ঘুম পাখি
ঘুমপাখিটির জন্ম যখন ভোরে,
স্বপ্ন দেখা আলগোছে রোদ্দুরে।
শীর্ণ বাতাস ডাকলে—এসো ঢেউ,
শরীরখানা পাতলো এবার কেউ।
বসন্তেরই বসন, ফুল ফুটছে চুপ!
কবিই জানেন সাতসকালের রূপ।
ঘুমপাখিটির জন্ম যখন ভোরে,
শীতযাত্রার শেষ উঁকিটি দোরে।
ঘুমপাঠানো অল্প আলোর খেলা,
বেড়ে যাচ্ছে অমোঘ সকালবেলা।
ঘুম পাখিটির জন্ম যখন ভোরে,
নীরার আঁচল ভরছে সমুদ্দুরে।
শিখেছ সে ভোরপাখিটার দাম—
পথভোলা হোক তাহার জন্মনাম।
বিদায় মানে চলে যাওয়া নয়
পৃথিবী পুনর্বার জেগে উঠেছিলো সেইদিন, উদাসীন পাখিদের শীতসন্ধ্যায়। জীবন হয়েছিলো নৃত্যের মতো।
অনন্ত যৌবনের ছায়া নিয়ে সুরভিত হয়েছিলো তপস্যা!
বোধটুকু বিসর্জন দিতে দিতে আমরা ততক্ষণে নিটোল বনভূমি…
তুমি কি জানো বিদায় মানে কী? সুধুই চলে যাওয়া
বিদায়ের একটা মমতা আছে,
বিদায়ের কোন শব্দ নেই।
বিদায় মেঘের সাথে উড়ে ,
বিদায় একটা শীতের রোদ!
বিদায়ের যন্ত্রণা জানতে চেওনা
আমি জানি…
পারদ
অনুভূতির পারদ উঠুক,
উঠতে উঠতে যেন তার শব্দ পাহাড়কে ছুঁয়ে যায়!
হাতের মধ্যে পুষেছি যে আকাঙ্ক্ষা
তাকে আমি মমতায় ধারণ করতে করতে
এগিয়ে যেতে চাই মাটির দিকে—
সূর্যের দিকে মুখ করে আমি
মাটির বুকে ঢেলে দেব শ্ন্যাপস!
পাথরের নিচে ফোটাব ফুল,
সহস্র বছরের জমিয়ে রাখা
অশ্রু এবং ধৈর্য—
আমার হাতিয়ার।
এলিক্সির
এলিক্সিরের ইন্দ্রজাল
আমার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে,
যখন জানি—তোমার মন ভালো।
তোমার মাথার ওপর থেকে
কালো ছায়া সরে গেছে।
তুমি ভালো আছো জানলেই
গ্যালাক্সির সব ক’টা নক্ষত্র
অন্ধকারে ফুটে ওঠে!
তোমার খুব ভালো থাকা
আমার হৃদয় ও আত্মাকে
নতুন করে জাগিয়ে তোলে, মা।
শান্ত নই সংযত
তোমার বাহারি খাবারের মৌতাত প্রলোভন!
হাত গুটিয়ে রাখি—তবুও
অসম্ভব ক্ষুধাকে পাশে সরিয়ে।
দেখো, ঠিকঠাক দাঁড়াতে শিখে গেছি আমি,
যদিও তা অতিমাত্রায় ভূকম্পন।
পড়ে যাইনি—তারপরও।
বৃষ্টি-ভেজা শহরের সোঁদা গন্ধ
স্পর্শ করেনি আমায়।
আকাশের দিকে তাকানোর অভ্যাস
একদম বদলে ফেলেছি।
অপেক্ষাই অভ্যাসবশত অভ্যাস এখন।
এটাকে শান্ত হয়ে যাওয়া বলো না—
এ শুধু সংযম,
ভদ্রতার মোড়কে।
আত্মবিলয়
অবশেষে একদিন চুপ হতে শিখে নিতে হয়।
যাকে তোমরা পরিপক্কতা বলো,
আমি বলি—নিরবতা!
নিরব হতে হলে
নিজেকে দাফন করে দিতে হয়।
মেয়েটি শিখে গেছে—
হৃদয়ের দাম দিতে হবে।
ভালোবেসে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে
পরীক্ষায় প্রথম হতে হবে রোজ!
অভিযোগ ভুলে
accept করে নেওয়াই তো সহজ!
একদিন—
সে মেনে নেয়, খাপ খাইয়ে নেয়।
তোমার ‘হ্যাঁ’-তে হ্যাঁ
আর ‘না’-তে না মেলাতে গিয়ে
হারিয়ে ফেলে নিজেকে,
হয় নিখোঁজ!
আজন্ম
প্রতিটি ঋতুরই একটা বসন্ত থাকে।
এখন চলছে শীতের বসন্ত!
সমগ্র শীতকাল যেন
জেগে উঠেছে কম্বলে,
মেঘে, বাতাসে
আর ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে।
গাড়ির জানালায় জমে উঠেছে
বিন্দু-বিন্দু বিষণ্নতা।
ঝাপসা চোখে
দেখতে পেলাম—তুমি!
গলায় জড়ানো মেরুন মাফলার।
একটা পুরো শীতকাল
যেন জড়িয়ে রেখেছে তোমায়।
বিহু উৎসবে—
যেন সবচেয়ে উষ্ণতম আদরটি
অপেক্ষা করছে তোমার জন্য।
একটা আজন্ম উইন্টারই জানে,
গ্রীষ্মের কী মর্ম!
পালক
বুকের ভেতর জমিয়ে রাখি পাঁপড়ি রোজ।
মনের মধ্য সন্ধ্যা নামে—পাইনা যখন খোঁজ!
দু-হাত দিয়ে আগলে রাখি
ময়না পাখির মুখ।
এই তো ভরাট, এই তো খালি—
শক্ত করি বুক।
দূর পাহাড়ে, দূরের দেশে
উঠছে যখন তারা।
দু-এক খানা স্মৃতির পালক
করে দিশেহারা!
ময়ূর পালক
সিংহাসনে এমন আসীন রাখি।
দূরত্বটা দূরত্ব নয়,
মনে-মনে, ফোনে-ফোনে থাকি…!
তোমার ভ্রুতে অন্ধকার
অরুণাভ, এত ত্রস্ত ব্যস্ততা নিয়ে জীবন পার করে দিলে!
ভ্রু-কোচকানো মুখ—যেন কোনো বাস কন্ডাক্টর,
খুচরো পয়সা খুঁজতে খুঁজতে হয়রান।
তোমাকে বারবার ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে
বলতে পারি না—আমার দিকে তাকানোর সময় কোথায় তোমার?
তোমার ঠোঁটের অর্থহীন হাসি আমাকে
হেনস্থা করেছে; যে-দিন সে-ই দিনই
আমি নিজেকে শুধরে নিয়েছি।
তোমার প্রেমে আমি হেমলক অথবা আফিম পান করা থেকে
বিরত রেখেছি নিজেকে।
সবুজ বীচের মধ্যে নিজের ডানা মেলে দিয়েছি,
ঈর্ষাকে মেনেছি সুখ—
সন্ধ্যেবেলার স্বর আর রঙের মতো
রহস্যময়ী হয়ে উঠেছি।
আর তুমি কোচকানো ভ্রুতে
ক্রমে ক্রমে বিস্তৃত করেছো
নিজস্ব অন্ধকার!
হয়তো ভেবেছিলে—
বাগানের সমস্ত গোলাপ হবে তোমার,
পদ্মবিল যাবে পেরিয়ে।
অহংকার নিস্ফল হয় কখন জানো?
যখন কেউ কেবল জৈবিক আনন্দ আহরণে মেতে থাকে।
সমর্পণের চাঁদ
অষ্টাদশীর অলৌকিক হাসি,
আর হেঁটে যাওয়ার নিপুণ ভঙ্গির চাল!
তার চুল- বাতাসের সামান্য ফুৎকারে
উড়ে যাওয়া যুবক—
তোমাকে ভালোবেসে আজন্ম পাপ করেছিল সে।
উৎসুক মন, আহ্লাদি ঘৃণা নিয়ে তোমার কাছে
পৌঁছেছিল যে জমকালো আগুন,
তা তুমিই নিভিয়ে দিয়েছিলে নিজেই!
সমর্পণের চাঁদ ভরে গিয়েছিল নোনতা জোছনায়।
সত্যি বলছি— এমন সর্বনাশা চাঁদ,
বেপরোয়া বাতাস, বিপজ্জনক খেলা
তার জীবনে কোনোদিন আসেনি।
কোনোদিন তার অহংকারে আসেনি এমন নিঃশব্দ—
সামান্য ফুৎকারে উড়িয়ে দিতে যেয়ে
এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেছে সে…

রেবেকা রহমান। জন্ম রাজশাহী শহরে। তাঁর বাবা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. লুতফর রহমান এবং মা সেন্ট্রাল লাইব্রেরির সেকশন অফিসার ছিলেন। শৈশব ও বেড়ে ওঠা রাজশাহীতে। লেখাপড়া রাজশাহী প্রমথনাথ বালিকা বিদ্যালয়, সরকারি রাজশাহী কলেজ এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। স্বল্প সময় রাজশাহী, পাবনা ও ঢাকার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন।
ছেলেবেলা থেকেই লেখালেখির সঙ্গে যুক্ত। কবিতা ও গল্প লিখছেন নিয়মিত। অমর একুশে বইমেলায় তাঁর একক ও যৌথ কবিতার বই একাধিক প্রকাশিত হয়েছে। জাতীয় দৈনিক পত্রিকায়ও নিয়মিত তাঁর লেখা প্রকাশিত হচ্ছে। সাহিত্যপত্র সমধারা-র সঙ্গে তিনি প্রথম বছর থেকেই যুক্ত এবং লেখালেখির জন্য পেয়েছেন কিছু সম্মাননা। বর্তমানে তিনি স্বামী ও দুই কন্যাসহ ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।