বিমর্ষ সময়
কী প্রচণ্ড শীত জমে আছে দেখো!
মাইনাস টু তো প্রচন্ডই হয়,
যখন তোমার গলার স্বরের অভাব;
উষ্ণতাটুকু না জাগিয়ে করে ক্ষয়।
কী চোখ ধাঁধানো শুভ্রতা ছড়িয়ে দেখো!
বরফে ঢাকা সব সাদাইতো হয়,
যখন সুদীর্ঘ দিন রাত কেবল অপেক্ষায়;
বছর ফুরিয়ে যায় তবু বিমর্ষ সময়।
অদেখার অভ্যাসে
আমি বোধহয় নিঃশ্বাস ফেলতে ফেলতে ক্লান্ত ভীষণ।
আজকাল বড় ঘনঘন করে দীর্ঘশ্বাস চলে আসে
দীর্ঘশ্বাসের ভারে আমি ক্লান্ত হই রোজ।
দিবারাত্রির স্বপ্ন পুড়ে যায় অদেখার অভ্যাসে।
অজুহাত
যখন সময় ছিন্ন করে হৃদয়ের বসতি
আর হৃদয় মেনে নেয় সময়ের পরাভব,
ফিকে হয়ে আসে উৎসবের সাঁঝ বাতির আলো
ফিকে হয়ে আসে তীব্র অনুভব।
যখন নদী হারায় তার চলার আপন গতি আর থেমে যায় তার সাগর পানে চলা, যখন পাখিরে ফিরে না নীড়ে
নিভে যায় দূরে সন্ধ্যা তারার মেলা।
যখন নিয়ন আলোয় হারায় নিজস্বতার রং মানুষের দামে বিকায় সবজির স্তুপ
লালমলাটের খাতায় লেখা থাকে
ছেড়ে যাওয়ার অজুহাত আর
ভেতরে পোড়ায় প্রাচীন ধোঁয়াটে ধূপ।।
প্রত্যাশিত প্রেমের মহাকাব্য
আমার দু’চোখের নীরব ব্যথার পাহাড় ধুয়ে মুছে যাবে তোমার উষ্ণ চুম্বনে,
আমি অকাতরে বিলাবো সকল দুঃখ লুটিয়ে পড়ে তোমার বুকে
তোমার বাহুডোরে শক্ত আলিঙ্গনে
ঝরা ফুলের মতো কোমল পরশে
আমরা জন্মাবো বহুবার যুগল প্রেমে।
সারাজীবনের প্রত্যাশিত প্রেমের মহাকাব্য রচে যাব তুমি আমি সুলগ্নে,
যেদিন তোমায় পাবো নতুন নামে ডাকব তোমায়
আমৃত্যু মনে প্রাণে।।
যখন তুমি
যখন তুমি আসো
সময়ের বেড়াজাল ছিন্ন করে
হৃদয়ের বসতি,
এক গ্যালাক্সি ভালোবাসা
যুথবদ্ধ হয় নিমিষেই।
যখন তুমি আসো
শিলালিপি লিখে ইতিহাস
প্রাচীন গানের সুরে।
যখন তাকাও চোখ মেলে
সমস্ত অনুভব কেন্দ্রীভূত হয়
বাকি সব চলে যায় দূরে।
যখন তুমি থাকো
চোখ জুড়ে স্বপ্ন থাকে,
হৃদয় জুড়ে থাকে প্রশান্তি।
যখন তুমি থাকো
পূর্ণ হয়ে উঠি প্রেমে- প্রত্যয়ে
পরম নির্ভয়ে।
যখন তুমি হাসো
সমস্ত চরাচর হেসে উঠে
চঞ্চল কিশোরের মতো,
যখন অভিমানে হয়ে যাও চুপ
পৃথিবীও থেমে যায়।
সাগর থেকে জন্ম নেয়া
নিম্নচাপ এক।
তোমাকে আগলে রাখে
হাতে ধরে নিয়ে চলে
স্মৃতির খেরোখাতা যত।
যখন তুমি আমার হয়ে উঠো
মহাজাগতিক সব রং
ধরা দেয় চোখে,
সব কথা থেমে যায়
দু’ঠোঁটের পরে এসে।
অব্যক্ত কথামালার
তরঙ্গ হিল্লোল তোলে
শুধু তোমাকেই ভালোবেসে।
যখন তুমি থাকো
চার চোখ খোলে -মুদে
তাকায় হৃদয়ের পানে,
তখন আমরা দেখি
কলুষতা উড়ে যায় দূরে।
আমদের কথাগুলো গান হয়
পাখিদের ঠোঁটে অবশেষে।।
অনুকবিতা
ওরা কী জানবে কি পেয়েছ তুমি?
যা পেয়েছ তা সোনার চেয়ে দামী।
ওরা কী জানবে কি হারিয়েছ তুমি?
যারা বেশি যৌক্তিক আজ
তারা আবেগিক কতখানি?
তুমিময়
একটা সকাল রোদ নিয়ে অপেক্ষায়
তুমিময় হবে বলে,
একটা দুপুর ক্লান্তিতে করে ভর,
তুমিময় হলে
বিকাল -রাত্রি পূর্ণতা পায় আর
মন খারাপ নেয় অবসর।
তুমিহীন একটা বেলায় শুধু
শূন্যতার হাহাকার,
অর্বাচীন দুঃখেরা দেয় ছূট
সময় হলে তোমার ফেরার।
একটুকরো মেঘ ভেসে ভেসে
ছায়া দেয় দিনমান তোমার আদলে,
খেলাঘর বেঁধে বেঁধে
লুকোচুরি নেই আছি
খেলার ছলে।
যদি তুমি হারাতে চাও
সাগর অতলে,
নিমজ্জমান হতে হতে জলজের মতো
আমাকেই পাবে ফিরে ওই মহীঢালে।।
আত্মপরিচয়
আমি তার কে,
কিবা সে আমার কে হয়?
তার মাঝে বেঁচে থেকে
তুমিময় বোধ জন্ম লয়।
এই যে জনারণ্য তবু
সে ছাড়া ধূসর মনে হয়।
এখানে রয়েছে দ্বিধা
এখানে প্রচণ্ড দহন।
সে যেন জলের মতো ঘুরে ঘুরে
একা একা কথা কয়;
আমার সে কথাগুলো
মনোভূম ছেড়ে ফুটে ওঠে
অধরের কোণে আর
চোখ মেলে দেখে বিস্ময়।
তারেই একদিন দেখেছিল কি কবি?
লিখেছিল কি
যারে ছাড়া কেউ কারো নয়!
আছে সে, আবার নেই
এভাবে খুঁজে ফেরে
অবিরাম আত্মপরিচয়।
চেতনে, অচেতনে আর অবচেতনে
কেন সে আমাতেই জেগে রয়?
আমি তার কে?
কিবা সে আমার কে হয়?
তোমার জন্য
তোমার জন্য রেখে যাচ্ছি শুনশান নগরী এক, রাঙা গোধূলির আবীর মাখা সন্ধ্যা,
ডাউন টাউনের সেই ঝুম বৃষ্টি,
তক্ষকের অবিশ্রান্ত ডাক, তাল মেলানো সেই ঝিঁঝিঁর ঘোর লাগা সুর,শিশির ভেজা ঘাসে ঝরা শিউলি,বেলি ফুলের মালা,সাদা জবা আর অজস্র হলুদ গোলাপ।
রেখে যাচ্ছি নীরবতার মালায় গাঁথা অজস্র প্রাণের কথা,
শুনশান গভীর রাত,চোখ জ্বালা করা অপেক্ষার ভোর,ঘুম ভাঙ্গানো আবেশী সম্ভাষণ,
তোমার প্রিয় গোধূলির হাসিমাখা মুখ।
অগণন স্মৃতি রাশি থেকে শুধু তোমার বিরহের বারিপাতে ফুলে ওঠা দু’চোখের ভারটুকু নিয়ে আমি চলে যাচ্ছি নীরবে, নিভৃতে দূর থেকে সীমাহীন দুরত্বে।
তোমার জন্য রেখে যাচ্ছি সব..
তোমার আমার প্রিয় অনুভব,
আর অভিমানের খেরোখাতা।।
আজব অসুখ
কী এক আজব অসুখ আমার!
যা কিছু ভুলতে চাই
ভুলতে পারিনা কিছুতেই,
আর সব ভুলে যাই
যা কিছু মনে রাখার।
আমার প্রাত্যহিক দিন,
নিত্য দিনের সংসার।
কী এক আজব অসুখ আমার!
তোমাকে দেখার আগে,
প্রাণ আনচান শুধু
একটিবার দেখবো বলে
পলকহীন দু’চোখে আমার,
প্রতিটা দিন যেন উৎকণ্ঠার ভার।
কী এক আজব অসুখ আমার!
তোমাকে দেখার পর,
নিদারুণ হাহাকার,
এখনো দু’চোখ নিদ্রাহীন,
প্রতিমুহূর্তে চলছি বয়ে
স্মৃতির পাহাড়।
কী এক আজব অসুখ আমার।
কী এক আজব অসুখ আমার।।
কবি ফাতেমা মিতু। পেশায় শিক্ষক। পড়ান রাজধানী ঢাকার একটি স্বনামধন্য কলেজে। লেখলেখি করেন বোধের তাড়নায়। প্রেম,প্রকৃতি আর সময় নিয়ে লিখতে ভালোবাসেন। সত্তা, বোধ, প্রেম ও প্রণয় এই তিনভাগে তার কাব্যের বিচরণ। অনেকেই তাকে বলেন, মিতবাক কবি। সাধারণত সহজ সরল ভাষায় অল্প কথায় পাঠককে নিয়ে ডুব দেন ভাবনার গভীরে। ভাবের ব্যঞ্জনায় কবিতায় রেখে যান কোনো এক গোপন বার্তা যা পাঠকের হৃদয়কে আলোড়িত করে।
অমর একুশে বইমেলা -২০২৪ এ প্রকাশিত “অনিন্দ্য ক্ষণে ” ও “নিমগ্নতায়” কবির দু’টি কাব্যগ্রন্থ। ১৯৯৫ সাল থেকে লিখতেন জাতীয় দৈনিকগুলোর সাহিত্য সাময়িকীতে। ২০১৪ থেকে বিরতি দিয়ে কোভিডকালে ফের অনলাইন ও অফলাইন পদচারণায় নিয়মিত হন। কবিতার পাশাপাশি গল্প, প্রবন্ধেও তিনি সাবলীল রচয়িতা। এছাড়াও যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন “জাগ্রত ওকে বাংলাদেশ” নামক ট্যাবলয়েড ম্যাগাজিনে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।