সমধারা

সেপ্টেম্বর ১৭, ২০২৬ , ৫:৫০ অপরাহ্ণ

কাজী নজরুল ইসলাম ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ

মজিদ মাহমুদ

বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে নিয়ে কোনো কবিতা লিখেছেন বলে আমার চোখে পড়েনি। বিদ্রোহী কবির স্বভাব অনুযায়ী, জিন্নাহকে তাঁর কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হলে তিনি নিশ্চয়ই এক বা একাধিক কবিতা লিখে বসতেন। কারণ সে সময়ের স্বাধীনতাকামী নেতৃবৃন্দের প্রায় সবাইকে নিয়েই নজরুল গান-কবিতা, এমনকি কাব্যগ্রন্থ পর্যন্ত লিখেছেন।

এটি খুবই রহস্যজনক যে, নজরুল কেন জিন্নাহকে নিয়ে কিছু লিখলেন না। জিন্নাহ তো ১৯১৬ সাল থেকেই মুসলিম লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতায় পরিণত হয়েছিলেন। যদিও শাহেদ আলীর একটি অসমর্থিত দাবিতে বলা হয়েছে, নজরুল একটি গদ্যে জিন্নাহর নেতৃত্বের প্রশংসা করেছিলেন। এটি হওয়া খুব অস্বাভাবিক নয়, কারণ ১৯৪০ সালের আগে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেস অনেক ক্ষেত্রেই ভারতীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে ব্রিটিশবিরোধী রাজনীতিতে কাছাকাছি অবস্থান নিয়েছিল। তখন মুসলিম লীগের অন্যতম প্রধান কাজ ছিল মুসলিম জনগণের স্বার্থ রক্ষা ও তাদের সংগঠিত করা।

১৯৪০ সালের গোড়ার দিকেও নজরুল পাকিস্তান আন্দোলনকে ‘ফাঁকিস্তান আন্দোলন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। এবং শেরে বাংলার সঙ্গে যুক্ত হয়ে আলাদা রাষ্ট্র-পরিকল্পনার আন্দোলনে সক্রিয় থাকার প্রতিশ্রুতিও ব্যক্ত করেছেন।

বরং নজরুলের চেয়ে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে জিন্নাহর যোগাযোগ কিছুটা বেশি হয়েছিল। কংগ্রেস-মুসলিম লীগের বিভিন্ন সভা ও রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে তাঁদের মধ্যে যোগাযোগ হয়ে থাকতে পারে। বিশেষ করে জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকাণ্ডের পরে ১৯২০ সালে বোম্বাইয়ে জিন্নাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত একটি সভায় অ্যান্ড্রুজ রবীন্দ্রনাথের বার্তা পড়ে শোনান।
রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুর পরে জিন্নাহ বলেন, ‘তরুণ বয়স থেকেই’ রবীন্দ্রনাথকে জানতেন এবং ‘শেষবার ১৯২৯ সালে লন্ডনে’ তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছিলেন; তাঁদের খোলামেলা ও আলোকপ্রদ আলোচনা তাঁকে উৎসাহিত করেছিল বলেও তিনি উল্লেখ করেন। (সাক্ষাতের সালটি হয়তো দুএক বছর পরে হতে পারে।)

প্রকৃতপক্ষে নজরুল যে ধারার কবিতা লিখতেন এবং যে ধরনের রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখতেন, সেখানে দেশভাগ তাঁকে শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল—এমন একটি সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। আমার নজরুলের জীবনভিত্তিক উপন্যাসে ‘তুমি শুনিতে চেয়ো না’তে তাঁর অসুস্থতার সম্ভাব্য কারণগুলোর মধ্যে দেশভাগকেও অন্যতম হিসেবে উল্লেখ করা আছে। কারণ একজন মানুষের সমাজমনস্তত্ত্ব ও বাহ্যিক আচরণের মধ্যে একটি সম্পর্ক রয়েছে। যদিও নজরুলে অসুস্থ হওয়ার বেশ কয়েক বছর পরে ভারতবাগ হয়, কিন্তু বিয়াল্লিশ তেতাল্লিশ সালে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক প্রায় তলানিতে চলে গিয়েছিল। সেটি কবির জন্য একটি হতাশার কারণ হতেই পারে। যদিও এটি কেবলই সম্ভাবনা।

নজরুল তাঁর জীবনের সৃষ্টিশীল বিশ বছরে যে উন্মাদনাময় সৃষ্টি ও অর্জনের জগৎ নির্মাণ করেছিলেন, দেশভাগের দ্বারা তা রাতারাতি প্রায় ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে—এই আশঙ্কা কবির জন্য অমূলক ছিল না। যে হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক এবং স্বাধীন ভারতের স্বপ্নে তিনি পল্লবিত হয়েছিলেন, সেই স্বপ্ন ব্যাহত হওয়ায় তাঁর মধ্যে গভীর মানসিক হতাশা জন্ম নেওয়া অসম্ভব নয়। আর সেই হতাশা থেকে তিনি বাইরের জগৎ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে এক অবচেতন মানসিক জগতে আশ্রয় গ্রহণ করে থাকতে পারেন।

আর এসব কারণেই পাকিস্তানের তেইশ বছরে নজরুলকে স্বাধীন পাকিস্তানে আনা সম্ভব হয়নি, কিংবা আন্তরিকভাবে আনার চেষ্টা কতটা হয়েছিল, সে প্রশ্নও থেকে যায়। যেসব চেষ্টা হয়েছে, সেগুলো ফলপ্রসূ হয়নি। পাকিস্তান সৃষ্টির প্রশ্নে নজরুলের অবস্থানও এর পেছনে একটি কারণ হয়ে থাকতে পারে। পাকিস্তান আমলে পাকিস্তানপন্থী কবি-সাহিত্যিকদের মধ্যেও তাঁকে এ দেশে আনার ব্যাপারে বিশেষ উৎসাহ দেখা যায়নি।

যাক, রবীন্দ্রনাথের মতো ব্রিটেনে জিন্নাহকে ঘিরে আমারও একটি প্রতীকী স্মৃতি আছে। ২০১০ সালে ম্যানচেস্টার সিটি হলে বেড়াতে গিয়ে দেখলাম, সেখানে পাকিস্তানের জাতির পিতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আবক্ষ একটি মূর্তি যত্নে সংরক্ষিত আছে।

সত্য কথা বলতে কী, আমার মধ্যে তখন একটি মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছিল। একদিকে আমাদের সঙ্গে অতীত সম্পর্কের কারণে এই মেধাবী মানুষটির প্রতি একধরনের ভালোলাগা; অন্যদিকে একটি সন্দেহ যে জাগেনি, তা হলফ করে বলতে পারব না—তিনি কি শেষ পর্যন্ত ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষা করেছিলেন?

মজিদ মাহমুদ : কবি, প্রাবন্ধিক ও গবেষক।

প্রিন্ট/ডাউনলোডঃ ,

© স্বত্ব দৈনিক সমধারা ২০২৫

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি

প্রিন্ট করুন

সেভ করুন