সকল মেনু

কমছে দিন-রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান, কেন এমন হচ্ছে, মানুষ–কৃষির ওপর প্রভাব কী

বিদায়ী ডিসেম্বর মাসের একটি দিনে ঢাকার সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান ৭২ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম দেখা গেছে। রাজধানীতে দিন-রাতের তাপমাত্রার গড় ব্যবধান বেশি মাত্রায় কমছে প্রায় এক দশক ধরে। শুধু ঢাকা নয়, দেশের অন্যান্য অঞ্চলের চিত্রও প্রায় একই রকম—বলছেন বিশেষজ্ঞরা।

দিন-রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান কমে যাওয়ায় সমস্যা কী? আবহাওয়াবিদেরা বলছেন, এর ফলে ঘন কুয়াশা বেড়ে যাচ্ছে, কমছে রৌদ্রোজ্জ্বল দিনের সংখ্যা, এর সঙ্গে বায়ুদূষণেরও সম্পর্ক আছে। আর বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এভাবে তাপমাত্রার পার্থক্য কমে আসায় মানুষের স্বাস্থ্য ও কৃষির ওপর বিরূপ প্রভাব বাড়ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর ঢাকা শহরের গত ৭২ বছরের আবহাওয়ার তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। সেই বিশ্লেষণে দিন-রাতের তাপমাত্রার সর্বনিম্ন ব্যবধানের চিত্রটি উঠে আসে।

সাধারণত যেকোনো স্থানে দিনে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা এবং রাতে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা থাকে। এর কারণ দিনের বেলা সূর্যের আলো উত্তাপ ছড়ায়, রাতে তা থাকে না। এক দিনে (২৪ ঘণ্টা) সর্বোচ্চ তাপমাত্রা (দিন) আর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা (রাত)—এই দুটির পার্থক্যকেই দিন-রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান বলা হয়।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের জ্যেষ্ঠ আবহাওয়াবিদ মো. বজলুর রশীদ ১৯৫৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ঢাকার তাপমাত্রার উপাত্ত বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি দেখেছেন, এই সময়কালের মধ্যে গত ২৯ ডিসেম্বর ঢাকা শহরের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান ছিল ১ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। সেদিন সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল ১৩ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

আবহাওয়াবিদ বজলুর রশীদ বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের পাওয়া ৭২ বছরের ইতিহাসে ঢাকায় সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার মধ্যে এত কম ব্যবধান কখনো দেখা যায়নি। তিনি বলেন, শুধু ঢাকা শহরের তাপমাত্রা বিশ্লেষণ করা হলেও এ থেকে দেশের অন্য অঞ্চল বিষয়ে ধারণা পাওয়া যায়। দেশে দিন ও রাতের তাপমাত্রার গড় ব্যবধান কমে আসার প্রবণতা প্রায় এক দশক ধরে বেশি মাত্রায় দেখা যাচ্ছে। যদিও এ প্রবণতা দুই দশক ধরে দেখা যাচ্ছে।

উপাত্ত বিশ্লেষণ করে আবহাওয়া অধিদপ্তর দেখেছে, ১৯৫৩ সালের পর থেকে গত শতাব্দীর শেষ দশক পর্যন্ত সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ তাপমাত্রার ব্যবধান মোটামুটি একই ধারায় ছিল। এর মধ্যে ১৯৯৭ সালের ৭ জানুয়ারি ঢাকায় সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ১৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, আর সর্বনিম্ন ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস। ব্যবধান ছিল ৫ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

এর পর থেকে কয়েক বছর পরপরই তাপমাত্রার ব্যবধান ধারাবাহিকভাবে কমেছে। ২০০৩ সালের ৯, ১৩ এবং ১৫ জানুয়ারি তাপমাত্রার মধ্যে ব্যবধান ছিল যথাক্রমে ২ দশমিক ৭ ডিগ্রি, ৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি এবং ৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পরের বছরের ২ জানুয়ারিতেও ব্যবধান ছিল ২ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। পরে ২০১১, ২০১৩, ২০১৯ এবং ২০২৩ সালে ধারাবাহিকভাবে এক বা একাধিক দিন তাপমাত্রার ব্যবধান উল্লেখযোগ্যভাবে কম দেখা যায়।

সর্বোচ্চ এবং সর্বনিম্ন তাপমাত্রার পার্থক্য যদি ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নামে, তবে শীতের অনুভূতি বাড়তে থাকে বলে জানান আবহাওয়াবিদেরা। তাঁদের মতে, তাপমাত্রার ব্যবধান ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে এলে শীতের অনুভূতি তীব্রতর হয়। এতে কুয়াশা বেশি তৈরি হয়। আর তাপমাত্রা প্রায় একই থাকলে জলীয় বাষ্প ঘনীভূত হয়ে কুয়াশা তৈরি করে। শিশির পড়ার সম্ভাবনা বাড়ে।

এ ছাড়া দিন-রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান কমলে ঠান্ডা দীর্ঘস্থায়ী হয়। তাপমাত্রার ওঠানামা কম থাকায় শরীর বা পরিবেশ দ্রুত উষ্ণ হতে পারে না, তাই শীতের অনুভূতি সারা দিন প্রায় একই থাকে।

২০২৩ সালের আবহাওয়া অধিদপ্তর ‘চেঞ্জিং ক্লাইমেট অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক গবেষণা করে। সেখানে দেখা গেছে, প্রতি ১০ বছরে শীতকালে সূর্যের আলো পাওয়ার সময় কমছে। সবচেয়ে বেশি কিরণকাল কমছে রংপুর বিভাগে। সেখানে কমছে শূন্য দশমিক ৯ ঘণ্টা; ঢাকা, রাজশাহী ও ময়মনসিংহে কমেছে শূন্য দশমিক ৮ ঘণ্টা। কিরণকাল সবচেয়ে কম কমছে সিলেট, চট্টগ্রাম ও বরিশালে। এসব বিভাগে কমার মাত্রা শূন্য দশমিক ৫ ও খুলনায় শূন্য দশমিক ১ ঘণ্টা। এই কিরণকাল কমের কারণে রংপুর, ঢাকা, রাজশাহী ও ময়মনসিংহ বিভাগে কুয়াশা বাড়ছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের ঝড় সতর্কীকরণ কেন্দ্রের প্রধান ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এস এম কামরুল হাসান বলেন, ‘চলতি বছর শৈত্যপ্রবাহের সংখ্যা অনেক কম। তারপরও শীতের অনুভূতি অনেক বেশি হওয়ার কারণ কুয়াশাচ্ছন্ন দিনের পরিমাণ বৃদ্ধি। এসব দিন বাড়ছে, তার সঙ্গে দূষণের একটা সম্পর্ক আছে বলে ধারণা করি। এ বাস্তবতা শুধু ঢাকার নয়, সারা দেশেরই।’

বিশ্বে বায়ুদূষণে ২০২৪ সালে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ। আর নগর হিসেবে বিশ্বের তৃতীয় শীর্ষ শহরের তালিকায় ছিল ঢাকা। আগের বছর (২০২৩) দেশ হিসেবে বাংলাদেশ শীর্ষে ছিল আর নগর হিসেবে ঢাকার অবস্থান ছিল দ্বিতীয়।

আবহাওয়াবিদ কামরুল হাসান বলেন, ধারণা থেকে বলা যায়, দূষণের সঙ্গে কুয়াশার সম্পর্ক রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক আবদুস সালাম দীর্ঘদিন ধরে বায়ুদূষণ নিয়ে কাজ করছেন। তিনি বলেন, দুই দশকের বেশি সময়ের পর্যবেক্ষণে দেখা যায় ঢাকার বাতাসে ব্ল্যাক কার্বন এবং ব্রাউন কার্বনের মতো উপাদানগুলো বেড়ে গেছে।

কীভাবে এসব দূষণকারী উপাদান কুয়াশার পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে? আবদুস সালামের বক্তব্য, ব্ল্যাক কার্বন বা ব্রাউন কার্বনের মতো দূষণকারী উপাদানগুলো কুয়াশাকে এক স্থানে আবদ্ধ করে ফেলে। এর বিস্তার বন্ধ করে দেয়। আবার সূর্যের আলোর সামনে একটি ঘন প্রাচীর তৈরি করে ফেলে এসব দূষক। কিরণ পৌঁছাতে দেয় না।

