সংশয়
আমি এখন সংশয়বাদী,
মানুষ নিয়ে!
মতলববাজ শুধু মতলবপুর থেকে আসে না!
পাশের বাড়ি থেকেও আসে,
হতে পারে পাড়া-প্রতিবেশী
বন্ধু ও আত্মীয়ও বেশি!
হিমালয়ের বরফগলা জল আসে না নদীতে!
আসে বেশি ড্রেনের জল!
এলো কী-এক নগর সভ্যতা!
নকরামি হয়ে উঠে মানুষের মূল প্রবণতা!
জটিল গ্রন্থিতে চিত্তবিকার!
ইন্দ্রিয় হারায় বানানের ইকার!
কে যে মতলব থেকে কথা বলে?
কে যে মন থেকে কথা বলে?
কে যে ভয় থেকে কথা বলে?
কে যে লোভ থেকে কথা বলে?
বিস্ময় ও বিভ্রমে ভ্রমরও ভুল ফুলে গিয়ে বসে!
কে কাকে হেফাজত করে?
কে কাকে আগলে রাখে?
কে কার পৃষ্ঠপোষকÑতোষক বিছিয়ে রাখে কার জন্য?
সঙ্ঘের লোকেরা বলশালী হয়ে বল খেলে কার সাথে?
বাছবিচার
যত নিজেকে ছড়িয়ে দেবেন?
ততই আটকে যাবেন!
ঘূর্ণিপাকে পড়ে পাক খাবেন!
যত বেশিখানে রাখবেন পা!
‘না’ বলা ততটা কঠিন হয়ে পড়বে!
‘না’ বলতে না পারলে-
কত রকমের আঁকচাআঁকচি,
আঁকড়ে ধরবে!
কত রকমের অক্টোপাশ,
পাশ ফিরে নড়তে দেবে না!
হরিচন্দনের কাছে হরিজনেরা যেতে পারেননি!
হলকুম-ঘুম দিয়ে রেখে,
সরাইখানায় গিয়ে শুধু সংজ্ঞাপন!
সঙ্ঘে গিয়ে কী করো উদ্যাপন!
কার তাতে লাভ?
রশুন ভাজার গন্ধে মাতোয়ারা হয়ে
যে কোনো রসুইঘরে ঢুকে পড়বেন!
আপনার রুচি নেই ? বাছবিচার নেই?
নিজের জায়গায় নিজেকে রাখেন-
সম্পূর্ণ বিলিয়ে দিয়েন না যেখানে-সেখানে!
বিল্লিরা দিল্লি থেকে ঘুরে এসে খামচে ধরবে!
আপনি কতটুকু যুক্ত থাকবেন?
আপনি কতটুকু মুক্ত থাকবেন?
তা আপনার শক্তি ও বিবেচনাবোধ!
প্রতিবোধ তৈরি করতে কেন পারছেন না!
‘না’ বলা শিখুন-‘না’ এখন,
বেঁচে থাকা ও মর্যাদার জরুরি এক অস্ত্র!
গিঁঠে গিঁঠে আরও প্যাঁচ
গিঁঠ লাগানোর চেয়ে
গিঁঠ খোলাটা যখন জরুরি,
তখনও গিঁঠ লাগানোর লোক বেশি!
এ-তল্লাটে, এ-মহল্লায়, এ-সংঘে!
গিঁঠ খোলার লোক কমে যাচ্ছে বলে
তল্লাটের কী অবস্থা?
গিঁঠ খোলার লোক কমে যাচ্ছে বলে
মহল্লার কী অবস্থা?
গিঁঠ খোলার লোক কমে যাচ্ছে বলে
সংঘের কী অবস্থা?
গিঁঠ খোলার লোক কমতে কমতে
শূন্যের কোঠায় পৌঁছে যাবে?
ফাঁস লেগে যাচ্ছে গলায়
জটিলতা বাড়ছে কথা বলায়,
খটরমটর করে মটর চলাও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে!
খঞ্জরের দুইদিকে ধারÑÑকে যে কার কাটবে ঘাড়!
জলকেলিতে কতজন!
জলমগ্ন হয়েও ডুবে যাচ্ছে-কারো কেনো খেয়াল নেই!
উদ্ধারকারীরা উদ্ধার করার বদলে
আকাশচারী হয়ে উঠছে!
পদ্মরাগের মণি খুঁজতে গিয়ে লোভে
চামড়ার পোশাক পরা লোকেরাও-
সাপের ঠোকরে মরছে!
গিঁঠে গিঁঠে আরও প্যাঁচ লেগে যাচ্ছে!
চিঁহি চিঁহি ডাক
একটা শয়তান
এত পর্বে-এতটা শয়তানি করতে পারে?
পর্বগুলো খুলি-দেখি, আর আশ্চর্য হই!
একেকটি পর্বে এত দৃশ্য!
প্রত্যেকটা দৃশ্যে এত এত শয়তানি!
এত শয়তানির শক্তি কই থেকে পেল?
রাজনীতির নামে-
দলের উৎস থেকে শয়তানি পায়,
ক্ষমতার নামে-
রাষ্ট্রের উৎস থেকে শয়তানি পায়!
যার ফলে দাপটের মাত্রা-যাত্রা মঞ্চেও দেখা যায়!
নিরঙ্কুশ ক্ষমতার উৎস পেয়ে গেলে
কত রকমের উৎসব উদযাপন করতে থাকে!
উৎসবগুলো হয়ে ওঠে-উৎপাতের আধার!
গাধার নিরীহ চলাচলও বন্ধ হয়ে যায়!
শনির দশায়-শনিগ্রহ দেখা যায়!
রমণীরা কুয়াতলায় গিয়ে গোসল করতে পারে না!
কৃষকেরা পায়ে লাগা কাদা পরিষ্কার করতে পারে না!
ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনির বদলে-
তাদেরই চিঁহি চিঁহিঁ ডাক শোনা যায়!
শেফালি ফুল নিয়ে কোথায় দাঁড়াতে হয়-তা জানে না!
ফুল নিয়ে শূয়রের খোঁয়াড়ে ঢুকে যায়!
পেরিফেরি
ফেরিতে নদীটা পার হয়ে-
ও পেরিফেরিতে আমিও পা রেখেছি,
করিডোরও চিনি-দোর খোলা ক’টা ঘর ছিল?
আমারও জানা আছে!
কে বোঁচকাবুঁচকি নিয়ে কোন ঘরে উঠেছিল,
তা আমারও জানা আছে!
কার কক্ষে কে যেত-তাও জানা আছে!
মখমল বিছানায় কার সাথে কে শুয়েছে,
তাও জানা আছে!
সুর ওঠা ঐকতানে-ঝংকারে-অমাবস্যা রাতে
আশা ছিল-অন্ধকার দূর হবে,
ঝুলনপূর্ণিমা নেমে আসবে!
কত রকমের লোকজন জড়ো হয়েছিল-
আলো ছড়িয়ে দেওয়ার অভিলাষে
আলো প্রজ্জ¦লিত হওয়ার পর-
কেউ কেউ সেই আলো-নিজের প্যান্টের পকেটে নিয়ে
-ছুটতে থাকল!
কেউ কেউ গণ্ডগ্রাম থেকে এসে
নাগরা পরে-অভিজাত নাগরিক হয়ে গেল!
কেউ কেউ ধাতুর পাত মুড়ানোর পেরেক
ক্ষমতার চৌকাঠে এমনভাবে বসিয়েছে,
কেউ যেন তা খুলতে না পারে!
আলো দিয়ে আলো জ্বালানোর কথা বলে
নিজেরাই গ্রাস করল ঝুলনপূর্ণিমা!
এক্সিলেটরে গ্রাউন্ড ফ্লোরে
টেনে নামাচ্ছেন আমাদের!
ট্রেনে কিংবা ক্রেনে আমাদের জায়গা নেই!
-টেনেটুনে এই বেঁচে থাকা!
ভাগ্যবিধাতারা-বনে গিয়ে হবেন বনধিরাজ?
সাজ পরে পাখা নিয়ে শুধু উড়বেন!
খেয়াল করবেন না-প্রজারা প্রজাপতি হয়ে উড়তে পারছেন না!
যারা উড়ছিল-তারাও এখন একেক শিকারির হাতে,
একেক ধরনের লাঠির আগায় থাকা একেক আঠায়
-আটকে আটকে যাচ্ছে!
পাটাতন যারা রক্ষা করে-
পাটেশ্বরীর পাটিসাপটা তারা শুধু পায়!
নিমকি খেতে চাইলে কেউ কেউ নিমখুন হয়ে যায়!
নিমিঝিমি জ¦লে আমাদের ঘরে বাতি!
রাতারাতি নেমে যাচ্ছি এক্সিলেটরে গ্রাউন্ড ফ্লোরে!
পিপাভর্তি তেল
ক্ষমা করে দিও-
আমি তো ফোটাতে পারিনি নিজেকে!
শেষমেষ ঘানিগাছ হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছি-
শুধু শ্রম আর শরীরের লোমকূপ দিয়ে
নিঃসৃত হয়েছে জল!
শিকারের অপেক্ষায় থাকিনি কখনো-
আমার খুঁটিতে
জোয়ালটা বেঁধে চারদিকে
ঘানি ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে তেল নিষ্কাশন করে
কোনো এক তেলবাজ পিপাভর্তি করে
নিয়ে গেল তেল!
তরঙ্গিণী
তরঙ্গিণী! তার ভাষা তরজমা করি
যখন সে আন্দোলিত-প্রবাহিত হয়
ঊর্মিমুখরও হয়-হিল্লোলিত হয়
তখন সে একভাষায় কথা বলতে পারে না!
যখন আরও নিমগ্ন হয়
যখন আরও বিক্ষুব্ধ হয়
যখন আরও চঞ্চলা হয়
তখন সে একরূপে উচ্চকিত হতে পারে না!
মাটির ঘরের চারদিকে নির্মিত বারান্দা
জলের ধারায়-
খসে যেতে যেতে
ভিন ্নভিন্ন অঙ্গ ভিন্ন ভিন্ন ভাষা পায়
সেই ভাষারও শব্দবোধ-ভাষাবোধ থাকতে হয়
না হলে ডাকটিকেট লাগানো খামের চিঠিও
পৌঁছাবে না কোনো ঠিকানায়!
শরৎশশীর চন্দ্রলেখা
গুহাবাসী হয়ে-
গুহার ভেতর দেওয়ালে উৎকীর্ণ চিত্রশালা
শরতের দিনে দেখতে লাগে না ভালো।
কাশবন ডাকে
পেঁজামেঘ ডাকে
শৈশবের স্মৃতি নিয়ে যাই ফাঁকা মাঠে!
চিরন্তন প্রকৃতিও আগ্নেয়াস্ত্র থেকে-
ছোঁড়া গুলিতে আঘাতপ্রাপ্ত হওয়ার পরও এখনো
শরৎশশীর চন্দ্রলেখা নিয়ে লেখে
সৌন্দর্যের নাম!
সে অক্ষরে হই পরিব্যাপ্ত
যা দেখেছি চোখ ফোটা থেকে-
গিরিচূড়া
গিরিমল্লিকা ফুটছে গিরিমাটিতেও-
তারপর থেকে পরিপার্শ্ব বদলে যাচ্ছে!
বদলে ফেলার কত চেষ্টা
কতকাল ধরে মনে পড়ে?
ঘটিচোর থেকে বড় চোরের উপদ্রব
সইতে হয়েছে-
জল রাখা একমাত্র পিতলের কলসটাও হয়েছে চুরি
চুড়ি হারিয়েছো!
বহুদিন ঘষামাজা করে বহু কষ্টে-
শরীরের লোমকূপ থেকে নিঃসৃত জল
-শুকিয়ে শুকিয়ে
সরীসৃপজাতীয় প্রাণিকে সরিয়ে দিয়েছি!
এইবার গিরিমল্লিকা ফুটেছে-
গিরিচূড়া দেখবো।
গোলাম কিবরিয়া পিনু, মূলত কবি। প্রবন্ধ, ছড়া ও অন্যান্য লেখাও লিখে থাকেন। গবেষণামূলক কাজেও যুক্ত। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক সম্মান, স্নাতকোত্তর এবং পিএইচ.ডি. । জন্ম : ৩০ শে মার্চ ১৯৫৬।
ইতোমধ্যে তাঁর কবিতা-ছড়া-প্রবন্ধ ও গবেষণা মিলে ৩৪টি গ্রন্থ বের হয়েছে। তার কবিতা ইংরেজি, ফরাসি, ডাচ, হিন্দি ও অন্যান্য ভাষায় অনূদিত হয়ে বিভিন্ন দেশে প্রকাশিত হয়েছে। আমন্ত্রিত হয়ে দেশের বাইরে বিভিন্ন সাহিত্য সম্মেলনে অংশ নিয়েছেন।
বর্তমানে বাংলা একাডেমির জীবনসদস্য ও এশিয়াটিক সোসাইটি অফ বাংলাদেশ-এর সদস্য। জাতীয় কবিতা পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রগতি লেখক সংঘের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
দেশ ও দেশের বাইরের বিভিন্ন সংগঠন থেকে পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। পেশাগত প্রশিক্ষণ ও অন্যান্য প্রয়োজনে ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, আমেরিকা, বলিভিয়া, নেদারল্যান্ডসসহ কয়েকটি দেশ ভ্রমণ করেছেন।
পেশাগতভাবে আর্ন্তজাতিক মিডিয়া বিষয়ক সংস্থা ‘ফ্রি প্রেস আনলিমিটেড’, ‘এফপিএবি’, ‘বিসিসিপি’ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানেও যুক্ত ছিলেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে সাংবাদিকতা, কলামলেখা, সম্পাদনা ও এডভোকেসি বিষয়ক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত থেকেছেন।
তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে-এখন সাইরেন বাজানোর সময়, সূর্য পুড়ে গেল, আমরা জোংরাখোটা, সুধাসমুদ্র , ও বৃষ্টিধারা ও বারিপাত, ফসিলফুয়েল হয়ে জ্বলি , ইত্যাদি।
তাঁর প্রবন্ধ ও গবেষণাগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে- বাংলা কথাসাহিত্য : নির্বাচিত মুসলিম নারী লেখক ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, সমকালীন কবিতা ও বোধের দিগন্ত , উনিশ-বিশ শতকের নারী লেখক ও আত্মশক্তির বিকাশ, ইত্যাদি
ছড়ার বইয়ের মধ্যে রয়েছে– খাজনা দিলাম রক্তপাতে, ঝুমঝুমি, এক কান থেকে পাঁচকান, ইত্যাদি।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।