সকল মেনু

শাহনাজ পারভীন মিতা’র ১০ কবিতা

সময়কে বাঁধি কাব্য কবিতায়

নিশ্চুপ কখনো সময়
ঘড়ির কাঁটা থমকে দাঁড়ায়,
সেই বেলায় অক্লান্ত আমি
কখনো মুখ থুবরে পথ হারাই।
সময়কে খুঁজে ফিরি সময়ের ভাজে ভাজে
চেনা আলমারির অচেনা দেরাজে,
যে সময় কখনো আমার
কখনো বা আমার নয় ।

তবুও আঁকড়ে ধরি সময়কে
জীবন পরিক্রমায়,
কখনো সময়ের বলিরেখা
চোখ কুঁচকে তাকায়!
বলে আমায় থেমে যাও
ডিঙাতে যেয়ো না সময়কে
সময়ের স্রোতে গা ভাসাও।

আমি ডিঙিয়ে যাই সময়কে
কাল মনে রাখি না,
বর্ণে গন্ধে তারার ফুল
তুষারের বুকে রং বেরঙে
সময় আমাকে থামাতে পারে না
সময়ের শক্ত আবরণে।

কাব্য কবিতায় সময়কে বাঁধি
ছন্দে শব্দে জলে নিস্তরঙ্গ আঁখি,
আমি সময় বিচ্ছিন্ন এক মহাকাল
রাত্রি গভীরে নিয়ে আসি সূর্য সকাল।

 

মনের ভেতর মন

মনের ভেতর মন
কে রাখতে পারে দুঃখ বেদন!
কে পারে বইতে মনের ভার
আপনার আপনায় খুলে দ্বার!

কে রাখে এ হাতে হাত
আমি আছি বলে বারবার,
কে এই চোখে স্বপ্ন আঁকে
অশ্রু কাজলে মিশে একাকার ।

কে ভেজায় ধুলোমাখা পথ
গভীর নিশ্বাসে বুকের ভেতর,
পথের বাঁকে দিগন্ত -রেখায়
মিলেমিশে কে হয় আপনায় ।

হয়তো সে স্বপনেই বাঁচে
ধরণীর বুকে সকাল সাঝে ।

 

পুরানো অসুখ

জীবনের সবকিছুই চুরি হয়
হাসি আনন্দ বেঁচে থাকার সর্বসুখ,
তবুও জীবন বয়ে চলে জীবনের নিয়মে
শুধু থেকে যায় কিছু পুরানো অসুখ ।

যে পীড়ন করে সুঁই হয়ে ফোটে
সময়ে রক্তগোলাপ প্রেমে হেসে ওঠে,
কত কথা ব্যথা হয়ে বাঁচে
প্রিয় মুখ হীরে কাটা কাঁচে ।

পথের ধারে অসংখ্য বেগুনি বুনোফুল
চোখ জুড়ায় ,মন কেবলই ব্যাকুল,
ঝর্ণার জল নদীর ধারায় চলে
সেখানে জমা হয় কষ্ট,চুপিচুপি কথা বলে ।

লালা খালের পান্না সবুজ রঙের জল
মনের গভীরে মন ,নিভৃতে অশ্রুজল

 

জীবন-মৃত্যু

পৌষের কুয়াশাচ্ছন্ন ভোর
সবুজ ঘাসের বুকে শিশির,
মৃত্যু এক হিমশীতল অনুভব
বয়ে চলা সময়ের পরাভব।

সংগ্রাম লড়াই জন্ম থেকে মৃত্যু
দীর্ঘ পথ উচু -নীচু অ‍্যমৃত্যু,
থেমে যায় সময় নিস্তব্ধ নদীতীর
উড়ে যায় পাখি ,শূন্যতা খাঁচাটির।

পৃথিবীর বুকে গন্ধপুষ্প ভরপুর
কাঁটার আঘাত গভীর পদ্ম -পুকুর,
কত ছরি মনের ক্যানভাসে আঁকা
কোথা যায় সুবাস, নেই জানা সময় ফাঁকা।

মাটিতেই গড়া মাটিতেই নিঃশেষ
একটা জীবন বেঁচে থাকে স্বপ্ন অশেষ।

 

পাগল মন

রঙমহলে জীবনের
রংবেরংয়ের মানুষ ,
কেউ হাসে কেউ কাঁদে
কেউ বা উড়ায় ফানুস।

কেউ আঁকে জলছবি
অশ্রু দিয়ে ক্যানভাসে,
কেউ হাসে অট্টহাসি
কার তাতে কি যায় আসে ।

কেউ জাগে নিশী রাত
দূর আকাশে ধ্রুবতারা,
বাউলের সুর পাগল করে
ঘরের মানুষ ঘর ছাড়া ।

লালন তোমার খোঁজে ছেঁউরিয়া
পাগল মন ব্যাকুল বাঁশুরিয়া ।

 

অপেক্ষা ঝরা পাতার মতো

ইচ্ছে করেই তুমি
অপেক্ষায় রাখো আমায়,
যেমন অপেক্ষা হেমন্তের ঝরা পাতার
রংবেরংয়ে উড়ে যায়
নদীজলে ভেসে ভেসে
হলুদ বসন্তে ফিরবার ।

তেমনই আমি সারাদিনমান
পলপল সময়ের বিস্মৃত প্রহরে
শুধু তোমাকেই খু্ঁজি!

নদীজলে ভাসাই অশ্রুজল
ঝরা পাতা যেন আমাকেই বোঝে ।

 

শিশিরে পা রাখছিনা আর

বেঁচে আছি সেই তো ঢের বেশী
গন্তব্য নেই কাছাকাছি,
নেই নদীজল সমুদ্র পাহাড়
ভোরের শিশিরে পা রাখছি না আর ।

শুনছি না কাকেদের কানাকানি
সকালের সোনা রোদের হাতছানি,
বলছে না কেউ উঠে বসো
চায়ের কাপে ঠোঁট রেখে হাসো ।

আসছে পৌষের হিমশীতল সকাল
সবুজ মাঠে হলুদ সরিষার দোল,
হয়তো দেখবো না চোখ মেলে
পাশে শুধু তুমি নেই বলে ।

একটা জীবন একাকী বেঁচে থাকা
নীল আকাশে সন্ধ্যার সূর্য আঁকা ।

 

মনের গভীরে মন

রবীন্দ্রনাথ চিনতে শেখায় আপনারে
রূপ-নারানের কূলে সদাই ভাবনারে,
সেখানে হাসি কান্না মিশে অজানায়
নিজেকেই ফিরে পাওয়া আপন সাধনায় ।

সেই সাধনায় মন সীমার মাঝে অসীমে
উড়ে যায় পাখি ,সন্ধ্যা ঘনায় সসীমে,
জলের শব্দ শুধু জলেই ডুবে মরে
প্রাণ তৃষ্ণায় ছটফট ,জল নাহি অন্তরে ।

কে তুমি বর্ষা আনো চোখের তারায়
মনের গহনে আগুন জ্বালো মায়ায়,
বন্ধ কপাট খুলে উড়ে যায় কষ্টগুলো
জেগে ওঠে সময়ে হারানো স্বপ্নগুলো।

রবীন্দ্রনাথ জাগায় মনের গভীরে মন
স্বার্থের পরিক্রমায় নিঃস্বার্থের বৃন্দাবন।

 

উত্তর গোলার্ধের দীর্ঘতম রাত

উত্তর গোলার্ধের দীর্ঘতম রাত আজ
কবি ভালোবাসে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘরাত,
রজনীগন্ধা শিউলির সুবাস মাখে সে
কলমে জড়ায় নিস্তব্ধতার নিগুঢ় আওয়াজ ।

চারিদিকে আঁধারের ঘনঘটা
তিমির রাত্রিতে জড়ায় চাঁদের আলো,
নদীজলে জোছনার রূপালী মায়া
আলোছায়ার গহনে কবি খোঁজে কার ছায়া!

কত দুঃখের প্রদীপ জ্বালায় সুখের সন্ধানে
জ্বলে জ্বলে দ্রুত ভোর হয় ,কেউ নাহি জানে,
তাইতো কবি খোঁজে দীর্ঘ রাত্রি
যেখানে মিলবে ওমর খৈয়ামের -রূবায়েত ,পথযাত্রী ।

“চেয়ে দেখো কবে কোন নিশাপুরে
ইরানের মানমন্দিরে
কাব্যকথা লিখতেন -রূবায়েত ,ওমর খৈয়াম
চাইতেন একটি কবিতা খাতা
মধুরা প্রেয়সী,
উন্মুক্ত উদ্যানের নিকুঞ্জ ছায়ায়,
একখন্ড রুটি আর মধুর মদিরা । ”

এইতো কবির স্বর্গ
এইখানে সে খুঁজে পায় আলোক,
দীর্ঘ থেকে দীর্ঘ রাত্রি পর
স্বার্থান্ধ জীবনের আঁধারের পাড় ।

 

সময়ের নির্যাস

কি দেখার কথা কি দেখছি
সময় হারাবে বলেই কী পথ হাটছি,
যে জীবন মিথ্যার আবরণে ঢাকা
সেখানেই এখন সত্য তিলক আঁকা ।

সত্য মিথ্যার লড়াই ,নিশ্চুপ যুধিষ্ঠির
ভাঙছে দালানকোঠা অসময় সৃষ্টির,
সবুজের বুকে রক্তাক্ত ধূসর চোখ
চলছে সময় নিভৃতে মনের অসুখ ।

ধর্ম বর্ণে মিশে থাক দেশ আমার
নয় বিভেদ বিসর্জন ,সময়টা সাধনের,
পাথরের নীচে ধূসর সবুজ ঘাস
সেখানেও ফোটে ফুল ,সময়ের নির্যাস ।

সময়টা কাঁদে মিথ্যার বেসাতি মালা
মিছিল স্লোগানে শুধু সত্যেকে জ্বালা,
সময় কখনো থাকে না সময়ে বাঁধা
সাম্যের কবি নজরুল ,বিদ্রোহী কবিতা ।

শাহনাজ পারভীন মিতা ১৯৬৮ সালের ২৪শে সেপ্টম্বর ঢাকার মতিঝিল এজিবি কলোনীতে জন্মগ্রহন করেন। পিতা মরহুম আব্দুল মান্নান একাধারে কবি, শিক্ষানুরাগী, প্রাবন্ধিক ও সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন । মা নূরুন নাহার বেগম একজন সুগৃহিনী ও সাহিত্য সমঝদার । শাহনাজ পারভীন মিতা মতিঝিল সরকারী উচ্চ বালিকা বিদ্যালয় থেকে ১৯৮৩ সালে এসএসসি এবং বেগম বদরুন্নেছা মহিলা মহাবিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে এইচএস সি পাশ করেন। ইডেন মহিলা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ এবং ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতিতে এম এ করেন । এছাড়া উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে টিচার্স ট্রেনিং কলেজ থেকে কৃতিত্বের সাথে বিএড সম্পন্ন করেন । তিনি কিছুদিন শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ছিলেন। ব্যাক্তিগত জীবনে দুই কৃতি সুসন্তানের জননী । কবি ছোটবেলা থেকেই বাবার কাব্যরচনা দেখে সাহিত্যের প্রতি অনুরাগী হয়ে ওঠেন। লেখালেখির সাথে যুক্ত হোন মধ্যেবয়সে। কথামালা তুমি-পাঞ্জেরী পাবলিকেশনস লিমিটেড থেকে কবির প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ। এছাড়া কবির প্রজাপতি হওয়ার অপেক্ষায় ও নৈঃশব্দ্যের শব্দ নামে আরো দুইটি কাব্যগ্রন্থ আছে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP