কেমন? ভাআআই সিরাম! (সেই রকম!) ফাটাফাটি! কেমন ছিল রে? ধুর! ঝুলে গেছে! পুরাই বোগাস মামা! পরিচিত লাগছে শব্দ বা অভিব্যক্তিগুলো? পরিচিত হোক বা অপরিচিত, হামেশাই অনুভূতি বোঝাতে নানান শব্দ এবং ভঙ্গির আশ্রয় নেয়াটা মানুষের স্বভাবজাত। এই শব্দ চয়ন আর অনুভূতি প্রকাশের ভঙ্গি থেকে আমরা মানুষ সম্পর্কে ধারণা করে নেই। আরো একটু ভাবুন তো, মানুষ সম্পর্কে ধারণা মানে কী?
ধারণা মানে আপনার ন্যাচারাল ব্রেন ইন্টেলিজেন্স (যেটি দেখে আর্টিফিশিয়াল ডিজাইন করা হয়েছে) তার স্মৃতির মহাসমুদ্র থেকে সেই মানুষটাকে এক বা একাধিক ক্যাটাগরি দিয়ে ট্যাগ করে। রাগী বা অমায়িক, মানুষটার মনটা বড় বা ছোট, ম্যানার নেই বা আছে, গেঁয়ো-চালু, ছ্যাঁচড়া-উদার, জাঁদরেল বা গোবেচারা ইত্যাদি আরো অসংখ্য রকম হতে পারে ট্যাগ।
অর্থাৎ মানুষটা এমন। পরবর্তীতে তাকে এভাবে সামলাতে হবে। কোন পরিস্থিতিতে কাকে কীভাবে সামলাবেন এটার জন্যে বেশ কিছু কৌশল আছে। এই লেখায় সেদিকে আমরা যাচ্ছি না। আজ আমরা নিজের শব্দ ভাষা আচরণের ওপর নিয়ন্ত্রণ বিষয়টাই বোঝার চেষ্টা করব।
কখনও কী ভেবেছেন, কোন কোন শব্দ আপনার কথায় বেশি ব্যবহার করেন? বোঝার সহজ উপায় হচ্ছে, স্মার্টফোনে মেসেজ লেখার সময় কি-বোর্ডের সাজেশন! দেখবেন, সাজেশন সঠিক হওয়ার হার গোল্ডেন জিপিএ পাওয়ার মতোই! কারণ মেমোরি থেকে কি-বোর্ড জানে, কোন ব্যক্তির সাথে আপনি কোন কোন শব্দ বেশি ব্যবহার করেন। সেভাবেই তাকে প্রোগ্রাম করা হয়েছে। তাই তার পরামর্শগুলোর ওপর আপনার নির্ভরতা বেশ! ফোন চেঞ্জ করলে বা নতুন কোনো কি-বোর্ড ইনস্টল করলে আমাদের এই অভ্যস্ততার বিষয়টা ধরা পড়ে।
কোনো পরিস্থিতি বা ঘটনার প্রেক্ষিতে আপনি কেমন আচরণ করেন, পোশাক পরেন, কথায় কী কী শব্দ ব্যবহার করেন, তা থেকেই অন্যদের কাছে আপনার ‘ইমেজ’ বা ব্যক্তিত্ব তৈরি হয়। এগুলোকে আপনি নিয়ন্ত্রণ করে আপনার ব্যক্তিত্বে পরিবর্তন আনতে পারেন। এখনকার ভাষায় ‘স্মার্ট’ হতে পারেন।
একটু খেয়াল করলেই বুঝতে পারবেন, কখন কখন আপনি ‘স্মার্ট’ থাকতে পারেন না! পোশাকে নয় অবশ্যই, আচরণে! হয়তো বেশ কিছু পরিস্থিতি আছে, যেখানে আপনি রাগ সামলাতে হিমশিম খান! বেশ কিছু শব্দও আছে, যেগুলো আপনার কানে এলেই ওই যে যেমনটা বলে কেউ কেউ! ‘আমার তখন মাথার ঠিক ছিল না!’ ঠিক সেরকম অবস্থা হয়।
আবার হয়তো পরীক্ষার মুহূর্ত এলেই কারো কারো ‘আত্মবিশ্বাস’ পরীক্ষা শেষের আগেই কক্সবাজারে বেড়াতে চলে যায়! যতটুকু প্রস্তুতি ততটুকুও ভালোভাবে লিখতে পারে না। এসবের কী সমাধান আছে? আছেই তো!
একটা মজার ঘটনা শোনাই। এক লোক একবার হঠাৎ আবিষ্কার করলেন, বাঘের গর্জন শুনেও তার হৃদয় কাঁপে না, কিন্তু কুকুর দেখলেই তার অবস্থা কেরোসিন হয়ে যায়! তাকে দেখলেই কুকুরেরাও ঘেউ ঘেউ শুরু করে। কাকে বলবেন আর দুঃখের কথা! শেষমেষ শরণাপন্ন হলেন এক বিজ্ঞ ব্যক্তির। খুলে বললেন, এই হাস্যকর বাস্তব সমস্যার কথা। জ্ঞানী লোকটি তাকে শিখিয়ে দিলেন একটি ছোট্ট পদ্ধতি। কুকুরের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ভয় লাগলেই মনে মনে আওড়াতে হবে, ‘আমি বিশ্বাসী! আমি সাহসী! আমি বিশ্বাসী! আমি সাহসী!’
খুব একটা বিশ্বাস না এলেও রাস্তায় কুকুরদের পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় খানিকটা অনিচ্ছাসত্ত্বেও কথাগুলো বলতে শুরু করলেন লোকটি। কিছুদিন পর এর কার্যকারিতা দেখে তো তিনি অবাক হয়ে গেলেন! কুকুরেরা এখন আর ঘেউ ঘেউ করছে না। তিনি ব্যাখ্যার জন্যে ছুটলেন জ্ঞানী লোকের কাছে।
জ্ঞানী বললেন, ব্যাখ্যা খুব সহজ। যখন আমরা ভয় পাই, তখন শরীরে হরমোনাল নানান পরিবর্তন হয়। ফলে অঙ্গভঙ্গি, ঘামের গন্ধ, হার্টবিট বেড়ে যাওয়া ইত্যাদি সূক্ষ্ম পরিবর্তনগুলো কুকুর তার তীক্ষè ঘ্রাণশক্তির কারণে আঁচ করতে পারে। যার কারণে অস্বাভাবিক কিছু আঁচ করে সে ঘেউ ঘেউ করে।
যখন বার বার বিশ্বাসী, সাহসী বলা হচ্ছে, তখন শরীরে সে হরমোনাল পরিবর্তনগুলো আর হচ্ছে না। ফলে কুকুরও অস্বাভাবিক কিছু মনে করছে না।
জ্বি! ইতিবাচক শব্দ এবং এর সঠিক প্রয়োগে অনেক কিছুই করা সম্ভব। যেসব জায়গায় আপনার ভয় লাগে, আপনি সেসব জায়গায় আমি বিশ্বাসী! আমি সাহসী! এই টেকনিক প্রয়োগ করে দেখতে পারেন।
তবে আপনার নার্ভাস সিস্টেম এ কথাগুলো সবচেয়ে ভালোভাবে গ্রহণ করবে যদি কথাগুলো বলার সময় আপনি প্রশান্ত থাকেন, ব্রেন ওয়েভ আলফা লেভেলে থাকে। আমাদের মানসিক অবস্থার প্রকাশ ঘটে ব্রেন ওয়েভ দিয়ে । আমরা উত্তেজিত হলে এই ওয়েভ গামা লেভেলে (২৭ সাইকেল+) থাকে। এ চরম উত্তেজনা/ অস্থিরতার মুহূর্তে নতুন কিছু বোঝা তো দূরের কথা, ব্রেনের আগের তথ্যগুলোও ঠিকমতো মনে পড়ে না। ফলে সিদ্ধান্তগুলো খুব সহজেই ভুল হয়। আর যখন আমরা স্বাভাবিক থাকি, তখন ব্রেন ওয়েভ থাকে বিটা লেভেলে (১৪-২৬ সাইকেল)। এই লেভেলে আমরা অনেক কিছুই মনে রাখতে পারি। চিন্তা-ভাবনাগুলো কিছুটা গুছিয়ে করা যায়।
আর ব্রেন সবচেয়ে ভালো কাজ করে যখন আমরা প্রশান্ত থাকি, বিজ্ঞানের ভাষায় আলফা লেভেলে (৮-১৩ সাইকেল) থাকি। সাধারণত প্রশান্তিদায়ক ঘুমের সময় আমরা এই লেভেলে থাকি। ভালো ঘুমের পর, জেগে উঠেও এই লেভেল কিছু সময় থাকে।
এসময় ব্রেন নির্দেশনা সবচেয়ে ভালো গ্রহণ করে। অর্থাৎ ‘আমি বিশ্বাসী! আমি সাহসী’ এই কথাগুলো আলফা লেভেলে থাকা অবস্থায় আমাদের নার্ভাস সিস্টেম খুব সহজেই গ্রহণ করতে পারবে। খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই, ভালো একটা ঘুম হলে জীবনটাও অনেক গোছালো লাগে!
এই আলফা লেভেলে কী সবসময় থাকা যায়? যাবে, যদি চর্চা করেন। আলফা লেভেলে অর্থাৎ প্রশান্তিময় অবস্থায় সবসময় থাকার চর্চাই হচ্ছে মেডিটেশন। মেডিটেশন বা ধ্যানের ইতিহাস ৫,০০০ বছর পুরনো। তবে এর জন্ম কিন্তু বাংলায়। বাংলার ধ্যান কীভাবে চীন দৌড়ে চ্যান আর জাপান পৌঁছে জেন হয়ে সারা বিশ্বে ছড়ালো তা আরেক মহাকাব্য।
আমাদের দেশে আবার মেডিটেশন নিয়ে আগ্রহ তুঙ্গে উঠছে! এটি ভালো ব্যাপার। তবে চাইনিজ কপির মতো ৫ মিনিটের দমচর্চাকে মেডিটেশন ভেবে ভুল না করাই ভালো; যে যতই ফার্স্ট কপির প্রতিশ্রুতি দিক! কারণ মেডিটেশন পৃথিবীর ইতিহাসে সেরা আবিষ্কারগুলোর একটি। এটি দিয়ে মুনি-ঋষি, ওলী-আউলিয়া, নবী-রসুলরা উপলব্ধির সর্বোচ্চ স্তরে পৌঁছেছেন। সেসব তো সাধনার উচ্চতর বিষয়। তবে নিজের দেহ-মনের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার জন্যে মেডিটেশন সবচেয়ে সহজ পথ।
বাংলাদেশে মেডিটেশনের সবচেয়ে জনপ্রিয় পদ্ধতি কোয়ান্টাম মেথডের শিথিলায়ন মেডিটেশনটি (https://shorturl.at/QNecj) আগ্রহীরা চর্চা করে দেখতে পারেন। অডিওর নির্দেশনা অনুসরণ করলে ধাপে ধাপে আপনি পৌঁছে যাবেন ধ্যানের গভীর স্তরে। যেখানে আপনার নির্দেশনা অনুসরণে সদাপ্রস্তুত থাকবে আপনার সবচেয়ে চৌকস মন্ত্রী ব্রেন।
ধ্যানের স্তরে ব্রেনকে কমান্ড দেয়ার পদ্ধতির নাম অটোশাজেশন। খেয়াল রাখবেন এ স্তরে ইতিবাচক শব্দ ব্যবহারের ব্যাপারে। যেমন- আপনি চান পরীক্ষা বা কাজের সময় এই ৩ ঘণ্টা মনোযোগ এখানেই থাকবে। অন্য কোনোদিকে নয়। এক্ষেত্রে অটোসাজেশন কী হবে? আমি পরবর্তী… ঘণ্টা পূর্ণ মনোযোগের সাথে এই কাজ করব। অর্থাৎ নেতিবাচক শব্দ পরিহার করবেন।
আগ্রহীরা (https://shorturl.at/TtUxg) এখান থেকে প্রয়োজনীয় অটোসাজেশন শিখে নিতে পারেন। এখানে সহ¯্রাধিক অটোসাজেশন দেয়া আছে। ভালোবাসার দাম নির্ধারণ করা অসম্ভবের প্রায় কাছাকাছি! তাই ‘অমূল্য’ উপহারকে ‘বিনামূল্য’ ভেবে উপেক্ষা করবেন না যেন। মুক্তোওয়ালা ঝিনুক পেয়ে না খুললে তো আর মুক্তোর সন্ধান মিলবে না।
এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তব প্রসঙ্গ দিয়ে লেখার ইতি টানা যাক। ভালো আমরা সবাই হতে চাই, গুণী হতে চাই, কাক্সিক্ষত বাস্তবতা নির্মাণ করতে চাই। কিন্তু গোপন কথা একটিই! মোটিভেশনের সাথে প্রেম বিয়ে পর্যন্ত কোনোভাবেই গড়ায় না! অর্থাৎ মোটিভেশন ধরে রাখতে পারি না! জীবনে ৩ ভাগের ১ ভাগ ঘুমাতে (৬০ বছর বাঁচলে ৮ ঘণ্টা করে ঘুমালে ২০ বছর আর ৬ ঘণ্টা করে ঘুমালে ১৫ বছর ঘুমাতেই চলে যায়) আর ভিউ ব্যবসায়ী অমুক ভাই তমুক আপা চমুক কোচের মোটিভেশনাল স্পিচ শুনতে শুনতে আরো ১ ভাগ প্রায় চলে গেল, কতজনের কত কিছু হয়! আমি তো ভাই যেই লাউ সেই কদুই রয়ে গেলাম!
নিজের দিকে না তাকিয়ে অন্যদের দিকে তাকানোর শাস্তি হচ্ছে এটি! মোটিভেশনাল স্পিচ বড়জোর সাময়িকভাবে উদ্দীপ্ত করতে পারবে আপনাকে। আর পরিশ্রমের তুলনায় আকাশকুসুম সাফল্য লাভের একটা অবাস্তব আকাক্সক্ষা তৈরি করবে!
সত্য হচ্ছে, সাফল্যের জন্যে মেহনত আপনাকেই করতে হবে। তবে নিজের ভেতর থেকে পরিবর্তনের তাগাদা তৈরির জন্যে আপনি মেডিটেশন এবং অটোসাজেশনকে কাজে লাগাতে পারেন। মোটিভেশনাল স্পিচ-এ সময় অপচয় না করে যত আপনি নিয়মিত মেডিটেশন এবং অটোসাজেশন অনুশীলন করবেন, তত নিজেই হয়ে উঠবেন নিজের মোটিভেশন!
কে জানে এই স্মার্ট সিদ্ধান্তের ফলে অমুক ভাই তমুক আপা ডাউন ফিল (মোটিভেশনের অভাব) করলে আপনার কাছে একদিন আসতে পারেন উজ্জীবিত হওয়ার জন্যে। সেই দিনটির স্বপ্ন আঁকার অনুরোধ রইল মেডিটেটিভ লেভেলে। বিশ্ব মেডিটেশন দিবসের শুভেচ্ছা ও ‘অমূল্য’ ভালোবাসার উপহার।
লেখক: জান্নাতুল আদন, সমাজকর্মী
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।