গত ২৫ ডিসেম্বর থেকে ৩ জানুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিন ঢাকার অবস্থান ছিল বিশ্বের দূষিত নগরীগুলোর মধ্যে প্রথমের দিকে। শুধু ঢাকা নয়, খুলনা, রংপুর বা রাজশাহী শহরের মতো শহরেরও এ অবস্থা ছিল। এসব শহরে ব্যাপক কুয়াশাও ছিল।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের গবেষণায় দেখা গেছে, সূর্যকিরণ সবচেয়ে কম পাওয়া যায় রংপুর বিভাগে। আবার সেই বিভাগেই দেশে শীতজনিত মৃত্যু বেশি। ‘ডেভেলপিং এ কোল্ড-রিলেটেড মর্টালিটি ডেটাবেজ ইন বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায় এ চিত্র উঠে এসেছে।

২০২২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সেন্টার ফর বায়োটেকনোলজি ইনফরমেশনের সাময়িকীতে এ গবেষণা প্রকাশিত হয়। সেখানে ২০০৯ থেকে ২০২১ সালের শীতকালীন মাসগুলো (ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি) নিয়ে বাংলাদেশের আট বিভাগের মৃত্যুর চিত্র তুলে ধরা হয়।

গবেষণা অনুযায়ী, এ সময় শীত ও শীত-সম্পর্কিত রোগে ১ হাজার ২৪৯ জনের মৃত্যু হয়েছে, যেখানে প্রতিবছর গড়ে ১০৪ দশমিক ১ জন মারা গেছেন। এর মধ্যে শীতজনিত মৃত্যুর সর্বোচ্চ হার (৩৬.৫১%) রংপুর বিভাগে ঘটেছে।

গবেষণা অনুযায়ী, শীতজনিত মৃত্যু সবচেয়ে বেশি ছিল ২১-৩১ ডিসেম্বর। এরপর বেশি মৃত্যু ছিল ১১-২০ জানুয়ারিতে।

নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির পাবলিক হেলথ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম চার বছর আগে সাতক্ষীরা, পিরোজপুর ও খুলনা জেলার শীতজনিত মৃত্যু নিয়ে গবেষণা করেছেন। তিনি বলেন, শ্বাসকষ্টজনিত অসুখ, অন্তঃসত্ত্বা নারীদের সমস্যা শীতের সময় বাড়ছে। এক দশকের তুলনায় সমস্যাটি এখন বেশি।

তাপমাত্রার ব্যবধান কমলে কৃষিতে ঝুঁকি থাকে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সিরাজগঞ্জ জেলার উপপরিচালক এ কে এম মনজুরে মাওলা প্রায় ১০ দিন ধরে মাঠপর্যায় থেকে অভিযোগ পাচ্ছেন, শর্ষেখেতে ব্যাপক মাত্রায় মৌমাছি মারা যাচ্ছে।

শর্ষের দানা সৃষ্টির জন্য পরাগায়নে সহায়তা করে মৌমাছি। এ ছাড়া মধুও হয়।

মনজুরে মাওলা বলছিলেন, ‘টানা প্রায় সাত দিন ধরে রোদের দেখা নেই। এই রোদহীন অতিঠান্ডা মৌমাছির মৃত্যুর কারণ বলে আমরা অনুমান করছি। উত্তরাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করতে গিয়ে কুয়াশাচ্ছন্ন দিনগুলোতে এসব সমস্যা দেখছি।’

দীর্ঘ কুয়াশা পেঁয়াজে ছত্রাক, আলুর ফলন কমানোর মতো সমস্যার পাশাপাশি বড় সমস্যা তৈরি করছে বোরো ধানের বীজ উৎপাদনের ক্ষেত্রে।

বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) এগ্রোমেন্ট ল্যাবের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নিয়াজ মো. ফারহাত রহমান বিষয়টি নিয়ে কাজ করেছেন। তিনি বলেন, দিন রাতের তাপমাত্রার গড় ব্যবধান কমে আসায় কুয়াশাঘন পরিবেশে বীজতলার চারা বাড়ছে কম হারে। অনেক সময় বীজের আগায় লালচে রং ধরে যায়। এসব প্রবণতা দিন দিন বাড়ছেই।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP