যুদ্ধমঙ্গল ১
মাহফুজা, আমাদের আত্মা থেমে আছে একটি যুদ্ধের ভেতর, হতে পারে দুই কুড়ি বা দুই হাজার বছরের পুরোনো সে যুদ্ধ, লোকক্ষয় ও হত্যা, কত কম লোক কত বেশি লোককে মেরেছিল— যুদ্ধ তো এসব বোকা বানাবার গল্প।
মাহফুজা, যুদ্ধ কে অস্বীকার করতে পারে বলো? আরো একটি যুদ্ধের ভেতর ঠেলে দেয়ার ভয়ে আমরা পুরোনো যুদ্ধকে মেনে নিই। তুমি জানো কিছু লোক তো এখনো যুদ্ধের ভেতর আছে।
যুদ্ধ থেকে আমরা যারা পালিয়ে এসেছিলাম, বলো, আমরা কি যুদ্ধ করিনি? জীবন নিয়ে পালানো যদি যুদ্ধ না হয়—তাহলে তো যে কোনো দুষ্কৃতিকারী সহজে পেতে দেবে গিলোটিনে মাথা। বলো, আমরা তো এখনো বেঁচে আছি। যুদ্ধ ছাড়া আমাদের আর কে বাঁচিয়ে রেখেছে? আমাদের সেই সব পূর্বপুরুষ— যুদ্ধের উন্মুক্ত ময়দানে দুজনকে জবাই করে নিজেও হয়েছিল কতল— তাদের গল্প আর চাই না শুনতে মাহফুজা— যাদের বিধবারা এখন অন্য পুরুষের বাহুলগ্ন— আর আমরা তাদের পিতৃহীন সন্তান— একাই করে যাচ্ছি বাঁচার লড়াই। বলো, কোন্ সম্রাট মৃত পিতার মূল্য বুঝেছে?
যুদ্ধমঙ্গল ২
মাহফুজা, আমরা যারা যুদ্ধের ময়দানে মরি; কিংবা যুদ্ধ না করলেও আমরা যারা মরি। আমাদের মেয়েরা যুদ্ধের ময়দানে ধর্ষিতা; যুদ্ধের বাইরে রক্ষিতা, তাদের জন্য তোমার কি কিছু বলার নেই মাহফুজা? যাই বলো, যুদ্ধ তো আমরা বাধাই নি। আমরা যারা যুদ্ধের শিকার। যারা যুদ্ধজয়ী, আমাদের মেয়েরা তো তাদের ভোগ্যা। আমাদের হাতগুলো তাদের পয়ঃপরিষ্কারের জন্য। আমাদের শ্রম তাদের উদ্বৃত্ত মূল্য ও মেদের জন্য। আমাদের খেতগুলো কর্ষিত হয় তাদের সেবা দানে।
মাহফুজা, আমরা যাতে যুদ্ধ থেকে না পালাই, সেজন্য আমাদের পশ্চাতে নিয়োজিত প্রশিক্ষিত কুকুরবাহিনি। আমাদের সামনে শত্রুর তরবারি; পেছনে ততোধিক নিষ্ঠুর সম্রাটবাহিনি। মাহফুজা, কথা হলো, কে আমাকে যুদ্ধে নামিয়েছে?
যুদ্ধমঙ্গল ৩
তুমি বলতে পারো মাহফুজা, আমাদের মুক্তিযুদ্ধ তো ছিল একটি যুদ্ধ— আমাদের স্বাধিকার আন্দোলন— বাঙালির প্রথম রাষ্ট্রপরিকল্পনা। সাতচল্লিশে কি আমাদের সে-কথাই বলা হয়নি মাহফুজা? মানুষ কে করেছিল ভাগ— হিন্দু ও মুসলিম; সেসব বিভক্তকারী মানুষ কী করে হতে পারে আমাদের নেতা। তুমি কি বলবে সেসব নেতা মূর্খ, সাম্প্রদায়িক শিশ্নোদরপরায়ণ, নিষ্ঠুর উল্লাসে মেতে ভূমি করেছে বাঁটোয়ারা— তাহলে কি তারা আরো একটি যুদ্ধের মধ্যে দেবে না ঠেলে তোমাকে? যুদ্ধ ছাড়া তোমার কল্লা হয়ে যাবে দুভাগ।
মাহফুজা, ১৮৫৭ সালের সিপাইদের অসংগঠিত আত্মদান নিয়ে তুমি কি বাহ্বা দাও? যাদের ঝুলিয়ে দেয়ার আগে পৈশাচিক উল্লাসে কেটে নেয়া হয়েছিল অণ্ডকোষ, গরম শিক ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল চোখের ভেতর, জিভ দিয়ে চেটে নিতে হয়েছিল সহযোদ্ধার কর্তিত খুন— সেদিন তুমি ছিলে নবাববাড়িতে। তাদের ভুল ধরিয়ে দেবার তুমি কে! তুমি তো এখনো কালো রমণী, শাদার ভান করে আমাকে রাখছ দূরে।
মাহফুজা, তুমি জানো, আরো একশ বছর আগে আরেক নবাব হারিয়েছিল রাজ্য তার ঈর্ষান্বিত স্বজনের হাতে। মাহফুজা, এসব তো নবাব বদলের কাহিনি। আমি তো বৈদ্যনাথতলায় তখনো দিচ্ছিলাম লাঙল; এখনো তার ফলায় লেগে আছে মাটি। বলো, তাহলে আমি কীভাবে স্বাধীনতা হারালাম?
যুদ্ধমঙ্গল ৪
যুদ্ধের এসব উন্মাদনা দেখে তুমি ইয়ার্কি মেরে বলো মাহফুজা, যুদ্ধ ও বুদ্ধতে কী এমন রয়েছে তফাত! আপন পিতা বিম্বিসার ৯৯ পুত্রকে যুদ্ধে সাবাড় করে অশোকস্তম্ভগুলো এখনো যুদ্ধের বাণী কি সোৎসাহে করে না প্রচার! বলো, বোধিসত্ব কি তার অহিংসার শিকলে কেড়ে নেয়নি নিরস্ত্রের অস্ত্র দুখানা! রাজা মারে—রাজার হাতে অস্ত্র। প্রজার যুদ্ধ করা না করাতে কার এসে গেল বলো?
তুমি বলবে, এটা তো সত্য—অশোক যুদ্ধ থেকে নামিয়ে নিয়েছিল হাত। শান্তির বাণী দূর-দূরান্তে করেছিল প্রচার। কিন্তু যুদ্ধ ছাড়া তার নিজের রাজ্য কি ছিল নিজের কবলে! বেশ তো, যুদ্ধ ছাড়া যদি না থাকে রাষ্ট্র— তাতে ক্ষতি কী! তুমি কি বলবে, যুদ্ধ ও রাষ্ট্র তাহলে সমার্থক? তাহলে আমি বলি, দুটিরই অবসান হোক তবে।
যুদ্ধমঙ্গল ৫
তবু বলি মাহফুজা, যুদ্ধ ছাড়া আর আমাদের আছে কী বাকি! যুদ্ধলব্ধ গনিমতের মাল সব চলে গেছে খাজাঞ্চিতে। এমন কি যেসব অস্ত্র আমরা তুলে নিয়েছিলাম কথিত শত্রুর বিরুদ্ধে— সেসব এখন অস্ত্রাগারের রক্ষীদের কবলে। যদিও সহযোদ্ধারা আক্রোশে বলে, প্রয়োজন হলে আবার অস্ত্র তুলে নেব। কিন্তু কোথায় সে অস্ত্র!
একমাত্র গ্রেনেড-বিধ্বংসী প্রাণ ছাড়া কার্যত আমাদের হাতে আর কোনো অস্ত্র নেই।
গেরিলা যুদ্ধ ৫
এবার আমি সম্মুখযুদ্ধের সমাপ্তি ঘোষণা করলাম মাহফুজা। এবার আমি গ্রহণ করলাম গেরিলা যুদ্ধের কৌশল। আমাদের পরস্পরকে ধরাশায়ী করা ছাড়া আর কোনো যুদ্ধ থাকবে না পৃথিবীতে। তুমি তো আমাদের দেশে চিরকাল অচেনা মাহফুজা। এসব খানাখন্দে ভরা সর্পিল নদী; বর্ণিল ঋতুপ্রবাহে ক্ষণে বদলে যায় রূপ; যে কোনো আত্মরক্ষার কৌশল তুমি সংগঠিত করার আগেই— আমি অতর্কিত চালিয়ে দেব হামলা। তোমার কর্তিত হাত ও পা, ছিটকে পড়া ঘিলু—আমি রক্তাক্ত প্রান্তর থেকে কুড়িয়ে নিয়ে পরম যত্নে— সাজিয়ে দেব বিছানায়। পাঠ করব তোমাকে জাগিয়ে তোলার অভয়মন্ত্র বেহুলার নিয়মে। তোমার মতো ঘোর শত্রু ছাড়া, তোমার মতো আগ্রাসী ভিনদেশি ছাড়া— আর কোনো যুদ্ধে আমি উদ্দীপ্ত হব না। তুমি শাদা চামড়ার চতুর ব্রিটিশ! তুমি ভয়াল পাঞ্জাবি! তোমাকে পরাস্ত করা ছাড়া আমার রক্তের উদ্দামতা থামে না। আমাদের এই শত্রুতা আজন্ম মাহফুজা। এই যুদ্ধ থেকে পাবে না রেহাই আমাদের সন্ততি। তাই আমরা জেগে উঠি প্রবল আক্রোশে বংশপরম্পরায় এই গেরিলা যুদ্ধে।
সন্ধি ৬
অনেক হয়েছে লড়াই, এবার সন্ধির পালা
ক্লান্ত সৈনিকেরা অনন্ত ঘুমের কোলে নিয়েছে আশ্রয়
দূরাগামী অশ্বে সওয়ার হয়ে যারা এসেছিল প্রান্তরে
কিংবা অগ্রগামী পদাতিকের বেশে
তারা আজ কেউ নেই যুদ্ধের ময়দানে
তাদের কর্তিত হাত, বিখণ্ডিত দেহ
ছিন্নভিন্ন পড়ে আছে অপরাহ্ণের বাতাসে
কেউ নেই পুনরায় যুদ্ধ শুরু করার আগে
করতে পারে আমাদের ঝান্ডা বহন
তুমি একাকী দাঁড়িয়ে আছ বিধ্বস্ত সমরপ্রান্তরে
আমিও আজ হৃতসর্বস্ব ভিক্ষুকের বেশে
অথচ তুমি ছিলে মহারানি ভিক্টোরিয়া
আর আমি মহীসুরের টিপু সুলতান
তবু কেউ আজ পরাস্ত নই— সন্ধি তো যুদ্ধের নিয়ম।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।