাহাড় জাগুক অবিশ্বাসী ঝরাপাতাগুলো পুড়ে হোক ছাই
আগুন জ্বলুক বুকে আগুনের শিখা থেকে ঝরুক রোশনাই।

 

প্রেমোপাখ্যান

যত পথ জুড়ে এ মৃত্তিকায় গোপাটের গতিবিধি
আমি সে পথের মৌন-একক প্রান্তিক প্রতিনিধি
সহসা দ্রুত সে পথ বদলায় স্বরূপ দৃশ্যমান
জাগে সমারোহ পরিপার্শ্বের ভীড়ে বিশ্ব সমান;
মৃত্তিকা তার ব্যস্ততা নিয়ে মগ্ন নিজের ঘোরে
বিশ্বাস ছিল যৎকিঞ্চিৎ নিয়ে গেছে চেনা চোরে
খুইয়েছে যার সর্ববিশ্বাস থাকে সে অন্ধকারে
বিশ্বাস যার হয় ছিনতাই ব্যর্থ সে চিৎকারে!
অসহায় যদি করলে আমায় বঞ্চনা অনাদরে
অভিযোগ করে কী-নিষ্পত্তি নাই যদি অন্তরে!

আনন্দ পাও বিস্ময় মোহে বিস্মৃতি লয়ে একা
আমি দিগন্তে নিঃস্ব পঙ্খি না-হোক পুনর্দেখা
সম্পর্কের সুতো ছিঁড়ে যদি প্রশান্তি পাও মনে
ভিক্ষাপাত্র নিয়ে একা কেন ঘুরবো সংগোপনে;
তুমি আর আমি হয়তো স্বজন ছলনার অঙ্গনে
আজ সে অতীত সত্তার ভিত ভাঙো সন্তর্পণে।
প্রেমোপাখ্যান হয়নি প্রণয় দু’জনের ত্যাগ ছাড়া
ত্যাগের শক্তি নাই যার বুকে সে হবে ছন্নছাড়া!
হয়তো-বা তুমি চাওনি কখনো প্রেমোপাখ্যান খুশি
আমি হতে চাই কিংবদন্তী ভালোবেসে ভালো বাসি।

 

স্পর্ধার কবিতা নির্মাণ

কবিকে যখন উদ্বাস্তুর মত ফেলে দাও দূরে
মহা সমারহে জাগে কবি ঠিক নিজের অন্তপুরে
যেখানে শূন্য নিরাকার আলো অদৃশ্য ফুলবাগ
সেখানে কবির নিজস্ব ঘর কবিতার অনুরাগ
শূন্য বাগানে ফুল তুলে গাঁথে মাল্যের সমাহার
মালার গোপনে হয়তোবা থাকে নির্ঘুম হাহাকার
অবহেলাগুলো মাল্যের সুতো পুষ্পে তীক্ষ্ণ তীর
পাপড়ির গায়ে অম্লান থাকে প্রত্যুষের শিশির
মক্ষিকাদের চুম্বন দাগ মাল্যে স্পষ্ট পাপ
আবেগ তাড়িত কাব্যের ঠোঁটে সঞ্চিত সন্তাপ;
কবির মালিকা পরে না এখন সত্যনিষ্ঠ চাঁদ
পূর্ণিমা রাতে মৃত্তিকা পাতে কবির মৃত্যু ফাঁদ।

বিশ্বজগৎ ছলনার লীলা কে কাকে নিঃস্ব করে
কার ইঙ্গিতে বিদ্ধ কে হয় বর্শাঘাতে কে মরে
শূন্য নিবাসে নির্মাণ হয় কাব্যের ইমারত
শত চেষ্টায় পাবে না কোথাও সন্ধানে ভূ-ভারত!
আপন মনের মাধুরি মিশায়ে কাব্য রচেন কবি
স্বার্থান্ধতা কলঙ্কে কেউ মুছে দিক জলছবি।

 

অষ্ট প্রহর যার

রাত্তিরে যদি নির্ঘুম থাকি প্রবল ইচ্ছে দেখি
ঘুমাই যখন স্বপ্নে তোমার বিষাদমগ্ন আঁখি!
সকালের পাখি ভৈরবী রাগে অনিন্দ্য গান গায়
সূর্যোদয়ের সুস্মিত রোদে কাঞ্চন দেখা যায়;
দুর্বাঘাসের শীর্ষ-শিশিরে রোদ্দুর লেগে হাসে
কাজল আঁখির চঞ্চল ভাষা মৃদু বলে ভালবাসে
মধ্যাহ্নের রৌদ্রে গলা তৃষ্ণায় চৌচির
সুস্নাত তুমি দাঁড়ালে সমুখে প্রতিনিধি দধীচির।
নিয়ে এলে তুমি বিজয় বার্তা শুদ্ধ অঙ্গিকারে
দিবা রাত্রির অষ্ট-প্রহর চাই তাকে বারেবারে।

শুষ্ক মরুতে সে মরুদ্যান সে মৃত্তিকা প্রজাপতি
নিত্য সে থাকে চিন্তা সূত্রে নাম তার মেঘবতী
স্বর্ণলতার নিকটাত্মীয় লাবণ্য তার নাম
সবুজ বাড়ির প্রাঙ্গণে তার ঘনিষ্ঠ বিশ্রাম
তার মুখে থাকে সৃষ্টির হাসি মৃত্তিকার বেদনা
বুকে জমে তার মুক্তো দানার দীপ্ত সম্মাননা।

 

প্রেমের ডাক

রাজার বাড়িতে বাল্যের সখি ব্রহ্মপুত্র তীরে
কৈশোরে খুব হাঁটতাম একা মাছ-পাখিদের ভীড়ে
সেই ঠিকানায় অস্থির হয়ে পাবে না আমায় খুঁজে
আত্মগোপন করতে এখন থাকছি চক্ষু বুঁজে!
মরাকাটালের বিষণ্ন জলে মীন শিশুদের খেলা
খঞ্জনা-লেজে বিমুগ্ধ নাচে গড়াতো তখন বেলা
এখন যতই সন্ধান করো খঞ্জনাদের ভীড়ে
পাবে না আমায় কক্ষনো আর ব্রহ্মপুত্র তীরে।
বাগানবাড়ির বটের তলায় কিম্বা অশোক ছায়ে
অথবা ধরো না পাবে না আমায় ছায়া সুনিবিড় গাঁয়ে
উন্মূল আমি স্বজনের থেকে নিজের ছায়ায় একা
কাঙ্ক্ষিত গ্রাম ফুল পাখিদের হচ্ছে না আর দেখা।

যার আহ্বানে একাকী হলাম সে থাকে না কাছে-পাশে
ঘাসের ফড়িঙ লুকায় যেমন সবুজ রঙের ঘাসে
আমি আছি তার সান্নিধ্যে সতত নিঃশ্বাস-দমে
অহংকারের রোদ্দুরে পুড়ে অবহেলা ডটকমে;
চির-নিভৃতির গহন গভীরে একাকী নিঃস্ব থাকি
সে থাকুক দূরে আমি তবু তারে দমে দমে কাছে ডাকি।

 

ছাড়াছাড়ি

তোমার-আমার সম্পর্ক আজ তলানিতে পৌঁছেছে
নাটায়ের সুতো ছিঁড়ে গেছে ঘুড়ি চোখে দৃশ্যত আছে
অদৃশ্য হতে কিছুটা সময় মাত্র রয়েছে বাকি
আকাশের নীল পেরুলে ঘুড়িটি দেবে জন্মের ফাঁকি;
পাড়ায় পাড়ায় কবি আড্ডায় তুমি দুর্জন দাগী
আর আমি তার কলঙ্ক হবো প্রণয়ের সহভাগী;
প্রণয় তৃষ্ণা নিঃশেষ যদি প্রয়োজন কেন ছলে
অবশেষে তুমি জয় তুলে নেবে ছলে-বলে কৌশলে;
স্বার্থ আদায় হয়ে গেলে তুমি ঘুড়ি ছিঁড়ে যাও চলে
বাকুল্যা মেঘ ঘুড়িটাকে খায় প্রেম ভাসে আঁখি জলে।

প্রেমের জন্য স্বর্গ ছেড়েছে যুগল জীবন মন
অগ্রাহ্য করে শাসন-বারণ খায় জ্ঞান-গন্ধম
যতবার ভাবো বিজয় তোমার পরাজয়ে আমি পুড়ি
আকাশ পেরিয়ে ছুঁয়েছি আকাশ একা নিঃসঙ্গ ঘুড়ি;
যতবার পুড়ে যতদূর যাবে পাবে শুধু মৃত ছাই
গণনার পর অঞ্চলে পাবে অঢেল শূন্যতাই।

 

বিরহকাল

যে মুখের হাসি আনন্দে রাখে নির্ভার সংগ্রামে
সে যদি হঠাৎ হারায় সুদূরে নিভৃতির এক গ্রামে
যে গ্রামের পাখি মাঠের সবুজ গোপাটের যত ফুল
আনন্দচিতে গন্ধ ছড়ায় জুঁই-চম্পা-বকুল;
তবু চেনা পথ নিরালোক হলে অন্ধের মত চলা
থেমে যায় নদী বায়ু চলাচল প্রাণে প্রাণে কথা বলা।
বিচ্ছেদ কাল মৌন-স্থবির যেমন থাকে পাহাড়
ফুরসত পেলে লুণ্ঠন হয়ে যাচ্ছে মুক্তো হার!
বিরহ রচনা করে অবহেলা প্রেমিক হারায় পথ
যাপনানন্দ হারায় যে তার সুখী ঋদ্ধ জগৎ।

সম্পর্ক কে যাও ছিঁড়ে দূরে ভাগ্য কি নিয়ে যাও
যায় না ভাগ্য ঘুনপোকা হয়ে হৃদয়-মগজ খাও!
ভালোবেসে তুমি কষ্ট ভিন্ন কিছু কি পেরেছো দিতে
শেখোনি যদিও দিতে আনন্দ দিয়েছো জহর তিতে;
আমিও শরাবে বুঁদ হয়ে থাকি মগ্ন শরাবি গীতে
সবুজ শীতল বরফে কি তুমি শিহরিত হও শীতে!

 

ঘোলা চাঁদের ছবি

যে চাঁদের আলো অস্পষ্টতা বেদনায় অপরূপ
বোবা চন্দ্রটি অভিমানে তাই করে আছে যেন চুপ!
ঘোলা চাঁদ নিয়ে মনে মনে তুমি যতই স্বপ্ন আঁকো
বিষণ্ন চাঁদে তন্দ্রাকাতর হতবিহ্বল থাকো!
লটকন ফল বুকের গভীরে রাখে ঘোলা বীজ ধরে
পূর্ণিমা চাঁদ জানি না কেন যে ঘোলা হয়ে ধরা পড়ে!
আষাঢ়ের চাঁদে কিসের বিষাদ কেন ঘোলা তার মুখ
কী বলতে যেন নির্ঘুম রাতে হয়ে আছে উন্মুখ!
গভীর রাতের আকাশে যখন মেঘ-গাঙে চাঁদ ভাসে
কেন তুমি ভাবো একলা পেয়েছে তাই বুঝি চাঁদ হাসে!
বিষণ্ন হাসি চন্দ্রমুখের অজানা বেদনা মাখা
তোমার ছবিতে কি সে সত্যটি আদৌ পড়েছে ঢাকা!

পৃথিবী যখন চাঁদের আলোয় আনন্দ পায় খুঁজে
তুমিই বা কেন বিষাদ এঁকেছো আহলাদে চোখ বুজে!
হয়তো জানো না কার অশ্রুতে ঘোলা চাঁদ হ’ল ম্লান
অলক্ষে কার প্রভাবে আকাশ ছড়াচ্ছে অভিমান!
তোমার প্রেমিক অনুপম যদি বিচ্ছেদে হয় নীল
সে বার্তা চাঁদে দ্রুত পৌঁছায় খয়েরি ভুবন চিল।

প্রেমে সমীহ-সম্মান

শ্রুত যত শব্দ-বাক্যকে যাচাই করি নিজের স্থুল প্রজ্ঞায়
যখন বিশ্বাস মুখোমুখি, প্রশ্ন করি— কেন ভুল ঠিকানায়!
প্রতারিত হতে চাইনি বলে প্রেমকে বলেছি— দূরে থাকো
তথাপি স্বার্থান্ধ প্রেয়সীর হাসি বলে— কাছে ডাকো!
ততোদিনে জানা হয়ে গেছে ছলনার ব্যাকরণ
পৃথিবীর মায়া ছেড়ে গেছে প্রেম পাপের কারণ
স্বার্থান্ধতা থেকে লোভ, লোভে আসে পাপ,
পাপে তার যুক্ত হয় অনন্ত সন্তাপ!
তাই বলি— অভিনয় তোমার সংযত রাখো বন্ধু যথারীতি
তবু মেকি অবয়ব নিয়ে আসে নকল সম্প্রীতি!

স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে আসে পবিত্র প্রেমের দ্যুতি
সবুজ পৃথিবী চাষাবাদে আনে আলোর আরতি
স্বর্গীয় প্রণয়ে আসে সৃষ্টির মৌসুম
মানুষের ভাগ্যে আসে ফসল তোলার ধুম
আশাবাদী মানুষ সঞ্চয় করে স্বপ্ন বুনিয়াদ
বঞ্চিত জীবন পায় ঋদ্ধি, ক্ষুধার্ত মানুষ পায় খাদ্যের সংবাদ!
যখন সৃষ্টির উৎস প্রেম, তাকে কেন করো অপমান!
প্রেমে মুক্তি-প্রেম দেয় মানুষকে সমীহ-সম্মান।

 

বন্ধু, ভাল আছো?

বেঁচে আছি, সে-ই সুখে আনন্দে কাটাই প্রতিদিন
যদিও মৃত্যুর বিভীষিকায় কাটাচ্ছি রাত্রি-দিন
মৃত্যুর অধিক অপদস্ত হবার শঙ্কায় কাটে দুঃসময়
চারিদিকে স্বার্থান্ধতা নাগরিক বিরোধের ভয়!
পথে-ঘাটে ইতিহাস-শৌর্য-বীর্য অপমান হয়
উশৃংখল জনতার হাতে নিগৃহীত হবার সংশয়!
সারল্য সৌজন্য করে বলে, ‘ভাল আছি অতিশয়’
প্রতিটি মুহূর্তে যদিও রয়েছে নিঃশ্বাসের ভয়।
এতো উৎকণ্ঠায় মানুষ কি পায় সহজ জীবন
আগাপাশতলা জুড়ে বৃশ্চিকের এখানে অবাধ বিচরণ।

ঘরে বন্দী বসে আর কতদিন নিরাপদ ডাকা
আর কতদিন নিরুত্তর অলীকের শরণার্থী থাকা
প্রতারক পশ্চিমের ছলনায় কত আর আত্ম-সমর্পণ
আর কত আত্মপ্রবঞ্চনায় অস্বচ্ছ জলে সন্তরণ
যা-কিছু বিষাক্ত আদ্যপান্ত নষ্ট-ভ্রষ্ট পুঁতিগন্ধময়
‘খোল-নইচা’সহ উৎপাটনে চাই বিশুদ্ধ সময়!

ফরিদ আহমদ দুলাল সত্তর দশকের অন্যতম কবি। কবি পরিচয়ের পাশাপাশি তিনি নাট্যকার, সমালোচক, প্রাবন্ধিক হিসেবেও পরিচিত। লিটলম্যাগ সম্পাদক ও সংগঠক হিসেবেও তিনি তাঁর দক্ষতার প্রমাণ রেখেছেন। জন্ম ১৮ মে ১৯৫৬ বাংলাদেশের ময়মনসিংহে। ঠিকানা: ৬৯ রামবাবু রোড, ময়মনসিংহ। বাবা মির্জা মো. ফেরদৌসী, মাতা ফাতেমা আখতার খাতুন। স্ত্রী কুমকুম সরকার। তিনি এক কন্যা ও এক পুত্র সন্তানের জনক। কন্যা রুবাইয়াত অস্মিতা অদিতি, পুত্র অনন্ত অনুপম। বর্তমানে বসবাস করছেন ময়মনসিংহে। তিনি ময়মনসিংহের মৃত্যুঞ্জয় উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৯৭৩ সালে এসএসসি (বাণিজ্য বিভাগ) ও ১৯৭৫ সালে সরকারি আনন্দমোহন কলেজ থেকে এইচএসসি (বাণিজ্য বিভাগ) পাস করেন। একই কলেজ থেকে ব্যবস্থাপনায় ১৯৭৮ সালে স্নাতক ও ১৯৭৯ সালে একই বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। দীর্ঘদিন সরকারি চাকুরি করে বর্তমানে অবসর জীবন যাপন ও লেখালেখি করছেন।

কবি ফরিদ আহমদ দুলাল-এর লেখালেখি শুরু করেন ১৯৬৮ সালে। প্রথম লেখা প্রকাশিত হয় ১৯৭৪ সালে। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৫৪টি। তার মধ্যে কাব্যগ্রন্থ ১৯টি, নাট্যগ্রন্থ ১২টি, প্রবন্ধ ৮টি, গবেষণা ৮টি, গল্প ৩টি, উপন্যাস ২টি এবং অন্যন্য ২টি। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ বাংলাদেশ ও ভারত থেকে তিনি বেশকিছু পুরস্কার ও সম্মাননা প্রাপ্ত হয়েছেন।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP