সুনন্দার আকাশ
শহরের এই তীব্র রোদ আর অবিরাম ব্যস্ততা
বোঝে না—ক্লান্তির আকাশ কতটা ভারী হয়।
শরীরের ঘাম চুইয়ে পড়ে ক্লান্ত ফুটপাতে,
যেন যান্ত্রিক চাকার নিচে পিষে যায়
এক-একটি সোনালি স্বপ্ন।
ধুলোজমা বিবর্ণ জীবনের একঘেয়ে কোলাহলে,
বইয়ের পাহাড় আর চেনা অক্ষরের ভিড়ে
কেটে যায় সুনন্দার একেকটি
ঘুমহীন, নীলচে রাত।
টেবিল ল্যাম্পের ক্ষীণ আলোয়
ওড়ে তার ধূসর একাকিত্ব।
চোখের নিচে জমে ওঠে ক্লান্তির গাঢ় কালি—
যেখানে একদিন
এক নদী মায়া জমে থাকত,
আনমনে ছন্দে ছন্দে
‘তুমি, তুমি’ সুর বুনত;
চোখের ইশারায় ভালোবাসত।
হরিণীর মতো যে চোখ দুটো
একদিন অবলীলায় আলো ছড়াত,
আজ তারা বন্দী
চশমার পুরু, শীতল কাচের ওপারে।
বাতাসে ওড়া সেই ঘন বাদামি রেশমি চুল
ঝরে গেছে অকালে—
ঠিক যেমন ঝরে যায়
শ্রাবণের শেষ পাতা।
তবু সুনন্দা হারেনি।
বইয়ের পাতায়,
শব্দের আড়ালে,
নির্মম শহরের বুকের ভেতর
সে আজও বুনে চলে
তার নিজস্ব আকাশ।
বিষণ্নতার কবি
বুকের ঠিক মাঝখানে
একাকিত্ব বাসা বেঁধেছে—
যেন জনমানবহীন
এক ধূ-ধূ প্রান্তর।
হেরে যেতে যেতে
প্রতিদিন নিজের সঙ্গেই
একটি যুদ্ধ চলে।
ভাবি—
কীভাবে নিজের হাসিগুলো
ধ্বংস করেছি নিজ হাতেই!
তবু কখনো কখনো
মনের গভীরে জেগে ওঠে
সেই হারিয়ে যাওয়া চেনা ‘আমি’কে
একটুখানি ছুঁয়ে দেখার
তীব্র আকুতি।
কখনো কি সত্যিই
ফিরে পাব নিজেকে?
নাকি এই খোঁজ
চলতেই থাকবে
অবসানহীন?
টেবিলে রাখা কফির কাপ থেকে
অলস ধোঁয়া উঠে যায়।
সেই ধোঁয়ার ভেতর
কি কোথাও জমে থাকে
একটুখানি প্রশান্তি?
নাকি এ শুধু
নীরবে একা থাকার
এক অদ্ভুত বিষণ্ন সুখ—
যা লুকিয়ে থাকে
কবিতার ভাঁজে?
চুমুক দিতে দিতে ভাবি—
নিজেকে আড়াল করার
এই মায়াতেই কি
বেঁচে থাকে
বিষণ্নতার কবি?
মেঘের কোলাজ
শহরের ব্যস্ত কোলাহল ছেড়ে
চলো আজ মেঘে হারাই।
তোমার হাতের কদম ফুলটায়
আমি এক মুহূর্ত থমকে দাঁড়াই।
ঝুম বৃষ্টিতে ভিজছে
আমার প্রেমাতাল নীল শাড়ি,
তোমার সাদা পাঞ্জাবিটাও আজ
ভিজতে চায় তাড়াতাড়ি।
মেঘের ভেলায় ভেসে যাক
শহরের যত হিসাব-নিকাশ,
বৃষ্টির শব্দে মুছে যাক
অভিমানের শেষ আঁচড়টুকু।
চলো, আজ কোনো কথা নয়—
শুধু পাশাপাশি হাঁটি,
কদমের গন্ধে ভিজে থাক
আমাদের অসমাপ্ত বিকেল।
হয়তো কোনো এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়
তুমি বলবে না কিছু,
আমিও রাখব নীরবতা;
শুধু চোখের ভাষায়
জেনে নেব—
এখনও কি আমাদের গল্পের
কিছু পৃষ্ঠা বাকি আছে?
অসমাপ্ত ভালোবাসা
খুব তাড়াতাড়ি তোমার-আমার হোক
অপেক্ষায় জমে থাকা
সেই একটুখানি চোখের দেখা।
কথা না হয় কিছুই বলব না—
শুধু একবার
তোমার চোখে চোখ রেখে
বুঝে নিতে চাই,
আমাদের গল্পটা
সত্যিই শেষ হয়ে গেছে,
নাকি কোনো এক শ্রাবণশেষের বিকেলে
এখনও একটু তুমি,
একটু আমি—
আর আমাদের হয়ে বেঁচে আছে
এক মুঠো অসমাপ্ত ভালোবাসা।
ক্লান্ত রোদের দিনগুলো পেরিয়ে
আজও কোনো ভেজা বিকেলে
তোমার মুখখানা মনে পড়ে।
অলিগলির মোড়ে মোড়ে
এখন তোমার কোনো ছায়া নেই;
আছে শুধু স্মৃতি—
পুরোনো দেয়ালে লেগে থাকা
বৃষ্টির দাগের মতো,
মুছে ফেলতে চাইলেও
যা থেকে যায়।
সেদিন শ্রাবণের আকাশটা
ছিল একেবারে নিচু।
কালো মেঘে ঢেকে গিয়েছিল
বিকেলের শেষ আলো।
হঠাৎ ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল।
ভেজা মাটির গন্ধে
চারপাশ ভরে উঠল।
বকুলগাছের চারদিকে
টুপটাপ শব্দ,
চাকার নিচে জমে থাকা জলে
রাস্তার আলো
কেঁপে কেঁপে ভেঙে পড়ছিল।
আমি হুড তোলা রিকশায় বসে
বৃষ্টির পর্দার ওপাশে তাকিয়ে ছিলাম।
ঠিক তখনই তোমাকে দেখলাম—
হাতে নীলচে একটি ফাইল,
বৃষ্টিতে ভেজা চুল
কপালের কাছে লেগে আছে,
পোশাকের কিনারায়
জলের ছোট ছোট দাগ।
তোমার চশমার কাঁচে
বৃষ্টির কয়েকটি স্বচ্ছ ফোঁটা আটকে ছিল।
তুমি সেগুলো মুছলে না।
সেই ভেজা কাঁচের ওপাশ দিয়েই
হঠাৎ আমার দিকে তাকালে।
তারপর—
ঠোঁটের কোণে
একটুখানি মুচকি হাসি।
সেই হাসিটা এত নিঃশব্দ ছিল,
ঠিক যেমন ছিল
তোমার-আমার ভালোবাসা।
রিকশার ঘণ্টা,
বৃষ্টির শব্দ,
রাস্তার কোলাহল—
সবকিছুর ভেতর থেকেও
কী আশ্চর্য স্পষ্ট হয়ে
পৌঁছে গিয়েছিল
তোমার সেই উজ্জ্বল হাসি!
আমি কিছু বলিনি,
তুমিও না।
শুধু কয়েক সেকেন্ডের সেই তাকানো—
তারপর হঠাৎ তুমি চশমাটা খুলে
বৃষ্টিতে ভেজা চোখে
আবার তাকালে।
সেই দ্বিতীয় দৃষ্টিটুকুতেই
কীভাবে যেন থমকে গেল সময়।
মনে হলো,
রিকশাটা আর এগোচ্ছে না,
বৃষ্টিও যেন
একই জায়গায় ঝুলে আছে।
শুধু তোমার চোখ দুটো
ধীরে ধীরে আমাকে টেনে নিচ্ছে
কোনো অচেনা মায়ার গভীরে।
চার বছর হয়ে গেছে।
তবু শ্রাবণের বৃষ্টি নামলে,
এই শহরে বৃষ্টির শব্দ শুনলে,
ভেজা মাটির গন্ধ পেলে,
অথবা কোনো রিকশার হুডে
বৃষ্টির ফোঁটা ঝরে পড়তে দেখলে—
আমি ফিরে যাই সেই বিকেলে।
আবার দেখি—
তুমি রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে,
হাতে সেই নীলচে ফাইল,
চশমার কাঁচে বৃষ্টির কণা,
ঠোঁটে সেই মৃদু হাসি।
আর আমি?
আমি সেই হুড তোলা রিকশায় বসে
চার বছর আগের সেই মানুষটিই হয়ে যাই—
যে তোমার একবার তাকানোতেই
নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিল
তোমার মায়াজালে।
মায়াজাল
কিছু মানুষ চলে যায়,
তবু তাদের রেখে যাওয়া
একটি বিকেল থেকে যায়।
একটি বৃষ্টির শব্দ,
এক জোড়া চোখ,
ঠোঁটের কোণে থেমে থাকা
একটি মৃদু হাসি—
কখনো কখনো
একটি জীবন পেরিয়ে যাওয়ার জন্য
এতটুকুই যথেষ্ট।
তুমি নেই—
তবু শ্রাবণের মেঘে
তোমার ছায়া দেখি।
ভেজা রাস্তায়
রিকশার চাকার শব্দে
শুনি তোমার নীরব ডাক।
কদম ফুলের গন্ধে
হঠাৎ মনে পড়ে যায়
সেই অসমাপ্ত বিকেল।
হয়তো ভালোবাসা
সবসময় কাছে থাকার নাম নয়;
কখনো কখনো
দূরে থেকেও
কারও স্মৃতির ভেতর
নিঃশব্দে বেঁচে থাকা।
তাই আজও বৃষ্টি এলে
আমি জানালার পাশে দাঁড়াই।
আকাশের দিকে তাকিয়ে
মনে মনে বলি—
আমাদের গল্প শেষ হয়নি,
শুধু শব্দগুলো থেমে গেছে।
আর সেই নীরবতার ভেতর
আজও তুমি,
আজও আমি,
আজও বেঁচে আছে
এক মুঠো মায়া।
তাসনিম তিনা। জন্ম : ২৬ মে, ২০০৯ জামালপুরে। বর্তমানে দ্বাদশ শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগে পড়াশোনা করেন। বই পড়তে পছন্দ করেন। অবসরে গল্প-কবিতা লিখেন।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।