সকল মেনু

কাজী গোলাম মাহবুব : আমাদের গর্ব ও প্রেরণার উৎস

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী ভাষাসৈনিকরা আমাদের গর্ব ও অফুরন্ত প্রেরণার উৎস। ভাষাভিত্তিক স্বাতন্ত্র্য চেতনাই পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নানা আন্দোলন ও সংগ্রামের মধ্যে ঘনীভূত হয়েছে ভাষাশ্রয়ী স্বাধীন ও সার্বভৌম একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে। অতঃপর একাত্তরের দীর্ঘ নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের মাধ্যমে অভ্যুদয় ঘটেছে আমাদের জাতি রাষ্ট্র, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের।

কাজের ব্যবধানে ভাষা-আন্দোলন নবতর তাৎপর্য ও মহিমায় প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। বাঙালির অমর একুশে হয়ে উঠেছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এখন প্রতিবছর ২১ ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বের দুশোর অধিক দেশে এ দিবস উদযাপিত হয়, প্রেরণা লাভ করে নতুন প্রজন্ম। তারা প্রতিজ্ঞা দীপ্ত হয়ে ওঠে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি ও নিজস্ব সত্তায় শিকড়ায়িত হয়ে বিশ্বনাগরিক হয়ে ওঠার। নিঃসন্দেহে এ চেতনার জনয়িত্রী, বাংলাদেশ ও বাঙালি জাতি।

মহান ভাষা-আন্দোলনে যাঁরা অংশগ্রহণ করেছিলেন তাঁদের অনেকেই আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। অনেকে জীবনের গোধূলি বেলায় উপনীত হয়েছেন। একুশের সংগ্রাম ছিল রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। মায়ের ভাষার জন্য প্রাণদান সেদিন বিশ্ববাসীকে স্তম্ভিত করে দিয়েছিল। শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি ভাষা আন্দোলনে যারা শহিদ হয়েছেন। বিশেষ করে সালাম, রফিক, সফিক, জব্বার প্রমুখ সংগ্রামীদের।

ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগের মাধ্যমেই অর্জিত হয়েছে এ মহান প্রাপ্তি। এ মহান প্রাপ্তি ও অর্জনের পেছনে আরও যাদের অবদান, নিঃস্বার্থ ত্যাগ জড়িত তারা আমাদের গর্বিত সন্তান। আমরা তাদেরকে ‘ভাষাসৈনিক’, ‘ভাষাসংগ্রামী’, ‘ভাষাবীর’ নামে অভিহিত করি। ১৯৫২ সালের সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক কাজী গোলাম মাহবুব তাদের মধ্যে মধ্যে অন্যতম।

গোলাম মাহবুব ১৯২৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর তৎকালীন বাকেরগঞ্জ জেলার গৌরনদী থানার কসবা গ্রামে এক ঐতিহ্যবাহী সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম- কাজী আব্দুল মজিদ ও মাতার নাম- আছিয়া খাতুন। তিনি ১৯৪২ সালে টরকী বন্দর হাইস্কুল থেকে ম্যাট্রিক, ১৯৪৪ সালে কলকাতার ইসলামিয়া কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৪৫ সালে বিএ পাশ করেন। ১৯৫১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ডিগ্রি লাভ করেন।

১৯৪২ সাল থেকেই তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৪৬ সালে তিনি কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ ছাত্র সংসদের ভিপি নির্বাচিত হন। ১৯৪৭ সালে তিনি ১৫০ নং মোগলটুলীর ওয়ার্কস ক্যাম্পে যোগদান করেন। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সময় থেকেই তিনি এ দলের সাথে জড়িত ছিলেন।

১৯৫৩ সালে বৃহত্তর বরিশালের আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, ১৯৪৯ সাল থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন প্রাদেশিক আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির অন্যতম সদস্য এবং ১৯৫৫ সালে এবং ১৯৫৭ সালে তিনি আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য ছিলেন। তিনি প্রত্যক্ষ ভূমিকা রাখেন স্বাধিকার ও স্বাধীনতা সংগ্রামে। পরবর্তীকালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে যোগদান করেন এবং কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।

পেশাগত জীবনে তিনি ছিলেন আইনজীবী। ১৯৫৩ সাল থেকে আইন পেশায় নিযুক্ত হন। ১৯৯৩ সালে তিনি সুপ্রিমকোর্ট বার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৯৪ সালে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি নিয়োগের ব্যাপারে বারের সভাপতি হিসেবে আইনজীবীদের স্বার্থ সংরক্ষণ ও দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় তিনি ব্যক্তিস্বার্থ তুচ্ছ করে নিজ দলের বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করেছিলেন, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরদিন এক অনন্য ও মহৎ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।

১৯৪৭ সালে ১৪ জন ভাষাসংগ্রামী পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘আমাদের দাবি’ সম্বলিত ২১ দফা ইশতাহার প্রণয়ন করেন। এই একুশ দফার দ্বিতীয় ও অন্যতম দফাটি ছিল বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করা সংক্রান্ত। এই ঐতিহাসিক ইস্তেহারের অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান। কাজী গোলাম মাহবুব ছিলেন এর অন্যতম স্বাক্ষরদাতা।

১৯৪৮ সালের ভাষা-আন্দোলনে কাজী গোলাম মাহবুব একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৪৮ সালের ২ মার্চ ফজলুল হক হলে সম্প্রসারিত ও দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের সভায় উপস্থিত ছিলেন কাজী গোলাম মাহবুব।

১৯৪৮ সালের ১১ মার্চের ধর্মঘটে কাজী গোলাম মাহবুবের ভূমিকা ছিল খুবই স্মরণীয়। তিনি সেদিন সচিবালয়ের দ্বিতীয় গেটের সামনে পিকেটিং করেন। এক পর্যায়ে পুলিশের আইজি জাকির হোসেনের গাড়ি সচিবালয়ে প্রবেশ করার চেষ্টা করলে কাজী গোলাম মাহবুবসহ অন্যান্যরা রাস্তায় শুয়ে পড়ে গাড়ির গতি রোধ করেন। এ সময় পুলিশের ব্যাপক লাঠিচার্জে তিনি আহত হন। পুলিশ তাঁকে গ্রেফতার করে প্রথমে কোতোয়ালী থানা পরে সেন্ট্রাল জেলে পাঠিয়ে দেয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। ১৫ মার্চ রাষ্ট্রভাষা চুক্তির শর্ত মোতাবেক সবাইকে মুক্তি দেওয়া হলেও, কাজী গোলাম মাহবুব ও শওকত আলীকে পৃথক মামলার কারণে মুক্তি দেওয়া হবে না বলে জানানো হয়।

মওলানা ভাসানীর সভাপতিত্বে কাজী গোলাম মাহবুবকে সর্বসম্মতিক্রমে পরিষদের আহ্বায়ক মনোনীত করা হয়। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক নিযুক্তির পর কাজী গোলাম মাহবুব তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্যের ব্যাপারে অত্যন্ত সচেতনতার পরিচয় দেন। সংগ্রাম পরিষদের গৃহীত কর্মসূচিকে সাফল্যমণ্ডিত করার জন্য তিনি নানা কর্মোদ্যোগ গ্রহণ করেন। রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অধিকাংশ নেতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করেন। তবে অলি আহাদ, আবদুল মতিন, শামসুল আলম (ফজলুল হক হলের ভিপি) ও গোলাম মাওলা ১৪৪ ধারা ভঙ্গের পক্ষে অবস্থান নেন। সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত অনুসারে কাজী গোলাম মাহবুব শামসুল হককে সাথে নিয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলাস্থ সমাবেশস্থলে হাজির হন। সভায় সংগ্রাম পরিষদের পক্ষে কাজী গোলাম মাহবুব ও শামসুল হক ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করার পক্ষে যুক্তি প্রদর্শন করে বক্তব্য রাখেন। এ সভায় গাজীউল হক সভাপতিত্বে করছিলেন। কাজী গোলাম মাহবুব কিংবা শামসুল হকের বক্তব্য ছাত্রদের পছন্দ হয়নি। ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে উত্তাল জনতা সরকারকে কড়া জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নেয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুসারে ১০ জন করে ছাত্রনেতা বের হয়ে ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে গ্রেফতার বরণ শুরু করেন।

স্পষ্টত কাজী গোলাম মাহবুবসহ সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ ১৪৪ ধারা ভঙ্গের বিপক্ষে থাকলেও যখন আমতলার ছাত্রসভায় ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার পক্ষে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় এবং ছাত্র-জনতার উপর নেমে আসে পুলিশের অত্যাচার, তখন তিনি ও সংগ্রাম পরিষদের অধিকাংশ নেতা বাস্তব পরিস্থিতি মেনে নেন।

৭ মার্চ শান্তিনগরে ডাক্তার আবদুল মোতালেবের বাসায় যে-সব ভাষা-সংগ্রামী গ্রেফতার হননি, তাদের একটি বৈঠক হয়। পুলিশ গোপন সংবাদটি জেনে যায় এবং বাড়িটি ঘিরে ফেলে। সেখান থেকে ৭ জনকে গ্রেফতার করা হয়। (সূত্র দৈনিক আজাদ: ১০ মার্চ ১৯৫২)।

কাজী গোলাম মাহবুব বাঁশের খাঁচার উপর এমনভাবে শুয়ে পড়েছিলেন যে, পুলিশ তাঁকে দেখতে পায়নি। রাত ৩ টার সময় তিনি সে বাসা থেকে বের হয়ে ওয়ারীতে এক আত্মীয়ের বাড়িতে ওঠেন। সেখান থেকে মোশাররফ হোসেনের সহায়তায় তাঁদের ফরিদপুর জেলার আমিরপুরের বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নেন।

বেশ কিছুদিন আত্মগোপন করে থাকার পর তিনি ঢাকা ফিরে এসে আতাউর রহমান খানের সাথে সাক্ষাত করে আইনের আশ্রয় নিয়ে কিছু করা যায় কিনা সে ব্যাপারে পরামর্শ করেন। আতাউর রহমান খান তাঁকে আত্মসমর্পণ করার পরামর্শ দেন। ২৯ মার্চ কাজী গোলাম মাহবুব ঢাকা জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নিকট আত্মসমর্পণ করেন। সেখান থেকে তাঁকে কেন্দ্রিয় কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কাজী গোলাম মাহবুব প্রায় এক বছর সেন্ট্রাল জেলে বন্দি থাকেন। ১৯৫৩ সালে প্রথম শহীদ দিবসে আরমানিটোলা ময়দানের বিশাল জনসভায় তিনি বক্তব্য রাখেন।

২০০৬ সালের ১৯ মার্চ তিনি ঢাকায় ইন্তেকাল করেন।

তথ্য সূত্র: ৫২ এর বায়ান্ন ভাষাসৈনিক, এম আর মাহবুব ও সালেক নাছির উদ্দিন

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP