সকল মেনু

ইপসা-সমধারা দ্বাদশ কবিতা উৎসব: শিল্প সাহিত্যের জয়গানে মুখর ছায়ানট

‘কবিতাই পারে’- এ শ্লোগানকে সামনে রেখে সাহিত্য বিষয়ক ম্যাগাজিন ‘সমধারা’র উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছে দ্বাদশ কবিতা উৎসব।

ছায়ানট সংস্কৃতি ভবনের প্রধান মিলনায়তনে শনিবার (২৫ এপ্রিল) বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় ‘ইপসা সমধারা দ্বাদশ কবিতা উৎসব-২০২৬’।

প্রয়াত কবি সরোজ দেবকে উৎসর্গকৃত দেশের অন্যতম বৃহৎ পরিসরে এ কবিতা উৎসবে ২শত জন অগ্রজ ও অনুজ কবি-লেখক উপস্থিত ছিলেন।

দেশের অন্যতম সাহিত্য বিষয়ক কাগজ সমধারা প্রতিবছর সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় গুণীদের পুরস্কার প্রদান করে আসছে। এ বছর সমধারা সাহিত্য পুরস্কার-২০২৬ গ্রহণ করেছেন

কথাসাহিত্যে জনপ্রিয় সাহিত্যিক ও সাংবাদিক মোস্তফা কামাল, কবিতাসাহিত্যে কবি আদ্যনাথ ঘোষ এবং শিশুসাহিত্যে বিজ্ঞানী ও প্রবাসী ছড়াকার ধনঞ্জয় সাহা। পুরস্কারপ্রাপ্তদের নগদ অর্থ, পোর্ট্রেট এবং উত্তরীয় প্রদান করা হয়েছে।

অতিথিদের উত্তোরীয় পরিয়ে দিচ্ছেন সমধারা পরিবারের সদস্যরা। ছবি: সমধারা

কবি প্রাবন্ধিক ফরিদ আহমদ দুলালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। উদ্বোধন করেন মুক্তিযোদ্ধা, প্রাবন্ধিক ও কথাসাহিত্যিক হারুন হাবীব। প্রধান আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জাতিসত্তার কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কবি-প্রাবন্ধিক মজিদ মাহমুদ, শিশুসাহিত্যিক রহীম শাহ, কবি নজমুল হেলাল প্রমুখ।

তিন পর্বের উৎসব পরিচালনা করেন সমধারা সম্পাদক ও প্রকাশক সালেক নাছির উদ্দিন।

উৎসবের মিডিয়া পাটনার ছিল দৈনিক খবরের কাগজ।

উৎসবের টাইটেল স্পন্সর ছিল স্থায়ীত্বশীল উন্নয়নের জন্য সংগঠন ইপসা।

প্রথম পর্বে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা কবির স্বকণ্ঠে স্বরচিত কবিতা পাঠ; আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি শিরোনামে ২০ জন কবিতা পাঠ করেন। কবিতাপাঠ করেন।

তৃতীয় পর্বে উৎসবে বিশেষ আকর্ষণ কথাসাহিত্যে পুরস্কারপ্রাপ্ত মোস্তফা কামালের পাঠকপ্রিয় উপন্যাস ‘দেবো খোঁপায় তারার ফুল’ অবলম্বনে কাব্যগীতি নৃত্যনাট্য ‘প্রেমার্ঘ্য নৈবেদ্য’। গ্রন্থনা ও রচনা করেছেন ফরিদ আহমদ দুলাল। নির্দেশনায় ছিলেন সালেক নাছির উদ্দিন। এতে সমধারা পরিবারের ২৫ জন শিল্পী অংশগ্রহণ করেন।

বক্তব্য করছেন ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ছবি: সমধারা

রাজনীতি ও অর্থনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের পরিচয় হলো তার সংস্কৃতি : অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

বর্তমানের পুঁজিবাদী উন্নয়ন ধারা মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে এবং প্রকৃতির সঙ্গে শত্রুতা তৈরি করছে উল্লেখ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন, এই ধারা পরিবর্তন করে সামাজিক মালিকানা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে মানবজাতির ভবিষ্যৎ বিপন্ন হবে।

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘রাজনীতি ও অর্থনীতি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু মানুষের চূড়ান্ত লক্ষ্য ও পরিচয় হলো তার সংস্কৃতি। সভ্যতা ধ্বংস হতে পারে, কিন্তু সংস্কৃতি টিকে থাকে। ৩০০০ বছর আগে প্যাপিরাসে লেখা হোমারের কবিতা আজও মানুষের স্মৃতিতে অম্লান থাকা তার বড় প্রমাণ।’

প্রযুক্তির চতুর্থ শিল্প বিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে এই প্রবীণ শিক্ষাবিদ বলেন, অতীতে ছাপাখানা বা রেডিও সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছিল, কিন্তু বর্তমানের প্রযুক্তি মানুষকে গৃহবন্দি ও একা করে দিচ্ছে। এটি মানুষের সৃজনশীলতার বিপরীত পক্ষ হিসেবে দাঁড়াচ্ছে। এখন তিনজন মানুষ পাশাপাশি বসে থাকলেও কেউ কারো সঙ্গে কথা বলে না, সবাই অদৃশ্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে যন্ত্রে বুঁদ হয়ে থাকে।

পুঁজিবাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, পুঁজিবাদ এক সময় মানুষকে সামন্ততন্ত্র থেকে মুক্তি দিয়েছিল, কিন্তু আজ তা চরম সংকটে। পুঁজিবাদী বিকাশের মূল ভিত্তি হচ্ছে ব্যক্তি মালিকানা, যা বৈষম্য ও বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে। মানুষ এখন সমুদ্রের উত্তপ্ত বালুকণার মতো হয়ে যাচ্ছে, যেখানে প্রতিটি বালু একে অপরের শত্রু।

বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন করেছি মুক্ত হওয়ার জন্য। কিন্তু রাষ্ট্রযন্ত্রের চরিত্র সেই ঔপনিবেশিক ও আমলাতান্ত্রিক রয়ে গেছে। বাংলাদেশ এখন ধনী লোকদের এক উপনিবেশে পরিণত হয়েছে, যারা এই দেশে ভবিষ্যতে বিশ্বাস করে না। তারা সম্পদ লুণ্ঠন করে বিদেশে পাচার করছে।

এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সাংস্কৃতিক জাগরণের ওপর গুরুত্বারোপ করে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, কেবল রাষ্ট্রীয় বিপ্লব নয়, আমাদের প্রয়োজন সামাজিক বিপ্লব। সাহিত্য মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে এবং বুদ্ধিকে শাণিত করে। পাড়ায় পাড়ায় পাঠাগার গড়ে তুলতে হবে এবং সংস্কৃতি চর্চাকে কেবল বিনোদনের মাধ্যম না করে সমাজ পরিবর্তনের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।

বক্তব্য রাখছেন কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা। ছবি: সমধারা

মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার নামই হলো সমধারা: মুহম্মদ  নুরুল হুদা।

বিশ্বের বর্তমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে কবি নুরুল হুদা বলেন, পুরো পৃথিবী এখন এক ভয়াবহ বিপদের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যেখানে পারমাণবিক হামলার ভয়ে মানুষ বাংকার তৈরি করছে, সেখানে আমরা কবিতা লিখছি, ভালোবাসার কথা বলছি। এর চেয়ে বড় অর্জন আর কী হতে পারে?

তিনি আরও যোগ করেন, মানুষে মানুষে ভেদাভেদ ভুলে যাওয়ার নামই হলো ‘সমধারা’। আমরা চাই সবাই সমান অধিকার নিয়ে বাঁচুক। একটি বিশ্বরাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখা কি খুব অসম্ভব? যেখানে সামরিক বাহিনী থাকবে শান্তির জন্য, ধ্বংসের জন্য নয়।

বক্তব্য রাখছেন সাহিত্যিক-সাংবাদিক মোস্তফা কামাল। ছবি: সংগৃহীত

লেখালেখি আমার কাছে প্রার্থনার মতো, আমি পবিত্র হয়ে লিখতে বসি: মোস্তফা কামাল

লেখালেখিকে ‘প্রার্থনা’ ও ‘মেডিটেশন’ এর সঙ্গে তুলনা করে কথাসাহিত্যিক ও খবরের কাগজের সম্পাদক মোস্তফা কামাল বলেছেন, পুরস্কারের আশায় নয়, বরং একটি ভালো কাজ সৃষ্টি করতে পারাই লেখকের জন্য সবচেয়ে বড় সার্থকতা।

পুরস্কার প্রাপ্তির অনুভূতি ব্যক্ত করতে গিয়ে মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আমি পুরস্কারের জন্য লিখি না। একটা ভালো উপন্যাস বা গল্প লিখতে পারা এবং সেটি পাঠকের কাছে পৌঁছানোকেই আমি বড় পুরস্কার মনে করি। যখন আনন্দ পাবলিশার্স কিংবা লন্ডনের অলিম্পিয়া পাবলিশার্স থেকে আমার বই বের হয়, সেটিই আমার কাছে বড় অনুপ্রেরণা।’

দেশের পুরস্কার বিতরণী ব্যবস্থার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে অনেক সময় পুরস্কার রাজনৈতিকভাবে কলুষিত বা সমালোচিত হয়। অনেক সত্যিকারের লেখক পুরস্কারের ধারে-কাছেও যান না। আবার দেখা যায়, অল্প লিখেও অনেকে রাষ্ট্রীয় বা প্রাতিষ্ঠানিক পুরস্কারে ভূষিত হচ্ছেন।’

কালজয়ী লেখকদের উদাহরণ টেনে তিনি আরও বলেন, ‘জীবনানন্দ দাশকে আমরা ১০০ বছর পর মূল্যায়ন করতে পেরেছি। নজরুল বা রবীন্দ্রনাথও তাদের সময়ে নানাভাবে সমালোচিত ও অপদস্থ হয়েছেন। কিন্তু কাজই তাদের টিকিয়ে রেখেছে। সত্যিকারের মূল্যায়ন এভাবেই হয়।’

ইমেরিটাস অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মোস্তফা কামাল বলেন, ‘স্যার কোথাও সচরাচর যান না, কিন্তু আজ এখানে এসেছেন। তিনি আমাদের পেশার অভিভাবক। সংকটের সময়েও তিনি সাহস জুগিয়ে বলেন- ভয় পেয়ো না, আমরা সঙ্গে আছি।’

নিজের লেখালেখির অভ্যাস সম্পর্কে এই কথাসাহিত্যিক বলেন, ‘লেখালেখি আমার কাছে প্রার্থনার মতো। আমি পবিত্র হয়ে লিখতে বসি। প্রতিদিন অন্তত এক ঘণ্টা আমি লিখি, না লিখতে পারলে দিনটি ভালো কাটে না। জীবনের শেষদিন পর্যন্ত যেন লিখে যেতে পারি, এটাই আমার চাওয়া।’

পদাবলির যাত্রার পাঠ উন্মোচন। ছবি: সমধারা

‘সমধারা’ নিয়মিত প্রকাশনার সঙ্গে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষণা, অবহেলিত শিশুদের স্বাক্ষরজ্ঞানসহ সামাজিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন সেবামূলক কাজ করে যাচ্ছে। তারই ধারাবাহিকতায় একুশ শতকের কবিদের মূল্যায়ন করার লক্ষ্যে সমধারা কবিতা উৎসবের আয়োজন করছে। পাশাপাশি খ্যতিমানদেরও সম্মান জানিয়ে আসছে।
২০২৫ সালে চার প্রবাসী মুহাম্মদ ইকবাল, শামীম আহমদ, আজিজুল আম্বিয়া ও সেলিম রেজাকে পুরস্কার দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে কথাসাহিত্যে বিশ্বজিৎ চৌধুরী, কবিতাসাহিত্যে মজিদ মাহমুদ ও শিশুসাহিত্যে ধ্রুব এষ পুরস্কার গ্রহণ করেন। ২০২৩ সালে কথাসাহিত্যে হরিশংকর জলদাস, কবিতায় ফরিদ আহমদ দুলাল ও শিশুসাহিত্যে স ম শামসুল আলম; ২০২২ সালে পুরস্কার গ্রহণ করেন কথাসাহিত্যে আনোয়ারা সৈয়দ হক ও কবিতায় ওমর কায়সার। ২০২১ সালে কথাসাহিত্যে ইমদাদুল হক মিলন এবং কবিতায় সরোজ দেব; ২০২০ সালে কথাসাহিত্যে সেলিনা হোসেন এবং শিশুসাহিত্যে রহীম শাহ। ২০১৯ সালে কবি মৃণাল বসুচৌধুরী, ২০১৮ সালে মুহম্মদ নূরুল হুদা, ২০১৭ সালে নির্মলেন্দু গুণ এবং ২০১৬ সালে হেলাল হাফিজ এ পুরস্কার গ্রহণ করেন।

সমধারা ১১০তম সংখ্যার পাঠ উন্মোচন। ছবি: সমধারা

সমধারা সাহিত্য পুরস্কার ২০২৭ এবং ২০২৮ ঘোষণা

উৎসবে সমধারা সাহিত্য পুরস্কার- ২০২৭ ঘোষণা করা হয়েছে। আগামী বছর ৫জনকে কবিতা সাহিত্যে পুরস্কার দেয়া হবে। নির্বাচিতরা হলেন কবি শুভ্রা নীলঞ্জনা, কবি মাহবুবা ফারুক, কবি সালমা বেগ, কবি আফরোজা হীরা এবং কবি ফারহানা হক।

এছাড়া সমধারা সাহিত্য পুরস্কার-২০২৮ সালেরও মনোনীত গুণীদের নাম ঘোষণা করা হয়েছে। গবেষণায় হারুন হাবীব, কথাসাহিত্যে দীপু মাহমুদ, শিশুসাহিত্যে রাশেদ রউফ, কবিতাসাহিত্যে হাসান হাফিজ এবং নজমুল হেলাল।

সাহিত্যিক-সাংবাদিক মোস্তফা কামালের সঙ্গে সমধারা পরিবার। ছবি: সমধারা

শিল্প-সাহিত্যে সমধারা সমাজের প্রতিচ্ছবি হিসেবে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মধ্যে একটি সেতু বন্ধন তৈরি করতে কাজ করছে। নিয়মিত বিষয় ভিত্তিক সংখ্যার পাশাপাশি সমধারা কবিতা উৎসব বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি শুধু আনন্দের উপলক্ষ নয়, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সক্রিয় প্লাটফর্ম। এ উৎসব কবি, লেখকদের জন্য বাৎসরিক মিলনমেলা। এতে করে নতুন প্রতিভাদের বিকাশের সুযোগ সৃষ্টি করছে।

মন্তব্য করুন

খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।

TOP