সকল মেনু

শাহিন শাজনীনের প্রেমের কবিতা

ভালোবাসার গন্ধরাজ

ছেলে, তুমি আমার ডালিম কুমার হবে?
জোনাক হাসি ঢেউ খেলানো
রাত্রিবেলার,অপার বিস্ময়ে শোনা!
মায়ের রূপকথার গল্পে বলা
সে-ই ডালিম কুমার!

মানুষের ছোবলের বিষ ভরা
এই পাথুরে শহরের প্রাণহীন বাতাসে-
আমার নিঃশ্বাসের আকুতি শুনে
তুমি আমাকে নিয়ে যাবে,
দূরে,বহুদূ-রের কোন পথে!

যেখানে গোধূলির রাঙ্গা আলোয়
আকাশ নদী সূর্যের মিলন দেখে,
তোমার পঙ্খীরাজ কেশর গুটিয়ে বলবে,
‘ও পাথুরে শহরের রাজকন্যে
এখানে পথের শেষ,
শেষ! আঁতকে উঠে বলবো।
তারপর আশার শেষ খড়কুটোটি
হাতে নিয়ে বলব-ই,
শেষ বলে কোথাও কিছু নেই!
সন্ধান করো নতুন পথ মিলবেই।

যার আকাশ ভালোবাসার বিশুদ্ধতায় জড়ানো–
যার মাটিতে ভালোবাসার অক্ষরেরা ছড়ানো–

যেখানে সন্ধ্যা নামলে মানুষেরা ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
জ্যোৎস্নার স্নিগ্ধ মখমলি চাদর পেতে
অনাদি থেকে চাষ করছে-
নতুন অস্থিমজ্জার পরিশুদ্ধ গন্ধরাজ।
দিনমান সে গন্ধরাজের সৌরভে –
খাদ্য মেলে, বস্ত্র মেলে, রোগমুক্তি মেলে,
স্বপ্নের পসরা সাজিয়ে ঘরকন্নাও মেলে।
যেখানে কান্নার জলে ভালবাসা ঝরে।
দুঃখের বিষম বেদনায় ভালোবাসার ওম থাকে।
অপরাধের শাস্তিও হয় ভালোবাসার দণ্ডে।

তুমি থামিয়ে দিয়ে বলবে…
অনেক হয়েছে ভালোবাসার সুখ কুড়ানি মেয়ে,এবার ক্ষান্ত দাও!

আরো বলবে…
সূর্যের আলো চব্বিশ ঘণ্টাই পেলে,
দিনের শেষে দিন মিলত!
রাত্রি কি পেতে? জ্যোৎস্না কি পেতে?
গন্ধরাজের চাষ কি করে হতো দিনের শেষে?
স্বপ্নরা কি ধরা দিত চোখের কোনে?
সুখের বিপরীতে দুঃখ
হাসির বিপরীতে কানা আছে বলেই
জীবন এত সুন্দর!
তুমি আবার ফিরিয়ে নিবে
সে শহরের ছোট্ট ঘরটাতে।
সেখানে আমাদের ভালোবাসায় ফোটা গন্ধরাজে –
কর্পূরের মতো উড়ে যাবে সব হৃদয়ের আবর্জনা।

খুনি চোখ

খুনি সে চোখের ধারালো চাহনিতে
খুন হচ্ছি জেনেও,
চোখের কার্নিশে খরস্রোতে
ঝরে পড়ছে মুগ্ধতার ঝর্ণাধারা।
যত খুন হচ্ছি মুগ্ধ হচ্ছি যেন
সমসত্ত্বে মিশ্রিত হচ্ছি তুমি আমি।
দেহবল্লরীর বন পুলকিত হচ্ছে,
দক্ষিণা পবনে মহুয়া মাতাল।
আবেগি চাঁদের আলো
নিঃশব্দে চড়ুইভাতি খেলে
নিবিড় মেহগনি পাতার ফাঁকে।

 

শুধরে যাই

নিজেকে শুধরে নিতে,
আরো একবার ধ্যানে যেতে চাই।
পিতৃ সুড়ঙ্গের উৎকর্ষিত পথ ধরে-
পৃথিবীর পবিত্রতম গুহাদেশ মাতৃ জরায়ুতে।
গর্ভ সরোবরের স্বর্গীয় সুধায়
পুণ্যস্নান সেরে, বিশুদ্ধ হবো
ভাসিয়ে দিয়ে বিবেকের জঞ্জাল, যত।
জিহ্বার ঝুল বারান্দা থেকে,
তেলবাজ শব্দের দেউলিয়াত্ব ঘোষণা করে,
মুছে দিব, বর্ণমালার চরিত্রের কলঙ্ক।
ভবিষ্যতের অলিগলির বাঁকে বাঁকে
দাঁড়িয়ে থাকা বখাটে মিথ্যাদের
প্রলোভনে পথভ্রষ্ট না হতে-
দশমাস দশদিনের নিরবচ্ছিন্ন ধ্যানে
এঁকে ফেলবো, এক কষ্টিপাথর ম্যাপ।
ফুসফুস ভরে নিব নির্মোহ অনিল।
আঁখিপাতে টেনে দিব সাম্যের কাজল।
পৃথিবীর আমন্ত্রণে…
দশমাস দশদিন পর ধ্যান ভেঙে
আমি দেখতে চাই…
দেবশিশুদের অভ্যর্থনা জানাতে ব্যস্ত পৃথিবীর
অন্দরের আয়োজন…
নির্মোহ সত্য প্রভায় ঝলমল!

 

মশলাদার শব্দ

অহোরাত্র মনভুবনে ঘুরে ঘুরে করি ফেরি
আমি মশলাদার শব্দের ফেরিওয়ালা।
ভুয়ো দর্শনের মেলা থেকে সওদা করি
মস্তিষ্কের ঝুড়িতে রাখা শব্দ ডাসা ডাসা!

পাঠক হৃদয়ের জঠরজ্বালা মেটাতে,
চিত্রকল্পের বয়ামে একে একে দেই ঢেলে,
উপমার পাচঁফোড়ন, টুকরো টুকরো ছন্দের পেঁয়াজ,
ঘানিভাঙা আবেগঘন-তেলে বেড়ে যায় ঝাঁঝ ।

ভালোবাসার ক্লাইমেক্সের ঝালে, শব্দ পড়লে
মনরোচক কবিতা তৈরি হয় এক নিমেষে।
বইয়ের হৃদয়গ্রাহী ঠোঙায় পুরে
তুলে দেই, পাঠার্থীদের অঞ্জলি ভরে।

 

উদ্দেশ্যহীন ভাবে মানুষ যখন বাঁচে

স্বপ্নেরা মরে গেলে মানুষ কি বাঁচে?
জীবন্মৃত হয়ে ধুলোয় লুটায়
মহাকালের দেউড়িতে।

অভিশপ্ত ভুলেরা হুল ফোঁটায়।
ডাগর স্বপ্নের অস্থিমজ্জায়
নিকষ আঁধারের হঠাৎ স্রোত
বান আসে শিরা উপশিরায়।
স্বপ্নের প্রানপাখি পালিয়ে
লুকোচুরি খেলে অসীম শূন্যতায়।
সেদিন মানুষ চাইলেও আর
চোখে কল্পনার আল্পনা আঁকতে পারে না,
জোছনার স্নিগ্ধতায় স্নিগ্ধ হতে পারে না,
সূর্যের উত্তাপে উত্তপ্ত হতে পারে না,
গোলাপের সৌন্দর্যে সুন্দর হতে পারে না ,
কোকিলের গানে গায়ক হতে পারে না,
সেদিনও মানুষ বাঁচে! উদ্দেশ্যহীনভাবে বাঁচে ।

 

তোমার পানে চেয়ে থাকি

আমার পুরোটা আকাশ জুড়েই তুমি
গোধূলির রাঙা আলোয়
যখন রঞ্জিত হয় পৃথিবী ,
ছাদবাগানের গোলাপটা মাথায় গুঁজে
তোমার পানে চেয়ে থাকি ।

যখন বিনিদ্র নিশিতে রাতজাগা কষ্টরা আমার শ্বাসনালি চেপে ধরলে,
তুমি চাঁদের বুড়ির ঘুমপাড়ানি গান ধরো।
বারান্দায় গ্রিলে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে
তোমার পানে চেয়ে থাকি।

যখন দিনের শুরু হতে না হতে
বিষণ্নতার বিষবাষ্প আমাকে পোড়ালে,
তুমি বিন্দু বিন্দু শিশিরের সজীবতা ঢালো।
দূর্বা ঘাসে দুহাত জড়িয়ে
তোমার পানে চেয়ে থাকি
তোমার পানে কেবলি চেয়ে থাকি ।

 

আরাধ্য প্রেম

যে প্রেম আমার কাছে আরাধ্য
তা কেবলি তোমার অভ্যাস
আমার হৃদয়ানুভূতির নিকষিত নৈবেদ্য ফেলে
তুমি নিতে ভালোবাসো কোমল মাংসের স্বাদ।
নষ্ট প্রেমের প্রলাপ দিয়ে সাজানো তোমার আফ্রোদিতির মন্দির,
কামনার জল ছিটিয়ে
আঁচল ভেজাও নিত্যনতুন পূজারির ।

 

সহমর্মিতা

বলতে পারো, কেন?
আমি তোমার মতো হবো।
তোমার পথে, তোমার দর্শন বিশ্বাসে,
কেন আমি উঠব বেড়ে?
আমার স্বপ্নগুলো নিজের রং হারিয়ে-
তোমার রংগে রঙিন হবে।
বলতে পারো কেন?

যদি হতেই হয়,
তবে তুমিই আমার মতো হও।
আমার কল্পনার বৃত্তে এসে,
দেখে যেতে পারো,
আমারও স্বপ্নগুলো কেমন ঝাঁঝালো!
নিপরে মন্ত্রণ দিলাম, এসো।

কিংবা দুজন দুজনার মতো নাইবা হলাম,
পাশাপাশি হাত ধরে পথ হাটলাম,
তাতে কী ধরবে ক্ষত?

এসো, দুজনে সহমর্মিতার ঘুড়ি উড়াই,
দুজনের হাতে থাকুক দুটি নাটাই।
এই বিশাল পৃথিবীর বিন্দু অংশে,
নিজেকে সমৃদ্ধ করি অবাধ বিচরনে।

 

তুমি যদি হতে আমি

তুমি যদি হতে আমি!
হিমালয় আল্পস গলে হতো
জল উঁচু জল নিচু কল্লোলিনী।
জলতরঙ্গের উচ্ছল আবেগে,
কর চুম্বন ভরিয়ে দিত কিরনমালী।
শতদলে গান শুনিয়ে,
দূর নীলিমায় সন্ন্যাস নিত হাজারো মধুলেহী।
অধরা খাবারের ইশারা ভুলে,
মাছরাঙা জলছড়ায় খেলত জলকেলি।
গুটানো পালে প্রাণ লেগে তুমি যদি হতে আমি!

 

প্রেমের গার্হপত্য

তবুও ভালোবেসে যাই,
ইনফিনিটিকেও হার মানাই ।
সুমেরু থেকে কুমেরুকে
সলতে বানাই,
বিশ্বসংসারের হৃৎপিণ্ড
তন্নতন্ন করে
সাইবেরিয়া থেকে সাহারার,
প্রতিটি কনার নির্যাস ঢেলে,
তোমার প্রেমের গার্হপত্য জ্বালাই!
হৃদয়ে আমার।

 

এতটাও কী ভালোবাসা যায়

এতটাও কী ভালোবাসা যায়?
যতটা ভালোবাসলে
ভাঁটাতেও দুকূল প্লাবিত হয়।
পলি মেখে উর্বরা হয় হৃদভূমি।
অঙ্কুর প্রেম পরিপুষ্ট হয়ে
ডালপালা মেলে, কুহরণ বাড়ে,
দলে দলে মনের বসতি গড়ার ধূম পড়ে।
নৈত্যনৈমিত্তিক প্রেম কর্মে-
উচ্ছ্বাস আসে, কাঙাল জীবনে।

এতটাও কী ভালোবাসা যায়?
যতটা ভালোবাসলে
শত সহস্র মাইল দূরে থেকেও,
আমার কষ্টগুলো
তোমার বুকপাজরে ঝাঁকুনি দেয়।
এক আকাশের নীচে আছি
এইটুকু সুখ নিয়েও
আমার নিঃশ্বাস মেশানো বাতাসে
তোমার প্রাণ জুড়ায়।
জৈবিক প্রেম নিষুপ্ত হলেও,
মানসিক প্রেমের প্রদীপ
দুই হৃদয়ে উষ্ণতা ছড়ায়।

 

জীবনের পদাবলি

মানব জমিনে হয় কিসের আবাদ?
কিসের হাহাকার বাজে বুকের পাঁজরে?
ফসলের হাসি হারায় ,অকাল প্লাবনে।
রাতের গভীরে শোন,
প্রভাতের ব্যাকুল কান্না।
অপেক্ষা করো, দেখো কোটি কন্ঠে
গীত হবে, জীবনের পদাবলি।

 

ভালোবাসাময় পৃথিবী

তোমার বুকের খাসজমিনে
ঘর বাঁধতে দিলে যেদিন;
সেদিন আঁধারের পরত গলে
আলোর হাসিতে ঝলমলে মুক্তো ঝরলো
আলোকময় হল পৃথিবী।
রংধনু বিলিয়ে দিল সব রং
আবির খেলাতে মত্ত চারপাশ,
রঙিন হল পৃথিবী।
চাঁদের জ্যোৎস্না মেখে
নির্ঘুম তারাদের চোখে প্রশান্তি, ঘুম এল,
রূপসি হল রাতের পৃথিবী।
খাঁ খাঁ মাঠ সবুজ ঘাসে ভরে গেল
সবুজ হল পৃথিবী।
মরা গাছটা প্রাণ পেল মুহূর্তে,
ছেয়ে গেল পাতা ফুলে ফলে
প্রাণের আঁধার হল পৃথিবী।
মরা নদীতে জোয়ার এল-
পাল তুলে নৌকা চললো-
গতিময় হল পৃথিবী।

তোমার বুকের খাসজমিনে
ঘর বাঁধতে দিলে যেদিন;
সেদিন ভালোবাসারা জন্ম দিল
ভালবাসাময় এক পৃথিবীর ।

 

জীবন কেটলি

গুহা দেশ পেরুলেই তপ্ত চুল্লি!
চুল্লির উপর বিস্ময় জীবন-কেটলি?
কেতলির ভেতর বাঁচার উত্তাপ নিয়ে
ফুটতে থাকে সুখ দুঃখের লিকার।
তৃষ্ণা-কাতর পথিক পথের ক্লান্তি ভুলতে
সময়-কাপে কর্ম অনুযায়ী বেছে নিতে পারে
লিকারের সাথে দুধ কিংবা মশলা।

আর চাওয়ালার হাতের জাদুতে
চুমুকে চুমুকে পথিকের মুখে ফোটে তৃপ্তির আভা!কখনও মুখ কুঁচকে ওঠে বিস্বাদে!

 

শাহিন শাজনীন। জন্ম ফুলবাড়ি,দিনাজপুর, ২০ ডিসেম্বর । পিতা আব্দুল গনি সরকার ও মাতা জয়নব বেগম। স্বামী মুর্তাজা আলী সরকারি কলেজ এর অধ্যাপক। একমাত্র পুত্র আরাধ্যকে নিয়ে তার নিবিড় গৃহকোণ। ছাত্রাবস্থায় লুকিয়ে লুকিয়ে কবিতা লিখতে লিখতে কবিতাতেই গেড়েছেন ঘর বসতি। সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে কবিতার পাশাপাশি উপন্যাসেও তার নিবিড় সখ্যতা। লিখেছেন উপন্যাস ‘চাঁদের ধোঁয়া’। দৈনিক পত্রিকায় তার কবিতা প্রকাশিত হয়। সৃষ্টিশীলতা গতি পায় তার ফসল হিসেবে প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দোঁহে যাই কুহক জোছনায়’ প্রকাশিত হয় ২০১৭ সালে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP