জনমানুষের কবিতা ১
কোন সে নিরুপায় চাতক
তাকিয়ে আছে ভুখা লোকেদের চোখের দিকে
যদি একফোঁটা জল নেমে আসে কপোল বেয়ে
কিন্তু চাষা-
এমন স্বার্থপর
জিরজিরে হাড়,
পোকায় খাওয়া আলু সে খায় আর
পোকা খেয়ে নেয় তার দাঁত;
তবু সে কাঁদে না,
কেবল কোটর থেকে চেয়ে থাকে
দুটি লাল সুরু্য ।
জনমানুষের কবিতা ২
সবাই তো সমুদ্র পাড়ি দেয়।
উথাল পাথাল।
অথচ নাবিক আর খালাসি কী সমান হয়!
উঁচুতলায় কেবিনের সাথে নিচতলার ডেকের পার্থক্য ফাইন চীনা কাপ আর টিনের মগে।
দোল খেতে থাকা খাটে আর পাটিতে।
উপর থেকে সহজে নিচে নেমে আসা গেলেও
নিচ থেকে উপরে উঠা বেশ কঠিন।
অথচ রাতের লোনা হিমে বয়ে আসা একাকিত্ব
সব যাত্রীর জন্য ই সমান।
বন্যার গল্প
এত্তবড় ঢল নামতো
আসমান ছুঁই ছুঁই,
ঘরের ভিতরে নদী আইতো
তাতে বিরাট বড় রুই!
কারের উপর বইসা বৌ এ
ধরতো সেই মাছ;
ভাত ছাড়া মাছ ভাজিতে কি আর
মিটে ক্ষুধার বাছ?
ভেলায় কইরা পড়শিরা সব
গল্প করতে আইতো,
তামুক মুড়ি পাইবো কোনে
ভিজ্জা কিসু নাইতো!
মরা গরুর ফুলতো পেট
গন্ধে মরমর-
সেই মরার উপরে আবার
শকুন করতো ভর।
এর মাঝেও নাকি সুরে
বৌ এ আমার গাইতো,
“মরা বাপে থাকলে তবে
নাইওর নিতে আইতো।”
চালের উপর শুকনা চুলা
মেঘের জলে ভিজে,
পেটের ক্ষুধা সারাবেলা
পেটের ভিত্রেই মজে।
লোহার পাখি টপ টপাটপ
ফালাইত খানা তাই-
খই এর লাইগ্যা আর উঠেনাই
এমনো আশনাই।
রাইতের বেলা কইতাম তারে,
“যদি থাকত ধান!
খই এর লাইগ্যা মন টা কেবল
করে গো আনচান।”
বৌ এ আমার বানের জলে
পড়লো অসুখে,
তার শুখা মুখ দেইখা আমার
পরান কাঁদে দুঃখে।
বান আইল
ধান ভাসল,
ভাসল বাড়িঘর-
নিজের হাতে লাশ ভাসায়া
বৌরে করলাম পর।
মাটি দেখা যায় না তবে
কবর দিব কোনে?
বউ আমার নাইওর গেছে
ভাবি মনে মনে।
ক্ষুধা
সোনালি রোদ কেটে দিয়েছে মাটি,
নশ্বর ঘাসেদের ডগায় চুমু খায়
সেজদাবনত কপালের জান্নাতী দাগ।
একটা বিড়ালছানার ক্রন্দন ভেসে আসে
মানবশিশু বলে হয় ভ্রম;
তারারা তাকিয়ে থাকে-
জোনাকীর মত ওরা জ্বলে আর নিভে,
হ্যাজাকের চারপাশে অল্প শিশির
আধখানা একসুতা রংধনু আঁকে
পাখিদের সরু ঠোঁট পাশ কাটিয়ে
বুদ্বুদ খেলে জলের রাঙ্গা মাছ,
রোয়াকে ফুলে কইতর আর
উনুনে ফুলে রুটি-
বাকবাকুম ডাক ডাকে পাখি আর
মানবের পেট।
ধান ভানার দৃশ্য
এখানে এত সোনালি ধানের বর্ণ যে
বধূরা যখন উঠানে ছড়ানো পাকা ধানের মাঝে হাতড়ে বেড়ায়-
তাদের স্বর্ণের বালাগুলো আলাদা করে বোঝা যায় না।
আমি সূর্যালোকে উষ্ণ কোমল ধানের মাঝেই
পা ডুবিয়ে দেই, টেনে টেনে হাঁটি
তিন আলিফের মত দীর্ঘ করে।
মনে হয় যেন সমুদ্রপাড়ে একটা গ্রীষ্মের সকালে
বালির মাঝে হাঁটছি।
একচালা ঘরের ঢেঁকিটাকে রাজার পদলেহী মন্ত্রী মনে হয়,
প্রতি আঘাতে “জী হুজুর” করে মাথা উঁচুনিচু করে সে
কৃষকের ঘামগুলোকে গুঁড়িয়ে দেয়।
আমি ভয় পাই যদি গুঁড়িয়ে যায় ঢেঁকির মুখে জাবর কাটা হাত ও?
অকুতোভয় বধুটির হাত ঠিক জাবর কেটে চলে
ঢেঁকির মুখে।
জলহস্তী যেমন তরমুজ খেয়ে ফেলে,
তেমনি ঢেঁকিটাও চিবোতে থাকে ধান।
নীলা হারুন। জন্ম সিলেট শহরে, ১৯৯৪ সালে। পিতা মো. হারুনুর রশীদ তালুকদার , মাতা রাশিদা আক্তার। পড়াশোনা করেছেন মার্কেটিং বিভাগে। ছোটবেলা থেকেই বইপড়ার নেশা। বাংলাদেশ বেতারের নিয়মিত শিল্পী ছিলেন তিনি। লিখেছেন পত্রপত্রিকা ও লিটল ম্যাগাজিনে। এছাড়া বেশ কিছু বই এর প্রচ্ছদ এঁকেছেন। পছন্দ করেন দেশ বিদেশে ঘুরে বেড়াতে। তার লেখা গল্পে নির্মিত হয়েছে ভারতীয় শর্টফিল্ম যা আন্তর্জাতিকভাবে সমাদৃত হয়েছে। লেখকের বই-অলীকালোকে (নভেলা), লাল কম্বল (গল্প), মিষ্টান্ন (উপন্যাস), নবীজি (সা.);দ্য ব্লেসড ওয়ান(সিরাত), মঙ্গোলিয়ার ঘোড়া (হিস্টোরিক্যাল ফিকশন), তোমার আরেকটি হাত কোথায় সালেহা? (অতিপ্রাকৃত উপন্যাস) উল্লেখযোগ্য।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।