জিতে যাওয়ার সুখ
আমার অস্তিত্বে লীন হয় সফেদ বকেরা
আশাজাগানিয়া সুরের অনুররণ
বয়ে নিয়ে আসে হিমালয় থেকে,
থেকে থেকে খুঁজে নেয়, বুঝে নেয় আমাকে
শূন্যস্থান পূর্ণ করে জড়িয়েই থাকে।
নাকফুল হয়ে জ্বলজ্বল করে, কণ্ঠহারে হাসে
চোখে ভাসে, চুলের ঘ্রাণে পাশে আসে
ডুবসাঁতারে লোহার ব্রিজ ভাঙে
বাঁশের সাঁকো পেরিয়ে আমার দরোজা ভেদ করে
আর আমি হারিয়ে যাই, হেরে যাই…
হারতে হারতে জিতে যাওয়ার সুখ পাই…
অনিরুদ্ধ প্রবাহ
অনিরুদ্ধ প্রবাহে তোমাকে খুঁজতে খুঁজতে
জন্ম থেকে জন্মান্তরে ভেসে যাই, হেসে যাই
জলকেলি করি, বৃষ্টি ধোয়া দিগন্তে রংধনু হয়ে হাত দু-খানি রাঙিয়ে তুলি পথের ধারের কাঁচের চুড়িতে।
কুন্দ ফুলের ঘ্রাণে মিশে যাই তোমাকে ছোঁয়ার নেশায়
সপ্তমীর সুরে তোমার আগমনের অপেক্ষা ছিল;
আজ মাঘের শুক্লপক্ষের পঞ্চমী
এখানেই তোমাকে পেলাম ইলিশের চকচকে আঁশে
শুভ্র আবরণ আমাকে করেছে পুলকিত, চকিত!
নূপুরের ধ্বনিতে আমি বিহ্বল
চুলের খোপার নিচে লুকিয়ে দুষ্টুমিতে মাতি
ডুবে যেতে যেতে বেঁচে উঠি, পসরা সজাই
প্রশস্ত প্রান্তরে, যেখানে নিত্য হাটে নিজেকে বেচি
আবার নিজেকেই কিনি তোমারই পানশালায়।
অগ্রন্থিত কাব্য
তুমি এক নিঃশব্দ বিকেল
অপরাজিতার রঙিন চা
আমার অগ্রন্থিত সহস্র কাব্য।
অন্তঃপুরের সেই নীরবতায় তোমার চলন
যেখানে শব্দরা ডুবে যায়
প্রশ্নেরা সব ক্লান্ত হয়ে উত্তরের খোঁজ ছেড়ে দেয়
সেই তোমাকেই আমি চাই
তোমাকে চাই না পাওয়ার মতো
পাওয়ার ভয়ে হারানোর মতোও না
এক চিরস্থায়ী অভ্যেসের দানায় হোক তোমার বসতি
দানার মতো গায়ে গায়ে লেগে থাকুক লাহোরি কবুতর
তুমি, আমি আর আমরা…
অতল পদ্মা
রোদ ঝরে পড়ুক জলির বিলে
ওখানে শিশিরে ভিজে আছ তুমি
শ্বেতপদ্মের পাপড়িতে তোমার চোখের আবাহন
আমার বাসস্থান এঁকেছি ওই ভ্রুযুগলের নিচে
নাকি ডেকেছি সর্বনাশ!
বানের জোয়ারে সর্বনাশের আহ্বান উন্মত্ত পদ্মার
সহসা ডাক শুনি সুফলা চর থেকে
পদ্মা! প্রেয়সী পদ্মা!
তোমার স্ফীত বক্ষ-সীমানায় হবে কি আমার ঠাঁই?
আমি মিশে যাই প্রমত্তা পদ্মায়
অতল থেকে অতলে।
আকাঙ্ক্ষা
উত্তুরে হাওয়ায় মিশে আছে পৌষ-শিশির
শরচ্চন্দ্রিমায় খুঁজেছিলাম তাকে
অবশেষে আজ সে নেমে এলো টিনের চাল বেয়ে।
হৃদয়-তূণীরে যত্ন করে রেখেছি
সেদিন কোজাগরী চাঁদ সহাস্য-মুখ বাড়িয়েছিল
ওখানেই পেয়েছি তাকে।
তাকে আমি আমার করেছি শীত-বস্ত্রের মতো
সহিষ্ণু-কাঁটায় গেঁথে বুকের ওমে আপন করেছি
কুড়িয়ে পাওয়া হাসনাহেনার পাপড়িগুলো
রেখেছি তার জন্যই।
শুধুই আকাঙ্ক্ষা
এই ঊষর আঙিনায় উষ্ণ আলপনা এঁকে দাও
কোমল তুলির ছোঁয়ায় আমি হয়ে উঠি আরো রঙিন, আরো মোহময়।
ভেসে আসা রোদ
কচুরিপানায় ভেসে আসে রোদ
একটু একটু করে উষ্ণ হই প্রতিদিন
দিবাবসান আনে প্রশস্ত সময়
উষ্ণতা বিস্তার লাভ করে সে-সময়ের রেখা ধরে
উপ্ত ও অঙ্কুরিত হয় নতুন বীজ
পত্রপুষ্পে সুশোভিত হয় প্রান্তর
পাখি গায়, ঢেউ তোলে বাতাস
বসন্ত আসন্ন, এসবই তোমার-আমার ফসল।
অনন্ত অভিলাষ
প্রতিদিনের অভ্যেসে মাত্রাহীন বর্ণমালাকে
কুয়াশাভাঙা ভোরের নরম আলোয় ছুঁয়ে দেখি,
ধূসর গোধূলির ক্লান্তিমাখা মুখশ্রী আঁকি, কেতকীর পেলব শাখায় স্নিগ্ধ ফুল্লদলে
অধরা মায়ায় আটকে থাকি।
খরখরে রোদ্দুরে প্রজাপতির ডানায়
উড়ি আর উড়ি
উড়তে উড়তে হারিয়ে যাই, ডুবে যাই মেঘনার মোহনায়
ডুবে ডুবে আবিষ্কার করি এ আমার সুধাময় দিঘি;
যে সুধায় আমার দুঃখেরা হয় পরম সুখ, চরম তৃপ্তি
সব না পাওয়ার শেষ হয় সুখময় চওয়াতে
এ যেন অন্তহীন প্রহরের অনন্ত অভিলাষ!
মধুপের পান্থশালা
কলমি ফুলের ঢেউয়ে বেগুনি বিকেল
দলবদ্ধ মন্থর গতি শুভ্র রাজহাঁস
কচুরিপানায় ছাওয়া পুকুরের ছাদ
ফলবতী বরই ডালে কাঁচামিঠে ঘ্রাণ
ক্যানভাসে জলরঙ চমৎকার দৃশ্যপট!
আমারও একটা ক্যানভাস আছে
সেখানে কেবলি সে আর তার সিন্ধুক
অগণিত প্রেমপিয়াসী মধুপের পান্থশালায়
সে একজন মাত্র। তাকে চেয়েছি, পেয়েছি।
বকেছি, মেরেছি, তবুও আমার হয়েই আছে
আমাকে নিয়ে আমার হয়ে আমি হয়ে তার স্থিতি
ভালোবাসি বলি অগণিতবার, অনন্তবার, অনন্তকাল।
বহতা নারী
আর একবার তাকাতে চাই ওই চোখে
মুগ্ধতার সীমানা ছাড়িয়ে জমে উঠুক নীড়
ভালোবাসা উড়ুক আকাশের উঠোনে
জলধারা নেমে আসুক বক্ষ বেয়ে, আমিও চলি,
ছুটে চলি বহতা নারীর মতো, নদীর মতো,
সানন্দে সাড়া দেই সাগরের আহ্বানে
পতিত হই, অতল তলানি পান করি
ধন্য হই, ধন্য করি ক্ষুধিত তৃষিত প্রাণ!
কবিতার বিসর্জন
আমার কবিতারা বিক্রি করে রোদ
তার আদরে প্রতিদিন ওম পাই, প্রতিক্ষণ।
কবিতায় গড়া ইমারত, গদ্যে বা পদ্যে
শীতল পাটির বুননে কবিতার অন্ত্যমিল
জামদানি তাঁত অক্ষরবৃত্তে,
কবিতা কেবল গাইছে মহিমা কোনো এক পান্থের
মধ্য গগণে ক্লান্ত মগজে হাডুডু খেলোয়াড়,
হালকা বাদামি চোখ, দশমী আর কবিতার বিসর্জন।

তিথি বালা। কবি, ছড়াকার ও গবেষক। জন্ম ১৯৮৭ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি, গোয়ালগ্রাম, মুকসুদপুর, জেলা গোপালগঞ্জ। বর্তমান আবাস: গোপালগঞ্জ। শিক্ষা: মুকসুদপুরের কলিগ্রাম মণিমোহন মডেল উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক (২০০৩), বঙ্গরত্ন মহাবিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক (২০০৫), বঙ্গবন্ধু সরকারি মহাবিদ্যালয় থেকে স্নাতক (২০১২) ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর (২০১৪) এবং প্রাইমারি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট (পিটিআই) থেকে শিক্ষায় সনদলাভ (সিইনএড)। প্রতিটি পরীক্ষার প্রথম বিভাগ ও প্রথম শ্রেণি সমমর্যাদা প্রাপ্ত। পেশা শিক্ষকতা। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীজীবনে লেখালেখির অভ্যাস থাকলেও প্রকাশিত হয়েছেন কারোনাকালে সম্প্রতি। ‘বাংলা একাডেমি বিজ্ঞান পত্রিকা’য় গবেষণা-প্রবন্ধ ছাড়াও প্রথম শ্রেণির জাতীয় দৈনিক এবং স্থানীয় সংবাদপত্রে তাঁর কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে। তৃতীয় দশকের কবি হিসেবে গণ্য। দেশের ও দেশ বাইরের বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর রচনা সংকলিত হয়েছে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রকাশিত তৃতীয় শ্রেণির ‘হিন্দুধর্ম ও নৈতিক শিক্ষা’ পাঠ্যপুস্তকের তিনি অন্যতম লেখক। বাংলা একাডেমির গবেষণা উপবিভাগ থেকে ২০২৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘গুরুনাথ সেনগুপ্ত কবিরত্ন’ শীর্ষক জীবনী তাঁর প্রথম প্রকাশিত গবেষণা-গ্রন্থ। ২০২৫ খ্রীস্টাব্দে আলোকায়ন প্রকাশনী থেকে ‘আমি একটি ছোট্ট ছেলে’ শীর্ষক ছড়াগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।