সকল মেনু

রীতা আক্তার’র ১০ কবিতা

রয়ে গেছে বাকি

তোমার সাথে অনেকটা সময় কাটানো বাকি।
শেষ বিকেলের গোধূলির রঙ ছোঁয়া বাকি।
রাত বারোটার পর হুডখোলা রিকশায় পুরো শহর ঘোরা বাকি।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ ঝুম বৃষ্টিতে ভিজেকাক হওয়া এখনো বাকি।
এখনো বাকি রয়ে গেছে নদীর পড়ে বসে ঝিরঝির বাতাসে কপোল ছোঁয়া।
খুব শীতে সকাল বেলায় তোমার সাথে ঘুরতে যাওয়া বাকি।
অনেক কিছুই তো বাকি রয়ে গেছে।
মাওয়া ঘাটে ইলিশ খাওয়া,
সন্ধ্যে গড়িয়ে সেই প্রিয় চায়ের দোকানে তুমুল আড্ডা রয়ে গেছে বাকি।
তোমার সাথে অনেকটা সময় কাটানো এখনো রয়েছে বাকি।
সর্ষে ক্ষেতের আইল ধরে ঘুরে বেড়ানো বাকি।
পড়ন্ত হেমন্তে তোমার সাথে খুনসুটি এখনো যে বাকি।
কত কিছুই তো রয়েছে বাকি।
তোমার সাথে অনেকটা সময় কাটানো রয়েছে বাকি……

 

স্মৃতির শহর ছেড়ে

হয়তো আর ফেরা হবে না এই স্মৃতির শহরে।
বসা হবেনা পাশাপাশি দু’ কাপ চায়ের সাথে।
না বলা কথা’রা রয়ে যাবে নিঃশ্চুপ রাতের ভীড়ে।
হয়তো আর ফেরা হবে না এই স্মৃতির শহরে।

অপেক্ষায় থাকা পড়ন্ত বিকেলে,
ফেরা হবে না…
দেখা হবে না…
কোণ ঠেসে বসে রবে আমার নিঃসঙ্গ দুপুরখানি।

হয়তো কোন নদীর ধারে, তোমায় মনে করে গুনবো ঢেউ।
রাতের মায়ায় জড়িয়ে থাকবো
স্মৃতির বাঁধা ঘরে।

হয়তো আর ফেরা হবে না এই স্মৃতির শহরে।
ব্যস্ত রাস্তা পার হয়ে বসা হবে না টং দোকানে।
যেখানে মিলেছিলো গান
গিটারের ঝঙ্কারে।

আধখানা বিস্কুটে কামড় দিয়ে
নেয়া হবে না ধোঁয়া উঠা চায়ের স্বাদ।

হয়তো মলিন পড়ে রবে আমার কবিতার খাতা।
জমে থাকা কান্নার দাগ।
তোমার বেলকুনিতে আমার খুনসুটি।

হয়তো নিরবতার উৎসবে
আমার মন খারাপ নিথর হয়ে রবে পড়ে।
তোমার হাতের তর্জনীর ছোঁয়ায়
মিলবে না সুখ।

ফেরা হবে না
না বলা কথারা মনের দরজার কপাট ভেঙে বেরিয়ে পড়বে খুঁজতে তোমায়।
রাতের ঐ আধখানা চাঁদের দিকে তাকিয়ে একবার আমায় মনে করো।
দূর হতে দেখতে পাবে,
বড্ড নিঃসঙ্গ এই আমি তোমাকে ছাড়া।

মিথ্যে প্রণয়

কে সত্যিকারে পাশে ছিলো,
বা অভিনয়ে….
এক চিমটি দূরত্ব বুঝিয়ে দিলো তার মানে।
কে সত্যিকারে বেসেছিলোভালো
অথবা ছলনাতে….
এক মুঠো অভিমান বুঝিয়ে দিলো সবই।
কে চিনেছে আমায়
অথবা না চেনার অভিনয় ছিলো মুখ্য
জেনেছি সবটা তার মিথ্যে প্রণয়।
কে ধরেছিলো হাত,
ছেড়ে দেবার বাহানাতে
আলতো মায়ায় না জড়ালেই হতো।

 

একাকিত্বের চৌকাঠ

অদ্ভুত জীবনের সামান্যতম উপস্থাপন হলো বেঁচে থাকা।
অথচ এই বেঁচে থাকবার জন্য আমাদের কত অনুনয় মৃত্যুর কাছে…
হেরে যাওয়া জীবনের জীর্ণ ঘরে, কত রাত জেগে
পাহারায় থাকা ক্লান্ত মন,ধূসর বেদনায় আচ্ছাদিত হয়।
তবুও থেমে থাকে না কিছুই।
চলমান শীর্ণতায় দু’ ফোটা চোখের জলই হয় সঙ্গি।
তোমাতে আমাতে ব্যবধান বিস্তর।
নতুবা আকাশ সমান অভিমানের চৌকাঠ পেরিয়ে
জীবনের মানে খোঁজা বড্ড কঠিন….
তুমিহীন ‘আমি’ মানুষটা বড্ড বেশি মলিন,
একাকিত্বের চাদরে মোড়ানো আমার সকল দিন…..

সুখ কিনতে চাই

রোজ একটু একটু করে খুচরো পয়সার মতো শ্রম জমা করি।
তপ্ত রোদে পুড়ে পুড়ে,
গলে পড়ে শরীরের লোনা জল,
সে জলে ভিজে ওঠে পিচ ঢালা পথ।
সে পথে আমি রোজ শ্রম বপন করি।

সুখ কেনার সামর্থ নেই, তাই রোজ আমার পরিশ্রমটুকু জমিয়ে রাখি একদিন সুখ কিনবো বলে।

আচ্ছা সুখের কত দাম বলতে পারেন?
কতটা শ্রম পুঁজি রাখলে সুখ কেনা যাবে?
আমি একটু সুখ কিনতে চাই…….

কোথাও কেউ নেই

কিছু কিছু মন খারাপের কোন সংজ্ঞা হয় না।
দেয়া যায় না ব্যাখ্যা।
শুধু নিঃশ্বাস আটকে আসে।
দম বন্ধকরা অস্হিররতায় বুকের ভেতরটা ভেঙেচুরে যায়।

অন্তহীন ভাবনায়,অন্ধকারে হেলান দিয়ে বসি।
শূণতার চাদরে নিজেকে জড়িয়ে,
নিরবতার সাথে বলি কথা।
হাজার কথার পাহাড় জমা হয়।
প্রশ্নত্তরের ঝড় বয়ে যায় মনের মাঝে।

চারদিক তাকালে এক অদ্ভুত শূণ্যতা গ্রাস করে আমায়। সবাই কেবল বোঝাতেই আসে
কিন্তু, আমাকে বুঝতে চায় না কেউ।

সবাই কেবল নিজের ভালো মন্দ সুখ খুঁজে বেড়ায়।
জানতে চায়না, অমন করে মন খারাপ করে বসে আছো কেনো তুমি?
চোখের চারপাশে কালসিটে দাগ ফেলে কেনো অমন করে কেঁদেছো?

নিরন্তর ভাবনার রেশ কাটিয়ে পাশে বসে কেউ জিগ্গেস করেনি কি হয়েছে তোমার?
বড্ড করুনা হয় নিজেকে দেখে।

সংসারের মায়াজালে আবদ্ধ হয়ে
নিয়তিহীন নিয়মের পাটে পাটে,
সবার খেয়াল রাখতে গিয়ে,
নিজেকে আবিষ্কার করলাম অন্য রকম একম এক
” আমি” কে।

দেখলাম এই ‘ আমি’ বড্ড বেশি শূণ্য।
বড্ড বেশি একা……
চারপাশে মানুষের কোলাহলে নিজেকে সামলে রাখলাম
নিজের ভেতর।
দেখলাম……
সবার জন্য আমি থাকলেও,
আমার জন্য কেউ নেই…..
আমাকে আগলে রাখার জন্য,
আমি ছাড়া কেউ নেই……
আমাকে বোঝার মতো,
আমি ছাড়া কেউ নেই..
কেউ নেই……
কোথাও কেউ নেই।

 

তবুও মানুষ ভালোবাসে

তবুও মানুষ ভালোবাসে
কাউকে আপন করে পাবে না জেনেও।
অপেক্ষা করে…
কোন দিন ফিরে আসবেনা জেনেও।

তবুও……
গাঢ় নিঃশ্বাসের তোলপাড় করা বুকের ভেতরটায়,
ভাঙনের হাহাকার আছে জেনেও
মানুষ প্রেমে পড়ে….

কাজল কালো রাতে,
অন্ধকারে হেলান দিয়ে নিভৃতে
ঝরে যায় চোখের জল।
নিশ্চুপ দ্বীপের বাসিন্দা হয়ে,
জীবন যাপন করে একাকিত্বের সাথে।

তবুও মানুষ ভালোবাসে…
কাছে পাবার তীব্র আকাঙ্খা নিয়ে ভালোবাসে।

খামখেলিয়ালিপনা একাকিত্বের ঘরে,
শূণ্যতার ছাউনিতে বৃষ্টি হয়ে ঝরে
অভিমান।

নরম আদরের স্পর্শ পেতে
মানুষও জেগে থাকে আধখানা বিরহী মনের সাথে।

না পাবার ব্যকুলতার আড়ষ্টতায়
হৃদয়ের দু’কূল যায় ভেঙে।
তবুও মানুষ ভালোবাসে……
এক অসহ্য রকম কষ্টকে, আলিঙ্গন করার আশায়।

 

তুমি এসো

তবু এসো….
শেষ বৈশাখের তপ্ত দহনে পুড়ে,
মলিনতার ভাঁজ খুলে,
তবুও তুমি এসো এক পশলা বৃষ্টি হয়ে দখিনের বারান্দায়।

অযাচিত অভিমানকে দেবো বিক্রি করে আষাঢ়ের কান্নায়।
অহেতুক কথাদের দেবো ছুটি।
তবুও থাকবে নিছক খুঁনসুটি তোমাতে আমাতে।
তবুও তুমি এসো….

তুমি আমার কাছে দুপুর হয়ে এসো।
আমি শিতল পাটি বিছিয়ে দিবো।
আমার আধ ভেজা চুল, তুমি বাতাস হয়ে দিও খুলে।
আমি তোমার রোদে হেলান দিয়ে চুল শুকাতে চাই।

তুমি এসো….
ঘন কালো রাতের শহর ছেড়ে
নিয়ন আলোর মুগ্ধতাকে দিয়ে ছুটি।
হ্যারিকেনের মৃদু আলোয় আমি থাকবো পথ চেয়ে।

 

তৃষ্ণা

তোমার মুখোমুখি বসবো বলে,
কথারা আজ জড়ো হয়েছে হেমন্তের শেষে।
বিদায়ী বিকেল নিশ্চুপ হয়ে অপেক্ষা করছে জলপাইয়ের ডালে।
ঐ যে দেখো, কলসিঁটে পড়া আনমনা মেঘ কেমন মন খারাপ করে আছে আকাশের ডানায়।
তুমি কি জানো তার কষ্ট?
থাক না হয় ওসব কথা।
তোমার মুখোমুখি বসবো বলেই, ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপে উবেছে সন্ধ্যা।
সমস্ত ব্যস্ততা আমায় দিয়েছে ছুটি,
শব্দের পরে শব্দ গেঁথে, কথার ভাঁজে কথা সাজাই।
অনেক গল্প আছে তোমার সাথে বুঝলে।
আচ্ছা কোথায় তুমি বলতো?
ব্যস্ততাকে একপাশে সরিয়ে রেখে চলে এসো।
তোমার মুখোমুখি বসবো বলে ঢের অপেক্ষা আমার।
নিমগ্ন হয়ে আছে কথারা আজ।
আমার কিন্তু ভীষণ কথা বলার তৃষ্ণা পেয়েছে,
ভীষণ কথা বলার তৃষ্ণা…..

 

বৃষ্টি

একদিন তুমুল বৃষ্টি হোক
ভিজে যাক ধুলো জমে থাকা
গাছের শরীর।
ভিজে যাক পিচ ঢালা পথে চলতে থাকা রিকশাটি।
ঝুপঝাপ শব্দ হোক টং দোকানের টিনের চালে।

চলো চায়ের কাপে ঠোঁট ভেজাই।
কান পেতে শুনে চলি বৃষ্টির কলতান।
চলো শুনি ঝুমঝুম বৃষ্টির সাথে চূড়ির মিঠে স্বর,
নয়তো নূপুরের আহ্লাদ।
হাঁটবে?
চলো হাঁটি দু’জন
পিচঢালা পথে ভিজুক তোমার আমার পা…..

রীতা আক্তার। জন্ম:ফরিদপুর জেলায়, ১৯৮৩ সালে। স্কুল জীবনে দেয়াল পত্রিকার মাধ্যমে লেখালেখি শুরু। দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হচ্ছে। বিদেশি পত্রিকায়ও লেখা প্রকাশিত হচ্ছে নিয়মিত। রীতা আক্তারের প্রথম কাব্য গ্রন্হ ২০১৮ সালে “স্বপ্নের মাঝে স্বপ্ন”। ২০২০ সালে যৌথ কাব্য গ্রন্হ “চিরদিনের বর্ণমালা” প্রকাশিত হয়। ২০২০ সালে কোলকাতা থেকে যৌথ কাব্য গ্রন্হ “ডানা মেলুক ইচ্ছেরা” প্রকাশিত হয়। ২০২১ সালে প্রকাশিত হয় যৌথ কাব্যগ্রন্হ শতাব্দীর পংক্তিমালা। ২০২৩ সালে প্রকাশিত হয় একক কাব্যগ্রন্হ “নিমগ্ন ভেজা চোখ”। লেখালেখির স্বীকৃতিস্বরুপ বিভিন্ন সম্মাননা পেয়েছেন।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP