সকল মেনু

সালমা বেগ’র ১০ কবিতা

প্রেমের অনুরাগ

“অনেক দেখেছি নদী পদ্মা, মেঘনা,যমুনা যতো
স্রোতস্বিনী ব্রহ্মপুত্র তোমার সৌন্দর্যে মাতাল হয়েছি কতো।
মানব-সভ্যতা ভেঙে-গড়ে কবির খাতায় এসেছো রূপক হয়ে
সবুজ-শ্যামল করেছো বাংলার রূপ পলিমাটি বয়ে।
মারছে তোমায় ভূমিদস্যু দখলদারিত্ব করে
স্রোত নেই ঢেউ নেই শীর্ণকায় আছো পড়ে।
প্রেমাবেগ নাই তোমার সঙ্গীতে কলকল ধ্বনি শুনি না এখন
একাকী নিরলে কাঁদি তোমার ও বুকে বাজে যন্ত্রধ্বনি যখন।
ঋতুস্নাত চাঁদ নগ্ন আলো ছড়ায় তোমার বুকে
পাখির উল্লাসে কণে দেখা আলোয় প্রেমের প্রহর কেটেছে কতো সুখে।
ব্রহ্মপুত্র তুমি শত জনমে প্রেমের অনুরাগ
ভেঙে ফেলো সব আছে যতো সুদৃশ্য দালানকোঠা বাঁধ।
যতো অনিন্দ্য সৌন্দর্য আছে সব ভুলে ব্রহ্মপুত্রে স্রোত চাই
জীবনে রচেছি যতো কাব্য সকল কাব্যে ব্রহ্মপুত্রের রূপ পাই।

পাই মধু বরিষণ

অনাহারি মন অমৃতের সন্ধানে তাকায় সমুখে দুর্লঙ্ঘ পারাবার।
নদীর কল্লোলে-অশ্রুপাত শুনি তোমার কিন্নর-ম্লান হাসি
আদিগন্ত শুধু এক শব্দ কানে বাজে “ভালোবাসি-ভালোবাসি’।

হৃদমন্দির শূন্য হলে মন্ত্র-মগ্নতায় তোমারই নাম করি উচ্চারণ
এসো বৃষ্টি হয়ে ঝরো, না হয় শিশির, ধুয়ে দিই ও চরণ।
চৈত্রের ভিষণ খরায় যেমন দাবদাহে পুড়ে যায় বন
তুমি-হীনতায় খরাক্লিষ্ট বুকে কোথা পাই মধু বরিষণ?
দু’কূল ছাপিয়ে জীবনে সবুজ আনে যদি বান
অনুপম ঝর্নার প্লাবনে বেদনার হয় চির অবসান।

অনুপম সুর চাই

আলোকিত করে নিতে হৃদয়ে জ্বেলেছি আজ কনক প্রদীপ
অন্তরের সে দ্যুতি তোমায় দেখাবে স্বপ্নের দ্বীপ;
কোন এক শুভক্ষণে হৃদয় হয়েছে তোমার হৃদয়তর
নিজেকে উৎসর্গ করি অনুপম অতলান্তে আরো,
তুমি ছাড়া আমার এ-প্রাণ বেদনায় টলমলো
সকালের রোদ গায়ে মাখি রাতে চাই তোমার জ্যোৎস্নার আলো।
গ্রীষ্ম-বর্ষা এলো, শ্রাবণ-বসন্ত এসে চলে গেলো
অশ্রু মুছে দিতে বলো তুমি ছাড়া কে হাত বাড়ালো?
হৃদয় গহনে তুমি সেখানে কেবল স্বপ্নে পারি যেতে
বন্ধ করে দু-চোখ তোমার আলিঙ্গনে উঠি মেতে।

যে চোখ তোমায় দেখিতে না পারে তাকে অন্ধ হতে দাও
যে কান তোমার কথা না শুনিতে পায় তাকে বধিরতা দাও
যে হাত তোমার স্পর্শ থেকে দূরে থাকে
সে হাত অসার হলে দোষ দিও না কখনো তাকে।
যে নদী চেনে না সাগরের প্রিয় মোহনা কোথায়
দোষ দিও না কখনো তাকে যদি সে অনাব্য হয়ে যায়;
যে পাখিটি শেখেনি তোমার অনুপম সুর
থাকুক সে বনে দৃষ্টি থেকে বহু দূর।

মায়াবী আলো

একটি মলিন ঝরা পাতা যদি ভুলে ছুঁয়ে দাও;
মনে হয় ভালোবাসা মাড়িয়ে অনন্ত সুখ পাও।
শ্রাবণ-বৃষ্টিতে যদি নিজেকে ভেজাও;
মনে হয় রাধা-কৃষ্ণ লীলা করে অহং দেখাও।
ঘাসের উপর শিশিরের মুক্তো যদি ছুঁয়ে দাও;
মনে হয়ে আমায় বিস্মৃত হয়ে পরিযায়ী সুখ খুঁজে পাও।
ভরা জ্যোৎস্নার সৌন্দর্যে যদি যাও ভিজে,
মনে হয় দস্যু এসে কেড়ে নিলো কী-যে।
আঁকড়ে ধরি জরা-জীর্ণ নিজের সীমাবদ্ধতা ভুলে,
মনে হয় হই বিদ্রোহী যখন কেউ
অনুপম ফুল নিতে চায় তুলে।

গোধূলির রঙ ছুঁয়ে যখন বিদায়ী সূর্য যায় ডুবে,
অনুপম মহিমায় চন্দ্রমুখ তখন উদিত হয় পুবে।
সবুজ দেখেছি তোমার দু’চোখে মনিময় আলো ছুঁয়ে;
সে সবুজ কেন মুছে যাবে শ্রাবণের জলে ধুয়ে?
অনার্যের দু’চোখ সাজাই মায়াময় অনুভবে
সে দ্যুতির আড়ালে থেকেছো কোন কালে বলো কবে?
যখন এসেছো আমার জীবনে মায়াবী আলো হয়ে,
নদীতে এসেছে জোয়ারের জল স্রোত যায় বয়ে।

 

মত্ত থাকো ছলায়

মৃত্তিকাকে পায়ে দ’লে আকাশ ছুঁতে যাও
দিনের আলো হারিয়ে কি রাতের তারা পাও?
সুবাস নিয়ে গোলাপ-বেলির খোঁজো ধুতরা ফুল
কাঁটার আঘাত স’য়ে আমি করলাম একি ভুল!
তোমার বাগান ভরে আছে রঙিন ফুলের ভিড়ে
জীবন নৌকা সুখের ঢেউয়ে ভাসালে কার তীরে।
আমি না হয় হারিয়ে যাই অন্তিম আঁধারে
সুখ সায়রে ভাসাও ডিঙা অনন্ত জোয়ারে।
তুমি দেখো নতুন সকাল নিত্যনতুন প্রেমে
রাধিকাকে রম্ভা সাজাও নিকোষিত হেমে।
যতোবার পড়ো তুমি প্রেমে অন্ধ মোহে
এ জীবনের চলার গতি সংগ্রামে আর দ্রোহে।
যতোভাবে ভোগ করো প্রেম বিভাবতী কলায়
হৃদয় নিয়ে মত্ত থাকো যতো রঙিন ছলায়!
চাতুরীতে আর কখনো আমি করি ভুল?
অবশেষে জানি তুমি কাগুজে ভুল-ফুল।

 

অদ্ভুত শূন্যতা

তৃষ্ণার্ত হৃদয় কেঁদে ওঠে বারেবারে
পরিচর্যাহীনতার যন্ত্রণা নেভাতে চাই অন্ধকারে
অন্তরাঙ্গন পোড়াই ফেলে দীর্ঘশ্বাস
এ প্রাঙ্গণে তুমি আসবে আমার বিশ্বাস।
জীবনের দিশা খুঁজে কখন গড়িয়ে গেছে বেলা
দেখতে পেলে না গোপন ব্যথার লুকোচুরি খেলা
অদ্ভূত শূন্যতা নিয়ে সন্ধ্যার আকাশে চেয়ে থাকি
হারানো ব্যথার খোঁজে তোমাকেই ডাকি।
বিষাদের কথা লেখা পরিপাটি মলাটে বাধানো
যেখানে আমার হৃদয়ের ক্ষত সুন্দর সাজানো।
আমিও দাফন করেছি মনের সব আকুলতা
সবই বদলে গেছে লেখা আছে শুধু বিক্ষত বিগত কথা।

 

বৃষ্টির নৈবেদ্য

বৃষ্টির সুরেলা শব্দে বুঝি অনুপম ভালোবাসে
অবাক সকালে বৃষ্টির নৈবেদ্য দেখি ঘাসে ঘাসে।
যতো কষ্ট বুকে শ্রাবণ ধারায় বিসর্জন দিই
বৃষ্টির শীতল স্পর্শে শরীরে সৃষ্টির মায়া নিই।
দমকা বাতাস কখন ডেকে নেয় সহসা দুয়ার খুলে
মাতাল হাওয়ারা অলক্ষে লজ্জার পর্দা নেয় তুলে।
আনন্দিত থাকি কষ্ট জরা আাছে যতো সব ভুলে
ফুলের সৌরভ গায়ে মেখে যাই সান্ধ্য-নদী-কূলে।
তোমার স্বপ্নের কথা ব’লে কাঁদিয়েছো অন্যমনে
মৃত্তিকার সাথে হৃদয়ের কথা বলো গুঞ্জরণে।
লাবণ্য-অরণ্যে খুঁজেছো আশ্রয় হরিৎ অঞ্চলে
নিজে নিজে পুড়ে আমাকে পোড়াও রৌদ্রের অনলে।
স্পর্শের উদ্ভাসে পেয়েছো অমৃত রস
প্রেম দিয়ে কিনে নিলে প্রেম করেছো আমায় বশ।
প্রেমাঞ্জলি দিতে হৃদয়ের অতলান্তে পৌঁছে যাই
অরণ্যের প্রেমালাপে অনুপম ভালোবাসা পাই।

 

কবিতা আমার ভুবন

স্তব্ধতা ভেঙে এ হৃদয় পোড়ে দুঃখ তাড়িত মন
ফুটন্ত ফুল কবিতা হতেই প্রাণ তার উচাটন
কবিতার দোলা ছল-চাতুরীতে ঢোকে পূজা মণ্ডপে
বুকে তার আশা কবিতার পায়ে নিজেকে দেয় সে সঁপে;
আমার আত্মা সেখানে যেখানে কবিতা ঘুমিয়ে থাকে
সারারাত জেগে আবেগী আঁধারে এলোমেলো সুরে ডাকে।
মাঝরাতে কেউ আমার ভুবন আগলে দাঁড়ায় কেন
কপালের টিপ তার স্পর্শেই চন্দ্র হয়েছে যেন
খরাক্লিষ্ট সবুজ বৃক্ষ পুনরায় প্রাণ পায়
স্বীকৃতির এ কীর্তি বাঁচুক শতাব্দ আঙিনায়
কবির জীবন সমুদ্রতীরে ঢেউ হয়ে ফিরে আসে
তার প্রেরণার সাফল্যে এই কবির জীবন হাসে;
ও চোখে তাকিয়ে বাঁচার স্বপ্ন জাগে এ সত্য মানি
দেবদূত হয়ে দুঃখী জীবনে মুছে দেয় হয়রানি,
আমার আকাশে দিশা অনুপম গভীর রাতের মায়া
উদাসী স্বপ্ন আমার কবিতা তাকে ছাড়া অসহায়া;
সীমাহীন প্রেমে আবৃত করে দিয়েছে আমায় জ্যোতি
দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা পাই সুক্তির বুকে মোতি,
শান্তি বরষা প্রণয়কাব্যে খুঁজি স্বর্গীয় সুখ
আদ্যোপান্ত সহস্রবার পড়ি প্রিয় হাসিমুখ।

 

অনুনয় করে বলি

তোমার সন্ধানে আকাশের নীলে যাই
আকাশ দেখালো কিছু কালো মেঘের ধুসর ছাই,
মেঘকে মিনতি করি, তোমার বুকের মাঝে তাকে খুঁজে দাও
মেঘ বলে, শ্রাবণের বারিধারা থেকে যদি পারো খুঁজে নাও;
মেঘ ভেঙে অবিরাম বৃষ্টি ঝরে মৃত্তিকার বুকে
কবে পাবো অনুপম স্মৃতি লুকাবো এ মুখ তার বুকে ছন্দময় সুখে;
বৃষ্টি আমাকে পাঠায় আকাশের কাছে,
আকাশ আমাকে বলে এখানে পাবে না কোন প্রাণের স্পন্দন
এখানে তো হাসি নেই পাবে শুধু বিরহ-ক্রন্দন
ঝর্নাকে মিনতি করে কতোবার বলি তাকে খুঁজে এনে দাও,
অস্থির চঞ্চল ঝর্না আমায় দেখায় নদীতে ময়ূরপঙ্খি নাও।

 

পুষ্পের ব্যথিত সৌরভ

যন্ত্রণায় নিত্য পিষ্ট হতে কতো আর লাগে ভালো
পলকের অভিঘাতে বর্ণিল মেঘেরা হয় কালো
কেন এতো দংশন বিবাদ প্রতিদিন
পুড়ে ভষ্ম করো ভুলে যেও যত ঋণ।
কাঁটার আঘাত যাপিত জীবনে সয়ে গেছি সব
অথচ ফুলের আঘাত পারি না সহিতে ফুলেরা হয় ব্যথিত সৌরভ;
অবহেলা যতো পাই আঁকড়ে থাকি অনুপম ভূমি
প্রচণ্ড খরায় সজীব বৃক্ষেরা মরে জনপদ হয় মরুভূমি।

তবুও জলসিঞ্চন প্রাণ-পণ লড়ি
উষর মাটিতে সবুজ অরণ্য গড়ি;
যে অরণ্য আমার আশ্রয় প্রিয় অনিন্দ্য আঙিনা
সে আশ্রয় ছায়া ছেড়ে কোনদিন কোথাও যাবো না।
আমার বেদনা যে অনুপম করেছে নিত্য পাঠ
আমি বুনোফুল সে আমার চির-ঘনিষ্ঠ গোপাট।

 

সালমা বেগ। জন্মঃ ময়মনসিংহের সম্ভ্রান্ত বেগ পরিবারে ২৯ শে জানুয়ারী। বেড়ে ওঠা ও পড়াশোনা ময়মনসিংহ শহরে। বিয়ের পর প্রকৌশলী স্বামীর চাকরীর সুবাদে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ঘুরে বর্তমানে শ্বশুরালয়ে বসবাস করছেন। ব্যক্তি জীবনে এক ছেলে ও এক মেয়ের গর্বিত মা।
সালমা বেগ লেখালেখি করেন। তাঁর পাঁচটি কাব্য ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। প্রথম কাব্য ‘ হৃদয়ে রক্তক্ষরণ’ দ্বিতীয় কাব্য ‘মাটি সর্বংসহা’ তৃতীয় কাব্য ‘এ প্রহরে বৃষ্টি ও প্রহরে রোদ’ চতুর্থ কাব্য ‘জল হয়ে যাই জলে’ পঞ্চম কাব্য ‘ শিশিরের অনুপম জল’। এছাড়াও বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় নিয়মিত তার কবিতা ও প্রবন্ধ প্রকাশিত হচ্ছে। তিনি ২০১৯ সালে পশ্চিমবঙ্গ থেকে ‘অক্ষরকর্মী’ সম্মাননা এবং ঢাকায় ‘সাহিত্য দিগন্ত’ সম্মাননা; ২০২০ সালে ‘দৈনিক বাঙ্গালীর কণ্ঠ’ সাহিত্য পুরষ্কার লাভ করেন। কবিতা চর্চা ছাড়াও সালমা বেগ সাহিত্যপত্র স্বতন্ত্র ‘র সহকারী সম্পাদক ও স্বজন সুহৃদ ময়মনসিংহের আহ্বায়কের দায়িত্ব পালনসহ বিভিন্ন সাহিত্য-সামাজিক এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত আছেন। তার বৃক্ষপ্রীতি উল্লেখ করার মতো। তিনি আমেরিকা, কানাডা ও ভারতসহ বেশকিছু দেশ ভ্রমণ করেছেন।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP