সেই ছোটবেলা থেকেই আয়শার দাড়ি ও টুপিওয়ালা হুজুর টাইপ লোক দেখলেই বিরক্ত হতো। ওর নাকি অসহ্য লাগতো। কারণ,হুজুর টাইপের মানুষগুলোর গা থেকে ভক ভক করে বের হওয়া আতরের বিকট গন্ধ নাকে গেলেই নাড়িভুঁড়ি উলটে বমি আসত ওর ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু ;ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস ! সেরকম একজন দাড়ি টুপি ওয়ালা হুজুরই আয়শার পুরো পৃথিবীটা দখল করে আজও বসে আছে ! আর থাকবেও হৃদয় গহিনে জলজ্যান্ত হয়ে বীরের বেশে আয়শা যতদিন বেঁচে থাকবে।
আয়শার বয়স তখন সতেরো কি আঠারো বছর। সেই ছোটবেলায় মাকে হারিয়ে বাবার কাছেই বেড়ে উঠছিলো। মায়ের মুখটা মনেই পড়ে না। বাবা একাই দু’জন হয়ে মায়া- মমতা, আদরে- সোহাগে ভরিয়ে তুলছিল। আয়শার বয়স যখন দশ বছর হঠাৎ একদিন বুকের ব্যথায় ছটফট করতে করতে আয়শা ও অন্যান্যের সামনে বাবার দেহটি নিথর হয়ে গেলো। বাবা কিছু না বলেই আয়শাকে একা রেখে চলে যাওয়ায় ওর বুকভরা অভিমানে শুধু চোখে জল গড়ায় সারাক্ষণ। ঠিক সেই সময়টিতে ওর চাচা- চাচি চলে আসে আয়শার দেখভাল করার জন্য।
প্রায় আট বছর যাবৎ চাচা চাচির কাছে থেকেই বেড়ে উঠছিলো আয়শা । বয়স সতেরো আঠেরোর কোটায় এলে ওর সমবয়সি অন্যসব মেয়েদের বিয়ে হয়ে গেলো ! কি এক রহস্যজনক কারণে আয়শার বিয়ে হচ্ছেনা দেখে চাচা-চাচিও বেশ বিরক্ত ভাব দেখাচ্ছে, ইদানিং। কিন্তু ; মুখ ফুটে কিছুই বলছে না। কারণ, আয়শার বাবার রেখে যাওয়া অগাধ সহায় সম্পত্তি আত্মসাৎ করে ওর চাচা ভোগ দখল করে বসে আছে । দক্ষিণাঞ্চলের প্রত্যন্ত এক জেলা শহরে ওর বাবার ব্যবসার সবচেয়ে ভালো দোকানটিও এখন চাচা তার নামেই চালাচ্ছে। এসবই আয়শা বুঝতে পারে, কিন্তু ; মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না।
আয়শা ওর বাবার একমাত্র সন্তান এবং খুবই আদরের। কিছু না চাইতেই বাবা সামনে এনে দিতেন। শহরের অভিজাত এলাকায় ওদের একবিঘা জমির উপর একটি দোতলা বিল্ডিং বাড়ি ছিলো। সামনে চারিধারে বিভিন্ন ফল ও ফুলের বাগান। পিছনে অনেক বড়ো শান বাঁধানো পুকুর । ওর মা- বাবা দু’জনার পছন্দমতো বাড়িটি করেছিলো। বাড়িতে সেগুন কাঠের কি সুন্দর সুন্দর চেয়ার টেবিল,পালঙ্ক! আয়শার বাবার মৃত্যুর পর পরই ব্যাবসা বাণিজ্য, দোকান, জমিজমা ও সুন্দর বাড়িটা চাচার দখলে চলে যায়। সাথে সাথে আয়শাকেও বিনা টাকায় কাজের জন্য সাথে করে চাচা-চাচি তাদের বাড়িতে নিয়ে আসে এবং অকস্মাৎ মারা যাওয়া বড়ো ভাইয়ের এতিম মেয়েটির দায় দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে
পাড়া পরশীর কাছে মহানুভবতার প্রমাণ দিয়ে দিলো।
চাচি পাড়ার লোকজনের সামনে দুঃখী ভাব নিয়ে চোখের পানি ফেলে আয়শাকে বুকে টেনে নিয়ে আঁচলের তলায় নিয়ে নেয়। অথচ এই চাচা-চাচিকে ওর বাবা বেঁচে থাকতে কোনোদিনও একটু খোঁজ খবর নিতে দেখেনি। ওদের বাড়ির সুন্দর সুন্দর পালঙ্ক, আলমারি সহ অন্যান্য ফার্নিচার সব চাচার বাসায় নিয়ে আসা হলো। কিছু ফার্নিচার শুনলো চাচা বিক্রি করে দিয়েছে। একদিন হঠাৎ শুনতে পেলো ওদের বাড়িটা চাচা বিক্রি করে দিয়েছে। ওর সামনেই দুঃখ করে চাচা চাচি অন্যদের বলেছিলো, “ওর বাবার না কি ব্যাংকে অনেক ঋণ ছিলো সেই ঋণ শোধ করতেই বাড়ি-ঘর জমিজমা সব বিক্রি করা হলো! ”
সেই থেকে আয়শা সত্যি সত্যিই একেবারে অনাথ হয়ে গেলো। চাচার বাড়িতে ওর বাবার তৈরি সেগুন কাঠের পালঙ্কে আর ঘুমানো হলো না আয়শার। চাচাতো বোনদের সাথে ছোট্ট একটি রুমে খাটের পাশে নিচে একটি বিছানা পেতে শুতো আয়শা। ওর তাতে কোনো দুঃখ হয়নি কোনোদিনও । কারণ, সেই বোনদের সাথে গল্প করতো অনেক রাত অবধি। তাছাড়া ওর যতো সাজ সরঞ্জামের জিনিসপত্র ছিলো সব ছোট বোনদের মাঝে ভাগ করে দিলো।
ওর চাচি ভারি ভারি গয়না পড়ে বেড়াতে বেড় হতো। দেখেই আয়শা চিনতে পারতো। কারণ,এই গয়নাগুলো ওর বাবা সিন্ধুক খুলে মাঝে মাঝে ওকে দেখাতো আর বলতো, “যেদিন তোর বিয়ে হবে আমি নিজ হাতে তোকে এই গয়না পড়িয়ে দু’নয়ন ভরে দেখবো রে মা! ” মায়ের রেখে যাওয়া সুন্দর সুন্দর শাড়ির মালিক হয়ে গেলো চাচি। তবে চাচিকে অমন সুন্দর করে সাজতে দেখে কিন্তু ; আয়শার কখনোই হিংসে হতো না বরং ওর ভালোই লাগতো। ভাবতো, হয়ত মাকেও তেখতে এমনই সুন্দর লাগতো। এমনি করে দিনের পর দিন অতিবাহিত হতে থাকে আর আয়শাও কাছাকাছি স্কুলে পড়তে পড়তে এস এস সি ভালোই পাশ করলো এবং স্থানীয় একটি কলেজে পড়ে এইচ এস সি পাশ করার পর চাচা তার আর্থিক অসচ্ছলতার অজুহাত দেখিয়ে লেখাপড়া বন্ধ করে দিলো। যুবতী হবার সন্ধিক্ষণে বুকের ভিতরে এক বিশাল হাহাকার নিয়ে চাচির সাথে ঘরের কোণে সময় কেটে যায় আয়শার । নিজের ভিতরের এক সমুদ্র কষ্ট আর হাহাকার ঢাকতে ও বেছে নিলো রাশি রাশি বই । বইয়ের সমুদ্রে ডুবে যেতে থাকলো ক্রমান্বয়ে । যতো রকমের বই পাওয়া যেতো কলেজের লাইব্রেরি
ঘরে ও গিয়ে পড়ে পড়ে সারা করতো সে সব বই । পরে পাড়ার লাইব্রেরি থেকে বই এনে পড়তে থাকলো। আয়শা নিজেই নিজের জন্য অন্য এক আলাদা জগৎ সৃষ্টি করে ফেললো । এই সময় চাচি আয়শাকে বিয়ে দেবার জন্য উঠেপড়ে লেগে লাগলো। প্রায়দিনই বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আত্মীয় ও অনাত্মীয়রা চাচা-চাচির কাছে আসতে থাকে । কিন্তু; চাচা-চাচি আর্থিক দৈন্যতা দেখিয়ে বনেদি পরিবারের সব সম্মন্ধগুলো ভেঙে দিতে থাকে। আয়শা এখন সবই বুঝতে পারে। কিন্তু ; কিছুই করার নেই ভেবে নিয়তির উপর নিজেকে ছেড়ে দেয়। এদিকে চাচাতো বোনরাও বড়ো হয়েছে। ওদের বিয়ে দিতে পারছে না ওরই কারণে একথা ইনিয়ে বিনিয়ে পাড়া প্রতিবেশির কাছে বলে বেড়াতো চাচা-চাচি।
এমন সময় চাচা চাচি তাদের মনের মতো এক পাত্রের সন্ধান পেলো। পাত্র একদম নিরীহ গোবেচারা।কোনো লোভ লালসা নেই। পাত্রের মা বাবাসহ তিনকূলে আত্মীয়স্বজন বলতে কেউ নেই। পাত্রকে কিছু দিতে তো হবেই না, এমনকি কোনো আরম্বর আয়েজনও করতে হবে না। চাচা চাচি এমন সুযোগ আর হাতছাড়া করলো না। আয়শার মতামতের কোনো তোয়াক্কা না করেই তারা ঘরোয়া পরিবেশে কাছের মসজিদের ইমাম সাহেব গোলাম সরোয়ারের সাথে বিয়ে পড়িয়ে দিলো। আয়শা আরো একবার নিজেকে তার ভাগ্যের উপর ছেড়ে দেয়। বাসরঘরে আয়শাকে বর গোলাম সরোয়ার জানায় ১৯৬৫ সনের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় ও পানি বন্যায় মা বাবা ভাইবোন হারিয়েছে। নদীতে বিলীন হয়েছে তার ঘরবাড়ি, জমিজমা ও গবাদিপশু। আয়শা ভাবলো ওর মতোই ওর বরের এই দুনিয়াতে কেউ নেই । ভীষণ রকমের নম্র ভদ্র আর বিশ্বস্ত স্বভাবের জন্য এলাকার সবাই স্নেহ করতো, ভালোবাসতো গোলাম সরোয়ারকে। তাঁর কণ্ঠস্বর ছিলো ভীষণ মিষ্টি , তাই স্থানীয় মসজিদ কমিটি গোলাম সরোয়ারকে দু-শো টাকা বেতনে মসজিদে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ও জুমা পড়াবার চাকুরি দেয় । সেই মসজিদের পিছনেই দুই কক্ষ নিয়ে একটি ঘরে গোলাম সরোয়ারের সাথে আয়শার সংসার জীবন শুরু হয়। আয়শার পছন্দ, অপছন্দ, মানসিকতা থেকে লক্ষ যোজন দূরের একজন ভিনগ্রহের মানুষ বলে মনে হলো ওর স্বামী গোলাম সরোয়াকে । বিয়ের পর প্রথম রাতেই নিজেকে দাঁড়িওয়ালা হুজুর লোকটির হাতে সঁপে দিতে চোখ নাক বুজে বুজে যখন আপ্রাণ চেষ্টা করতে ছিলো! ঠিক তখনই গোলাম সরোয়ার অত্যন্ত বিনয় ও সম্মানের সাথে আয়শাকে অবাক করে দিয়ে বললো, ” আমি তোমায় সারাজীবনের জন্য বিয়ে করেছি। তুমি আগে সময় নাও! আমার সম্পর্কে জানো! আমাকে দেখো! তারপর যেদিন স্বামী হিসেবে সম্মান দিতে পারবে, ভালোবাসতে পারবে, তোমার মন জয় করেই আমরা আমাদের দাম্পত্যজীবন শুরু করবো। আমি অপেক্ষায় থাকবো। জীবনে এই প্রথম আয়শা কি কারণে নিজেই জানে না, হাউমাউ করে কাঁদলো।
বিয়ের পর আয়শাকে ওর স্বামী রান্না করতে দিতো না। কোনো কাজই করতে দিতো না। ওর স্বামী গোলাম সরোয়ার আয়শাকে কাছে বসিয়ে নিজেই রান্না করে খেতে দিতো। আয়শা ভাবতো, আহ্ কী অসাধারণ রান্না। এমন করে ভালোবেসে ওর বাবা ছাড়া কেউ কোনোদিন ওকে খেতে দেয়নি । আয়শার পছন্দের বই এনে দিতো এবং পরে ওর কাছ থেকে শুনতো এবং নিজেই দেশ বিদেশের গল্প ও দেশের সমকালীন প্রেক্ষাপট নিয়ে রাজনীতির গল্প করতো।
এভাবে কখন যে দুজন দুজনার আপন হয়ে গেলো বুঝতেই পারলো না আয়শা । এদিকে দেশে তখন কানাঘুষা শুরু হয়েছে । স্বাধীন একটা দেশের দাবি করতে শুরু করছে দেশের নিরীহ মানুষগুলো । উচ্চ পর্যায়ে বৈঠক হচ্ছে, রেডিওতে নিয়মিত সে সব শ্বাস রুদ্ধকর খবর প্রচার হচ্ছে । গোলাম সরোয়ার গভীর আগ্রহ নিয়ে সে সব গল্প করে আয়শার সাথে। আয়শা অবাক হয়ে দেখে ওর স্বামীর চোখের তারা থেকে কি অদ্ভুত একটা আলো ঠিকরে বের হয়ে আসছে ! এ যেনো দেশ প্রেমের আলো ! এ যেনো মুক্তির স্বপ্ন ! আয়শা গোলাম সরোয়ারকে কখন যেনো মনের অজান্তেই ভালোবেসে বিমুগ্ধতায় আচ্ছন্ন হতে থাকে !
এর কিছুদিন পর পরই দেশের মানুষ সত্যি সত্যিই একজোট হয়ে গেলো । সাত মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকায় রেসকোর্স ময়দানে ভাষণ দিলো। গোলাম সরোয়ার সেই ভাষণ শুনে বুক ফুলিয়ে যেনো ফুঁসে উঠলো। ভাষণের পর পরই দেশের মানুষ কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ শুরু করে হানাদার পাকিস্তানি স্বৈর শাসকের বিরুদ্ধে ! আয়শা একদিন গভীর রাতে ঘুম ভাঙলে অবাক হয়ে দেখতে পায় ওর হুজুর স্বামী গোলাম সরোয়ার রাতের অন্ধকারে বড় একটা পাতিলে চুলায় খিচুড়ি ও ডিম রান্না করছে। আয়শা কিছু একটা আঁচ করতে পেরে তাঁকে সাহায্য করতে গেলে উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে ফিসফিস করে বলে, ” শোনো আজ আমদের এখানে মুক্তিবাহিনী আসবে। তারা খাবে ও এই মসজিদেই বিশ্রাম নিবে ! ওরা ফেরেশতা হয়ে আসছে দেশকে মুক্ত করার জন্য! একদল ফেরেশতা নেমে এসেছে এই দেশেরই জমিনে ! আয়শার হৃদয়ে কাঁপণ ধরে, স্বামীর সাথে সাথে উত্তেজনায় কাঁপতে থাকে দুজন ! সত্যি সত্যি একদল দুরন্ত মুক্তিযোদ্ধার দল আসলো সেদিন সরোয়ার ও আয়শার ছোট্ট ঘরে ! পরম তৃপ্তিতে খিচুড়ি আর ডিম দিয়ে পেট ভরে খেয়ে তারা ওই মসজিদেই বিশ্রাম নিলো । আয়শা সহস্র বিস্ময়ে সেদিন দেখলো,শুনলো নম্রভদ্র অমায়িক মুখচোরা স্বামী গোলাম সরোয়ারকে মুক্তিবাহিনীর উদ্দেশ্যে দেয়া রক্ত গরম করা ভাষণ ! অদ্ভুত এক গনগনে আগুনের গোলা যেন অমায়িক নিরীহ মানুষটার চোখে মুখে ! তারপর সেই ফেরেশতা রূপী মুক্তি – যোদ্ধাদের হাতে তুলে দিলো মসজিদের ভিতরে স্বযত্নে লুকিয়ে রাখা অস্ত্রগুলো ! সেদিন থেকে আয়শার মনে হতে থাকে,ওর সামনেই দাঁড়িয়ে আছে ওর স্বপ্নের নায়ক ! আয়শা আজ আর কিছুই চায় না। মনপ্রাণ উজাড় করে ভালোবেসে ফেলে সকল মানুষের কাছে গোবেচারা, চুপচাপ থাকা এক দুর্দান্ত দেশ প্রেমিককে! একজন আগুনের মতো দেশপ্রেম বুকে ধারণ করে থাকা যোদ্ধাকে। একজন সত্যিকারের প্রেমিক পুরুষকে ! সেইদিনই ওদের দু’জনের কানে কানে পুরো পৃথিবীটা প্রথমবারের মতো যেন আত্নসমর্পণ করলো ! ওরা একে অন্যের হয়ে গেলো পরিপূর্ণভাবে। এ যেনো যুদ্ধ জয়ের পূর্ব সন্ধিক্ষণ !
আয়শা তখন সাত মাসের গর্ভবতী । ওরা দু’জনই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে একটা স্বাধীন দেশে ওদের সন্তানের শুভ আগমনের দিনটির জন্য ! প্রথমবারের মতো মা হবার এক অদ্ভুত শিহরন তখন আয়শার সারা শরীর মন জুড়ে ! বাবা হবার সাধ ও স্বাধীন দেশের অপেক্ষার উত্তেজনায় অস্থির হুজুর গোলাম সরোয়ারও। সেদিন ছিলো ডিসেম্বরের প্রথম দিকের শুক্রবার! আয়শা ও গোলাম সরোয়ারের জীবনে নেমে আসে বিনামেঘে বজ্রপাত! দু’টি মন আর দু’জোড়া চোখের স্বপ্নগুলো ভয়ংকর এক শব্দে খণ্ড বিখণ্ড হয়ে ভেঙ্গেচুড়ে স্বদেশের মাটিতে মিলিয়ে গেলো!
এই পাড়ার রাজাকার সাথে করে একদল পাকিস্তানি হানাদার নিয়ে আসে মসজিদের সামনের ছোট্ট জায়গাটিতে। হানাদারগুলো গোলাম সরোয়ারের কাছে জানতে চায় ,” এখানে অস্ত্র আছে কিনা ? মুক্তিবাহিনী আসে কিনা ? আবার কবে আসবে ? ইত্যাদি!” আসলে তাদের জানাতে হুকুম করে। গোলাম সরোয়ারের কণ্ঠ চিকন হয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকে । শান্তশিষ্ট ভদ্র গোলাম সরোয়ার কঠিন গলায় জীবনে এই প্রথম মিথ্যা কথা বলে,সে কিছুই জানে না। কিন্তু ; তার কথা হানাদারগুলাে বিশ্বাস করে না । তল্লাশি করে পুরো ঘর এবং মসজিদ। মুক্তিবাহিনীর রেখে যাওয়া কিছু অস্ত্র পায় ওরা। হায়েনাগুলো সাথে সাথে হিংস্র হয়ে উঠে!গোলাম সরোয়ারকে টেনে হিঁচড়ে মসজিদের সামনের ছোট্ট জায়গাটিতে নামিয়ে বেয়নেট দিয়ে মারতে থাকে! আয়শাকে দুজন হায়েনা টেনে নিয়ে যেতে থাকে। গোলাম সরোয়ার প্রাণপণ দৌড়ে এসে আয়শাকে আকড়ে ধরে বাঁচাতে চেষ্টা করে। হায়েনারা অট্টহাসিতে ফেটে পড়ে। আয়শার চোখের সামনেই গোলাম সরোয়ারের বুকের উপর রাইফেল তাক করে। আয়শা অনেক জোড়াজুড়ি করে পাগলির মতো ছুটে যায় স্বামীর কাছে । সাথে সাথে হায়েনাগুলো রাইফেলের বাট দিয়ে ওর পেটে আঘাত করে। আয়শা প্রচণ্ড ব্যথা সহ্য করতে না পেরে হঠাৎ মাটিতে পড়ে যায় আর গোলাম সরোয়ারের সামনেই তার সতীসাধ্বী স্ত্রী আয়শাকে মসজিদের সামনেই বিবস্ত্র করে পালাক্রমে ধর্ষণ করে পশ্চিমা কয়েকটি হায়েনা।
গোলাম সরোয়ারের চোখ দু’টো অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে চেতনা হারিয়ে ফেলে। ওরা আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলে গোলাম সরোয়ারের বুকটা বুলেটের আঘাতে ঝাঁজরা করে দিয়ে চলে যায়। সেইদিন মাগরিবের আজান হয়নি ওই মসজিদে। অন্য এক মসজিদের আযান ভেসে আসছিলো হেমন্তের হিমেল হাওয়ায় ভেসে ভেসে আর আয়শা ও গোলাম সরোয়ারের অনাগত সন্তানের রক্তে ভিজতে থাকে মসজিদের সামনে বাঙলার মাটি । সেই সন্তান ওর মায়ের জরায়ুর তাজা রক্তে সাঁতার কাটতে কাটতে বৃথা চেষ্টা করে অতলে হারিয়ে যায়। জন্মের আগেই জন্মদাতা পিতার সাথে জন্মভূমি স্বাধীন করতে শহিদ হলো ভূমিষ্ঠ না হওয়া শিশু আর তার মা হলো বাংলার বীরনারী!
কিন্তু ; আয়শা বেঁচে আছে আজও জিন্দা লাশ হয়ে এই বাঙলারই বুকে। বয়স সত্তর ছাড়িয়ে এসেও শহিদ স্বামী সন্তানের মুখ বুকে ধারণ করে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিচ্ছে এই ভেবে যে, “স্বাধীনতা এসেছে আমার স্বামী সন্তান ও জরায়ুর রক্তের স্রোতে ভেসে! আমি তো দায় এড়াতে পারিনা!”
তাই নিজ হাতে সাদা কাগজের পাতায় পাতায় বর্ণ পরিচয়ের বই লিখে ঘুরে ঘুরে ছোট্ট শিশুদের হাতে, প্রজন্মের হাতে তুলে দেয়। বলে স্বাধীনতা অর্জন করা যতো না কষ্টের সেই স্বাধীনতা বজায় রাখা, ধরে রাখা আরো বেশি সাধনার। বাড়ি বাড়ি,পথে ঘাটে ঘুরে ঘুরে স্বাধীনতার কাহিনি শোনায় যাকে যেখানে পায় সেখানে বসেই |
শিক্ষণীয় : আজ স্বাধীনতা রক্ষায় আত্মনিবেদিত
” মা আয়শারা আজও বাংলার আনাচে কানাচে বেঁচে আছে ” বাংলার জননী হয়ে! স্যালুট জানাই তোমাদের! বাংলার বীরনারী! বাংলার জননী! ”
পাদটিকা: আজ দেখছি সেই বীর নারীদের ত্যাগের কথা অবজ্ঞাভরে অস্বীকার করছে বিপথগামী তরুণ বর্তমান প্রজন্ম। যাদের অবদান মনে গেঁথে নিয়ে দেশ গড়ার কথা, তাদেরকেই অবহেলা করছে, বলছে সব মিথ্যা, বানোয়াট! হা খোদা! বাংলার সেই দামাল ছেলেদের আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। অবশ্য কাণ্ডারি ১০০% দায়ী এই পরিস্থিতির জন্য |
সত্যি ঘটনা অবলম্বনে এই লেখা। শুধু নাম ধাম স্থান কাল পাত্র লেখিকার সৃস্টি
ফিরোজা সামাদ: লেখক, কবি ও প্রাবন্ধিক
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।