সকল মেনু

শিশুকে কোন গল্প শোনাবেন?

প্রায় সব শিশুই গল্প পছন্দ করে। সুযোগ পেলেই নানি-দাদি অথবা প্রিয়জনদের কাছ থেকে গল্প শুনতে চায়। কখনো ভূতের গল্প, ধর্মীয় মহাপুরুষদের কাহিনি, লোকায়ত গল্প, পূর্বপুরুষদের জীবনে ঘটে যাওয়া সত্য ঘটনা, ঠাকুরমার ঝুলি, ঈশপের গল্প, আরব্য রজনীর গল্প ইত্যাদি আরও কত কী? কিন্তু আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, শিশুর মানসিক বিকাশে গল্পের প্রভাব কতখানি? এই প্রভাব কি ইতিবাচক না নেতিবাচক?

শিশুর মননে গল্পের প্রভাব নিয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। যিনি গল্প বলছেন, তিনি ভুলে গেলেও এই গল্পের রেশ শিশুর অবচেতন মনে থেকে যায়। প্রতিটি গল্প শিশুর মনে ভিন্ন ভিন্ন কল্পচিত্র তৈরি করে, মস্তিষ্কে নিউরাল সংযোগায়ন বৃদ্ধি করে। এ ছাড়া নতুন নতুন শব্দ এবং উপমার সঙ্গে পরিচয় ঘটে, যা তার ভাষাজ্ঞান এবং শব্দভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে।

গল্প শোনার সময় শিশু তার কল্পনাশক্তিকে ব্যবহার করে। গল্পের প্রতিটি বক্তব্য, প্রতিটি চরিত্র শিশু তার আপন মাধুরী মিশিয়ে কল্পনা করে। এমন অনেক বিষয়ও কল্পনা করে, যা শিশু চোখেও দেখেনি। এর ফলে শিশুর কল্পনাশক্তি শাণিত হয়, ভাবনার জগৎটা প্রসারিত হয়।

পূর্বসূরিদের জীবনযাপন নিয়ে গল্প বললে, এটা তাকে অতীত সম্পর্কে কল্পনা করতে সাহায্য করে। শিশু হয়তো ভাবতে পারে, আজ থেকে ৩০ বছর আগে মোবাইল ফোন ছাড়া কীভাবে মানুষ যোগাযোগ করত। এটা তার কাছে অসম্ভবই মনে হবে। বাস্তবতা হচ্ছে, ওই সময়ে মানুষ মোবাইল ফোন ছাড়াই একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করত। তখন দুর্ঘটনা বা মৃত্যু সংবাদ কীভাবে আপনজনদের জানানো হতো, কেউ বিদেশে গেলে কীভাবে যোগাযোগ করত, এই বিষয়গুলো নিয়ে যখন গল্প বলবেন, তা শিশুর কল্পনা ও চিন্তাশক্তিকে শাণিত করবে।

শিশুকে যদি মহামানব ও সফল মানুষদের গল্প শোনান, তার মধ্যেও বড় কিছু করার স্বপ্ন জাগ্রত হতে পারে। বিখ্যাত মানুষজন সফলতার জন্য যে পরিমাণ পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করেছেন, সেটা যখন শিশু জানবে, তখন সে-ও ধৈর্য ও অধ্যবসায়ের নানা কৌশল রপ্ত করতে শিখবে। সফল মানুষজন কীভাবে প্রতিকূলতা মোকাবিলা করেছেন, তা যদি শিশুর জানা থাকে, তাহলে শিশুও প্রতিকূলতা মোকাবিলার বিভিন্ন উপায় রপ্ত করতে শিখবে।

গল্পের মাধ্যমে শিশুর মধ্যে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও গুণাবলি সঞ্চারিত করা সম্ভব। ধরুন, শিশুকে মীনা ও রাজুর গল্প শোনাচ্ছেন। মীনা ও রাজু প্রতিদিন স্কুল থেকে এসে ঘরের কাজে মা-বাবাকে সহযোগিতা করে, উঠান পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখে, গাছ লাগায়, অন্যকে সহযোগিতা করে ইত্যাদি। বারবার যদি এ ধরনের গল্প শোনাতে পারেন, কিছুদিন পরে শিশুর মধ্যেও এই গুণগুলো দেখতে পাবেন।

ধর্মীয় গল্প ও ঈশপের গল্প শোনালে নৈতিকতা জাগ্রত হবে, সাহসী মানুষের গল্প শোনালে সাহস সঞ্চারিত হবে, বিজ্ঞানীদের গল্প শোনালে আবিষ্কারের ইচ্ছা সঞ্চারিত হবে, দানবীর ও মহান মানুষদের গল্প শোনালে মানবিকতা জাগ্রত হবে, রূপকথার গল্প শোনালে কল্পনাশক্তি শাণিত হবে, পূর্বপুরুষদের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস শোনালে শিশুর আত্ম-ধারণা সমৃদ্ধ হবে এবং সফলতার গল্প শোনালে শিশুও বড় কিছু হতে চাইবে। অর্থাৎ গল্প বলার মাধ্যমে শিশুর মধ্যে অনেক ভালো গুণ সঞ্চারিত করতে পারবেন।

এই সুযোগটিকে যদি কাজে লাগাতে পারেন, তাহলে চমৎকার কিছু ফলাফল পাবেন। গল্পের মাধ্যমে আদব-কায়দা, নৈতিক শিক্ষা, করণীয়-বর্জনীয়, দায়িত্ববোধ, এমনকি পড়াশোনাও শেখাতে পারবেন। শিশুরা যেহেতু গল্প এবং খেলাধুলা পছন্দ করে, তাই উন্নত বিশ্বের অনেক দেশে খেলাধুলা ও গল্পের মাধ্যমে শিশুদের অনেক কিছু শেখানো হয়।

তবে গল্পের ইতিবাচক দিকের পাশাপাশি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। গল্প থেকে শিশু কতটা উপকৃত হবে, তা মূলত নির্ভর করে গল্পের বিষয়বস্তুর ওপর। বিষয়বস্তু ইতিবাচক হলে, শিশুর মননে তা ইতিবাচকতা সঞ্চারিত করবে। বিষয়বস্তু নেতিবাচক হলে, শিশুর মানসিক গঠনেও তা নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে।

অনেক মা জ্বিন-ভূত-ডাকাত-বাঘের গল্প শুনিয়ে শিশুকে ঘুম পাড়ানো বা খাওয়ানোর চেষ্টা করেন। অথবা নিছক আনন্দ দেওয়ার জন্য শিশুদের ভয়ের গল্প শোনান। মা-বাবা নিজেরাও জানেন না তারা শিশুর কত বড় ক্ষতি করছেন। ভূতের গল্প বললে শিশু ভূতের অবয়ব কল্পনা করে এবং একে বাস্তব বলে মনে করে। ক্রমাগত এসব গল্প শুনতে শুনতে শিশুর অবচেতন মনে ভয়ের ধারণা বদ্ধমূল হয়ে যায়। শিশু বড় হলেও এই ভয় কাটিয়ে ওঠতে পারে না। জ্বিন-ভূত না দেখলেও গভীর রাতে ভূতের ভয় পায়, শরীর অবশ হয়ে যায়।

কল্পনা শক্তির বিকাশে রূপকথার গল্পের কার্যকারিতা সবচেয়ে বেশি, এটা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে এর ক্ষতিকর দিকও আছে। বিশেষ করে কন্যাশিশুরা রূপকথার গল্প থেকে মনের অজান্তেই পরনির্ভরশীলতার বার্তা পায়। অধিকাংশ রূপকথা গল্পের কাহিনি মোটামুটি এ রকম-রাজকুমারীকে ডাইনি বা দুষ্টু লোক ধরে নিয়ে কোথাও বন্দী করে রেখেছে। রাজকুমারী অনেক কষ্টে দিন অতিবাহিত করছে। একদিন সুদর্শন এক রাজকুমার এসে তাকে এই বন্দীদশা থেকে উদ্ধার করল। এরপর তারা বিয়ে করে সুখে শান্তিতে বসবাস করতে লাগল।

এ ধরনের গল্প শুনতে শুনতে কন্যাশিশুদের অবচেতন মনে কাল্পনিক রাজকুমারের (সুপুরুষের) প্রতি একধরনের নির্ভরশীলতা তৈরি হয়। কন্যাশিশুর মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মে যে একদিন তার জন্যও কোনো এক সুপুরুষ আসবে, যাবতীয় দুঃখ-কষ্ট থেকে তাকে উদ্ধার করবে, এরপর সুখে শান্তিতে তারা বসবাস করবে। এই কন্যাশিশুরা বড় হলেও জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ক্ষেত্রে কাল্পনিক রাজকুমারের অপেক্ষায় থাকে, যা অধিকাংশ সময়েই বাস্তবতা বিবর্জিত।

রূপকথার গল্পের আরেকটি সীমাবদ্ধতা হচ্ছে, রূপকথার গল্প বেশি শুনলে শিশু ফ্যান্টাসিতে আসক্ত হয়ে বাস্তবতা বিবর্জিত হতে পারে। যে শিশুদের বাস্তব জগতের (অর্থাৎ প্রকৃতি ও মানুষের) সঙ্গে যোগাযোগ কম থাকে, তাদের ক্ষেত্রে এই ব্যাপারটি বেশি ঘটে। প্রকৃতি ও মানুষের সঙ্গে মিশতে দিলে শিশু বুঝতে পারে, কোনটি বাস্তব কল্পনা, কোনটি অলীক কল্পনা।

ধর্মীয় গল্পের ব্যাপারেও কিছু সতর্কতা আছে। মহাপুরুষদের জীবনে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন গল্প শুনলে নিঃসন্দেহে শিশুরা উপকৃত হবে, আলোকিত হবে। তবে এটাও ঠিক মহাপুরুষ বা ধর্মের নাম দিয়ে এমন অনেক গুজব বা বানোয়াট গল্প আছে, যার সত্যতা ধর্মগ্রন্থ বা ধর্মের ভেতরেও নাই। এ ধরনের গল্প শিশুকে না শোনানোই ভালো। কারণ, তা শিশুর যুক্তিশীল সত্তাটিকে ধ্বংস করতে পারে।

যেহেতু গল্পের ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুটি দিকই আছে, তাই সচেতনতা জরুরি। অভিভাবক হিসেবে আমাদের দায়িত্ব শিশুকে ইতিবাচক চরিত্রের গল্প শোনানো। গল্পের মূল চরিত্রকে হতে হবে নীতিবান, দায়িত্বশীল, মানবিক। কারণ, গল্পের প্রধান চরিত্র মনের অজান্তেই শিশুর কাছে আইডল বা মডেল হয়ে যায়। মূল চরিত্রের গুণাবলি একবার অবচেতন মনে গেঁথে গেলে, তা তাকে পর্দার আড়াল থেকে চালিত করে। এ কারণে গল্পের মূল চরিত্রে কোনো ধরনের নেতিবাচক বিষয়, দোষ, ত্রুটি ইত্যাদি রাখা উচিত নয়।

সত্য, ন্যায় ও মানবিকতার জয়গান করেই গল্পের ইতি টানবেন। বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপট বা বাস্তবতা যা-ই হোক না কেন, গল্পে আপনি ইতিবাচক দিকটিই তুলে ধরবেন। সমাজের নেতিবাচক বাস্তবতা শিশু বড় হয়ে জানবেই, কিন্তু গল্পের মাধ্যমে শিশুর মধ্যে নীতিবোধ জাগ্রত করতে পারলে, তা শিশুর ব্যক্তিজীবনকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করবে।

শিশুদের জন্য যারা গল্প লেখেন, তাদেরও এই বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে-গল্পে যেন ইতিবাচকতার জয়গান থাকে। এখানে প্রকাশকের দায়িত্বও কম নয়। গল্পের বই কেনার সময় মা-বাবাকেও এই বিষয়গুলো খেয়াল রাখতে হবে।

লেখক: মোটিভেটর, গবেষক

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP