স্মরণশক্তি নিজের সঙ্গে প্রতারণা করছে আজকাল। স্মৃতির হেঁয়ালিপনায় আমি যখন দুমড়ে-মুচড়ে একাকার, তখন মনে হয়, সেই দৃশ্য দেখে কেউ একজন বিমলানন্দে ভাসছে। দূরে বসে। এই যেমন সপ্তাহ খানেক আগের ঘটনা। পুরনো সহকর্মী পাসকালের সঙ্গে দেখা হয় না অনেকদিন। ভাবলাম একবার যাই ওর কাছে। ১৩ নম্বর মেট্রো ধরে নামলাম মেরি দ্য সাঁতোয়ায়। বেরোতেই কফিশপ। সেখান থেকে একটা কাফে এসপ্রেসো নিয়ে রাস্তা পেরোলাম। ট্রাম ধরবো। কাফেটা শেষ হতে না হতেই ট্রামের দরজা খুললো পায়ের কাছে। কিছুদূর যাওয়ার পর, হঠাৎ মাঘের দাপুটে বায়ুর মতো একটা হিম অনুভূতি বয়ে গেল মেরুদণ্ডজুড়ে। ‘কোথায় যাচ্ছি আমি?’ নিজেকেই প্রশ্ন করলাম। উত্তর খোঁজার আগেই পরের স্টপেজে দুয়ার মেলে দিল ট্রামটি। এক লাফে বেরিয়ে এলাম। বসে পড়লাম পথের পাশে।
সকালের নিরুদ্দেশ সূর্যটার সন্ধান মিলেছে। তাপ নেই বললেই চলে। হিমাগম। শীত খোলস ছাড়ে ছাড়ে। হেমন্তের দুপুর। অথচ মাথার চারপাশে ধেয়ে আসছে ঘন অন্ধকার। কতক্ষণ তা জানি না। বসে আছি। চোখ বন্ধ করে। মনে পড়ছে। মাস ছয়েক আগে পাসকালকে শেষবার দেখতে গিয়েছিলাম, হাসপাতালে। পঁচিশ বছরের তরুণ। সুঠাম দেহটা ততদিনে শুকনো কড়িকাঠ। কপালের ওপর পড়ে থাকা বাদামি চুলগুলো ঝরে গেছে বহু আগেই। কয়েক গোছা অবিন্যস্ত। বিস্তীর্ণ মরুর বুকে অকিষ্ণিৎ উদ্ভিদের মতো। কিছু বাক্য বিনিময়ের পর, ঘুমিয়ে পড়েছিল একসময়। অথৈ ক্লান্তি আর যন্ত্রণার ছাপ ওই উজ্জ্বল মুখটার ওপর এঁটে ছিল মুখোশের মতো।
তার দুদিন বাদে, এক সন্ধ্যায়, ওর স্প্যানিস সঙ্গিনী জোয়ানার ফোন। ‘পাসকাল আজ দুপুরে আমাদের ছেড়ে চলে গেছে।’ কান্নায় আদ্রকণ্ঠ জোয়ানার, ‘আমরা দেহ নিয়ে নরমন্দির পথে। ওর বাবা-মা ওখানেই থাকেন।’ আরও মনে পড়ল, পাসকাল ক্যানসারে ভুগছিল। জেনেছে বছর খানেক আগে। ততদিনে কিছুই করার ছিল না অবশ্য।
জান্কে ঘটনাটি বললাম। ‘ঘুম হচ্ছে না বোধ হয় তোমার।’ ও আমার চোখের দিকে তাকালো, ‘কাজ থেকে দিন পাঁচেক ছুটি নিয়ে বিশ্রাম করো। ঠিক হয়ে যাবে।’
ঘুমে যে সমস্যা হচ্ছে না, তা বলা যাবে না। তবে সময়ের অভাবে যে ঘুম হচ্ছে না, তা নয়। ঘড়ির কাঁটা পিছিয়েছে ঘণ্টা খানেক। অক্টোবরের শেষাশেষি। দিন খুবই ছোট এখন। পাঁচটা বাজতেই সন্ধ্যা নামে। বিছানায় যাচ্ছি রাত নয়টার মধ্যেই। চোখ জুড়ে রাজ্যের ঘুম। ঘণ্টাখানেক বেঘোর। তারপর হঠাৎ যে ভেঙে যায়, আর ধরা দেয় না। কোথায় যে পালায়! ঘুম ভেঙে গেলে মুঠোফোনে সময় দেখি। স্ক্রিনের নোটিফিকেশন তল্লাশির ফাঁদে পেরিয়ে যায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ততক্ষণে ঘুমের ছিটেফোঁটাও অবশিষ্ট নেই চোখে।
ইদানীং সমাজযোগাযোগ মাধ্যমে ঢু মারতেও ভয় হয়। এতো মৃত্যুর খবর! কাছের-দূরের কত মানুষের। কত দুর্ঘটনার খবরও যে ভেসে বেড়ায়।
মাঝেমাঝে মনে হয়, এখন কি মানুষের আয়ু কমে এসেছে খুব? আগেও তো মারা যেত মানুষ। হঠাৎ মসজিদের মাইকে ভেসে আসতো সেই মৃত্যুর খবর। কখনো মাসে একবার। আবার কখনো সপ্তাহে একাধিক মৃত্যুর সংবাদ হাঁকতেন মোয়াজ্জিন। ‘একটি শোক সংবাদ। নিশ্চিন্তপুর নিবাসী জনাব…।’ সেই সংবাদ ভেসে আসতো মধ্যরাতে। অথবা প্রদোষে। মনে আছে, একেকদিন একেকটি মৃত্যু মানুষের মনে শোকের ছায়া ফেলতো। পুরো এলাকাজুড়ে। আর এখন? মৃত্যু সংবাদের পোস্টারে ছেয়ে যায় ফেসবুকের দেয়াল। ‘অন্তিম শ্রদ্ধা, গভীর শোকাহত, আত্মার শান্তি হোক।’ ছোট ছোট বাক্যে শোক জানানো, এইটুকুই। আঙুল ঘষটে পরের ফিডে। মৃত্যু ছাপিয়ে আনন্দের কোনো উপলক্ষ। দিনকে দিন অনুভূতিশূন্য হয়ে পড়ছে কি মানুষ? প্রতিক্রিয়া কিংবা কাগুজে প্রতিবাদই এখন মানুষের প্রধান বৈশিষ্ট্য! অসাড় ভাবনা, আধখেঁচড়া ঘুম-তিতিবিরক্ত মন নিয়ে দিন শুরু হয় প্রায়ই।
অফিসের কাজেও যে ইদানীং খুব মন বসছে না, তা বুঝতে পারি। যে কাজটি কয়েক মিনিটে করা যায়, সেই কাজে বারবার ভুল। পেরিয়ে যায় কয়েকঘণ্টা। পাকে-প্রকারে সময়টা শেষ করেই বেরিয়ে পড়ি। ঘরে ফেরার তাড়াও অনুভব করি না খুব। ঘুরে বেড়াই। পারীর সাঁ মিশেল বুলভারে। বইয়ের দোকান জিবের জোজেফে। কিংবা পুরনো বইয়ের সম্ভার বুলিনিয়েতে। শাতলের কাছে লেয়ালেও আছে আরেকটি বুলিনিয়ে। ওখানেও যাই প্রায়শই।
যাওয়া হয় বিবলিওথেক বা গণগ্রন্থগারেও। কত রকমের বই যে প্রকাশ হয় এই ফরাসি দেশে! শিল্প-সাহিত্যের বাইরেও অন্তহীন বিষয় বৈচিত্র। প্যারিসের কোথায় কোথায় মলমূত্র ত্যাগ করা যায়, তা নিয়েও ঢাউস এক বই চোখে পড়ল সেদিন। কী অনিন্দ্য তার বিন্যাস! কিংবা ল্য শা বা বিড়ালকে নিয়ে লেখা কয়েকশ পৃষ্ঠা। বিশ্বখ্যাত ফরাসি কবি-সাহিত্যিকরা কে কী লিখেছেন বিড়াল নিয়ে, তার অনবদ্য সংকলন।
বইপত্র নাড়াচাড়া করতে গিয়ে ভুলেই যাই, কখন সূর্য ঢুবে গেছে। মুঠোফোনটা বেজেই যাচ্ছে। নিঃশব্দে। রিংটোনের টুটি চেপে রাখা। হাতে নিতেই চমকে উঠি। ছোট্ট চড়ুইয়ের মতো ফুরৎ করে পালিয়ে গেছে সময়। চারটায় ঢুকেছি, এখন সন্ধ্যে সাতটা। সব সময় যে বইয়ের দোকানেই সময় কাটে, তা নয়। দিকভ্রান্তের মতো হাঁটি। পথে পথে। এই শহরে পায়ে হাঁটার জন্য যে সুব্যবস্থা, তা বলে বোঝানো যাবে না। চোখবন্ধ করেও হেঁটে যাওয়া যায়, পথের পর পথ। দূরত্বের পর দূরত্ব। লা সেন নদীর দু-ধারে বাঁধানো মসৃণপথ, সুস্থাপত্যের নজির পাড়াপাড়ের সেতুগুলো। রূপকথার বইয়ের মতো। একটার পর একটা পাতা উল্টে যাই, তারপর কী দেখার জন্য।
কখনো জান্ও সঙ্গী হয়। ওপর পুরো নাম জান্ ফুজিকাওয়া। মা ফরাসি। বাবা জাপানি। স্থাপত্যশিল্পে পড়াশোনার জন্য জাপান গিয়েছিলেন ওর মা। সেখানেই সহপাঠী সঙ্গে প্রণয়। তারপর বরকে নিয়ে ফিরেছেন ফ্রান্সে। থিতু হয়েছেন এখানেই। ওর বাবার ব্যাগের পসরা। প্রতিটি ব্যাগে শোভা পায় নানা চিত্রকর্ম। যা তিনি নিজেই আঁকেন। মা চাকরি করেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। দেশ-বিদেশেই কাটে বেশিরভাগ সময়। জানের সঙ্গে পরিচয় একটি অ্যাসোসিয়েশনে। ফরাসি ভাষা শেখায় সেখানে। আমি ছিলাম ওর ছাত্র। বয়স ছাব্বিশ কি সাঁতাশ হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়েছে সবে। ওর সঙ্গে কয়েকদিনের আলাপে গড়ে ওঠে সখ্য। তারপর বন্ধুত্ব। দুবছর তো হবেই চেনাজানার। মেয়ে হিসেবে বেশ নরম স্বভাবের জান্। জাপানি-ফরাসি মিশেলে কোমল কাঞ্চনফুল ফুঁটে আছে মুখে। চোখ দুটো জাপানিদের মতো কিছুটা ক্ষুদ্রকায়। আর চেহারার মাধুর্যটা পেয়েছে মায়ের। গাঁয়ের রঙ ফ্রমাজ তথা ফরাসি দেশের চিজের মতো।
কাজ শেষে সপ্তাহে দু-একদিন দেখা হয় আমাদের। ঘুরে বেড়াই। পায়ে হেঁটে। ও-ই প্রথম নিয়ে গিয়েছিল ৭৪ র্যু জু কারডিনাল ল্যোমোয়ানে। কারতিয়ে লাতা। এই ঠিকানায় থাকতেন বিখ্যাত লেখক আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। পাঁচতলা দালান। তার তেতলায় ভাড়া অ্যাপার্টমেন্টে। ১৯২২ সালের জানুয়ারি থেকে ১৯২৩ সালের আগস্ট অবধি। স্ত্রী হ্যাডলি রিচার্ডসনের সঙ্গে। বাড়িটির ফটকের উপরে আঁটা সাইনবোর্ডে লেখা সেই তথ্য। গাঢ়ো নীল রঙের দুয়ার। সোনালী হাতল। আধুনিক স্থাপত্যের গোড়ার নজির হয়ে দাঁড়িয়ে বাড়িটি। বহুবর্ষী পুরনো পথ। যেই পথে হেঁটেছেন হেমিংওয়ে, আমরা হাঁটি সেই পথে। ‘দেখো দৃঢ় চোয়ালের শশ্রুমণ্ডিত ওই লোকটিকে?’ জান্ উৎফুল্ল ভঙ্গিতে বলে ওঠে, ‘মনে হচ্ছে না হেমিংওয়ে?’
চোখ তুলে তাকাই। সুঠাম দেহী। ফরাসি মত্যো জড়ানো গায়ে। মনে হচ্ছে লম্বা শশ্রুতে ঘি ঢেলে দিয়েছে কেউ। মাথায় বাঁকানো হ্যাট। ‘তাই তো! এখনো হয়তো এই পথে পায়চারি করেন হেমিংওয়ে। দিনের আলোয়। কিংবা রাতের ঘন অন্ধকারে। ফিরে ফিরে আসেন স্মৃতির অলিগলিতে।’ বিস্ময় ফোঁটে আমার কণ্ঠে। ‘তুমি কি পুনর্জন্মে বিশ্বাস করো?’
‘যে জীবন থেকে স্বেচ্ছায় বিদায় নিয়েছেন হেমিংওয়ে, সেই জীবন কি ফের চাইবেন তিনি?’ উলের শোয়েটারের আস্তিনে হাত গুঁজে দিয়ে প্রশ্নটি ছুড়ে দেয় জান্।
‘ওইটুকু ছাড়া বাকি জীবনটা?’ জানের সঙ্গে দ্বিমত জানাই। ‘যুদ্ধক্ষেত্র থেকে লেখার টেবিল, গভীর সাগরে মৎসশিকার, ক্যারিবিয়ান দ্বীপপুঞ্জসহ পৃথিবীর নানাপ্রান্তে ছুটে বেড়ানো জীবনটাকে এপাশ-ওপাশ করে ওঁর মতো কজনই দেখেছে আর?’
স্মিত হাসিতে মাথা নাড়ে মেয়েটা। ছায়ার দূরত্ব ছিল দুজনের মাঝে। সেই ব্যবধানে ছেঁদ টেনে নিজের বাহুতে টেনে নিল আমার বাহুটা। শতাব্দীর পুরনো র্যু মুফতার বেয়ে হাঁটছি আমরা। পেছনে পড়লো পনিরের দোকান। একটা টক গন্ধ সঙ্গী হলো আমাদের। ফল আর সবজির পসরার কাছে আসতেই তা উধাও। পাশাপাশি চলল স্ট্রবেরি, কমলালেবু আর আপেলের মঁ মঁ ঘ্রাণ। মাংসের দোকানিরা ব্যস্ত খদ্দরের সঙ্গে আলাপে। শুকনো রক্তের ঝাঁঝাঁলো গন্ধটা থরে থরে বাতাসের ভাজে। আরও কিছুটা পথ পেরোলে মাখনের প্রলেপ দেওয়া অর্ধচন্দ্র গরম ক্রোয়াসোঁর নরম সুবাস। নাক গলিয়ে সিঁধিয়ে গেল আঁতের গহ্বরে। সঙ্গে চুল্লি থেকে সদ্য ভূমিষ্ঠ দণ্ডসম বাগেতের স্বাদু গন্ধটা গ্রাস করছে সব। সেই সঙ্গে, আমাদেরও। মিহিদানা বৃষ্টির মতো উতরে যাচ্ছি গাঢ় বাতাসে।
দিনভর বৃষ্টি। ভিজে ভিজে সজল পারীর পথঘাট। নভেম্বরের শুরুতে ঠাণ্ডা পড়েছে বেশ। আজ জেরোমের জন্মদিন। বন্ধুদের নিয়ে রাতে খাবে রেস্তোঁরায়। সকালে বাসা থেকে বেরোবার আগে মনে করিয়ে দিল। জেরোমকে কী উপহার দেওয়া যায়? অফিস থেকে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ভাবছি সে কথাই। উপহার যাই হোক, একটা বই থাকতেই হবে সাথে। বেশ পড়ুয়া ছেলে জেরোম। জাতিতে মেক্সিকান। বছর ছয়েক হচ্ছে থিতু হয়েছে ফ্রান্সে। পড়ছে আর্ট নিয়ে। পারীর সাঁ জ্যরমা দে প্রের একটি ছোট্ট স্টুডিওতে থাকি দুজনে। গোলগাল চেহারা জেরোমের। গায়ের রঙ টকটকে লাল। গায়ে-পায়ে যেমন লম্বা, তেমন সুঠাম। ওর বয়সের তরুণদের ফরাসিদের ভাষায়, দু-চারজন প্যঁতিত আমি বা প্রেমিকা থাকা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। স্বাভাবিক তাদের সঙ্গে সংসর্গও। বিস্ময়কর হচ্ছে, জেরোম তাদের তুলনায় আলাদা। বান্ধবীদের কথা তুললে, আলাপে আগ্রহ দেখায় না মোটেও। সময়-অসময়ে অজস্র প্রশ্নের অত্যাচারে জেরবার হয়ে ভাবলেশহীন জবাব ওর, মেয়ে বন্ধু আছে কয়েকজন। প্যঁতিত আমি নেই একজনও। এ ব্যাপারে নিরাগ্রহই ওর।
হাঁটছিলাম মেট্রো ধরবো বলে। অন্যমনষ্ক হয়ে পড়েছিলাম কিছুটা। পা দুটো ভুল করেনি। সোঁজা এনে দাঁড় করিয়েছে মেট্রো স্টেশনের সামনে।
সময়সূচির বোর্ড বলছে পরের মেট্রোটি আসতে বাকি মিনিট পাঁচেক। ডানে-বায়ে সুরঙ্গ গলিপথ। ঘুটঘুটে অন্ধকার। এপাড়-ওপাড় প্ল্যাটফর্ম। ওইটুকুতেই আলো। মাঝে মেট্রো চলার সরু ইস্পাতের লাইন। প্ল্যাটফর্ম থেকে বেশ নিচে। উন্মুক্ত প্রগাঢ় অন্ধকার। বিপজ্জনক চিহ্ন দিয়ে সতর্ক করা। কড়া বারণ। নামা যাবে না এখানে। কেন নামা যাবে না? কী ক্ষতি নামলে? কীসের বিপদ? কোনো বিপদ তো চোখে পড়ছে না! একটা লাফ দিয়ে নেমে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে তেলতেলে ইস্পাতের ওপর। কিছুটা এগিয়ে যাই। প্ল্যাটফর্মের অনেকটা কিনারায়। পা ফেলার জায়গা নেই আর। দেখাই যাক না একটা লাফ দিয়ে! ডানপাশের অন্ধকার প্রোকোষ্ঠে শো শো শব্দ। ধেয়ে আসছে। ঘূর্ণিঝড়ের মতো। শব্দটা প্রকট হচ্ছে বাতাসে। সর্পিল পথ বেয়ে ছুটন্ত ঘোড়ার মতো, শাঁ শাঁ ধেয়ে আসছে মেট্রোরেল। অন্ধকারের গর্ভ থেকে আলো ফুটেছে সামান্য। হঠাৎ মুঠোফোনটা বেজে ওঠে আচমকা। জাঁকুনি দিয়ে জ্বর আসার মতো কাঁপতে থাকে শরীর। মুহূর্তে পিছিয়ে যাই কয়েক পা। স্ক্রিণে চোখ রাখি। ‘হ্যাঁ, মোহিত? কোথায় আছো?’ জান্রে কণ্ঠ।
এক তরুণকে নিয়ে এসেছে জান্। রাফায়েল। সংক্ষেপে রাফ্। বন্ধু বলে পরিচয় দিল ও। চেহারা বলছে, চৈনিক। বাঁশ গাছের মতো। যেমন লম্বা। তেমন লিকলিকে। ওর পাশে জান্ খর্বকায়। সে কারণেই কিনা জানি না, জানের পাশে ছেলেটিকে চোখ সওয়া লাগছে না। নাকি ঈর্ষা? তা-ও বলা কঠিন।
ঠাণ্ডা সত্ত্বেও উলের একটা শর্ট সোয়েটার জড়িয়েছে জান্। পান্তালু আর সোয়েটারের মাঝে উঁকি দিচ্ছে পেটের শুভ্রতা। নাইকুন্ডলের চারপাশে হালকা বাদামী পশমের ঔজ্জ্বল্য। মুগ্ধতায়দগ্ধ হচ্ছে চোখ দুটো। এর আগেও অনেক দেখেছি জান্কে। খোলামেলা পোশাকে। আজ একটু বেশিই পুষ্পবতী লাগছে ওকে। চোখেমুখে ঝলমলে ভাব। তবে রাফের ধবল মুখটায় কুণ্ডল মেঘের আভাস। চোখ তুলে পা থেকে মাথা পর্যন্ত কয়েকবার মেপে নিল আমাকে। আমিনের জমিন মাপের মতো। হয়তো আমরাই মতো, ওরও মনের অবস্থা। জানের পাশে সাড়ে পাঁচ ফুটের শীর্ণকায় জীবটাকে বেমানানই ঠেকছে ওর চোখে। সাক্ষাতের বাকিটা মুহূর্ত খানিকটা অব্যক্ত অস্বস্তিতেই কাটলো ওর। বুঝলাম, চেহারায় ফুটে ওঠা ছবি আর যৎসামান্য আলাপে।
‘রাফ্ খুব ভালো পিয়ানো বাজায়।’ জানের ঠোঁটের ওপর গড়ানো হাসিতে নির্মল আনন্দ। ‘সামনে মাসেই তো একটা সলো শো আছে। তুমি চাইলে যেতে পারো আমার সাথে।’
‘নিশ্চয়ই।’ রাফের দিকে চোখ রেখে বললাম। ‘দিনক্ষণ জানিয়ে দিও তবে।’
তারপর কথা হলো আরও কিছু বিষয় নিয়ে। শেকড়ের সন্ধান। কেন সেই শেকড়ের সঙ্গে দূরত্ব। অতিসাধারণ, মূল্যহীন আলাপে রঙ চড়াতে জান্ জুড়ে দিলো আমার একটু আধটু লেখার বাতিকের গল্প। বাংলা ভাষার সাহিত্য। রাফ্ জানালো, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখার সঙ্গে তার পরিচয়ের কথা। ফরাসি অনুবাদে তাঁর কয়েকটা গল্প পাঠের অসামান্য অভিজ্ঞতাও। কিন্তু কিছুতেই আগ্রহ পাচ্ছিলাম না খুব। আশ্চর্য! ঘোরাচ্ছন্নের মতো ভাবছিলাম, রাফের কথা আগে তো কখনো বলেনি জান্! বন্ধুত্ব? নাকি অন্যকিছু? ‘ছেলেরা বন্যপশুর মতো, শরীর ছাড়া কোনো প্রত্যাশা নেই।’ প্রণয়, বিয়ে এসব প্রসঙ্গ এলেই যে রোষ ফুটতো ওর চোখেমুখে, তা কি সর্বৈব মিথ্যা? তবে কি এসব তারÑ। আমাকে এড়িয়ে যেতেই কিÑ। নাকি আমিও ভেতরে ভেতরে পুষে যাচ্ছি সেই বন্য পশুটা, তা জানতেই ওর নানা কৌশল? মাথার ভেতর দিয়ে এইসব ভাবনার গতায়াত যখন, তখন খুব সন্তর্পণে সেই নিকষ কালো অন্ধকারটা হাত ধরাধরি করে গোল হয়ে এলো মাথার চারপাশে। বাইরে হাড়ে দাঁত ফোঁটানো শীত। ভেতরে আগুনের হলকা। দগ্ধ হচ্ছি। মুখ ঘেমে কাই-কাই দশা। চোখবন্ধ করে বসে পড়লাম। বৃংহণের মতো হুইসেলে একটা দ্রুতগতির ট্রেন সেই অন্ধকারকে ছিঁড়ে-খুড়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। গুঁড়ো হয়ে যাচ্ছি কাঁচের মতো। পায়ে পায়ে পিষে যাচ্ছি, ম্যাপল-পপলারের শুকনো পাতার মর্মর শব্দে।
মাস ছয়েক হতে চললো। আলাপ নেই জানের সঙ্গে। না ফোনে। না সাক্ষাতে। হঠাৎ করেই টেনে নিলাম ব্যবধানের এই দেয়াল। নম্বরটা ব্লক কলারে। জানের সঙ্গে আমার চেনাজানার সুতো হাতড়ে, উত্তর খুঁজি সম্পর্কের। সম্পর্কটা কি বন্ধুত্বই ছিল না? রাফের সঙ্গে ওর ঘনিষ্ঠতায় আহত হবারই কী আছে? নিজেই নিজের মুখোমুখি হয়েছি একবার। বহুবার। অবশ্য যোগাযোগ করার আগ্রহ খানিকটা অবশ হয়ে এলেও ফুরিয়ে যায়নি। তবে নিজে থেকে যোগাযোগে কোথাও একটা কুণ্ঠা। ওর সঙ্গে পরিচয়ের পর থেকে বিগত যৌথ সময়। ফালি ফালি অসংখ্য স্মৃতিতে আক্রান্ত। গৃহপালিত পশুর মতো স্মৃতির জাবর কাটি অবসরে। তখন হাত ধরাধরির কালো পোশাকের অন্ধকারটা চলে আসে হুটহাট। যুঝে যাচ্ছি সময়ের সঙ্গে। মাসখানেকের লম্বা বিরতি নিয়েছি চাকরি থেকে। ফরাসিরা যাকে বলে, কঁজে। একবছর কাজ করলে প্রায় একমাস বেতনসমেত ছুটি। নিই-নিচ্ছি করে জমে গেছে ঢের। মানসিক চাপ কমাতে দূরে কোথাও ভ্রমণে যাওয়ার পরামর্শ দিলেন চিকিৎসক। সেই সুযোগে ছুটির দরখাস্ত। মঞ্জুরও হলে গেল। তবে কোথায় যাবো, কী করবো তা ঠিক হয়নি এখনো। জীবন প্রায় থিতিয়ে এসেছে যেন।
জেরোম ব্রাসেলসে। ওর বন্ধু গিয়মের আমন্ত্রণে। সপ্তাহ দুয়েক থাকবে বলে গেছে। গেলরাতে ওর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হলো দীর্ঘক্ষণ। কী খাচ্ছে, কোথায় যাচ্ছে সেই বর্ণনা। ইচ্ছে না থাকলেও শুনতে হলো অগত্যা। ঘুমের কথা বলায় পরিত্রাণ মিললো বটে। পরক্ষণে পলাতক হলো ঘুমও। তার ফেরার আশায় রাতভর খুলে রেখেছিলাম জানালা। রাতে আর তার খোঁজ মেলেনি। তবে সেই সুযোগে জানালা টপকে ঘরে ঢুকেছে দিনের আততায়ী আলো। বিছানায় পড়ে ছিলাম তবুও। দুপুর হতে চললো প্রায়। আর থাকা যাচ্ছে না। উঠিউঠি করছি। ল্যান্ড ফোনটা বেজে উঠলো তখনই। ‘হ্যালো মোহিত?’ তুলতেই উদ্বেগমাখা কণ্ঠ। ‘তুমি ঠিক আছো তো?’
‘এই তো, চলে যাচ্ছে সব মিলে।’ আমার জড়ানো কণ্ঠ ভেসে গেল ওপাশে। ‘তুমি?’
‘মন্দ না। যাক অবশেষে তোমায় পাওয়া গেল!’ একটা ছোট্ট নিঃশ্বাস ভেসে এলো এপাশে। ‘সেই কবে থেকে চেষ্টা করে যাচ্ছি, ফোনে পাচ্ছি না তোমাকে।’
‘ফোনটা বন্ধ ছিল কিছুদিন।’ ভাবলেশহীনভাবে জবাবটা উড়িয়ে দিলাম বাতাসে। ‘এখন ঠিক আছে।’
‘তোমার অফিসে ফোন করে জানলাম ছুটিতে আছো।’ কণ্ঠটি নমনীয় হয়ে এলো খানিক। ‘ওরাই তোমার ল্যান্ড ফোন নম্বরটা দিল।’
‘রাফ্ কেমন আছে?’ অজান্তেই মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল প্রশ্নটা।
জান্যে হাসির শব্দটা ঝনঝনিয়ে উঠলো, ‘আরে ওর কথা বলতেই তো হন্যে হয়ে খুঁজছি তোমায়।’
‘কেন, কী হয়েছে এমন?’ জবাবটা রুঢ় শোনায় নিজের কানেই।
‘রাফের বিয়ে। তোমায় নিমন্ত্রণ করেছে।’ কণ্ঠে উচ্ছ্বাস ঢেলে দিল জান্। ‘আন্দ্রেয়াকেই বিয়ে করছে শেষমেশ। ও আচ্ছা ওর কথা তো বলাই হয়নি তোমাকে। যে ক্ষ্যাপা মেয়ে। পর্তুগিজ।’ জান্ আপন মনে বলে যায়, ‘ওর গর্ভে এখন রাফের সন্তান।’ হঠাৎ জানের কণ্ঠে কিছু একটা এঁটে যায় শক্ত করে। হাসিটা লুকালো কোথাও। ‘ছেলেদের এখনো চিনে উঠতে পারেনি আন্দ্রেয়া। বন্যপশুদের কাছে প্রণয় যেমন তুচ্ছ, তেমনি।’ জানের আদ্রো কণ্ঠ লা সেন নদীর জলের মতো নিস্তরঙ্গ। ‘ছেলেদের হাতে সময় খুব কম। শরীরের ক্ষুধা মেটাতে সব ছদ্মবেশ।!’
প্যারিস থেকে দুশো কিলোমিটারের বেশি পাড়ি দিয়ে আমরা এখন এত্রোতায়। ফ্রান্সের উত্তরের সমুদ্র উপকূলীয় শহর। নরমন্ডি অঞ্চলে। রাফের বিয়েতে আর যাওয়া হয়নি। নিমন্ত্রণ বার্তাটি পৌঁছে দিয়েছিল যে, সেই জান্ই বিয়ের অনুষ্ঠানে যাবে না বলে ঠিক করল শেষ মুহূর্তে। বলল, ‘আমার খুব সমুদ্র দেখতে ইচ্ছে হচ্ছে মোহিত। তুমি যাবে আমার সাথে?’
যোগাযোগ বিচ্ছিন্নে কেটেছে দীর্ঘ সময়। তবুও জানের আচরণ কিংবা আলাপে সেই প্রসঙ্গে লেশ নেই বিন্দুমাত্র। নেই কোনো আড়ষ্ঠতাও। আমিও যে ওকে মন থেকে পুরোপুরি মুছে ফেলতে পারিনি, তাও বুঝলাম প্রায় ছয়মাস পর ফোনের ওপাশ থেকে কণ্ঠটা শুনে। মনে হচ্ছিল, এই কণ্ঠটার অপেক্ষাই কি করছিলাম না আমি?
দ্রুতগতির ট্রেনে প্রায় দুইঘণ্টার ভ্রমণের পুরোটা পথই মন মরা হয়ে ছিল জান্। কখনো বইয়ের পাতায়, কখনো কাঁচের জানালার ওপাশে রেখেছে চোখ। যতসামান্য আলাপ তার ভাজে ভাজে। তবে সমুদ্রের তটে পা রাখতেই ওর চেহারার বিষণ্নতা মিলিয়ে যেতে লাগলো জরির সুতোর মতো চকমকে রোদে। ‘আকাশ আর সমুদ্রের সামনে মুখ গোমড়া করে থাকা যায় না।’ অসীম নীলের দিকে তাকিয়ে নুড়ি পাথরের তটে নগ্নপায়ে হাঁটছে জান্। ‘এতো গাঢ় নীল জল। জগতের সব বেদনার রঙ শুষে নিয়ে কতটা নির্ভার!’ পা ফেলাতে ওকে এতটাই সাবধানী দেখাচ্ছে যে, পাথরগুলো যেন আঘাত না পায় এতটুকু।
‘রাফ্কে তুমি ভালোবাসতে?’ প্রশ্নটা শুনে দাঁড়িয়ে পড়ল জান্। মুখ তুলে তাকাল। ‘ওর বিয়ে সহ্য করতে পারবে না বলে পালিয়ে এলে?’
মুখ ফিরিয়ে নিল সে। বসে পড়লো পাথরের ওপর। প্রশ্নটা শুনতে পায়নি ভাব করে বলল, ‘তুমি সাঁতার জানো?’
‘তাতো সেই শৈশব থেকেই।’ জবাব দিলাম।
‘আমি কিন্তু সাঁতার জানি না।’ ছোট্ট একটি পাথর নিয়ে আনমনে অন্য একটি পাথরে মৃদু আঘাত করছে জান্। ‘তবে সমুদ্রের কাছে এলে জলে নামার লোভও সামলাতে পারি না।’ বলেই আমার হাত ধরে টেনে নিল সে। ‘এসো জলে নামি।’
রাফের প্রসঙ্গটা এড়িয়ে যেতে চাইছে জান্? অথচ ভাবনটা আমার করোটিতে তরল হয়ে গড়িয়ে যাচ্ছে রন্ধ্রে রন্ধ্রে। তবে কি রাফের সঙ্গে বিচ্ছেদের অসুখ সারাতে আমার সঙ্গ চাইছে জান্? হাত ধরে হরহর করে আমাকে জলে নামিয়ে আনলো জান্। নামলো নিজেও। শিশুদের মতো প্রফুল্ল খেলা করছে ওর চোখেমুখে। একটু একটু করে নেমে যাচ্ছে সমুদ্রের কোলে। সরে যাচ্ছে পায়ের নিচের নুড়ি পাথরের আশ্রয়। হাঁটু জল থেকে কোমর অবধি। তারপর ধীরে ধীরে উঠে এলো বুকে। পায়ের নিচে এখন আর পাথর নেই। জমাট বালুর ফরাস। আরও একটু নেমে গেল জান্। তখনও আমার হাতটা শক্ত করে ধরে রেখেছে ও। কী ভরসায়? সাঁতার না জানলেও আমি ওকে বাঁচাবো?
দূর থেকে মাথা তুলেছে একটা ঢেউ। আমাদের মাথা থেকে বেশ ওপরে। ধেঁয়ে আসছে। প্রকাণ্ড গোখরার ফণার মতো। জড়ো হয়ে আসছে সেই অমোঘ অন্ধকারও। বাউরি বাতাসের মতো দলা পাকিয়ে। ভাবনাকে অসাড় করে দেওয়া সেই নিকষ নিস্তব্ধতা। গলা পেরিয়ে নোনা জল তখন নাক ছুঁই ছুঁই। জানের চেহারার প্রফুল্লতা মিলিয়ে গেছে কোথাও। সে তখন ফিরতে চাইছে উল্টো পথে। কিন্তু জলের ঘন দেয়ালের বুকে চিরে এগুতে পারছে না খুব। ‘মোহিত আমি ডুবে যাচ্ছি। আমায় টেনে তোলো।’ ততক্ষণে তুমুল গর্জনে, মাথার কয়েক হাত ওপর দিয়ে পেরিয়ে, তীরে গিয়ে আছড়ে পড়ল দৈত্যের মতো ঢেউটা। হেঁচকা টানে ঢেউটাকে যখন নিজের বুকে টেনে নিল সমুদ্র, তখন ধসে গেল পায়ের নিচের বালুর আস্তরণ। অনুভব করলাম আমার হাতটিও আর সিঁধিয়ে নেই কারো হাতে। চকিতে চারপাশটায় তাকাতে শূন্যতা ছাড়া কিছুই ধরা দিল না চোখে।
জলের মাতাল উন্মাদনা থিতু হয়ে এলে, আবছায়া অন্ধকার ভেদ করে, আরও খানিকটা দূরে, জলের পেট ফুঁড়ে বেরিয়ে আসা দুটো হাতের ইশারা চোখে পড়ে। ওদিকে এগিয়ে যেতে উদ্যত হই। কিন্তু আছাড়ি-পাছাড়ি গোলকধাঁধা পেরিয়ে এগুতে পারি না। শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে দুহাতে সিঁথি কাটি জলের কেশে। যতটা এগিয়ে যাই, পিছিয়ে পড়ি তারও বেশি। আমাকে পেছন টেনে ধরে শীতল কোমল সেই অন্ধকার।
হাবিবুল্লাহ ফাহাদ : লেখক ও সাংবাদিক।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।