সমধারা

অক্টোবর ১০, ২০২৬ , ৭:২১ অপরাহ্ণ

পারফেক্ট মা নয়, সুখী মা হওয়াই হোক লক্ষ্য

ফাতেমা তুজ জোহরা তারিন

মা শব্দটি খুব ছোট হলেও যেদিন থেকে এই পরিচয় একজন নারীর জীবনে যুক্ত হয়, সেদিন থেকেই তাঁর পুরো পৃথিবী বদলে যায়। জীবন ভারী হয়ে ওঠে হাজারো দায়িত্বে। তবে তার মানে এই নয় যে পূর্বের অন্য দায়িত্ব থেকে তিনি মুক্তি পান। বরং সবকিছু পারফেক্টভাবে ম্যানেজ করার সামাজিক চাপ প্রতিনিয়ত মায়ের মানসিক স্বাস্থ্যকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। আর একজন মা মানসিকভাবে ফিট না থাকলে তার প্রভাব পড়ে সন্তানের ওপরও।

মা ও সন্তানের মানসিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে বদলাতে হবে দৃষ্টিভঙ্গি। তথাকথিত “সুপার মম বা পারফেক্ট মম” নয়, বরং “হ্যাপি মম” হওয়াটাই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য।

জাপানের এই পাঁচ জীবনদর্শন কাজে লাগিয়ে যেকোনো মা খুঁজে পেতে পারেন সুখী মা হওয়ার সূত্র:

১. তুলনা বাদ দিন (ওউবাইতোরি / Oubaitori)

আপনি কি কখনো সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্য মায়ের জীবন দেখে নিজেকে পিছিয়ে আছেন বলে ভেবেছেন?

সুখী হওয়ার পথে অন্যতম বাধা হলো তুলনা। ওউবাইতোরি দর্শন অনুযায়ী প্রত্যেকটা বিষয়ের একটা নির্দিষ্ট সময় আছে। প্রকৃতির দিকে তাকালে আমরা দেখি, একেক ফুল একেক ঋতুতে ফোটে: বর্ষায় কদম, শরতে শিউলি, বসন্তে পলাশ। এরা কেউ কারও সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে না, তবু প্রত্যেকের সৌন্দর্য আলাদা, সময়ও আলাদা। কিন্তু প্রায়শই সোশ্যাল মিডিয়ায় অন্য মায়ের জীবন দেখে আমরা নিজের অজান্তেই তুলনার হীনম্মন্যতায় ভুগি। বাস্তবে প্রত্যেক মায়ের পারিপার্শ্বিক অবস্থা, সন্তানের বেড়ে ওঠার গতি, পরিবেশ ও সাপোর্ট সিস্টেম ভিন্ন। তেমনি আমাদের প্রত্যেকের জীবনের সুখ, দুঃখ ও চ্যালেঞ্জের সময়ও আলাদা। তাই সুখী হতে হলে নিজের জীবনের প্রতিটি ধাপ এবং পাওয়া-না-পাওয়ার সময়কে স্বতঃস্ফূর্তভাবে গ্রহণ করা উচিত। অন্যের সাথে তুলনা ছেড়ে এই বিশ্বাস ও প্রত্যাশা নিয়ে এগিয়ে যাওয়া যে নির্দিষ্ট সময়ে আপনার জীবনও গুছিয়ে উঠবে, এই ভাবনাই মূলত “ওউবাইতোরি” দর্শনের প্রয়োগ। যেকোনো মা চাইলে ওউবাইতোরিকে কাজে লাগিয়ে হতাশা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। ওউবাইতোরি নিয়ে ইংরেজিতে সাওরি ওকাদার Oubaitori: The Japanese Art of Self-Acceptance বইটি পড়তে পারেন।

২. বেঁচে থাকার কারণ খুঁজুন (ইকিগাই / Ikigai)

সন্তান ও সংসারের বাইরে এমন কী আছে, যা আপনার জীবনকে অর্থপূর্ণ করে?

মায়েদের দিনের বড় অংশ কাটে সন্তানের দেখভাল, যত্ন ও গৃহস্থালির কাজে। এ সময় অনেক মা আত্মপরিচয় ও কাজ নিয়ে হীনম্মন্যতায় ভোগেন। বিশেষত পেশাগত পরিচয় গড়ে তুলতে না পারলে ঘরের কাজ বা সন্তানের যত্নের কাজেও তাঁরা যেন তেমন সম্মান ও স্বীকৃতি অনুভব করেন না। একজন মা চাইলে ইকিগাইয়ের মাধ্যমে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন।

ইকিগাই জাপানের একটি প্রাচীন ধারণা, যার অর্থ বেঁচে থাকার কারণ খুঁজে নেওয়া। সেজন্য নিজেকে এই চারটি প্রশ্ন করুন: কোন কাজটি করতে আপনার ভালো লাগে? কোন কাজে আপনি দক্ষ? কোন কাজটিকে উপার্জনের মাধ্যম করা যায়? আর পৃথিবীর এখন কী প্রয়োজন? এমন কোনো কাজ কি আছে, যা এই সব প্রশ্নের উত্তরের সঙ্গে মিলে যায়? তা ভেবে বের করুন, অল্প হলেও, সেই কাজে নিয়মিত সময় দিন। সন্তান লালন-পালনের পাশাপাশি প্রতিদিন নিজের এই বিশেষ কাজে সময় দিলে জীবন তার নতুন অর্থ খুঁজে পাবে, হয়ে উঠবে আনন্দময়। ইকিগাই নিয়ে জানতে পড়তে পারেন কেন মোগির The Little Book of Ikigai এবং হেক্টর গার্সিয়া ও ফ্রানসেস্ক মিরালিয়েসের Ikigai: The Japanese Secret to a Long and Happy Life।

৩. ছোট পদক্ষেপে এগিয়ে চলুন (কাইজেন / Kaizen)

শেষ কবে এমন কিছু করেছেন, যা নিয়মিত করলে মাস বা বছর শেষে আপনাকে এনে দিতে পারে বিশেষ কোনো অর্জন?

কাইজেন হলো প্রতিদিন অল্প অল্প করে এগিয়ে যাওয়ার ধারণা। বড় লক্ষ্য বা বড় পরিবর্তনের কথা ভাবলে আমাদের মস্তিষ্ক ভয় পেয়ে যায়, আমরা শুরু করতেই ভয় পাই। কাইজেন অনুসারে একজন মা প্রতিদিন অল্প অল্প করে নিজের যত্নে মনোযোগী হতে পারেন। ফিটনেস চাইলে সেটি হতে পারে প্রতিদিন অন্তত ৫ মিনিটের জন্য ব্যায়াম করা, ত্বকের যত্ন নেওয়া, চুল আঁচড়ানো, হাত-পায়ের যত্ন নেওয়া ইত্যাদি । আর আত্মপরিচয় গড়ে তুলতে কোনো দক্ষতা বাড়াতে চাইলে প্রতিদিন শুধু ২০ মিনিট সেই কাজে সময় দিন। প্রতিদিনের এই ৫-২০ মিনিট মাস শেষে দেবে নতুন আত্মবিশ্বাস ও ইতিবাচক পরিবর্তন। কাইজেনের কার্যকারিতা ও কৌশল সম্পর্কে আরও জানতে পড়তে পারেন রবার্ট মরারের One Small Step Can Change Your Life: The Kaizen Way।

৪. অপূর্ণতাকে মেনে নিন (ওয়াবিসাবি / Wabi-Sabi)

“মম গিল্ট” বা মাতৃত্বজনিত অপরাধবোধ কি আপনারও নিত্যসঙ্গী?

মায়েদের জীবনে এই অপরাধবোধ যেন নিত্যসঙ্গী। আমরা একই সঙ্গে চাই ঘর পরিপাটি থাকবে, সন্তানের খাওয়া-পড়াশোনা ঠিক থাকবে, নিজেও থাকব হাসিখুশি, আবার সময়মতো নানা পদের রান্নাবান্নাও হবে। “পারফেক্ট মম” হওয়ার একটা তাড়না কাজ করে আমাদের। আর এসব করতে গিয়ে উল্টো মা শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন, এবং সেই বিরক্তি অনেক সময় সন্তানের ওপরই প্রকাশ পায়। জাপানের ওয়াবিসাবি দর্শন এখানে একটি ভিন্ন দৃষ্টি দেয়। এই দর্শন অসম্পূর্ণতাকে ব্যর্থতা নয়, জীবনের স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখে।

একজন মা চাইলে এই চোখে নিজেকে দেখতে পারেন। আজ রান্না দেরি হয়েছে, ঘর অগোছালো, সন্তান কম খেয়েছে, তবু আপনি চেষ্টা করছেন, এটাই যথেষ্ট। “পারফেক্ট মা” হওয়ার বদলে “সুখী মা” হওয়াই সুখের প্রথম ধাপ। তাই প্রায়োরিটি সেট করুন। আজকের দিনে কোন কাজগুলো না হলেও চলবে, সেসব নিয়ে আর অপরাধবোধ নয়। ফোকাস থাকুক সন্তানকে কোয়ালিটি সময় দেওয়ার দিকে। রান্না একটু সহজ সাধারণ কোনো রেসিপির হলে তাতেও সমস্যা নেই। এই অপূর্ণতাগুলোও জীবনের অংশ। ওয়াবিসাবি ধারণাটি নিয়ে আরও জানতে পড়তে পারেন বেথ কেম্পটনের Wabi Sabi: Japanese Wisdom for a Perfectly Imperfect Life।

৫. প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হোন (শিনরিন-ইওকু / Shinrin-yoku)

আপনি শেষবার কবে প্রকৃতির সাথে কিছুক্ষণ নীরব সময় কাটিয়েছেন?

গৃহবন্দি থাকা কিংবা কাজ থেকে ফুরসত না পাওয়ার অনুভূতি মাকে মানসিকভাবে হাঁপিয়ে তোলে। এ থেকে মুক্তি পেতে যেকোনো মা শিনরিন-ইওকু কৌশলটি অবলম্বন করতে পারেন, যাকে বলা হয় ফরেস্ট বাথ বা বনস্নান। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, ব্যস্ত শহরে বন পাব কোথায়, বা প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম হব কীভাবে? আসলে জীবন চালাতে হয় যা আছে তা দিয়েই। প্রকৃতির সান্নিধ্যে যেতে পারলে তো ভালোই, তবে সেই সুযোগ কম থাকলে বাসার ছাদে, বারান্দায় কিংবা খোলা মাঠে মাঝে মাঝে হেঁটে এলেও তা মানসিক স্বাস্থ্যকে সতেজ করে। এতে মা ও সন্তান দুজনই প্রফুল্ল হন। ঘরে ইনডোর প্ল্যান্ট লাগিয়ে তার যত্ন নেওয়াও হতে পারে মায়ের জন্য ইটপাথরের শহরের বনস্নান।

সবশেষে জাপানের এই পাঁচ জীবনদর্শনের পাশাপাশি একটি বোনাস কৌশন আছে, যা জাপানের নয়, তবে মায়েদের কাজে লাগতে পারে। এর নাম প্যারেটো প্রিন্সিপল বা ৮০-২০ রুল। মোটাদাগে এর অর্থ, আমাদের ফলাফলের ৮০ শতাংশ আসে ২০ শতাংশ গুরুত্বপূর্ণ কাজ থেকে। মা চাইলে নিজেকে জিজ্ঞেস করতে পারেন, আমার কোন ২০ শতাংশ কাজ আমার সুখের জন্য সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রাখে? কোন ২০ শতাংশ মানুষ আমার ৮০ শতাংশ সুখের কারণ? কোন ২০ শতাংশ দক্ষতা আমাকে জীবনে ৮০ শতাংশ এগিয়ে নেবে? সেগুলোতে মন দিন, বাকিগুলো একটু কম নিখুঁত হলেও ক্ষতি নেই। এটি কোনো কঠোর গাণিতিক নিয়ম নয়, বরং অগ্রাধিকার ঠিক করার একটি সহজ দৃষ্টিভঙ্গি।

আসলে সুখী মা হওয়ার রহস্য সবকিছু পারার মধ্যে নয়, অগ্রাধিকার নির্ধারণ ও সঠিক দৃষ্টিভঙ্গির মাঝেই নিহিত। আর সুস্থ থাকা, ভালো থাকা এবং নিজের যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব নিতে হয় নিজেকেই। তাই বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে সব মায়ের সুখী হওয়ার প্রয়াসে জাপানের এই পাঁচ জীবনদর্শন হোক অনুঘটক।

লেখক : অ্যাসিস্ট্যান্ট প্রফেসর, বাংলাদেশ আর্মি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি (বাইউস্ট)

প্রিন্ট/ডাউনলোডঃ ,

© স্বত্ব দৈনিক সমধারা ২০২৫

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি

প্রিন্ট করুন

সেভ করুন