সকল মেনু

নুরুন্নাহার মুন্নি’র ১০ নির্বাচিত কবিতা

নিষেধের ছায়া

প্রতিটি ঘর যেন আশ্রয় নয়, বন্দিশালা
সব জানালা উন্মুক্ত অথচ অসহায়
প্রতিটি দরজা, এক নীরব দেহ
শরীর তার ছায়ার হাতে গ্রেপ্তার।

রক্তের ভেতরেও শেকল জন্মায়
একটি বন্ধ কপাট লুকিয়ে রাখে
অদেখা দিগন্তের গন্ধ।

মানুষ এড়াতে পারে না
ওপরে তীক্ষ্ন লোভের দৃষ্টি।
কপাটের বাইরে কাঠের গন্ধ মেখে
অপেক্ষা করে রঙমাখা সভ্যতা।

ভাড়াটে যাপনে একদিন
দেহ পচে যায় দুর্গন্ধসহ।
অথচ জোড়া চোখে তাকিয়ে থাকে
নিষেধের ছায়া।

নির্লজ্জ কে – সভ্যতা?
নাকি আত্মগ্লানির চিহ্ন বয়ে বেড়ানো
একটি বদ্ধ কপাট?

 

দেয়াল

মুখোমুখি বসে থাকলে অভিমান কখনও নগ্নতা দাবি করে
একা- তবুও দূরত্ব ঘোচাতে আগাম জামিন।
অনুভূতিহীন আমি ও আমরা
স্নিগ্ধ ভোর যেন শীতল পুদিনার মেনথল।

দেয়াল কেবল ইট নয়
অদৃশ্য ভাঙচুরে গড়া আমাদের অনন্ত দ্বিধা।
হাজার অবৈধ অভিযোগ-
রাতের আঁধারে অদেখা অদ্ভুত চাঁদ
কথারা জমে ওঠে, অথচ ঠোঁট ছুঁতেই
তাদের ডানা ভিজে যায় অকারণ নীরবতায়।

একদিন এই দেয়াল ভেঙে
আমরা হয়তো আলোকে ভুলব
অথবা খুঁজে পাবো ছায়ার আস্তিনে লুকানো
নতুন কোনো চুক্তি-
যেখানে অভিমানও হবে বৃষ্টির মতো ক্ষণস্থায়ী
আর নগ্নতা মানে হবে কেবল মুক্ত বাতাস
যেমনি করে নদীর স্রোতে ভেসে চলে দুরন্ত নৌকা।

 

নিনাদ প্রকৃতি

শ্যামর্বণের মলিন আকাশে এক টুকরো চাঁদ
কপাল ছুঁয়ে যায়
শ্রাবণঝরা কান্না কবিতা হয়ে ওঠে
মেলে ধরে সবুজের আঙিনা
লুটিয়ে পড়ে বিবেক
জলজীবনের হয় বিশুদ্ধ সঙ্গম;
রোদখাই প্রেম পরিপক্ক হয়
ভূমির যৌনাঙ্গ ছিঁড়ে বেরিয়ে আসে
আশ্রিত সত্ত্বার মাটি ও মায়া।
ঋতু পরির্বতনে খুলে যায় আবরণ
দাঁড়িয়ে থেকে দেহের নগ্নতা দেখে
ইউক্যালিপটাস গাছের পাতা
প্রকৃতি অদ্ভুত,যন্ত্রনা হয় তবু
শিকড় ছাড়ে না।

 

ধূমায়িত প্রচ্ছদ

আপাদমস্তক তোমাকে অনুধাবন করি
নবান্নের ধানের গোলা থেকে বেরিয়ে আসা
ভাপের মতন সে অনুভব,
এ আমার অনুভূতিকাল।

তোমার মায়াবী হাসিতে
আমার পাঁজর ভেঙ্গে চৌচির
সীমানা লঙ্ঘিত বেদনায় এ আমার মৃত্যুকাল।

চিরচেনা সদালাপী তুমি,
কতো লাল রঙা আবির ধবংস করে তোমার আমিত্ব!
কথায়,ঢংয়ে,সাজসজ্জায়,
আমি ছেড়ে দেই
এ আমার মানবিককাল।

সততার আয়নায় ঢাকা তোমার আগুন সরষে ফুল
আবেদনগুলো ফাইলচাপা পড়ে তাই-
তখন এসে যায় আমার হিমায়িতকাল।

 

ধীর মেঘ ও শামুকের সন্ধ্যা

অপেক্ষার বালিশে ওম দিতে দিতে
ঘুমিয়ে পড়েছে প্রেমের পোয়াতি শরীর।
অদ্ভুত জগতে হেঁটে চলেছে –
ধীর মেঘের ভ্রমণ
রংগুলো মানুষ হয়ে কথা বলছে-
কখনও লালের শানিত উচ্চারণ
কখনও বেদনার্ত নীল,
কখনও কালো শোকের আর্তি
কখনও রাতের কথোপকথন।

স্তুতিগুলো প্যাঁচানো,জরাজীর্ণ গিলাবে
রঙ বদলের শহরে কেউ ধুলি সরায়, পড়ে-
আবার ফেলে যায়
আর কেউ বসে থাকে আস্ত গিলাব হয়ে
শামুকের পেটের মতোন।

আমি আর বনসাই

একটা বৃক্ষ ছিল অন্যরকম- সবুজের শিলায় তার দেহ পরিপাটি
বুক ভরা তাজা নিঃশ্বাস ঢেলে দিতো আমার দেহে
আমি শ্বাসতন্ত্রে গিলে নিয়ে বেঁচে থাকতাম
রুগ্ন অমাবস্যার মতো মৃতপ্রায় আমাকে-
স্থলজ জীবনের আশ্বাস দিল
সহস্র বেদনার বোতাম টিপে নিচ্ছিদ্র করে দিল আমার আব্রু
আমি আনন্দিত হলাম,
ফুলে ফুলে তীব্র ঘ্রাণে ভরে উঠলো তার দেহঘর
আমি বন্ধনহীন পাহাড়ের গ্রীবা ছুঁতে চাইলাম
একদিন বৃক্ষটি গর্ভবতী হলো
তার দুপাশ ভেঙে আরও দুটো বৃক্ষ জন্মালো
খাদ্যাভ্যাস বদলে গেল
অন্তর খেয়ে নিল নিদাগ রোগের জীবানুগুলো
সতেজ মলিনতায় ঢেকে গেল তার রূপশ্রী
ঝড় আসে বন্যা হয়, বৃক্ষটি দাঁড়িয়ে থাকে
আমি খুঁজে চলি পরাগায়নকারী সেই পাখিটি,
বড় হতে হতে বৃক্ষটি একদিন আমাকে ভুলে যায়
তবুও নিয়ম করে একবার মায়া বাড়াই শেকড়ে জল ঢালি
মেদহীন জিরাফের মতো তাকিয়ে থাকি
কষ্টের গানিতিক সংখ্যা সাজাই।

প্যাথোজেন

পৃথিবী ঘুরছে এক অদ্ভুত পাঁকের ভিতর
মৃত্যুর আঙুল ছুঁয়ে যায় কাঁধ বালিশে
জঙ্গলে বিষণ্ন কান্নার চড়াই-উৎরাই ভাসে অহর্নিশ
একটা আলোকিত মেসেজ
রমণীর ভাঁজ ভাঙা শাড়ীর গিটে স্পষ্ট হয়ে ওঠে,
খুঁজে বেড়াই চাঞ্চল্যকর সেই খুনি!

যত্ন করে কুকুর পুষি রক্তের ভেতর
দেশি,বিলেতি,ঋদ্ধ, প্রভুভক্ত, চৌকস
শকুনের উল্লাসে যখন বেড়িয়ে আসে কোরাস
সমাজ খামচে ধরে জলাতংক,
বেরিয়ে আসে র‌্যাবিস ভাইরাস।

খোলস

চারদিকে গিরগিটির অগণিত আনাগোনা
মানুষ মানুষকে নিক্ষেপ করে মারকুপে
লাঞ্ছিত পৃথিবী প্রয়োজন শেষে ঠেলে দেয় ভাগাড়ে
যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় শিশুরাই ভুলে গেছে খেলা
চেতনার বুকে বিষ
মার্কুইস মিশাইল ললিপপের আকারে ঘুরে বেড়ায়
উদার উন্নয়নে এদেশের মানুষ এখনও অবুঝ
আপাদমস্তক ঢেকে দেয়া স্বাধীনতা-বালতিতে ধুয়ে জল খায়
বিনিময়ে প্রতিবেশী থেকে ও বেশ কৃপণ।
অপার শস্যদানা খেয়ে যে পাখি ঘরে ফেরে
সেও কৃতজ্ঞ গুণে ভরা মৌসুমে আবার জন্মায়
কিন্তু মানুষ জন্মায় না।
পশু হয়ে ঘুরে বেড়ায়, এপাড়ায় ওপাড়ায়
সুবর্ণ সুযোগে গেঁথে দেয় হিংস্রতর নখর।

 

মুছে যায় ঋতু

পৌষের হিমকানন গুচ্ছ কুয়াশার দুর্বাধোয়া শিশির
তোমার বিহঙ্গ লতায় আটকে যায়
জ্যাকেট ভর্তি উনুন আমায় উষ্ণতা দেয়
প্রকৃতির কাছে হয় আমার নির্লিপ্ত আত্¥হনন।
পাটালি গুড়ের পাটিসাপটা কিংবা ভাপা পিঠার মৌসুমি গন্ধ
তোমার কাছে পৌঁছে দেয় আমার বহিরাগত চিঠি
শীত রাত্রির নাবিক বলে স্বপ্ন কিনতে মানা
তোমার উষ্ণতার অন্তর্বাসে খিলখিলিয়ে হাসে
অসংখ্য বংশরেণু;
তাই স্বপ্ন পড়ে গোঙায় কোমায়
আবার বছর ঘুরে আসে আমার পানকৌড়ি নিবাস
মশকী লার্ভার মতো নির্দিষ্ট জীবন
তারপর মুছে যায় ঋতুর পার্বণ।

 

বীজ

হাসি–খেলার ভেতর
আমাকে কেউ ফেলে দেয়—
অন্তঃসারশূন্য এক উচ্চারণ।

মুখের লালা,জিহ্বার উষ্ণ আলিঙ্গন
আমার ভেতর কম্পন তোলে
আমি পড়ে যাই এক টুকরো পৃথিবীতে
যার শরীর জুড়ে
মানুষের মল-মূত্রের ইতিহাস।

এখানে কেঁচো আর কেউটে
গিজগিজে জীবনের মানচিত্র
তাদের নীরব হালচাষে
আমার নগ্ন দেহ ঢেকে যায়।

মৃতপ্রায় আমাকে
কেউ ওম মেখে আগলে রাখে—
অদৃশ্য প্রার্থনার মতো।

অবাঞ্ছিত হয়েও আমি চেপে আছি
মানুষে–মানুষে, মাটির উপর
তবু জল আর মাটি
শরণার্থীর মতো আমাকে নিরাপত্তা দেয়।

আমার দু’চোখে তখনও
বেঁচে থাকার সবুজ।

পত্র–পল্লবে আমি প্রতিবেশী হয়ে উঠি
আবার বড় হই।

ভাবি—‌
কোন কালের অভ্যাসে দাঁড়িয়ে-
প্রজন্ম ধ্বংসের মহড়া দিচ্ছি
আমি ও আমরা।

 

নুরুন্নাহার মুন্নি। কবি ও কথাসাহিত্যিক। জন্ম ৫ জানুয়ারি ১৯৮৩ চাঁদপুরে। প্রাণিবিদ্যায় সম্মান এবং স্নাতকোত্তর। নির্বাহী সদস্য ,চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমি এবং প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি, চর্যাপদ সাহিত্য একাডেমি, চাঁদপুর। প্রকাশিত গ্রন্থসমূহ: “আধখোলা জানালার আলাপ” (কাব্যগ্রন্থ),“ কেউ থাকে অন্ধকারে”(কাব্যগ্রন্থ), “গণতন্ত্রে পুরুষতন্ত্র”(গল্পগ্রন্থ),“ভ্রুণফুল” (কাব্যগ্রন্থ)।সম্পাদক লিটলম্যাগ “আখ্যান”।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP