নার্সিসিজম
জীবনকে বুকপকেটে নিয়ে
ছুটে চলেছি জটিল যাপনের পথে
হর্ষ নিনাদে বেজে ওঠে বিউগলের সুর
যে পথ শুরু হয়, শেষ তার কোথায় কেউ জানে না
কেননা একটা পথের সাথে যুক্ত হয়ে যায়
হাজারো পথের নিশানা।
ভাগ্য বিড়ম্বনায় কেউ হয়তো
পা গলিয়ে দেয় মরীচিকার চোরাগলিতে
কেউ কেউ নার্সিসিজমে ভোগে আজীবন।
নতুন ঠিকানাতেও লেগে থাকে পুরনোর সোঁদা ঘ্রাণ
আজন্ম, অনির্বাণ।
সম্ভাবনাময় রোদ্দুর
কিছু বিষাদ সাথে নিয়ে হেঁটে যায় ঘূর্ণায়মান অতীত
যেন বিষাদের পালতোলা নৌকা পাড়ি দেয়
অনাদিকালের ভবিষ্যৎ
সভ্যতার অনাগত সৌষ্ঠব ঘিরে থাকে মরীচিকার সমাধিসৌধ।
দূরাগত পাখিরা বেঁধে রাখে গান আলজিভে
মধ্যরাতে স্বপ্নের ঘোরে আঁধার কাটে নিমেষে
ঘুম ভেঙে গেলে সামনে ভেসে আসে শাশ্বত নিয়তি
স্বপ্নাহত একজোড়া চোখের পাপড়িতে লেগে থাকে
এক আকাশ সম্ভাবনাময় রোদ্দুর।
শূন্য করপুট
অনেককে তো অনেককিছু দিলে
সুগন্ধি ফুল, সুগন্ধ ধূপ ধোঁয়া
আমায় না হয় দিলে নদীর জল
কর্ণফুলি অথবা করতোয়া।
কাউকে দিলে দারুণ হাসির ছটা
ওষ্ঠপুটে গোলাপ ফোটার ছল
আমায় না হয় দিলেই বা ধুতুরা
বিষের কথাই বলবো অনর্গল।
কারো হাতে রাখলে কোমল হাত
সঙ্গে দিলে চুড়ির রিনিঝিনি
আমায় দিলে শূন্য করপুট
শূন্যতাকেই অধিক ভালো চিনি।
কারো জীবন ভরিয়ে দিলে সুরে
কারো ভুবন রাঙালে আবীরে
বিষাদ ভরা যাপন আমায় দিয়ে
ভিন্ন সুখের কাছে গেলে ফিরে।
অসম্পূর্ণ হিসাব
জানালার ঝুল বেয়ে অতিক্রান্ত হয় সময়
পরম শুশ্রূষায় বেঁচে থাকে কিছু গহন পরাণ
নদী ও নারীর মতো তুমিও ছুটে চলো অনন্তের পথে
যেখানে সুদৃশ্য চর জাগে গোপন ব্রোথেলের মতো।
শিকারি পুরুষ রাত-বিরেতে শিকার করে ফেরে
কতিপয় নরোম তুলতুলে মাংস।
বাজারে বা ব্রোথেলে ভালোবাসা বিকায় না
বিকায় পাপপুণ্যের অসম্পূর্ণ হিসাব
জাত-পাত নিয়ে খেলা কিছু অদৃশ্য কিতাব।
মধ্যবিত্ত
স্বপ্নের সমান বড় হতে গিয়ে
ক্ষুদ্র সত্তাটিকে অযথাই টেনে নিয়ে যায়
অন্তহীন বাসনার সাগরে, কাল্পনিক অমৃত নন্দনে।
তারপর…
যাপনের গ্লানিতেই কেটে যায় জীবনের যাবতীয় ঘোর
বেঁচে থাকার ইঁদুর-বেড়াল দৌড় যেন অব্যাখ্যাত নাভিশ্বাস
যেন সমূহ সন্তাপে ঘেরা বেলোয়ারি ঝাড়, ক্রমাগত দীর্ঘশ্বাস
সেলাই মেশিনের সুঁই এফোড় ওফোড় করে অর্ধমৃত শরীর
ভাগ্য বদলের চাকায় ঘোরাতে চায় দিন বদলের চিত্র।
অথচ দিন বদলের বদলে
কেবলই বদলায় গোধূলির মরীচিকা রঙ।
অতঃপর, অন্তিমলগ্নে এসে
জীবনের শেষ মধু পানের বদলে
আকণ্ঠ গিলে ফেলে এক পৃথিবী বৃহন্নলা স্বপ্ন
অনাদরে পড়ে থাকে আজন্ম আদরে বোনা
ফিকে হয়ে আসা রঙিন মোহের চাদর।
ছাই হওয়া সিগারেট জানে
ছাই হওয়া সিগারেট জানে
কতখানি নিঃশেষ হতে হতে জীবনে পূর্ণতা আসে
কতটা জোয়ারে পরিপূর্ণ হলে
মরা নদী ফের যেতে পারে মোহনার কাছে
জটাধারী বৃক্ষ জানে কতটা পুরনো হলে
ক্লান্ত পথিকের নাড়িনক্ষত্র সব অনায়াসে বলে দেওয়া যায়।
শেকড়ের কাছে বসে শেখরের গান গেয়ে গেয়ে
পথিক মাতাল হলে কার কী এসে যায়!
মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে
বয়সের ভাড়ে ন্যুব্জ বয়োবৃদ্ধ লোকটিও
করতলে ভাগ্যরেখা গুণে বলে –
জীবন এতো ছোটো কেনো?
জীবনের নান্দীপাঠ
যেখানেই যাই
যতটাই পারি দু’হাতে শূন্যতা সরাই
মনকে মেলে ধরে উত্তুরে হাওয়ায়
মুঠো ভরে তুলে আনি আনন্দ রেনু।
স্বর্ণলতার মতো নির্মল সুখে
হৃদয় অর্ঘ্য সাজাই চেতনার রঙে
পদ্মপুকুর বুকে কাকচক্ষু জল
দু’চোখে মেখে দেয় পুণ্য বিভা।
বিষাদের তনু বেয়ে কখন কোথায়
ধেয়ে আসে কালো মেঘ ঘোর সন্তাপে
সবুজ অরণ্য ঘাসে প্রাণের উপাখ্যানে তাই
জীবনের নান্দীপাঠ করি যাপনের কাছে।
কাঙ্ক্ষিত অরুন্ধতী
কতকিছু খোয়া যায় জীবনে
শুধু দুঃখগুলোই আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে থাকে অনন্তকাল
কালের অমল স্রোতে নিরন্তর ভেসে চলে
বিষাদের পালতোলা নাও।
সুখটুকু বড়োই স্বার্থপর যেন
ফুলের রেণুর মতো আলতো স্পর্শ দিয়েই
লুকোচুরি খেলে যায় বৃন্তের চতুর্পাশে।
স্বপ্নের সোনালি পালক! সেতো
দূরতম আকাশের নিত্য জ্বলে থাকা
কাঙ্ক্ষিত অরুন্ধতী!
ক্ষীণ আলোর তোড়ে মগ্ন নেশার ঘোরে
কেবলই বিছিয়ে যায় প্রবঞ্চনার মায়াজাল
অমৃত নন্দন
কাঠফাটা রোদে পোড়া মধ্যদুপুর
মাতাল জোয়ার তোলে ভৈরবী সুর।
মখমলি শয্যায় নরোম বালিশ
নেশা জাগানিয়া চোখে হাজারো নালিশ।
তীব্র আহ্বান জাগায় ঘুমঘুম সুখ
কামনার অনলে জ্বলে যাবতীয় অসুখ।
তপ্ত নিশ্বাস বোনে প্রগাঢ় চুম্বন
তৃপ্ত-ক্লান্ত তনুর অমৃত-নন্দন।
মনের অগ্নিগিরি
বাইরের আগুন আর কতখানি পোড়ায়!
ভেতরের আগুনেই তো দগ্ধ দিনরাত
একটা দেশলাই কাঠি কতো বা আগুন ধরে
বারুদ ফুরোলেই তো ফুরোয় সংঘাত।
আগুনে পোড়ায় বন, আগুনে পোড়ায় মন
উর্দ্ধদিকে চলে তার সমস্ত সন্ত্রাস
বনের আগুন নেভে ধূসর ছাইয়ের ঝোপে
নেভে না মনের আগুন জ্বলে বারোমাস।
যে কাঠি আগুন জ্বালে তার তো অজানা
ধ্বংসলীলার ভেতর কত হাহাকার
যে জন জ্বেলে যায় মনের অগ্নিগিরি
তারই আর কীবা দায় আগুন নেভাবার!
রুমি চৌধুরী। জন্ম ২৯ মার্চ। কলেজ জীবন থেকেই লেখালেখির চর্চা। এ পর্যন্ত বেরিয়েছে ৪টি কাব্যগ্রন্থ। নীল দিগন্তের ছায়াসঙ্গী, একমুঠো মেঘ, মঘমলি গোধূলি, নির্বাণ প্রতীতি। কবিতা লেখার পাশাপাশি গানও লেখেন সমান তালে। হয়েছেন বেতার, টেলিভিশনের তালিকাভুক্ত গীতিকার। ২০১৮ সালে বাংলাদেশ বেতারে এবং ২০২০ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। বেতার, টেলিভিশনে নিয়মিত প্রচারিত হচ্ছে তাঁর লেখা গান। এভাবেই আজীবন লেখালেখির চর্চায় থাকতে চান তিনি। পেতে চান পাঠক, শ্রোতাদের অনাবিল ভালোবাসা।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।