বন্দি সময়ের উপাখ্যান
তারা স্বর্গে দাঁড়িয়ে জনতার দিকে ছুড়ে- বেঁচে থাকার মন্ত্র
জনতার ঢল তাই শোনে- শিখে নেয় পরতন্ত্র
মিছিলের পকেটে মৃত্যু নিয়ে করে উল্লাস
তারপর কবরেতে গিয়ে শেষ হয় বিশ্বাস!
স্বর্গের মানুষ আজীবন আয়েশে কাটায়
দীর্ঘ জীবন মন্ত্রেতন্ত্রে এভাবেই লোক ঠকায়।
বাংলা ভাষা
বাংলা ভাষা রক্তে মাখা শহিদ আর সাহসী প্রাণ
বাংলা ভাষা আমার ভাইয়ের অকাতরে জীবন দান
বাংলা ভাষা তুমুল ঝড়ে মাঝ নদীতে বহতা তরি
বাংলা ভাষা বাংলাদেশের জন্ম দেওয়া পোয়াতি নারী
বাংলা ভাষা হিমের বুকে আগুন ঢালা ধোঁয়া ওড়া
বাংলা ভাষা চোখের কোণে ক্ষিপ্ত এক তেজস্বী ঘোড়া
বাংলা ভাষা আমার মায়ের হারানো ধন ছেলের প্রাণ
বাংলা ভাষা পূর্ণতা পেল সে যে বায়ান্নের সন্তান
বাংলা ভাষা অভয়টাকে সঙ্গী করে লড়ে যায়
বাংলা ভাষা বিশ্ব যাহার ইতিহাসে প্রাণিত হয়
বাংলা ভাষা দেশের জন্য লড়াকু এক প্রেমিক অভিধা
বাংলা ভাষা উপবাসের পরে খাওয়া অমৃত সুধা
বাংলা ভাষা শান দেয়া মস্তিষ্ক এক তীক্ষ্ণ ছুরি
বাংলা ভাষা খাঁচার দুয়ার দাও ভেঙে ইচ্ছে ঘুড়ি
বাংলা ভাষা ইতিহাসের মহান দাতা হাতেম তাই
বাংলা ভাষা জয়ের বুকে লেপ্টে থাকা দুঃখ বাঁশি
সৌহার্দ্যের চারা
হে উদীয়মান নক্ষত্রেরা!
আমি কোনো দলের স্বপক্ষে নই
আবার বিপক্ষেও নই
আমি শুধু সত্য বলতে এসেছি
এসেছি গণতন্ত্রের কথা বলতে
এসেছি সৌহার্দ্যের চারা বপন করতে।
আমি একটি সমৃদ্ধ বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখছি!
হে অতীত! হে সৌহার্দ্য আমার!
সমবেত কণ্ঠের সংগীত ডুবে গেছে-
একক সংগীতে সন্ধ্যা ছেয়ে গেছে
আদি জননী কেঁদে চলেছে অবিশ্রান্ত নিচু গলায়…
আমি এসব দেখতে অভ্যস্ত নই!
হে জীবিত সময়! হাওয়ায় এখন মৃত্যুফুল!
মৃত্যুফল লাভ করার আগেই তুমি পতিত হও!
অতীতের সাযুজ্য ঘটাও।
আমি কোনো নক্ষত্রের পতন দেখতে আসি নি
এই রাজ্যে আমি একা-নিঃসঙ্গ থাকতে আসি নি
এসেছি সম্প্রীতি আর ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে সকলকে আবদ্ধ করতে
এসেছি হৃদয় চক্ষু খুলে দিতে।
আজ তোমাদের চোখ নয় হৃদয় অন্ধ হয়ে আছে
হে অন্ধ হৃদয়,- চোখ মেলে দেখো সোনালি অতীত!
আগুন মানুষের নিজের শরীর
আমরা ড্রামের ভেতর লোভের
আগুনের চারা রোপণ করি।
আগুন মানুষের নিজের শরীর
বেরিয়ে পড়েছে ভ্রমণে…
আমরা প্রতিদিন আগুনের মধ্য দিয়ে
আগুন হয়ে হাঁটি আর ভস্মীভূত হই।
যখন আমরা অন্ধের মতো আগুন বহন করছি
যখন আমরা বোবার মতো আগুন দেখে চুপ থাকি
তখন আগুন আমাদের একমাত্র সহচর।
আমাদের আধুনিক অব্যবস্থাপনা আমাদের কাছে অগ্নিকুণ্ড হয়ে ফিরে আসে।
আমরা যতই আধুনিক হচ্ছি, হচ্ছি বেপরোয়া
আমরা ব্যবহার করি আধুনিকতা,
তার ফল ভোগ করি আগুন আহারের মধ্য দিয়ে।
আমরা পরিত্রাণের উপায় খুঁজি না
মীমাংসা করার জন্য কিছুই রাখি না
আমরা ভোগবাদী, আমাদের লালসা ছাড়া
দ্বিতীয় কোনো ইচ্ছে নেই।
আমাদের আমরা ভালোবাসতে ভুলে গেছি
যেদিন থেকে আমরা আধুনিক হতে শুরু করেছি।
শূন্যতার স্বর
নীল আকাশে আজ জেগে ওঠে শূন্যতার স্বর
হেমন্ত যেন চুপিচুপি বলে
সব শেষে নীরবতাই সত্যি
রঙেরা শুধু ক্ষণিকের অতিথি
মাঠের উপর সোনালি ধান
আলোয় ঝলকে ওঠে যেমন শেষ হাসি।
পরিশ্রমের গোপন ব্যথা
তৃপ্তির ঢেউ তোলে
যেন অনন্ত বিদায়ের গান বাজে
পাতার রঙ বদলের ভেতর
আমি দেখি সময়ের ক্ষয় চিহ্ন
যা আজ ঝরে পরে মাটির কোলে
কাল তা হবে নবজন্মের বীজ
হেমন্ত জানে, ক্ষয় মানেই শেষ নয়
ক্ষয় মানেই পরিণতির দুয়ার
শুষ্ক হাওয়ার প্রতিটি স্পর্শ
আমার আত্মায় রেখে যায় প্রশ্ন :
আমি কি সত্যিই বদলাতে পেরেছি
ঋতুর মতোই ধীরে ধীরে?
নাকি আমি এখনও অচেনার ভয়ে
ধরে আছি পুরনো পাতার রঙ
হেমন্তের রাতে দুরাকার অন্ধকারে
যখন ওঠে হালকা কুয়াশা
তখন মনে হয়
প্রকৃতি, নিজের হৃদয়ের গভীরতম কথা।

আইরিন সুলতানা লিমা। জন্ম: ৪ এপ্রিল ১৯৯৩ সালে চাঁদপুর সদর উপজেলার তরপুরচন্ডী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। গোলাম মোহাম্মদ জমাদার ও নিলুফা বেগমের জ্যেষ্ঠ কন্যা তিনি। পেশায় একজন শিক্ষক। দীর্ঘদিন ধরে লিখছেন স্থানীয় এবং জাতীয় দৈনিক পত্রপত্রিকায়। তার ‘ভুল প্রণয়ের গন্ধ’ কাব্যগ্রন্থটি দেশের স্বনামধন্য প্রকাশনা সংস্থা অনুপ্রাণন প্রকাশন আয়োজিত পাণ্ডুলিপি প্রতিযোগিতায় অন্যতম সেরা পাণ্ডুলিপি হিসেবে নির্বাচিত হয়। বর্তমানে তিনি চর্যাপদ সাহিত্য অ্যাকাডেমির নির্বাহী পরিচালক এবং প্যাপিরাস পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।