সকল মেনু

মাহমুদা মৌ’র ১০ কবিতা

কুশলাদী বিনিময়

 

জানিস সুদীপ্ত,,
তোর চাহনী
তোর হাস্যোজ্জ্বল মুখ
পূর্ণিমার আলোর মতো দীপ্তোজ্জ্বল।
এক দেখাতেই মনে হয়
এতো আলো!
এক নিমিষেই মুছে যায় জাগতিক
যতো বেদনার প্রলেপ।
তোকে নিয়ে মরা নদীর পাড়ে যাবো
দেখবি,
মুহূর্তেই জল থৈ থৈ করছে
আমার ভেতরের বহু – বহু পুরনো মরুক্লান্তি দূর হয়ে সবুজবীথিকা জন্ম নেবে, নতুন কুড়ি ফুটবে।
মরা গোলাপ গাছটিও হেসে উঠবে।
আকস্মিক ভাবে, রাইটার্স ব্লক খুলে
শব্দের প্লাবনে কবিতার ডায়েরি ভরে যাবে।
তখন,
ফেলে আসা কিশোরী বেলার গোপন
কোঁচড়ের স্বপ্নগুলো আহ্লাদি ভঙ্গিতে
বুকের ভেতর জমে থাকা দু’ফালি মেঘ সরিয়ে আয়নায় অনিন্দ্যরূপে নিজেকে দেখবে।
ভাবছি,,
আমি আমার স্বপ্নে দেখা
মহামায়া লেকেও তোকে নিয়ে যাবো,
যাবি তো!

 

কবিদের কলমে রক্তক্ষরণ

 

কবিরা জানে কখন প্রতিবাদী হয় ভাষা
জানে, কখন কলমে রক্তক্ষরণ হয় !
প্রতিবাদী মানেই কি রাজনীতি?
নিপীড়িত , প্রতারিত ও শোষিত ,অবহেলিত মানুষকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে দেওয়ার নাম রাজনীতি।
শিল্পভাবনায় চিন্তাকে প্রস্ফুটিত করার নাম রাজনীতি।
কবির ভাবনায় অসামাজিক নীতির
পরিবর্তনের কথা বলে,
রাজনৈতিক তত্ত্বের গঠনতন্ত্র নামের টালমাটাল
খুঁটিকে শক্ত অবস্থানে ফিরিয়ে আনতে
দুটো লাইনে স্বপ্ন জাগানো কথা বলে ,
কলমের মাধ্যমে জাগিয়ে তোলে
সংশ্লিষ্ট ঘুমিয়ে থাকা বিবেক।
কবিরা স্বপ্নের কথা বলে,
এ কলম ব্যঙ্গ বা হিংস্রতাকে স্পর্শ করেনা
কবিরা সবুজ প্রকৃতি নিয়ে বাঁচে ।,
কালের পর কাল যুগের পর যুগ
যখন ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে,
তখনই শাণিত হয় কবিদের কলম
তেড়ে উঠে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর
ভুলে যায় শোষকের অত্যাচারের কথা ।
কলমের কালি তখন কালো নয়
লাল রক্ত ধারন করে
সত্য জয়ের নেশায় হুংকার দিয়ে
পথ চলা শুরু করে।
কবিরা হিংস্র পৃথিবীর স্বপ্ন দেখে না
যতদিন হিংস্রতা থাকবে ততদিন
কবিদের প্রতিবাদী কলম চলবেই চলবে-
ইতিহাস তো বারে বারে এটাই বলে।

 

নির্বিকার

নরপশুরা নৃত্য করে ধর্ষণ নামক উৎসবে
নৃত্যের নাম উদ্ধাহু নৃত্য !
সকাল – সন্ধ্যা কিংবা মাছরাঙা দুপুর
কিছুই যায় আসে না ওদের,
শুধু নারী মাংশ চাই

নৃত্যের তালে খোঁজে নতুন মাংসের স্বাদ ঘুরেফিরে শুধু নারী মাংস চাই।

প্রতিযোগিতায় যোগ্যতার জন্য লাগে
শক্তিমান সেবক ,
যারা চালাক পাখির মতো ফুরুত করে উড়ে যেতে পারে নির্ভয়ে!
তাদের জন্য কোন আইন তৈরি হয় না
হবে বলে মনেও হয় না,
আর ধর্ষিতারা নির্বিকার হয়ে
কলঙ্কের ধারাপাত মুখস্থ করে
সমাজ ভেংচি কাটে
সুরে সুর করে পড়ে !
সকালে বিকেল আয়োজন করে পড়ে ।
কোথায় যেনো , ডিজিটাল ব্যাকরণে
ভুল ভ্রান্তি ঠেকে চোখে ,
সবই বুঝি , বলতে পারিনা শুধু মুখে ।

 

প্রতিবাদ এবং উপেক্ষার পত্র

সবিনয় নিবেদন এই যে , আমি
প্রতিবাদ করি বিবেকের আহ্বানে।
জাতি বর্ণ গোত্র নির্বিশেষে সবার কল্যাণে ।
আর যদি একে উপেক্ষা করি
যদি ভাবি –
কে মরে মরুক- আমার কি ?
কেউ নির্যাতিত হলে হোক
আমার কি ?
ওরা না খেয়ে আছে!
আমার কি ?
আমি থাকবো আমার রাজত্ব আর বাহু পেশির
জোর খাটিয়ে !
এই দুইয়ের মধ্যেই মিলবে মনুষ্যত্বের পরিচয় !

 

সুখ সাহারারা স্বপ্ন

পৃথিবী জুড়ে বিশুদ্ধতার হাহাকার
লোড শেডিং সন্ধ্যার মতো ,
গভীর রাতের নিস্তব্ধ রাস্তায়
ভয়ে কুঁকড়ে যাবার মতো ।
চলার গতি থেমে যায় ,
নিঃশ্বাসে নরক ধোঁয়ার গন্ধ পাই ।
বিপদ্‌গ্রস্ত মস্তিষ্ক তখন গভীর চোখে
মায়াপুরীর স্বপ্নে ডুবে
দুর্লভ পরিবেশ , সুশান্ত বাতাস আশা করে।

উদ্দেশ্যহীন ভাবে হুড খোলা রিক্সায় উঠে ভয়কে দূরে সরিয়ে লক্ষহীন তাড়িত আবেগে গল্পে মাতার স্বপ্ন দেখে ।
সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বেলে আজলা ভরা সুখ খোঁজে
কারো গভীর চোখে অপ্রাপ্তির কবিতা লিখে ।
প্রতিকুলগামী মস্তিষ্ক তখন দক্ষিণের জানালা খুলে বেওয়ারিশ ভয়গুলোকে শক্ত হাতের মুঠোয় ভরে দূরে-বহুদূরে নিক্ষেপ করে,
প্রশান্তি নিয়ে স্নিগ্ধতায় ডুবে প্রিয় মুহূর্তে ফিরে ।

অতৃপ্তির ছাঁচগুলোকে নতুন ছাঁচে সাজিয়ে
শুদ্ধ জমানো ভাবনাগুলোকে ধুয়ে মুছে রঙতুলির আঁচড়ে রং বাহারি উৎসবে মাতিয়ে
জল রঙে পোর্ট্রেট এঁকে জীবনকে আলিঙ্গন করে নতুনভাবে নতুন সাজে।

 

কাল্পনিক জগত

অতি আধুনিক মনের কার্নিশ বেয়ে
নেমে আসে অসংখ্য পরিকল্পনাবিহীন
এলোমেলো উদাসী প্রেম।
সৃষ্টি হয় ধোঁয়াসার কাল্পনিক জগত।
যেখানে বসবাস করে অগণিত মন আর
শৌখিন মোহের অবাধ যাতায়াত।
অলক্ষ্যে লক্ষ লক্ষ ভ্রূণ অবয়ব
হবার আগেই দেয় প্রাণ।
নিষিদ্ধ বিতর্কিত হলেও সগৌরবে
চলে সূক্ষ প্রণয়ের উদ্যেমের খেলা।
সেখানে বর্ষায় এক গুচ্ছ কদমের পরিবর্তে
কেবলি উষ্ণতা খোঁজে
হুড খেলা রিক্সায় একসাথে ভিজতে না গিয়ে গোপন অন্দরে উচ্ছ্বসিত দুপুর কাটে।
ফের সারাটা বিকেল পরবর্তী
দিনের আলপনা আঁকে।
কিভাবে মেধার বিলুপ্তি ঘটে বোঝে না
নিজেকে উপস্থাপন করতেও তারা জানে না
আটকে থাকে শুধুই বাহারী পোশাক আর
অসাধারণ অপ্সরী শিকার ধরাতে।

 

হাহাকার

পৃথিবী জুড়ে বিশুদ্ধতার হাহাকার
লোড শেডিং সন্ধ্যার মতো
গভীর রাতের নিস্তব্ধ রাস্তায়
মানুষ ভয়ে কুঁকড়ে যায়
চলার গতি থেমে যায় ,
নিঃশ্বাসে নরক ধোঁয়ার গন্ধ পায় ।
বিপদ্‌গ্রস্ত মস্তিষ্ক তখন গভীর চোখে
মায়াপুরীর স্বপ্নে ডুবে
দুর্লভ পরিবেশ
সুশান্ত বাতাস আশা করে।

 

রাঙা সন্ধ্যা

লালচে গোধূলি রাঙা সন্ধ্যায় যখন
সুনসান নিরবতা নেমে আসে
আধো আলো ছায়ার আদলে সাজে
তখন আসমানকে নান্দনিক লাগে
যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা ক্যানভাস ।
হঠাৎ করেই বোধের দুয়ার খুলে যায়
একাগ্রচিত্তে ভাবনার সরোবরে ডুব দেই !
গুমরে ওঠে টুকরো টুকরো স্মৃতি
অবুঝ আবেগে আপ্লুত হয়ে
নীরবতার আচ্ছন্নতায় ফেরারি
স্বপ্নে বিভোর হই ,
অপরিমেয় শক্তি খুঁজে পাই ।
নিশ্চুপ আমি তখন নিজের অজান্তেই
তোমাকে নন্দিত উপমায় ডাকতে থাকি ।
মনোমুগ্ধকর শব্দের অলংকরনে
অনুভূতির অনুভব প্রকাশ করি ।
সময়ের প্রেক্ষাগৃহ তুলির আঁচড়ে
আঁকি।
রঙিন কল্প জগতে ডানাবিহীন আমি
ডানা মেলে উড়ি, হারিয়ে যাওয়া
আমার আমিকে নতুন করে
মনের মাধুরী মিশিয়ে সাজাই !

 

রঙের দ্যোতনা

সব রঙের সুঘ্রাণ হয় না
তবুও কিছু আগুন রঙা রঙের
স্পর্শে জুড়ায় ক্ষতবিক্ষত ক্লান্ত মন ।
যেমন ভেজা ঠোঁটের মধ্যে মায়া থাকে
ঠিক তেমন।
পরাজিত মন যখন নিরুদ্দেশ হতে
অচেনা পথে হাঁটতে শুরু করে
বিষণ্ন প্রলাপ বকে,
ঠিক তখন আগুন রাঙা রঙ
নিরুদ্দেশ হওয়া থেকে বিরত রাখে
বোধিত শক্তি যোগায় ।
হৃদয়জুড়ে রিনিঝিনি আওয়াজ তোলে
সান্ধ্যকালীন নিরবতা ভেঙ্গে
উল্লাসে মেতে উঠে বিরহের
নিত্য উপোষী অভিমানী মন ।
কিংবা ফিরে যায় বসন্ত ভোরে
পড়ে না উঁচুনীচু কোন গিরিখাতে
অথবা নির্বিকার হয়ে ভাসে না
একাকিত্বের শূন্য হাহাকারে ।

 

মায়াবী স্বপ্ন

হেসেছিল রোদ্দুর কিছুটা সময়ের জন্যে
দিয়েছিল খুলে এক ঝাঁপি আঙুলে আঁকা।
মায়াবী স্বপ্ন !
সকালকে দুপুর আর
দুপুরকে সন্ধ্যা মনে হলো ।
স্বর্গ আর মর্ত্যে আলো-ছায়ার পরিবর্তনে
প্রতিশ্রুত স্বপ্ন হৃৎপিন্ডে হাতুড়ি দিয়ে
সজোরে আঘাত করে ।
আকাশে তখন শোর
মেঘেদের উড়াউড়ির তোড়
হলো না হলো না —
ঘন কালো কাজল চোখ আর কালো টিপে
একাকার হয়ে যাওয়া !
স্বপ্ন-স্বপ্নই থেকে গেলো
আশারা দাঁত চিবিয়ে হৃৎপিন্ডকে
শাসন করে স্বত্ত্বকে অন্তরালে ঠেলে দিলো !

 

কবি মাহমুদা মৌ। গীতিকবি মনসুর রহমানের কন্যা। ১ লা ফেব্রুয়ারি রংপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। বেড়ে ওঠা সেখানে।  কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাস অ্যান্ড সংস্কৃতিতে অনার্স, এবং ঢাকা এশিয়ান ইউনিভার্সিটি থেকে সোসিওলজি অ্যান্ড অ্যানথ্রোপলজিতে মাস্টার্স করেন । মাহমুদা কবিতা, গল্প এবং কলাম বিভিন্ন পত্রিকাসহ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়ে আসছে দীর্ঘদিন ধরে। তার প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ৪টি। আগামী ২০২৬ একুশে বইমেলায় প্রকাশিত হতে যাচ্ছে প্রথম উপন্যাস ‘যে পথে ফুল ফোটে না’

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP