সাঁতারু
সব দিক থেকে আসে, বাদ নাই দিক
সব দিক মিলে মিশে তবু এক দিক
এভাবেই মুখোমুখি দুজনে দুজনা
আপনা বন্দনা মানে ভুবন বন্দনা
সকলে সাকারে হাসে, তুমি ভিন্নাকারে
আমার দেখার আগে তুমিই দেখেছো
আমি যে-ই ভিনপথে ভিন পারাপারে
রসিক সুজন তুমি, হঠাৎ হেসেছো
তাইতো যাইনি ফিরে, আছি করজোড়ে
ভাসিনি জলের স্রোতে, জোয়ারের তোড়ে
আমাকে রেখেছে ধরে আমার নোঙর
চরে চরে বাঁধি ঘর, চর চরাচর
সফেন তরঙ্গে শুধু বাজে মনবাঁশি
মনের গহনে মন সাঁতারু উদাসী
যে কোনো প্রবাসে
চলো তবে সঙ্গে সঙ্গে চলো। চলো, সামনেই চলো।
যেতে যেতে কে কোথায় কখন বদল হয় বলো?
কতক্ষণ চোখে চোখে আমরাও তাকিয়ে ছিলাম?
কোথায় ছিলাম আর পরমুহূর্তেই কোথায় এলাম?
গতি আর স্থিতি হাসে মুহূর্তে মুহূর্তে পর্যায়ক্রমিক,
পলকে পলকে ডানা মেলে তারা ওড়ে দশদিক।
কথায় কথায় কথা, বুড়িগঙ্গা কথা অমরতা,
তরঙ্গে তরঙ্গে জলধ্বনি বহমান মগ্ন মর্মরতা;
আমরা মরমে মরে যাই, নীলে নীলে অবাক তাকাই;
যেদিকে তাকাই শুধু সবখানে ভিন্ন ভিন্ন প্রতিবিম্ব পাই;
সব বিম্ব কাল থেকে কালে কালে টলমল করে,
তুমি আছো আমি আছি আমাদের নিত্য রূপান্তরে;
দেখা হলে বসে থাকি হাল ধরে মেঘের ভেলায়
যাত্রা শুরু হলে হালে পালে উড়ে যাই দূর নেবুলায়;
আমরা বসত করি ভুবনে ভুবনে দূরে বদলনিবাসে
আমাদের দেখা হয় জন্মে জন্মে যে কোনো প্রবাসে।
মানুষে মানুষ শুঁকি
১
আমার আসার পথ আমার একার
আমার যাওয়ার পথ আমার একার
কখনো ভাবিনি আমি কে কার কে কার
আমি তো তোমার আর তুমি তো আমার
চরাচর আমাদের যুগল সাঁতার
২
মুহূর্তে সাঁতার কেটে অনন্তের পাড়ি
নিজেই নিজের নৌকা নিজে মাঝি-দাড়ী
তোমাকেই পাই শুধু আমার ভিতর
তুমি আমি পরস্পর আদি ডুবোচর
এ আমার এ তোমার দায় পরস্পর
৩
মাটিতে শেকড় রেখে সমুদ্র-নীলিমা
ঘুরে আসি আমাদের অসীম-অসীমা
অনন্তর প্রস্ফুটিত এক নীড়-বীজে
অনন্ত ভোরের আলো একা নিজে নিজে
ভালোবাসি অবনাশী এক সরসিজে
৪
যা কিছু ভেতর থেকে আসে সত্য তা-ই
তোমার আমার ভিন্ন বিবরণ নাই
না বিজ্ঞান ঋষিজ্ঞান কেবল স্বজ্ঞান
প্রাণের ভিতরে প্রাণ শুধু সর্বপ্রাণ
মানুষে মানুষ শুঁকি, মানুষের ঘ্রাণ
এ পাপ জন্মের নয়
উদ্ভিদেরা প্রতিবেশী, বিবর্তনময়;
বীজ থেকে চারা আর ফুল থেকে ফল;
বনে ও বাগানে তারা পাশাপাশি রয়,
রোদে ও বৃষ্টিতে বাড়ে, শিশিরে উচ্ছল;
ভেষজ লতার বুকে মমতা অপার,
প্রাণে বেড়ে প্রাণীকেও বাড়তে শেখায়;
তার কাছে হাত পাতে জগৎসংসার,
অন্নবস্ত্র জীবিকার সবক সে পায়;
মানুষ উদ্ভিদ প্রাণী মূর্ত ও বিমূর্ত,
মহাবিশ্বে সৃষ্টিসত্যে নিত্য সম্পূরক;
মিলন অবশ্যম্ভাবী জেনেও যে ধূর্ত
যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা খেলে, সে তো আহাম্মক।
প্রাণে প্রাণে মিলে যদি প্রাণের সমাজ
মানুষে মানুষে মিলে মানবসমাজ;
সহজ সরল বটে এ সমীকরণ,
মানুষ করেছে যার শুচিতা হরণ।
এ পাপ জন্মের নয়, এ পাপ কর্মের;
এ পাপ ধর্মের নয়, ঘৃণ্য অধর্মের।
যুদ্ধবাজ কখনো জেতে না
না, কোনোকালে হারেনি পৃথিবী;
প্রাণবিশ্ব নয় নিঃস্ব, কখনো হারে না।
কে তবে নিজেই তুই নিজেকে হারাবি?
যুদ্ধবাজ বাজি ধরে; কখনো জেতে না।
ত্রিভুবনে সর্বজন; একা কেউ নয়;
জীবসত্যে প্রাণসত্য সর্বসত্তাময়;
সর্বকালে সদাচারী প্রাণীদের জয়;
অমানুষ অজাচারী, মানে পরাজয়।
হাস্যে, ভাষ্যে, বিশ্বাসে বা অবিশ্বাসে
যত ভিন্ন, ততোধিক অভিন্ন নিশ্বাসে;
মানবসুষমা তাই সৃষ্টির সুষমা,
প্রমিতমানব তাই মানবউপমা।
তুমিও মানুষ হও খাঁটি ষোলোআনা;
মানবতা ধ্রুবসত্তা; মানবঠিকানা।
জয় হোক জয় হোক জয় সর্বপ্রাণ,
জীবেদের ঘ্রাণ নাও, জীবনের ঘ্রাণ।
হত্যা যার নেশা পেশা সে কিন্তু দানব;
বন্ধু তার নয় কোনো প্রকৃত মানব।
বন্ধু সেজে দেয় যারা স্বার্থের সবক,
পরোয়া করে না তারা অপরের হক।
দখলবাজেরা কেউ মানে না সীমানা;
বিধির বিধান তারা জেনেও জানে না।

মুহম্মদ নূরুল হুদা। ১৯৪৯ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের পোকখালিতে জন্মগ্রহণ করেন কবি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে অধ্যয়ণের সময় সাহিত্য অঙ্গনে প্রভাব ফেলতে শুরু করেন তিনি। পরে বাংলা একাডেমির পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পান। কর্মজীবনে জার্মানি, জাপান, আমেরিকা, হাওয়াই, লন্ডন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান, বেইজিং, শ্রীলংকা, তুরস্ক প্রভৃতি দেশে বিভিন্ন সেমিনারে অংশগ্রহণ করেন তিনি, পেয়েছেন নানা সম্মাননা। বাংলা সাহিত্যে অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৮৮ সালে তিনি পান বাংলা একাডেমি পুরস্কার। মুহম্মদ নূরুল হুদা কবিতার পাশাপাশি লিখেছেন উপন্যাস, ছোটগল্প, প্রবন্ধ, কাব্যনাট্য, গান। ‘জাতিসত্তার কবি’ হিসেবে পরিচিতি মুহম্মদ নূরুল হুদা ২০১৫ সালে পান একুশে পদক। ২০১৮ সালে সমধারা সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন মুহম্মদ নূরুল হুদা
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।