সকল মেনু

‘ফিনিক্স পাখি’ হয়ে ফিরে আসা তারেক রহমানের কাছে জনপ্রত্যাশা

গ্রিক পুরাণের ফিনিক্স পাখির মতো বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরে আসলেন তারেক রহমান। বারবার ধ্বংস করে দেওয়ার শত অপচেষ্টার পরও এ দেশের মানুষ অভাবনীয় ভালোবাসায় বরণ করে নিয়েছে আপনাকে। অবশেষে অসংখ্য ষড়যন্ত্র ও নানামুখী অপপ্রচারের বেষ্টনী ছিন্ন করে আপনি হয়ে উঠলেন সবার আস্থার প্রতীক। নতুন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান, আপনাকে অভিনন্দন। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর সন্তান হিসেবে এবার আপনিও প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিতে যাচ্ছেন—এটি মহান আল্লাহ তায়ালার অশেষ রহমত এবং পৃথিবীর রাজনৈতিক ইতিহাসে এক বিরল দৃষ্টান্ত। জীবনের ঝুঁকি, নিপীড়ন ও নির্যাতনের কঠিন পথ অতিক্রম করে নেতৃত্বগুণে আজ আপনি এই অবস্থানে পৌঁছেছেন। নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও আপনার ক্যারিশমেটিক নেতৃত্বে দেশের মানুষ যে ভালোবাসা ও সমর্থন দেখিয়েছে, তার সুস্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে ১২ ফেব্রুয়ারি দেশজুড়ে, যা ‘তারেক বসন্ত’ নামে পরিচিতি পেয়েছে। বাংলার প্রকৃতিতেও বসন্ত ঋতুর আবির্ভাব হতে যাচ্ছে।

‘সবার আগে বাংলাদেশ’, ‘প্রার্থী নয়, মার্কা দেখে ভোট দিন’, ‘শহীদ জিয়া ও বেগম খালেদা জিয়াকে ভোট দিন’, ‘তারেক রহমানকে ভোট দিন’—এই আহ্বানগুলোতে সাড়া দিয়েছে বাংলাদেশের মানুষ। দেশে ফিরেই আপনার ঘোষণা “I have a plan for the people of my country” সাধারণ মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। তারই প্রতিফলন দেখা গেছে ব্যালটে। সারা দেশে ধানের শীষকে বিজয়ী করেছে জনগণ। মা বেগম খালেদা জিয়াকে হারানোর শোকের মধ্যেও যেভাবে আপনি গণমানুষের দুয়ারে পৌঁছেছেন, তা ছিল অনেকের কল্পনার বাইরে। বিরামহীনভাবে জেলা, মহানগর ও বিভাগীয় শহরগুলোতে ভ্রমণ করেছেন। আপনার আহ্বানে মানুষ সাড়া দিয়েছে। যে বাংলাদেশ থেকে ষড়যন্ত্রকারীরা আপনাকে ২০০৮ সালে আহত অবস্থায় দেশ ছাড়তে বাধ্য করেছিল, যে দেশের ফ্যাসিবাদী শক্তি আপনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক রেড অ্যালার্ট জারি করেছিল, সেই বাংলাদেশের মানুষই আজ আপনাকে দেশ পুনর্গঠনের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছে। ইংরেজ কবি রবার্ট ব্রাউনিংয়ের ‘দ্য প্যাট্রিয়ট’ কবিতার ভাষায় বলতে হয়, বাংলার মানুষ আপনার চলার পথে গোলাপের পাপড়ি বিছিয়ে দিয়েছে। শহর ও গ্রামজুড়ে দালান ও জনপদে প্রতিধ্বনিত হয়েছে আপনার বিজয়ধ্বনি।

এখন সময় আপনার। শত-সহস্র লেখক, কবি ও সাংবাদিক আপনার এই বিজয়গাথা নিয়ে উচ্ছ্বসিত লেখনী প্রকাশ করবেন। বিজয়ের পেছনের গল্প লিখবেন অনেকেই। আপনার পরিকল্পনা ও অঙ্গীকার, পাশাপাশি নেতাকর্মীদের দীর্ঘদিনের সংগ্রাম ও ত্যাগ—সবই তাঁদের লেখায় স্থান পাবে। দীর্ঘ ১৮ বছর পর আপনার দল বিএনপি ক্ষমতায় আসায় নেতাকর্মীদের মনে নতুন করে আশার আলো জেগেছে। এই আশা ও প্রত্যাশার সঠিক ব্যবস্থাপনা এবং জনগণের কাছে দেওয়া ‘পরিকল্পনা’ ও ‘অঙ্গীকার’ বাস্তবায়নই আপনার প্রধানমন্ত্রিত্বের মূল দায়িত্ব হয়ে উঠবে। আপনার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হওয়ার পথ যেমন কঠিন ছিল, তেমনি বর্তমান ভঙ্গুর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর বাংলাদেশ পরিচালনাও সহজ হবে না।

দেশের মানুষ মূলত নেতার ওপর আস্থা রাখেন শর্ত দিয়েই। আপনার ওপর আস্থা রাখতে মানুষের প্রধান শর্তই হলো দেশে শান্তি ফেরানো; দুর্নীতি-অনিয়মের লাগাম টেনে ধরে মানুষকে নিশ্চিন্তে ঘুমানোর সুযোগ করে দেওয়া। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে গণ-অভ্যুত্থানের পর নবনির্বাচিত সরকারের ওপর মানুষের আস্থা তৈরি করা অনেক কঠিন। এই দায়িত্ব পালনে আপনাকে কঠোরতা ও বিচক্ষণতা দেখাতে হবে। কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করছি—

প্রথমত: সৎ, দক্ষ এবং গতিশীল ব্যক্তিদের নিয়ে একটি মন্ত্রিসভা গঠন করতে হবে। শহীদ জিয়াউর রহমানের মন্ত্রিসভাকে এক্ষেত্রে মডেল হিসেবে রাখা যেতে পারে। তিনি বিভিন্ন খাতের সফল পেশাদারদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন। আপনার মন্ত্রিসভায় একজন সদস্যও যেন নৈতিকতার নিরিখে বিতর্কিত হওয়ার সুযোগ না পান।

দ্বিতীয়ত: সুশাসন প্রতিষ্ঠা করাই হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মানুষ চায় সরকারি দপ্তরে হয়রানি ছাড়া কাঙ্ক্ষিত সেবা পেতে। এক্ষেত্রে প্রধান বাধা আমলাতন্ত্র। ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে আমলাতন্ত্রই তাদের প্রধান অস্ত্র হিসেবে কাজ করেছিল। আমলাতন্ত্র, পুলিশ ও বিচার বিভাগের কাঠামোগত সংস্কার করে জনসেবা নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত: নির্বাচনের আগে দেওয়া ইশতেহার বা পরিকল্পনা বাস্তবায়নে নিয়মিত ‘ফলোআপ’ কার্যক্রম রাখতে হবে। সবকিছু একদিনে আলাদিনের চেরাগের মতো পরিবর্তন সম্ভব নয়, তবে জনগণের কাছে আপনার আন্তরিকতা ও চেষ্টার প্রমাণ থাকা জরুরি।

চতুর্থত: বিএনপির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ‘নেতিবাচক ব্র্যান্ডিং’ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আপনি আগেই বলেছেন, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি বন্ধে দ্বি-স্তরবিশিষ্ট পদক্ষেপ নেবেন। কোনো নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তাৎক্ষণিক সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে।

পঞ্চমত: নতুন প্রজন্মের সঙ্গে সংলাপ অব্যাহত রাখতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুস্থ ধারার ছাত্ররাজনীতি নিশ্চিত করতে হবে, যার মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে জাতীয়তাবাদী ও উন্নয়নমুখী রাজনীতির চর্চা বাড়বে।

ষষ্ঠত: সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগ দিন। আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংক খাতে যে লুটপাট হয়েছে, ভবিষ্যতে যেন এমন লুটেরা শ্রেণি তৈরি না হয়—তা নিশ্চিত করতে হবে।

সবশেষে, রবার্ট ব্রাউনিংয়ের সেই কবিতার শেষাংশ স্মরণে রাখা জরুরি। যে জনতা একসময় গোলাপের পাপড়ি দিয়ে বরণ করে, তারাই প্রত্যাশা পূরণ না হলে মুখ ফিরিয়ে নিতে পারে। আপনার জনপ্রিয় স্লোগান ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ যেন আপনার কাজে ও মননে প্রতিফলিত হয়—জাতি সেই প্রত্যাশাই করে।

লেখক: আইনজীবী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP