সকল মেনু

তানজীনা ফেরদৌসের কবিতা

অপার্থিব প্রেমের দোরগোড়ায়

দু-চোখ চাইলেই আর অন্য পাড়ায়
কাজল পরতে যেতে পারে না,কত নীল বসন্ত কেটে গেলো রোমন্থিত প্রাচীন সুখে।

চুলে পাক ধরেছে ,চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা,
তখন–এখন–কখনোই আয়ু বাড়ানোর লোভ
আমাকে ছোঁয়নি।
থার্মোমিটার বেয়ে নামতে নামতে
আমি টের পাই আয়ুর রেখা, বাতাসে সবকিছু রয়ে যায়
আমাদের অনুপস্থিতিতেই শুরু হয় কথাবার্তা।

জীবিতদের যত গোপনীয়তা,
মৃত্যুর পর মানুষ সব জেনে যায়, মানুষ মরে গেলেই কেবল বিশ্বস্ত হয়। কারও গোপন কথা আর বলে না।
চোখ—সমুদ্রে মান হারানো নৌকা পাল তুলে দেয় নিঃশব্দে,
গন্তব্য— কোনো অপার্থিব প্রেমের দোরগোড়ায়।

 

প্রেমের মিথলজি

দীর্ঘ জলপ্রপাতের নিচে দাঁড়িয়ে
আগুন জ্বালাতে চেয়েছি—
শরীরের নাম দিয়েছি
তুমি নামক সাংবিধানিক এক রাষ্ট্রের নামে…

ভালোবাসা আজন্ম দোষ জেনেও
রোজকার পড়ার টেবিল আর পাঠাভ্যাসে থেকে যাও তুমি,
যেখানে প্রেমের মিথলজি বলতে শুধু তোমার আলিঙ্গন।
অথচ তোমার হৃদয়ে চলছে শীতকালীন অবকাশ—
যেখানে রকমারি অতিথি পাখিদের আগমনি কলতান।

নিঃসঙ্গ শালিকের মতো আমি চেয়ে থাকি,আর
আমার বারান্দায় গড়িয়ে পড়ে লুকানো সমুদ্র।

শরীর থেকে অনুভূতি মুছে গিয়ে জেগে ওঠে বিস্ময়।

 

ভালোবাসা পৌরাণিক অভ্যেস

হাত ধরাধরি করে চলার রাস্তার বাঁকটিও আগের মতোই জমজমাট,,,
জোড়া শালিকের আনাগোনায় শোরগোল গোলাপের মোড়।
শত আবদারেও পাওয়া হয়নি যে এক গুচ্ছ বেলী, সেই বেলী কি সাজিয়েছে অন্য কারো খোঁপা!
অথচ অন্য কেউ আমার খোঁপা রাঙিয়ে দিতে চান লাল গোলাপে।
গোলাপ কে স্থান দিলে কী বেলী’র আক্ষেপ বিদায় জানাবে চিরতরে?
জীবনের নামতা কষতে বসে একটা প্রশ্ন বারবার উঁকি দেয় সদর দরজায়—
আচ্ছা কল্পনার মতো জীবন নয় কেন, জীবনের মতো করে কেন কল্পনা ধরা দেয়?
যে হাতটি শক্ত করে ধরেছিলাম অবলীলায়, যে কাঁধে মাথা রেখেছিলাম আস্থায়–
সেই হাত সেই কাঁধ এখন কেমন আছে?
বহুদিনের অভ্যেস মনে আছে ওদের!
না-কি সেই অনুভূতিটুকুও আজ তামাদিতে বারিত?

 

হারানোর ভয়

এই যে আমি আমার মতোই যদি,
তোমার প্রাণে প্রেমের সুর তুলি।
তুমি শুধুই আমার সূর্যোদয় আর
উষ্ণতার একটি ইচ্ছে নদী।

এই যে এখন মন-কেমনের বেলা
অভিমানের চড়াই উৎরাই শেষে
তোমার বুকে জিরিয়ে নিয়ে বুঝি
শেষ হলো অবিশ্বাসী দহন দিনের খেলা।

যদি এমন কোন দিকশূন্যপুরে
বিসর্জনের বাজনা বাজে।
আমার ব্যথার আগুন সারে সারে
সেজে উঠবে কি পলাশ প্রদীপ হয়ে!

হবে কি তুমি সাঁওতাল মেঘ
সোনাঝুরির একলা আকাশ ঢেকে।
আমার সকল ব্যথা শুষে চাইবে
উথাল-পাতাল চৈতালী ঝড় হতে?

কিন্তু জানি এসব কিছুই নয়
এই বুকে শুধু নিঃস্ব নিরবতা।
সুযোগ পেলেই জিরিয়ে নিয়ো বুকে
বুঝে নিয়ো কবিতাটি হারানোর ভয়ে লেখা।

 

ভাষার ঋণ

সকালটা শুরু হয়েছিল অন্য সব দিনের মতোই,
মা ভেবেছিল ছেলে কলেজে যাবে, ফিরবে বিকেলবেলা।
কিন্তু শহরের বাতাসে সেদিন অন্যরকম একটা ডাক ছিল
ভাষার ডাক, অস্তিত্বের ডাক।

আমি কবি ও গল্পকার—-
আমি জানি ইতিহাস কেবল বইয়ে থাকে না,
ইতিহাস হামাগুড়ি দেয় মানুষের বুকের ভেতর।
সেদিন কিছু তরুণ বুক পেতে দিয়েছিল, তারা জানতো
কিছু শব্দ বাঁচাতে হলে,কিছু শরীরকে ঝরে পড়তে হবে।
রাস্তায় পড়ে থাকা একজোড়া চশমা,একটি ছেঁড়া খাতা,
আর রক্তে ভেজা শার্ট।
এইসব দিয়েই শুরু হয় অনেক গল্প আর কবিতা।
যেগুলো আমরা পরে নাম দিই “ভাষা আন্দোলন”।
আমি শুনেছি…..
একজন ছেলে শেষবার বলেছিল আমার মাকে বলবেন, আমি বাংলায় ফিরছি। তারপর আর ফেরা হয়নি,
শুধু তার নামটা রয়ে গেছে শহিদ মিনারের সিঁড়িতে ফুলের নিচে আর মায়ের কান্নার নিচে।
বছরের পর বছর কেটে যায়, আমরা বইয়ে পড়ি, মাইকে শুনি, মিছিল ও করি।
কিন্তু সেদিনের সেই মায়ের হৃদয়ের খালি উঠোনটা কেউ দেখেনি, যেখানে কলেজ থেকে শেষ বিকেলে আর কোনো পায়ের শব্দ ফেরেনি।
আমি কবি ও গল্পকার,
আমি জানি শহিদেরা কেবল স্মৃতিস্তম্ভ নন,তারা অসমাপ্ত জীবন,ভাঙা স্বপ্ন,আর আমাদের বেঁচে থাকা মানুষের দায়।
একুশে ফেব্রুয়ারি তাই শুধু একটি তারিখ নয়,
এটা সেই দিনের নাম যেদিন কিছু বীর শহিদ হয়ে প্রমাণ করেছিলো ভাষা কেবল কথা বলার মাধ্যম নয়,
ভাষা মানে বেঁচে থাকার অধিকার।

কবি তানজীনা ফেরদৌস। জন্ম: যশোর জেলার চাঁচড়া ইউনিয়নের তপসি ডাঙা গ্রামে। লেখাপড়া যশোর সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়, ডা. আব্দুর রাজ্জাক মিউনিসিপ্যাল কলেজে। সর্বশেষে ঢাকায় মোহাম্মদপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি থেকে আইনে অনার্সসহ স্নাতকোত্তর। বর্তমানে ঢাকা জজ কোর্টে আইন পেশার পাশাপাশি কথার কাগজ সাহিত্য পত্রিকা ও শব্দমুকুর জীবন যাপন পত্রিকায় কর্মরত আছেন। তানজীনা ফেরদৌস ছড়া দিয়ে লেখালেখি শুরু করেন। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ঝগড়ার বয়স বাড়ুক’ -আত্ম পরিভ্রমণের অনন্য উপলদ্ধি নিয়ে রচিত। দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমের হুলিয়া জারি হোক তোমার নামে’। তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ “খামবন্দি প্রেমের রসায়ন “। চতুর্থ কাব্যগ্রন্থ ই-বুক “বুকের দেরাজে প্রেমিকের কারাবাস”
পঞ্চম কাব্যগ্রন্থ ” প্রেম পরোয়ানায় আগাম জামিন”। সাহিত্য কর্মের জন্য পেয়েছেন একাধিক সম্মাননা পুরস্কার।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP