সকল মেনু

তারেক রহমানের ঘোষণা: দুর্নীতি নির্মূল, আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

বিএনপি ক্ষমতায় গেলে দেশে দুর্নীতি নির্মূল, আইনের শাসন ও জবাবদিহিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান।

শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের বলরুমে বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার তুলে ধরে তিনি এই প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন।

তারেক রহমান বলেন, আপনাদের সামনে আমি যত প্ল্যান-প্রোগ্রাম-কর্মসূচি পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছি, তার কোনো কিছুই করা সম্ভব হবে না, যদি না আমরা তিনটি বিষয়ের ওপরে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিই। তিনটি বিষয় হলো—দুর্নীতি, আইনের শাসন এবং জবাবদিহি। যারাই সরকার গঠন করবেন, তারা যদি এই তিনটির ব্যাপারে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করেন, তাহলে আমরা আমাদের কোনো পরিকল্পনাকে সফল করে গড়ে তুলতে পারব না। বিএনপির পক্ষে আমি আপনাদের এতটুকু বলতে চাই, আমার দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনে জয়ী হয়ে ইনশাআল্লাহ সরকার গঠনে সক্ষম হলে আমাদের সর্বাধিকার-সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকবে এই তিনটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করা। দুর্নীতি নির্মূল, আইনের শাসন এবং জবাবদিহি—যে কোনো মূল্যে আমরা এটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেব।

ইশতেহারের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, আমরা যখন প্রথম দেশের মানুষের সামনে ৩১ দফা, ২০২৩ সালে ২৭ দফা উপস্থাপন করেছিলাম, তখন ৩১ দফা বা জুলাই সনদের বিষয়টি ছিল না। যেহেতু এটি আমাদের জাতির জন্য সবকিছু মিলে একটি অত্যন্ত জরুরি বিষয়, সেজন্য এটিকে আমরা সামনে নিয়ে এসেছি। কাজেই আমাদের জাতি গঠন এবং গণতন্ত্রের ভিত্তিকে যদি শক্তিশালী করতে হয়, আমরা বিশ্বাস করি, ৩১ দফা এবং জুলাই সনদকে অবশ্যই আমরা বাস্তবায়ন করব। কারণ, জুলাই সনদের যে প্রধান বিষয়গুলো আছে, সেগুলোর সঙ্গে আমাদের ৩১ দফার অনেক কিছুর মিল আছে, যা আমরা অনেক আগেই জাতির সামনে উপস্থাপন করেছিলাম।

তিনি বলেন, আমরা যদি বাংলাদেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, যারা দেশের গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বে বিশ্বাস করে; এ রকম জ্ঞানসম্পন্ন যে কোনো মানুষের সঙ্গে কথা বলি, তারা একবাক্যে বলবে যে, অবশ্যই আমরা ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি চাই না। যেহেতু আমরা ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি চাই না এবং দল-মত নির্বিশেষে প্রত্যেকটি মানুষ এ কথা বলবে, সেজন্যই আমরা এটিকে গুরুত্বারোপ করেছি এবং এই ফ্যাসিবাদের পুনরাবৃত্তি যদি না চাই, অবশ্যই আমাদের ডেমোক্রেটিক প্রসেস বা গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে।

বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আমরা জনগণের শাসন, জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলি। ব্যক্তিগতভাবে একজন রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে আমি মনে করি ও বিশ্বাস করি যে, জনগণের শাসন যদি আমাদের প্রতিষ্ঠিত করতে হয়, আমরা যদি আসলেই জনগণের ভাগ্যের পরিবর্তন করতে চাই, তবে একটি বিষয় আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, সেটা হচ্ছে জবাবদিহি বা অ্যাকাউন্টেবিলিটি। আমাদের সমাজের প্রতিটি স্তরে, রাষ্ট্র পরিচালনার প্রতিটি স্তরে, সরকার পরিচালনার প্রতিটি স্তরে ধীরে ধীরে আমাদের জবাবদিহি প্রতিষ্ঠিত করতে হবে।

তারেক রহমান বলেন, যেহেতু আমাদের দেশের অধিকাংশ মানুষ মুসলমান; শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পান, সংবিধানে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম এবং সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস—এ কথাটি সংযোজন করেছিলেন। দুর্ভাগ্যবশত আমরা দেখেছি, স্বৈরাচারের সময় সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস—এ কথাটিকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ইনশাআল্লাহ ১২ তারিখে নির্বাচনে বাংলাদেশের জনগণের সমর্থনে বিএনপি সরকার গঠনে সক্ষম হলে আমরা সংবিধানে সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস—রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে সংবিধানে পুনঃস্থাপন করতে চাই।

সংবিধান সংস্কার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা ৩১ দফার মাধ্যমে একটি প্রস্তাব জাতির সামনে অনেক আগেই দিয়েছিলাম। সেই প্রস্তাবটি হচ্ছে যে, এক ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রী হবেন, তার দুই মেয়াদ কিংবা ১০ বছরের বেশি হবেন না। পরবর্তী সময়ে সরকার গঠিত রিফর্ম কমিশনে অন্য অনেক দল এটা আলোচনা করেছে। কিন্তু এই কথাটি সর্বপ্রথম বিএনপি বলেছিল, এটি ডকুমেন্টেড। কাজেই এটির ক্রেডিটও আমরা অবশ্যই গ্রহণ করতে চাই। আমরা ইনশাআল্লাহ সরকার গঠনে সক্ষম হলে অবশ্যই দেশের আইনের মধ্যে এই বিষয়টি প্রবর্তন করব যে, একজন ব্যক্তির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সর্বোচ্চ ১০ বছর তার কার্যকাল থাকবে।

জাতির সামনে ৩১ দফা উপস্থাপনের বিষয়টি তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, সে সময় অন্য আর কোনো দল বলার আগেই আমরা বলেছিলাম যে, আমরা দেশের সংসদে উচ্চকক্ষ প্রবর্তন করতে চাই। আমরা চাই, শুধু রাজনীতিবিদ নয়, রাজনীতিবিদের বাইরেও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার যেসব ব্যক্তি আছেন, যারা কন্ট্রিবিউট করতে পারেন, সবার মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে আমরা ধীরে ধীরে দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নিতে চাই, পুনর্গঠন করতে চাই। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য আনার কথাও নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছে সুস্পষ্টভাবেই।

দলের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, আগামী ১২ তারিখের নির্বাচনে আমরা বাংলাদেশের মানুষের সমর্থনে ইনশাআল্লাহ সরকার গঠনে সক্ষম হলে অবশ্যই আমাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য থাকবে যে কোনো মূল্যে সুশাসন নিশ্চিত করা। আমাদের অন্যতম লক্ষ্য ন্যায়পাল নিয়োগ করা। যার মাধ্যমে আমরা আমাদের সুশাসনকে নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একধাপ এগিয়ে যাব। এ ছাড়া গণঅভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের কল্যাণার্থে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আলাদা বিভাগ প্রতিষ্ঠা, শহীদদের নামে সরকারি স্থাপনার নামকরণ, শহীদ ও আহতদের পরিবারকে সহায়তা প্রদানের করার কথাও বলেন তিনি।

তারেক রহমান আরও বলেন, বিগত সরকারের সময় ১৬ বছর ধরে বিএনপির নেতাকর্মী-সমর্থকসহ বহু মানুষ গুম-খুন-অত্যাচারের শিকার হয়েছে, নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তবে অবশ্যই আমরা চাই না যে বিভীষিকার ভেতর দিয়ে বিএনপি গেছে, সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি বাংলাদেশে হোক। কারণ, এই ঘটনার যদি পুনরাবৃত্তি হয়, তাহলে কোনোভাবেই শান্তি প্রতিষ্ঠিত করা সম্ভব না। আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, আমাদের নেতাকর্মীরা পঙ্গুত্ব বরণ করেছে, সহায়-সম্পত্তি হারিয়েছে। কিন্তু প্রতিশোধ কখনো শান্তি এনে দিতে পারে না, প্রতিশোধ কখনোই ভালো কিছু এনে দিতে পারে না। সেজন্যই আমরা মনে করি, যত দ্রুত সম্ভব সর্বস্তরে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত করার মধ্য দিয়েই একমাত্র এই দেশ এবং জাতিকে রক্ষা করা যেতে পারে।

দেশ ও জনগণের স্বার্থ অক্ষুণ্ন রেখে বিএনপি তার পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত করবে বলে জানান দলটির চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, খুব সংক্ষেপে যদি বলি, আমাদের ফরেন পলিসিটা এমন হবে অর্থাৎ আমার দেশের মানুষের সমস্যার সমাধান করে, আমার দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রেখেই আমাদের সঙ্গে যাদের যাদের বন্ধুত্ব করা সম্ভব, অবশ্যই আমরা তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করব।

বিএনপি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন করতে চায় জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, আমাদের নিজের দেশের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। এই জনসংখ্যার কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা, খাদ্যের সংস্থান, চিকিৎসার ব্যবস্থা সব কিছু করতে হবে। আমাদের এখানে প্রায় ১ দশমিক ২ মিলিয়নের মতো রোহিঙ্গা আছে। তারাও মানুষ, মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা এখানে তাদের আশ্রয় দিয়েছি। অবশ্যই আমরা তাদের দেখব। এট দ্য সেম টাইম আমরা চাইব যে, তাদের এলাকায় তাদের ঘরে তাদের জন্য সেফ একটা সিচুয়েশন তৈরি হোক এবং ধীরে ধীরে তারা তাদের এলাকায় ফিরে যাক। অর্থাৎ আমরা রোহিঙ্গার সেইফ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে চাই।

প্রতিবেশীদের সঙ্গে নদনদীর পানি সমস্যার সমাধান চান জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, যাতে আমার দেশের মানুষ তার পানির ন্যায্য হিস্যা পেতে পারে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP