মানুষের দঙ্গল থেকে বেরিয়ে এসেও বুক ধড়ফড় করে ওর। বুক ভরে বাতাস টেনে নেয়ার চেষ্টায় আয়নায় মুখটাকে বিদঘুটে দেখায়। পানির রেণু চুলে-গালে-দাড়িতে লেগে আছে। কয়েক সেকেন্ড নিজেকে দেখতে দেখতে একসময় সে মুচকি হেসে ওঠে। এতদিনে পোর্ট্রেইট আঁকার জন্য মুখটা উপযুক্ত হয়ে উঠেছে!
গলা অবধি পানি খেয়ে আবার রাস্তায় নামে সে৷ ঝাঁকে ঝাঁকে রিকশা দাঁড়িয়ে, কিন্তু কেউ যাবে না। অবাক হবার মতো কিছু নয়। আজকাল এ শহরের এই তো রুটিন, প্রতিদিন কিছু না কিছু নিয়ে বিক্ষুব্ধ জনতার আন্দোলন জারি থাকে। প্রায় দু’দিন হলো এই রুটে বাস চলাচল বন্ধ। যদিও সিএনজি নেবার মতো মুরোদ নেই ওর, তবু খানিকটা চেষ্টা করে দেখতে দেখতেই তলপেটের ব্যথাটা বিদ্যুতের মতো চমকাতে শুরু করল।
আজ টাকা দিলেও এরা কেউ যাবে না-না রিকশা, না সিএনজি। নাকমুখ খিঁচিয়ে সোজা হাঁটা ধরবে কিনা তাই ভাবছে সে। সামনেই বড় রাস্তার মোড়, ছাত্ররা ওদিকটা আটকে রেখেছে। কজন সামনে এগোতে বারণ করল, বোধহয় মারামারি শুরু হয়েছে। হেসে ফেলে হামিম। মার তো কপালে ওর আছেই, হয় পিঠে নাহয় পেটে। কাজেই ভয়ে পিছপা হলে চলবে কেন! জেদি মোষের মতো ভেতরটা ফুঁসতে থাকে ওর।
কাজলের দোকানটা সামনেই। কিছুক্ষণ সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে একবার আকাশের দিকে তাকায় হামিম। বৃষ্টি নামার আভাস চারদিকে। এক আধুলির বৃষ্টি। শান্তির বারি নয়, করুণাধারা না কী যেন- ঠিক সেরকম। দু’ফোঁটার বৃষ্টিতে ভ্যাপসা গরমটা আরো বাড়বে। এতক্ষণ দরদর করে ঘামছিল সে, ভিড়ের প্রতিটি মানুষ। উটকো গন্ধটাও সয়ে গেছে, আর গা গোলায় না ওর।
দেরি না করে হামিম ভেতরে ঢুকে পড়ল। পা রাখার জো নেই ভেতরে-রড, সিমেন্ট, চটের বস্তা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এদিক ওদিক দেখল হামিম। না, কাজল নেই। একজন বলল গতকালকেও আসেনি কাজল। বৃষ্টি নেমে গেছে। অপেক্ষা করা ছাড়া আর কীই বা করার আছে হামিমের।
কাজলদের বাড়িতে সে বছরখানেক ভাড়ায় ছিল। সরু গলির ভেতর শ্যাওলাপড়া দেয়ালের ঘেরাটোপে রোদের মুখ দেখাই হত না। ক্যাম্পাস থেকে হাঁটা দূরত্ব বলে রাজি হয়ে গিয়েছিল সে। বাড়িটা আসলে বাড়ি নয়, একটা পঁচা সাবানের ফ্যাক্টরি। তার দেড়তলার ছাদের সাথে লাগোয়া যে সিঁড়িঘরটা সেটাই ভাড়া নিয়েছিল হামিম। সারাদিন ক্লাস করে, টিউশনি সেরে রাতে এসে ঘরটায় শুয়ে থাকত। শুরুর দু’মাস সময়মত ভাড়া দেয়া নিয়ে কোনো বেগ পেতে হয়নি ওর। ঝামেলা শুরু হল এরপর থেকে।
শহরজুড়ে গন্ডগোল বেঁধে বেশ কয়েকটা টিউশনি ছুটে গেল। ছুটা বুয়া না থাকায় কাজলদের রান্না নিয়ে প্রায়ই বেকায়দায় পড়তে হত। হামিম রান্নার ভারটা নিয়ে নিলে কাজল কিছুটা বাগে এসেছিল। কিন্তু কাজলের বাবা-বেশ ঠ্যাঁটা লোক। হামিম যতই তক্কে তক্কে পালিয়ে বেড়াতে চাইত, ততই ধরা পড়ত লোকটার কাছে। কড়ায় গণ্ডায় টাকা না নিয়ে ছাড়ার লোক ছিল না সে। মাসদুয়েকের মাঝে জমানো টাকা খুইয়ে বাড়িছাড়া হতে হয়েছিল হামিমের। বাপ-ছেলের সম্পর্কও তেমন ভাল ছিল না। ফ্যাক্টরির কাজে গরজ নেই বলে প্রায়ই মন কষাকষি হত ওদের। একদিন কথা কাটাকাটি থেকে হাতাহাতি হয়ে যেতেই কাজল বন্ধুর বাড়িতে গিয়ে উঠল। তারপর এই ওয়েল্ডিংয়ের কাজটা নিল। টঙের দোকানে চা খেতে খেতে কাজল ওকে সবই বলেছিল।
ঘড়ি দেখে হামিম। সবাই ব্যস্ত, কারুর সময় নেই ওর দিকে তাকাবার। কাজলের ফিরতে দেরি হবে কিনা সেও জানা গেল না। সে তবু অপেক্ষা করবে। মনে মনে কথা গোছাবার সময় পেয়ে একটু স্বস্তি লাগছে ওর৷ না এলেও হতো আজ, ফোন করে খোঁজ নেয়াই যেত। কিন্তু সেদিনের খবরটা দেখার পর ঘুসঘুসে জ্বরের মত যে ভাবনাটা ওকে অনেকটা সময় অস্বস্তিতে রেখেছে তা থেকেও তো রেহাই পেতে হবে।
যন্ত্রের বেগে কাজ হচ্ছে। নীলচে আলোর ঝলকানি থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকায় হামিম। রাস্তায় হেঁটে যাবার সময় ওয়েল্ডিংয়ের দোকান পড়লেই মা বলত শক্ত করে চোখ বন্ধ করে নিতে। হামিমের আজকাল মনে হয় কী হয় তাকিয়ে থাকলে? চোখ পুড়ে যাবে, অন্ধ হবে? তা হোক অন্ধ! দুদিন আগে ঘুমের মধ্যে সিলিন্ডার বিস্ফোরণ হয়ে মারা গেল কিছু মানুষ। হামিমেরও নাহয় সেরকম কিছু হোক।
জীবনটা যেমন ম্যাড়ম্যাড়ে-পান্তাভাত, মৃত্যুটা নাহয় একটু চমকদার হোক। এ শহর অবশ্য স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি দিতে অসম্মতি জানিয়েছে বহুকাল আগেই। ঢাকনা খুলে রাখা ম্যানহোল কিংবা নির্মাণরত দালান থেকে খসে পড়া রড- মৃত্যুর সব উপাচারই সহজলভ্য এ শহরে। শুধু ঘর থেকে দু’পা বাড়ালেই চলবে। ঘরের ভেতরেও বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে। গ্যাসের সিলিন্ডারতো ঘরের ভেতরেই বিস্ফোরিত হয়েছিল! আজকাল তাই পত্রিকার শিরোনামগুলো হওয়া উচিত কে কোথায় ঘুমের ভেতর, নিরিবিলিতে নিরেট সুখে আচ্ছন্ন অবস্থায় মরে গেছে-তাই নিয়ে। এরচেয়ে বড় ব্রেকিং নিউজ আর কী হতে পারে! নিজের ভাবনায় হামিম একা একাই হাসে।
যন্ত্রের ঘড়ঘড়, নীলচে আগুনের চোখরাঙানি বেড়ে চলেছে। এতক্ষণ ধৈর্য ধরলেও এবার উসখুস করে ওঠে সে। এই রে, কাজল কি আর আসবে না? ফোন বেজে বেজে থেমে গেছে; মেসেজ দেয়াটা কি তাহলে ভুলই হল? এখন হয়ত আর ইচ্ছে করেই আসবে না। নাহ, ছেলেটা নিতান্তই কর্মচারী, হামিমকে এড়াতে কাজে ফাঁকি দেবার মত স্বাধীনতা নিশ্চয়ই ওকে মালিক দেয়নি!
ঘড়ির কাঁটা ঘোরে, যন্ত্র ঘোরে, লাল-নীল আলো জ্বলে নিভে।
হামিম একসময় বুঝতে পারে-এখানে আর অপেক্ষা করাটা হয়ত নিজের সাথেই প্রতারণা। সে দরজার দিকে এগোয়।
হঠাৎ যন্ত্রটা থামতেই সব একেবারে শুনশান হয়ে গেল। নীলচে আলো নিভে গিয়ে অন্ধকারটা তিরতির কাঁপতে লাগল। কানের দুপাশে ঝিঁঝিঁপোকারা জেঁকে বসল।
কেউ বোধ হয় এবার পাশ থেকে বলল-‘কাজল আসছে!’
হামিম অকারণেই পিঠ সোজা করে দাঁড়াল এবার। এতক্ষণ ঝুলে থাকা শরীরটা যেন হঠাৎ নিজের ওজন টের পেল। দরজার দিকে তাকায় হামিম। একটা চেনা, ক্লান্ত চোখমুখ। কিছু না বলেই কাউন্টারের ওপর কাজল একটা ছোটো প্যাকেট রাখল। মুঠোটা বোধ হয় একবার কেঁপে ওঠে। তারপরই ব্যস্তভঙ্গিতে সরে যায় সে, চোখাচোখি হয় না। হামিম প্যাকেটটা পকেটে ঢুকিয়ে আর দাঁড়ায় না; চটপট বেরিয়ে পড়ে ওখান থেকে। বাইরে তখন বৃষ্টি নেই। ভেজা রাস্তার ওপর শহরের ছায়া টুকরো টুকরো হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে। রিকশাগুলো তখনো ঝাঁকে ঝাঁকে দাঁড়িয়ে। হাঁটতে থাকা মানুষগুলো কেউ কাউকে দেখছে না। পায়ে পায়ে হোঁচট খাচ্ছে ক্লান্তি, অদৃশ্য কারুর প্রতি ফুঁসতে থাকা কদর্য গালি।
হামিম দেখল মোড়ের কাছে ভিড় ঘন হয়ে উঠেছে। লাঠি, পতাকা, ভেজা কাগজের পোস্টার-সব একসাথে দুলছে। কেউ ঠেলছে, কেউ থামতে বলছে, কেউ কারো দিকে তাকাচ্ছে না। ধাক্কা খেতে খেতে প্যাকেটটা বুকের ওপর ঠোঁকর খায়। হামিম জানে ভেতরে খুব পরিচিত একটা নাম আর কিছু ওষুধের তালিকা। উল্টোপিঠে আঁকা কিছু পোর্ট্রেইট। হয়ত কাজলেরও স্কেচ থাকতে পারে সেখানে। আচ্ছা, কাজল কি জানত এতকিছুর পরেও হামিম একদিন এভাবে ফিরে আসবে, তোষকের নিচে ফেলে আসা কয়েকটা পুরনো প্রেসক্রিপশনের জন্য? কাগজগুলো না পেলে খুব বেশি ঝামেলা হত না কিন্তু আজ না এলে সেদিনের খবরটা হামিমকে এখনো তাড়িয়ে বেড়াত।
ফেসবুকের সেই ভিডিওটা, দেখতে না চেয়েও দেখে ফেলেছে হামিম। পুড়ে অঙ্গার হয়ে যাওয়া যুবকের শরীরটা ভিডিওতে ঝাপসা করে দিয়েছিল ওরা৷ তাকে চেনার কোনো সুযোগ ছিল না কিন্তু কাজলেরই নামে নাম ছিল ওর। কাজল কি খবরের কাগজ পড়ে না? ফেসবুক তো দেখে নিশ্চয়ই! বীভৎস খবরটা কি ওকেও বিহ্বল করেনি?
এইসব ভাবতে ভাবতেই ভিড়ের ভেতরে ঢুকে হাঁটতে শুরু করে হামিম। ভিড় তাকে টেনে নিতে নিতে একসময় নিজের বিশাল উদরে গিলে নেয়। রাস্তার বুকের ভেতর সে মিশে যায়-নামহীন, শব্দহীন এক পথচারী হয়ে, যেমন প্রতিদিন হাজারো হামিম মিশে যায়, সবার অগোচরে।
দূরে কোথাও মিছিলের শব্দ ওঠে, প্রথমে গুঞ্জন, তারপর গলা ফাটানো চিৎকার। পেটের ব্যথাটা বিপ্লব শুরু করবে এখুনিই, কিন্তু দাঁড়িয়ে থাকলে চলবে না। হাঁটার গতি বাড়ায় হামিম। এই শহরে মানুষের আর কিছু করার নেই-শুধু হাঁটতে থাকা ছাড়া।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।