ইঙ্গিতপ্রসূত কার্নিভ্যাল
একপশলা নেশাতুর রোদে পাখিরা পোহায় উত্তাপ
খুব বেশী মনে পড়ে। বর্ণবিভা হলুদ ঝরাপাতার পথে জ্বেলেছিলে দু’চোখের মায়া-জ্যোতি আগুন ।
প্রলোভিত হাওয়ায় বেজেছিল যতিচিহ্ন স্পর্শকাতরতা—
হয়তোবা নেমেছিল বৃষ্টি নিভৃত কথার জীবনে
গুচ্ছ মৌসুম-রমণ বেদনায় ফুটেছিল নিবিড় উচ্ছ্বাসে
বড় বিলাসী চাওয়ার এ যোগাযোগ অনাহুত আবৃত্তিক
তথাপি দৃশ্যগুলো দেয়ালে আড়াল হলো ; ইঙ্গিতপ্রসূত সন্তাপে ।
পৃথিবী রঙে সাজে, মেতে ওঠে উৎসবসমাজ ঈর্ষামগ্ন—
নদীর ধার ঘেঁষে নির্জনতার ভাঁজ খুলে অধিকৃত আঁধার থেকে
বিন্দু সন্ন্যাস বিষাদের কণা কুড়িয়ে জমিয়ে রাখি ললাটের পর্বভাগে—
এমন বিস্ময় দৃষ্টি মেলে হিম-ক্রন্দনে জেনেছি যাপনহেতু
এই সামান্য ভ্রমের দিন, নদী-মেঘলায় জীর্ণ ধ্বনিতে কবিতা হয়ে নাচে।
হায় একাকীবোধ, নতমুখী উপসনারত দৈবপ্রণোদনায় বাঁচো—
বিপুল আকর্ষে ছুটে আসে মন্দির শরীরে মর্মার্থ প্রেম -সংগীত
বোঝোনি ? প্রাচীন নৈঃশব্দ্যরা গন্তব্য ছুঁয়ে আছে
কতটুকু উপশম ? শূন্যবৃত্তে সাজানো বিনাশীবিজয়?
অনন্তের অপেক্ষা, তৃষ্ণার্ত অপেক্ষার ভ্রূণে।
সংহিতা
বাতাসে ঘ্রাণ সন্ধ্যার, গাঢ় জ্বলজ্বলে আকাশ
কবিতা তন্ময়— অন্তর্জাত কবি
কনকনে শব্দে-বর্ণে সাজানো।
নতুন পাতার বৃক্ষরা প্রেমময়, খোলা জানালায় নিবিড়
মৌন রমণী যেন, বুকে অবারিত ঢেউ
কান পেতে শোনে কি পথিক ধর্মযাজক কেউ ?
নিঃসঙ্গ বিহঙ্গের দুঃখদিনের দ্যুতি–
ফেলে যাওয়া মধ্যাহ্নের ছায়া।
অস্ত দিনের আলোক-চঞ্চল; কথার বুদ্বুদ
বুনোফুলে কি বিষণ্ন তমসা ছেয়ে আসে আরণ্যক।
সৃষ্টি-অবসাদ-বিচ্ছেদের এফোঁড়-ওফোঁড়
কি প্রবণ জীবনতৃষ্ণা জাগাও, তৃণধান্য বাগিচায়
সন্তর্পণে চৈতি মনোবনভূমিতে।
কাঙ্ক্ষার প্রাচীর
এই নির্লিপ্ত গুন্ঠন নীল জানে, কী সান্দ্র নিঃসঙ্গতা! আঙুলস্পর্শের ইশারা; হৃদয়ের মৃদু কম্পন।
চলে যাওয়া এক অপরুপ প্রতিশ্রুতি l ফেরাই কি রূপে! কী মিথ্যে কেঁপে ওঠে, অনুভবের বৈভব!
বাইরে কাঙ্ক্ষার কুয়াশা—ভেতরে জলের বুদ্বুদ,
এইসব ঘোরের ভোরে ছন্নছাড়া বাতাসে কেবল দ্বিধার রং
কেউ কেউ এ স্থিতিকালকে সভ্যতার কান্না বলে আখ্যা দেয়।
বৃক্ষদের পট পরিবর্তন দুর্দশায় লীন অকালপ্রয়াণ
অদৃশ্য উদ্বেগ প্রাচীন এ নগরীর সড়কপথে
মানুষের মনে অর্ন্তদহনের মতো বেজে চলে
হয়তো কেউ শোনেনা উপলব্ধির সৈকতে ঢেউয়ের গর্জন ;
এ এক প্রগাঢ় মুগ্ধতা আমার, প্রলুব্ধতা জাগরণের।
সূর্যের অতি সামান্য আলোয় চিন্তনগুলো ক্ষীণ হয়ে আসে। প্রকৃতিসম্মত আমার নিঃশ্বাস বারতা বলে যায়।
আকাশ ও আমার মুখোমুখি আসা যতিচিহ্ন
আমাদের উত্থানের নীরব প্রাচীর।
সবুজের ধীর প্রস্থান, ঝরা হলুদের বিবাগি বাহুলগ্নকাল
বনলতা সেনের মত দু’দন্ডের শান্তি
মর্মভেদ করে মগ্নতা সবটুকু আমাকে লুফে নিতে চায়।
মালিণ্য
মতিস্কের ভেতর ধারাবাহিক জিজ্ঞাসা,
এখানে জংশন মেলে না—
জীবনের সঙ্গে যশ ও স্বার্থের মোলাকাত।
জয়গান এখন বিবেকহীন হিংস্রতার।
এই নাগরিক নির্লিপ্তবাস, জাহির প্রেম—
সকালের দু’টো ডানা দু’দিকে উড়ে যায়
পশ্চিমে ও পূর্বে
অক্ষরে প্রত্যুত্তরে সময়ের এপিঠ-ওপিঠ—
আমরা একে অপরের দিকে চেয়ে থাকি
উত্তর-দক্ষিণে দমকা বাতাসের সংঘাত
লক্ষ্য তোমার দিকে অন্যটি অরণ্যের দিকে।
ফিরিয়ে দিয়েছি পুষ্পঘ্রাণ বহুবার, সচেতন মন্ত্রে—
অথচ কোন কোন উদ্যানে অযথাই ফোটে নির্জন পাপড়িদল—
বুনোপাতাগুলো সরিয়ে দেখি—
উদ্ভিদের দেহ বেয়ে জড়িয়ে আছে অকৃতজ্ঞ পন্নগ
মৃত্যুমুখর বসন্তমোহন অন্তরে।
ঝরে যাবে পাতা-ফুল ও সূর্যের ব্যালকনি,
জানালায় কাঁচবিম্ব প্রখরতর,
অজানা মুখছবি ভেসে ওঠে—
নিকষে রঙিন ? ব্যাকুল বিভ্রম ?
আজব মানুষ আজন্মকাল ভুলে যেতে চায় প্রমাদকলুষ
খোলস ছেড়ে স্নেহ ঢেলে ক্যামোফ্লেজ হাতে হাত ছুঁয়ে
সতত দিব্য মানুষ হাঁটে কালের অভ্যুত্থানের দিকে।
হরিৎসংকুল
চূর্ণ বাতাসে সন্ন্যাসীবেশ, কোন উদাসী
চেয়ে আছে বিমূঢ়, অন্যথা সুন্দর—
কে ছড়ায় এ মায়া-ভাঙা শোক চারিপাশে
কেমন করে পোড়ে সবুজ বনানী ফাঁদ
যেন ধূপ জ্বেলে মৃতের গন্ধ ছড়ানো সংবাদ !
পাথরচ্যুত নদী কেবল স্থির, অন্যরকম ঢেউ
অন্তরে পুষে রেখে বিদ্বেষ, ভর্ৎসনা—
ইট-পাথরের মানুষেরা সর্পিল জড়িয়ে থাকে
আশা-নিরাশার অন্তর্গত শিশু কি কাঁদে অবাধে?
অপরুপা ধরিত্রীর আদ্যন্ত অক্ষর
মানুষের হিংস্রতায় হারিয়েছে বস্ত্র-সম্ভ্রম।
একদন্ড স্বস্তির খোঁজে বৃক্ষের কাছে গেলে
কান পেতে শুনি বিসর্জনের গান—
তৃণাঞ্চলে ঢাকা মেঘে পতিত পালক
কফির সুতীব্র গন্ধে সন্ধ্যা নামায়,
শেকড়ের মতো নিগূঢ়, অপৃথক, একাকী
শান্তি ও কল্যানঅন্বেষী—
মানুষ কেন ঝরে কেবলই সত্যসন্ধানী বিপ্লবীদোষী !
রওশন হাসান। জন্ম ১৭ই জানুয়ারী। স্নাতকোত্তর : ইংরেজী সাহিত্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পিতা-মাতা দুজনেই জন্মসূত্রে কুষ্টিয়ার কৃতিজন। আমলাতান্ত্রিক পরিবারে জীবনের উন্মেষ ঘটেছে। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্ক সিটি সিভিল সার্ভিসে কর্মরত আছেন।
রওশন হাসানের লেখনীর বিষয়বস্তু বহুমুখী। মানুষ, সমাজ, প্রেম, দেশপ্রেম জীবন ও প্রকৃতির নানা বিষয়ে তার স্বতস্ফুর্ততা বজায় রেখে রচনা করে চলেছেন। উপমা, ইমেজারি, দৃশ্যকল্প নির্মাণ, অন্তমিলে ও গদ্য কবিতায় নিজস্বতায় কবিতার জগতে বিচরণ করছেন। বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই রওশন হাসান নিয়মিতভাবে লিখছেন। রওশন হাসান একজন সফল অনুবাদক। বহু বিখ্যাত ইংরেজি কবিতার অনুবাদে তাঁর পারদর্শিতা দেখিয়েছেন। তিনি বেশ কিছু গানের লিরিক্স লিখেও সমাদৃত হয়েছেন। নিজের লেখা লিরিক্সে নিজে ও সহশিল্পীরা কণ্ঠ দিয়েছেন। নিয়মিত প্রবাসের বিভিন্ন সংবাদপত্রে কলাম, কবিতা লিখছেন।
তিনি সাপ্তাহিক ঠিকানা লেখক সম্মাননা, নন্দিনী সাহিত্য সংগঠন সম্মাননা, বেগম লুৎফুন্নেসা আব্বাস ভাষা ও সাহিত্য সম্মাননাসহ বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। লেখকের উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ স্বপ্নের অভিলাষে, নন্দিত সায়রে, মেঘ তুমি কতদূরে, অনুভবে অনুক্ষণ, সবুজ ঘাসের পৃথিবী, জলের রং বদলে যায়, বাতাসে দোঁহের সংকেত ভেসে আসে,অরণ্য অপরাহ্ণ (উপন্যাস)। সম্পাদনা করছেন উত্তর আমেরিকার নির্বাচিত বাংলা কবিতা ২০২৩।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।