মোহাম্মদ আজম বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের এই অধ্যাপক প্রাবন্ধিক ও সাহিত্য সমালোচক হিসেবেও প্রসিদ্ধ। অমর একুশে বইমেলা, বাংলা একাডেমির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছে দৈনিক আমাদের সময়। সাক্ষাৎকারটি সমধারার পাঠকের জন্য উপস্থাপন করা হলো:
প্রশ্ন : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা ছেড়ে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক পদের দায়িত্বে এলেন। প্রায় এক বছর শেষ হলো। কাজের অভিজ্ঞতা কেমন?
মোহাম্মদ আজম : বাংলা একাডেমি অত্যন্ত ব্যস্ত একটি প্রতিষ্ঠান। এখানকার কাজের সঙ্গে জনসম্পৃক্ততাও অনেক বেশি। ফলে সব সময় ব্যস্ত থাকতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার সময় প্রত্যক্ষ অফিসসংক্রান্ত কাজে সময় কম ছিল। কিন্তু এখানে অফিসের সময় এবং কাজের চাপ অনেক বেশি। তবে একই সঙ্গে এখানে কাজ করার সুযোগও অনেক।
প্রশ্ন : বিগত সরকারের আমলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হলেও একাডেমির ভেতরের কাজ নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। এক বছরে আপনি ভাবমূর্তি ফেরাতে কতটা সফল?
মোহাম্মদ আজম : পত্রপত্রিকা এবং ফেসবুকের প্রচারণা দেখে মনে হয় যে, ভাবমূর্তি খুব পরিবর্তিত হয়নি। কিন্তু আমরা আসলে অনেক কাজ করেছি। প্রাতিষ্ঠানিক দিকটি শক্তিশালী করার দিকে জোর দিয়েছি- যেমন গবেষণার ওপর গুরুত্ব, প্রকাশনা নিয়মিত করা এবং প্রকাশনার মানোন্নয়ন। পাশাপাশি একাডেমির কার্যক্রম ডিজিটালাইজ করার কাজ চলছে। এগুলো দৃশ্যমান হতে কিছুটা সময় লাগবে, তবে অগ্রগতি নিশ্চিতভাবেই হচ্ছে।
প্রশ্ন : ২০২৬ সালের বইমেলা কি হবে?
মোহাম্মদ আজম : বইমেলা নিশ্চিতভাবেই হবে। আমরা প্রকাশকদের এবং বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে আলাপ করে সবচেয়ে উপযুক্ত সময়টা নির্ধারণ করেছিলাম। কিন্তু একপক্ষ বিরোধিতা করেছে। পুরো তথ্য-উপাত্ত না জেনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিরোধিতা করেছে। সেটার কোনো প্রভাব আছে কি না জানি না। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে, নির্বাচনের আগে মেলা নয়। ফলে আমরা আমাদের নির্ধারিত তারিখটি স্থগিত করতে বাধ্য হয়েছি। কিন্তু মেলা নিঃসন্দেহে হবে। আমি আশা করি নভেম্বরের শেষ নাগাদ আমরা নিশ্চিত হতে পারব, কবে কখন নির্বাচন হবে। যদি ঘোষিত সময়- ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন হয় তাহলে হয়তো মেলা নির্বাচনের পরপরই হবে। আর যদি আমরা দেখি যে, নির্বাচনের সময় পরিববর্তন হয়েছে তাহলে ফেব্রুয়ারি মাসেই হতে পারে।
প্রশ্ন : এমন অভিযোগ অনেকেই করেন যে, বাংলা একাডেমি প্রধানত বইমেলা নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বাকি ১১ মাস তাহলে বাংলা একাডেমি কী কাজ করে?
মোহাম্মদ আজম : এটা মূলত না জানার ফল। বইমেলার আগে-পরে প্রায় দুই মাস মেলার প্রস্তুতি ও পরিচালনায় ব্যস্ত থাকতে হয় সত্য, কিন্তু বাকি ১০ মাসেও একাডেমির নানা কার্যক্রম চলে। আমরা যেমন করেছি গত বইমেলার আগে এবং পরে। ফলে এটা একটা ঢালাও মন্তব্য। এটা ঠিক যে, বইমেলা বাংলা একাডেমির ঘোষিতভাবে প্রধান কাজগুলোর মধ্যে পড়ে না। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে এটা বাংলা একাডেমির গুরুত্বপূর্ণ কাজ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বইমেলা বাংলা একাডেমির ঐতিহ্য, হঠাৎ বদল সম্ভব নয়। যদিও মেলা বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন দেশে প্রকাশক সমিতি করে। কিন্তু আমাদের প্রকাশনা সমিতি খুবই নড়বড়ে। তাদের মধ্যে এই দাবি করার আসলে এখন পর্যন্ত কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না যে, তারা মেলা করবে। যদি প্রচুর লোক মনে করে যে, বাংলা একাডেমির মেলা করা উচিত নয় তাহলে সেভাবে প্রস্তুতি নিয়ে একটা দীর্ঘ পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে।
প্রশ্ন : অনুবাদ কার্যক্রম এখন তেমন সক্রিয় নয়- কেন?
মোহাম্মদ আজম : অনুবাদে ঘাটতি মানের, সংখ্যায় নয়। সংখ্যার বিচারে অনুবাদ কমেনি, কিন্তু মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পৌঁছে দিতে অনুবাদ গুরুত্বপূর্ণ। এই কাজের জন্য স্বতন্ত্র ইনস্টিটিউট ও বাজেট প্রয়োজন। বাংলা একাডেমির বর্তমান সক্ষমতায় এত বড় পরিসরে কাজ করা সম্ভব নয়, তবুও সীমিত পরিসরে অনুবাদ কার্যক্রম চলছে। তবে যতটা প্রয়োজন, ততটা এখনও হচ্ছে না।
প্রশ্ন : লোকসাহিত্য গবেষণা বা অন্য গবেষণার কাজে তেমন গতি নেই। আবার বিগত সরকারের নজর ছিল শুধু একদিকেই। সেখান থেকে বের হয়ে আসতে বা গবেষণার কাজ বাড়াতে কোন ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে?
মোহাম্মদ আজম : গত দশকে লোকসাহিত্য বিষয়ে বড় পরিসরে কাজ হয়েছে- ৬৪ জেলার সংকলন প্রকাশ তার প্রমাণ। মান নিয়ে প্রশ্ন থাকতে পারে, কিন্তু কার্যক্রম বন্ধ হয়নি। এই মুহূর্তে নতুন কোনো উদ্যোগ নেই, তবে গবেষণাধর্মী প্রকাশনা অব্যাহত আছে।
প্রশ্ন : বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিয়ে প্রায়ই প্রশ্ন ওঠে, এমনকি আপনি দায়িত্ব নেওয়ার পরও তা উঠেছে…
মোহাম্মদ আজম : প্রথম কথা হলো যে, বাংলাদেশে প্রশ্নহীন পুরস্কার হয়েছে এটা বাংলা একাডেমির বাইরেও কোনো উদাহরণ পাওয়া যাবে না। আমি নিজে অন্য সংস্থার পুরস্কারের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। এবং আমি দেখেছি যে, সব নিয়মকানুন মান্য করে খুব নিরাসক্তভাবে আমরা পুরস্কারের জন্য নির্বাচন করেছি। কিন্তু সেগুলো নিয়েও বিতর্ক হয়েছে। বাংলা একাডেমির ক্ষেত্রে বিতর্ক হওয়াটা এটা খুবই ট্রেডিশনে পরিণত হয়েছে। গত বছরের পুরস্কারের ক্ষেত্রে আমরা বলব, নিশ্চিতভাবে সরকারের তরফ থেকে আমাদের একটা পুরস্কারের ব্যাপারেও প্রভাবিত করা হয়নি। এমনকি বাইরের কোনো প্রভাবেও আমরা আসলে দিকপাত করিনি। এরপর যা ঘটেছে এবং আমাদের তার সমালোচনার জবাবে যা করতে হয়েছে এর কোনটা ঠিক এবং কোনটা বেঠিক সেটা হয়তো ভবিষ্যতে নির্ধারিত হবে। আমাদের দিক থেকে আমরা পরিপূর্ণভাবে সততার সঙ্গে কাজটা করেছি। কিছু রাজনৈতিক বিবেচনার দিক থেকে যেটা খুবই জরুরি ছিল। সেই ধরনের কোনো ব্যাপারে আমাদের ভুল হয়েছে। আমরা খুবই যত্নের সঙ্গে, অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এবং নিরপেক্ষতার সঙ্গে চেষ্টা করেছি। তো সব মিলিয়ে পুরস্কারের ব্যাপারে আমার বিবেচনায় সম্ভবত বাংলাদেশে এর চেয়ে সততা এবং নিরপেক্ষতার পরিচয় দেওয়া সম্ভব নয়। পুরস্কার প্রশ্নহীন নয়, তবে প্রভাবমুক্ত থেকেছি।
প্রশ্ন : বাংলা একাডেমি যে ধরনের প্রতিষ্ঠান, এর কাজের ওপর সরকারের হস্তক্ষেপ কাম্য নয়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও অতীতে তা দেখা গেছে। আপনার সময়ে এমনটা দেখতে পাব না বলে আশা করতে পারি?
মোহাম্মদ আজম : কতগুলো ব্যাপার আছে, যেটা সরকারের মনোভঙ্গির পক্ষে বাংলা একাডেমির কাজ না করে উপায় থাকে না। যেমন ধরা যাক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্বায়ত্তশাসিত। কিন্তু কতগুলো ব্যাপারে আসলে তার পক্ষে পুরোপুরি সরকারের বিরুদ্ধে গিয়ে কাজ করা সম্ভব নয়। যেমন বাংলা একাডেমির যে প্রধান কাজ- গবেষণা, পত্রিকা এবং বই-পুস্তক প্রকাশ, বিভিন্ন অনুষ্ঠান, সেমিনার-সিম্পোজিয়ামের আয়োজন- এগুলোর ব্যাপারে মন্ত্রণালয় যে সরাসরি কোনো হস্তক্ষেপ করে এটা আমার অভিজ্ঞতা থেকে পুরোপুরি দেখিনি। তবে বাজেট বরাদ্দ এবং আরও আনুষঙ্গিক কোনো কোনো ব্যাপারে বাংলা একাডেমি সরাসরি সরকারের ওপর এবং মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভরশীল। সেসব ব্যাপারে মন্ত্রণালয় যদি আরও সহযোগিতাপ্রবণ হয় তাহলে বাংলা একাডেমির কাজে নিশ্চয়ই গতি আসবে।
প্রশ্ন : তরুণ লেখক প্রকল্প নিয়ে নতুন কোনো পরিকল্পনা আছে কি? প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নিয়ে কোনো কিছু করা যায় কি না?
মোহাম্মদ আজম : বর্তমানে একটি ব্যাচ চলমান। তবে পরবর্তী ব্যাচের জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুদান না থাকায় অনিশ্চয়তা রয়েছে। পুরনো ব্যাচগুলোর জন্য আপাতত আলাদা পরিকল্পনা নেই, তবে অর্থবহ প্রস্তাব পেলে আমরা সেটি বিবেচনা করতে পারি।
প্রশ্ন : সরকারি প্রজ্ঞাপন, সাইনবোর্ড, ব্যানার-পোস্টারে ভুল বানান এখন মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলা একাডেমি কি কিছু করবে না?
মোহাম্মদ আজম : বাংলা একাডেমির এ বিষয়ে কোনো আইনি বা প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই। একাডেমির নিজের অভিধানগুলোয়ও বানানে অসামঞ্জস্য আছে। এখন আমাদের মূল লক্ষ্য অভিধানগুলোর বানান সামঞ্জস্যপূর্ণ করা। এই মান নির্ধারণের পর অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সেটি অনুসরণ করলে বানানের সঠিক ব্যবহারও ছড়িয়ে পড়বে।
প্রশ্ন : বহির্বিশ্বে বাংলা ভাষার প্রচার ও প্রসারে বাংলা একাডেমির কি কিছুই করণীয় নেই?
মোহাম্মদ আজম : এটা আসলে শুধু কারও বলার ব্যাপার নয় কিংবা এটা কোনো হীনম্মন্যতা বা উচ্চম্মন্যতা বা অন্য কাউকে খাটো করা বা বড় করার ব্যাপার নয়। বাস্তবতা হলো রাজনৈতিক বা রাষ্ট্রনৈতিক বাস্তবতার কারণে ঢাকা আসলে এই জায়গায় এসে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ যেহেতু বাংলা ভাষাকেন্দ্রিক একমাত্র রাষ্ট্র ফলে এর বাংলা ভাষা নিয়ে কাজ করার ক্ষমতাও বেশি এবং দায়িত্ব বেশি। আমি নিজে মনে করি বাংলাদেশের পক্ষে বাংলা একাডেমি সত্যি সত্যি দায়িত্ব পালন করতে পারে। এখনও পুরোপুরি করছে না বা তার ওই উচ্চাভিলাষ নেই। কিন্তু আমি প্রথম থেকেই বলে আসছি যে, বাংলাদেশের পক্ষে বাংলা একাডেমির আসলে ৩০ কোটি বা প্রায় ৩০ কোটি বাংলাভাষীর পক্ষে কাজ করার সক্ষমতা অর্জন করা উচিত। এবং অবিলম্বে ওই উচ্চাভিলাষে পৌঁছানো উচিত। অন্য যে বাংলা ভাষাভাষী গোষ্ঠীগুলো আছে যেমন পশ্চিমবঙ্গে আছে, আসামে আছে, ত্রিপুরায় আছে, সারা পৃথিবীতে অভিভাষী গোষ্ঠী আছে তাদের প্রত্যেকের কথা মাথায় রেখে বাংলা একাডেমি কাজ করতে পারে। যেহেতু বাংলাভাষীদের একমাত্র স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশ। আমি আশা করছি, এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের এখানে বিকশিত হবে। এবং বাংলা একাডেমি সেই দায়িত্ব এবং উচ্চাভিলাষ গ্রহণ করবে।
প্রশ্ন : নতুন কোনো অভিধান বের করার পরিকল্পনা আছে কি?
মোহাম্মদ আজম : আপাতত নতুন অভিধানের পরিকল্পনা নেই। বরং বিদ্যমান অভিধানগুলোর বানান বিশৃঙ্খলা দূর করে সেগুলো সুশৃঙ্খল করার কাজ চলছে। পরবর্তী ধাপে এগুলোর রিভাইজ করার পরিকল্পনা আছে।
প্রশ্ন : মুক্তিযুদ্ধ অহংকারের জায়গা। গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমি এই বিষয়টিকে কীভাবে মূল্যায়ণ করবে?
মোহাম্মদ আজম : মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলা একাডেমির প্রকাশনার সংখ্যা প্রচুর। গত এক বছরেও আমরা অনেকগুলো নতুন বইয়ের অনুমোদন দিয়েছি। কিছু প্রকাশিত হয়েছে অথবা প্রকাশের পথে আছে। সাধারণভাবে কথাটা হলো- মুক্তিযুদ্ধ আমাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বর্ণাঢ্য অংশ। ফলে ইতিহাসচর্চার স্বাভাবিক গতিপ্রবাহের মধ্যেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রচুর কাজ হবে। আবার বাংলা একাডেমির ঘোষিত প্রধান লক্ষ্য হলো বাংলা ভাষা, সাহিত্য, ইতিহাস এবং সংস্কৃতি। এগুলো সম্পর্কে গবেষণা করা, গ্রন্থ প্রণয়ন করা এবং একই সঙ্গে এগুলো প্রমিতায়ন করা। সুতরাং বাংলা একাডেমির মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থেকে পিছপা হওয়ার কোনো অবকাশই নেই। কিন্তু বিশেষভাবে উদ্দেশ্যপ্রবণ হয়ে মুক্তিযুদ্ধসংক্রান্ত গবেষণার নামে নানান ধরনের ঐতিহাসিক বয়ান তৈরি করার কাজটি কখনও কখনও বেশি হয়েছে, এখন হয়তো সেই কাজটা হবে না।
প্রশ্ন : আপনাকে ধন্যবাদ।
মোহাম্মদ আজম : আমাদের সময়কেও ধন্যবাদ।
প্রিন্ট/ডাউনলোডঃ ,
© স্বত্ব দৈনিক সমধারা ২০২৫
এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি