বসন্ত শুধু আমারই
কোথাও নেই কেউ, ছিলো কি কখনো?
নির্জন চরাচরে আমি একাকী
নিঃসঙ্গ রেল লাইনে দীর্ঘশ্বাস
কেউ কি ডাকে, কেন ডাকে
এই অগ্নি স্রোতে?
জ্বলুক আগুন এই ভর বসন্তে
ফুলে পল্লবে গান লাগুক প্রাণে
মাতাল বাতাসে উড়ুক ঝরাপাতা
নবপল্লবে আঁকুক সুখ আগামী
বর্ণিল দিনে উদ্বেলিত প্রেমটুকু ছেঁকে
রাতের বিশ্বস্ত হাতে রাখে প্রথম সূর্যের হাত।
ভেসে যাই তবুও ভেসে যাই
এই প্রবল অগ্নিস্রোতে,
বুকের ভেতর প্রখর চৈত্র দহন
আসবে কি জোছনার প্লাবন।
এই বসন্তে একবার বলতে চাই
বসন্ত শুধু আমারই।
শরতের দিনযাপন
ভাদ্রের ভর দুপুরটা ঠিক ভাদ্রের নয়
কখনও বর্ষার জল ঝরানো প্যাচপ্যচ সময়
কখনো মেঘ ফুঁড়ে ঝাঁঝালো রোদের দিন
আকাশটাকে টেনে নেয় মহা বাদল
ছাড় দেয় না সদ্য শরত ছিনিয়ে এনে
ছড়িয়ে দেয় নীল বরণে শিমুল তুলো
নগরে কাশবন কোথায় ছড়ালো মায়া
আফতাবনগর না দিয়াবাড়ি
নাকি বালুনদীর পাড়।
তুরাগ পাড়েও কি আছে ছিটে ছিটে কাশবন।
শরৎ বা কাশফুল প্রেমী না হলেও কাশবনে
ছবি তো লাগবেই নাগরিকদের।
নীল শাড়ি সাদা ব্লাউজ নীল পাঞ্জাবি
আউটলেটে মূল্যহ্রাস বা বাহারি নকশার
প্রদর্শনী টেনে নেয় দৃষ্টি।
আমিই বা বাদ যাব কেন,
খুঁজি কোথায় ফুটেছে গন্ধহীন অপরুপ কাশ
শাড়িও আছে আনকোড়া।
তখ্খুনি কাচের জানায় এসে দাঁড়ায়
অনন্য অসাধারণ এক নাগরিক সন্ধ্যা
না আছে মেঘ না বর্ষা।
শুধু শরতের ঝকঝকে আকাশে এক নিবিড় সন্ধ্যা,
অপরূপ সন্ধ্যা জানায় কাশবন ছাড়াও
আকাশেও থাকে বর্ণিল শরতের কিছ…
শূন্যের উপাসনা
তুমি প্রকাশ নও
তবু তোমার অদৃশ্য
আমার অস্তিত্বের প্রমাণ।
প্রেম মানে হয়তো এটাই —
একটি না-ঘটা ঘটনার
অবিরাম প্রতিধ্বনি।
আমি তোমাকে খুঁজি না,
কারণ তুমি আছো
আমার ভেতরের প্রতিটি
অন্ধকার আলোকবিন্দুতে।
এ শহর জানে না
শহরের ছাদে এখন কুয়াশা নয়, নিয়ন আলো,
ধানের গন্ধ ঢেকে কফি বার বি কিউ কোলাহল
মোবাইলের স্ক্রিনে আটকে যায় উৎসবের মুখ,
আকাশে থেকে নামে না শিশির শুধু হাইরাইজ বিজ্ঞাপনের অরুপ।
যে শিশির ভেজা সকালে গ্রাম জেগে উঠত গানে
সে সকাল এখন ঘুমিয়ে থাকে অ্যালার্মের নিচে
নলেন গুড়ের পায়েস ভাপা পাটিসাপটা হারিয়ে
শুধু কৃত্রিম হাসি ঝরে স্টোরিতে, রঙিন ফিল্টার ঘিরে।
তবু মাটির নিচে এখনো নড়ে ওঠে এক পুরোনো ছন্দ,
জেগে ওঠে মায়ের হাতের পিঠার অমলিন গন্ধ
এ মাটির বুকে লুকানো এক আত্মপরিচয়
এই শহর জানে না—
ধানের সোনালি রঙে লুকিয়ে আছে স্বপ্নের গল্প,
শ্রম আর প্রেমের মিশ্রণে গড়া এক জীবন সংগ্রাম
তারা জানে না— কুয়াশার ভেতর সূর্য ওঠা মানে
আশা, বিশ্বাস আর মানুষের অনন্ত পরিশ্রমের ইশারা।
তাদের কাচের শহর,
উষ্ণতাহীন আলো ঝলমল
চোখ ধাঁধিয়ে মাটিগন্ধা মন কাঁদে প্রাচীণে
কোন এক রাতে ওঠে আসে
ইতিহাসের পাতা থেকে নবান্ন
শহরের ছাদে কুয়াশা নামবে ধীরে
শেকড় সন্ধানি অচেনা বিস্ময়ে বলবে,
“নবান্ন মানে কী?
এই শব্দে এত উষ্ণ আলো কেন জ্বলে?”
শীতের গভীর অরণ্যে
শীত নেমে আসে সময়ের
সবচেয়ে নির্জন সন্ন্যাসী হয়ে
তার গায়ে লেগে থাকা কুয়াশা
পুরোনো ইতিহাসের ধুলো,
বহুদিন আগে লেখা সমৃদ্ধ রাজ্যের মহা কাব্য
শেষবারের মতো আলোর কাছে স্বীকারোক্তি রেখে হিমেল হাওয়া আসে।
মৃত পাখিদের ডানার স্মৃতি হয়ে
তার প্রতিটি স্পর্শে যেন পৃথিবী
আরো একবার নিজের শূন্যতার আয়না দেখে
শিশির জমে থাকে পাতার কিনারায়
অনুচ্চারিত প্রার্থনার ক্ষুদ্র মুক্তো,
যা কেউ কখনো তোলে না,
শুধু সকালে রোদ এসে ভুলক্রমে হারিয়ে দেয়।
শীতের রাতগুলো অসীম গ্রন্থাগার
তার তাকে তাকে সাজানো থাকে
মানুষের অস্বীকার করা সত্যগুলো।
জোছনার
সোনালি কালিতে লেখা অনুবাদ
দূরের বাঁশবনে বাতাস ফুঁ দিয়ে
অর্থবহ শব্দের স্বপ্নে বাজানো বাঁশি
আগুন জ্বলে ওঠার শব্দ
প্রতিটি উষ্ণতার ভিতরই
অদৃশ্যভাবে লুকিয়ে থাকে বিচ্ছেদের দাহ।
মানুষ মূলত এই ঋতুতে
অদ্ভুতভাবে নিজের কাছেই ফিরে আসে
যেন হৃদয়ের ভেতর
এক মায়াবি কুঁড়েঘর বহুদিনের জমা বেদনা
উষ্ণ হয়ে ওঠে।
শীতের রোদ দৃশ্যমান রোদ নয়
এ যেন ঈশ্বরের প্রেম থেকে ছিটকে বেরিয়ে যাওয়া
এক কণা আশ্বাস,গভীর সত্য
অদৃশ্য হওয়ার অপেক্ষায় থাকি।
অস্তিত্বের গায়ে সামান্য কুয়াশা না জমলে
মানুষ নিজের গভীরতা চিনতে পারে না।
শীত নীরব এক ঋষির মতো,
পৃথিবীকে শিখিয়ে যায়
কঠিন ঠান্ডাতেও আত্মা জ্বলে ওঠার
এক বিস্মৃত আগুন খুঁজে পায়..
শীতের নীরবে উজ্জ্বল বলা
শীত নামে আদুরে বেড়াল পায়ে
নদীর বুকের কুয়াশা ধুসর চাদর তুলে রাখে,
শহরের ক্লান্ত বাতি ঘুমিয়ে পড়ে
মুঠোমুঠো আলোয় ভেজা ভোরের কোলে।
দূরের গ্রামে…
বাঁশবাগানের পাতায় পাতায়
নেমে আসে ঠান্ডা সেতার সুর
হিমেল বাতাসে কাঁপতে থাকা বিবর্ণ বৃক্ষে
জেগে ওঠে প্রেম পুরনো সংবাদে।
নিভৃত পল্লীর চুলায় লাকড়ির দাউ দাউ আগুন,
গরম ভাতের ধোঁয়া মিশে যায় শিশিরে—
মায়ের ডাকে শিশুরা লেপের ভিতর
জোছনা লুকিয়ে মিটি মিটি হাসে ।
শীতের রোদ, সোনালি অতিথি,
দু’হাত বাড়িয়ে নেমে আসে উঠোনে,
রোদ স্পর্শে জমাট মাটির বুকেও
ফোটে একটুখানি নরম উষ্ণ ঐক্য গান।
ঋতু পরিক্রমায় একদিন ফিরবে ভেবে
হৃদয়ও জ্বলতে থাকে অপেক্ষার নিরব ধুপ।
যে শীতে তুমি একদিন হেসেছিলে,
সে শীত আজও গাছের আড়ালে দাঁড়ায়,
শিশিরে ডুবানো তোমার উষ্ণ নিশ্বাস
স্মৃতির পর্দা স্থির নদী হয়ে দৃষ্টি সীমায়
শীতও রুপ বদলায় সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে।
শীত এক স্মৃতির উত্তাল সমুদ্র
সবচেয়ে উজ্জ্বল কথাটুকু বলা।
শীত একমাত্রিক প্রশ্নের বহু মাত্রিক উত্তর খোঁজা..
পৃথিবীতে আসুক অমলিন অনিঃশেষ শান্তি
শান্তির পৃথিবী চাই এই মিনতি ভেসে ওঠে ভোরের নরম আলোয়।
যুদ্ধের গন্ধ পুড়িয়ে দিয়েছে আকাশ, তবু মানুষের স্বপ্ন থাকে সবুজে সুন্দরে।
শিশিরভেজা ঘাসে আজও পড়ে থাকে অগণিত নিঃশব্দ কান্নার চিহ্ন।
পৃথিবী আহত মা ক্ষত বুকে আগলে সন্তানকে রাখে।
ন্যায়–সুন্দর স্বদেশ চাই এ শুধু উচ্চারণ নয়, মানুষের আত্মার প্রাচীন ব্যাকুলতা।
অন্ধকারের ভয় এক দানা আলো,
প্রতিটি মুখেই জেগে ওঠে মর্যাদার অগ্নিদীপ্ত শান্ত স্বর।
শান্তি হৃদয়ের গভীরে অস্তিত্বের পুনর্জন্ম।
ন্যায় মানে প্রতিশোধ নয়, অন্যায়ের দীর্ঘ রাত ভেঙে সকালের মুক্ত নিশ্বাস।
যেখানে শ্রমিকের ঘাম হয়ে ওঠে নীলিমার স্বচ্ছ মর্যাদা।
চাই এমন স্বদেশ, যেখানে বৈষম্য ভেঙে পড়ে প্রথম বৃষ্টির মতো
অন্ধকার নয়, আলোই নির্ধারণ করে মানুষের ভবিষ্যৎ।
অনুপস্থিতির ব্যাকরণ
তুমি আর আমি —
একই বাক্যের দুই প্রান্ত,
যেখানে যতিচিহ্নও ক্লান্ত হয়ে পড়ে থাকে।
অক্ষরের ভেতর লুকিয়ে থাকা আলো,
নীরব বিদ্রোহের মতো।
দূরত্বও এক প্রকার সহবাস,
যেখানে না ছোঁয়ার অভ্যাস
রাতের শহরে আমি শুনি
তোমার না-বলা কথার প্রতিধ্বনি,
প্রেম ফুরিয়ে হারিয়ে যায় না
অনিবার্য ছায়া পাশে হাঁটে,
কখনো অনুচ্চারিত স্বরে কথা বলে
নিজের সাথে নিজে
সান্নিধ্য হারিয়ে
অনুভবে ফিরে পাওয়া এক যুগল আমরা
অদৃশ্য প্রেম নিরন্তর ছুঁয়ে যায়।
অনুপস্থিতির ব্যাকরণ
তুমি আর আমি —
একই বাক্যের দুই প্রান্ত,
যেখানে যতিচিহ্নও ক্লান্ত হয়ে পড়ে থাকে।
অক্ষরের ভেতর লুকিয়ে থাকা আলো,
নীরব বিদ্রোহের মতো।
দূরত্বও এক প্রকার সহবাস,
যেখানে না ছোঁয়ার অভ্যাস
রাতের শহরে আমি শুনি
তোমার না-বলা কথার প্রতিধ্বনি,
প্রেম ফুরিয়ে হারিয়ে যায় না
অনিবার্য ছায়া পাশে হাঁটে,
কখনো অনুচ্চারিত স্বরে কথা বলে
নিজের সাথে নিজে
সান্নিধ্য হারিয়ে
অনুভবে ফিরে পাওয়া এক যুগল আমরা
অদৃশ্য প্রেম নিরন্তর ছুঁয়ে যায়।
বিছানার গ্রীষ্ম বর্ষা
পরিপূর্ণ নিভাঁজ বিছানা
নিদারুণ ভাগ হয়ে যায়,
একপাশে রিউম্যাটিক বেড
ইলেকট্রনিক বাতাসে ফুলে থাকে
অনেক কথা নিয়ে।
একটু খোঁচায় ফুসফুসিয়ে বলে দেবে
নিবিড় গত পঞ্চাশ।
অন্যপাশে যৌথ চাদর ভাঁজ হয়ে
অনায়াসে একক।
ভাঁজ চাদরটার প্রতি সূতোয়
মায়াবি ইস্পাত সুর
দাপিয়ে বেড়ানো পদযুগলে
ফুটিয়েছে হৃদকমল
নবীন পত্রপল্লবে চারপাশ
রিউম্যাটিক বেড গেয়ে চলে সমৃদ্ধ অতীত সোনালি চিহ্ন
পাশের সেলফে ঔষধের তীব্র ঘ্রাণ
ডেটলের ঝাঁজ, ক্যাথেটার, হুইল, প্যম্পাস
তবুও নিশ্বাস খোঁজে বিশুদ্ধ শ্বাস
ভাঁজ করা যুগল যাপন টানটান
সাহস বার্তার বৃক্ষ।
ষড়ঋতু বৈচিত্র্যময় রুপে এই ছোট্ট ঘরে
এখন দিবারাত্র করে আনাগোনা।
রোকেয়া ইসলাম। কবি, গল্পকার ও নাট্যকার। জন্ম ফেব্রুয়ারী ১৯৫৯, টাংগাইল। প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা -১৪টি। তাঁর লেখা বহু নাটক টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে। লিখেছেন বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্রের কাহিনি। লেখালেখিতে অসামান্য অবদানের জন্য তিনি পেয়েছেন অসংখ্য পদক ও সম্মাননা। বর্তমানে তিনি প্রশিকা মানবিক উন্নয়ন কেন্দ্রের চেয়ারম্যান। ডরপ এর নির্বাহী সদস্য। এছাড়া বাংলা একাডেমির সদস্য, বৃহস্পতির আড্ডা সাহিত্য সংগঠনের আহ্বায়ক। বহু সামাজিক সংগঠন ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সদস্য।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।