সমধারা

অক্টোবর ১০, ২০২৬ , ১০:২৩ অপরাহ্ণ

জালাল খান ইউসুফী: পুঁথির পুনর্জাগরণের কবি

আবু সাইদ কামাল

বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস কেবল মুদ্রিত গ্রন্থের ইতিহাস নয়; এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে মুদ্রণপূর্ব যুগের দীর্ঘ মৌখিক পরম্পরা ও লোকসংস্কৃতিতে। পল্লিজীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত গান, কাহিনি, পদ্য, পালা ও পুঁথিসাহিত্য কালপরম্পরায় আমাদের সামগ্রিক সাহিত্য-সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে এবং আজও সেই ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার হিসেবে বিবেচিত।

পুঁথিসাহিত্য মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিক ঐতিহ্য বহন করে। এ ধারা কেবল মধ্যযুগের সাহিত্যকে সংরক্ষণ করেনি; এটি মধ্যযুগীয় ধর্মচেতনা, লোকবিশ্বাস, প্রেম-রোমান্স, নৈতিকতা, ভাষা, ছন্দ ও লোকজ সংস্কৃতিরও বাহক। পুঁথিসাহিত্য ছিল বাংলার মুসলিম জনসমাজের সাংস্কৃতিক আত্মপ্রকাশের একটি শক্তিশালী মাধ্যম। আরবি-ফারসি শব্দ, ইসলামী ভাবধারা এবং দেশজ বাংলা ভাষা ও লোকজ কাহিনির সমন্বয়ে যে সাহিত্যরীতি গড়ে উঠেছিল, তা বাংলার মুসলিম সমাজের নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিসর নির্মাণে ভূমিকা রাখে।

সময়ের পরিবর্তনে এই ধারাগুলোর অনেকটাই বিস্মৃতির অন্তরালে চলে গেছে। বিশেষত পুঁথিসাহিত্য, একসময় যার ছিল ব্যাপক জনপ্রিয়তা, আধুনিক মুদ্রণ ও নগরকেন্দ্রিক সাহিত্যচর্চার প্রবল স্রোতে অনেকটাই আড়ালে পড়ে যায়। এই বিস্মৃতপ্রায় ধারাকে নতুন করে পাঠকের সামনে উপস্থিত করার ক্ষেত্রে জালাল খান ইউসুফীর ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। তিনি মূলত কবি; কিন্তু তাঁর সাহিত্যিক পরিচয় কবিতার পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়। পুঁথির রচয়িতা, পুঁথিশিল্পী, লোকসংস্কৃতি গবেষক, পথকবি, সম্পাদক, প্রকাশক এবং সাহিত্য-সংগঠক হিসেবে তিনি নিজস্ব একটি কর্মভুবন নির্মাণ করেছেন। ১৯৭২ সালের ৩ সেপ্টেম্বর সিলেট জেলার ওসমানীনগরে তাঁর জন্ম। তাঁর পিতা মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক ও পুঁথিকবি ইউসুফ খান। ফলে লোকসাহিত্য ও পুঁথির সঙ্গে তাঁর পরিচয় কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়। বরং পারিবারিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারের মধ্য দিয়েই তাঁর সাহিত্যজীবনের সূচনা। পিতার হাত ধরে পথকবিতা ও পুঁথিসাহিত্যে প্রবেশ করে তিনি ধীরে ধীরে আধুনিক সাহিত্যের নানা শাখায় নিজেকে বিস্তৃত করেছেন। এ দিক থেকে তাঁর সাহিত্যিক অভিযাত্রাকে এক অর্থে ঐতিহ্য থেকে আধুনিকতার দিকে যাত্রা এবং আবার আধুনিকতার ভিতর থেকে ঐতিহ্যের পুনরাবিষ্কার—দুই দিকেরই সম্মিলন বলা যায়।

জালাল খান ইউসুফীর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত পুঁথিসাহিত্যকে কেবল অতীতের স্মারক হিসেবে না দেখে তাকে জীবন্ত সাহিত্যিক মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা। তাঁর প্রথম পুঁথিকাব্য ‘৮৮’র বন্যার কবিতা’ প্রকাশিত হয় ১৯৮৮ সালে। সেই সূচনা থেকে তিনি শতাধিক পুঁথিকাব্য ও পথকবিতা রচনা করেছেন। তাঁর পুঁথির বিষয়বস্তুর দিকে তাকালে এই সৃষ্টিশীলতার ব্যাপ্তি সহজেই বোঝা যায়। মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান, ধর্মীয় ইতিহাস, প্রেমকাহিনি, ঋতু, অঞ্চল, সমকালীন রাজনীতি, সামাজিক ঘটনা—প্রভৃতি বিচিত্র বিষয়কে তিনি পুঁথির কাঠামোয় ধারণ করেছেন। ‘পুঁথিকাব্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ‘পুঁথিকাব্যে সাত বীরশ্রেষ্ঠ, ‘পুঁথিকাব্যে নজরুলের জীবন, ‘গণঅভ্যুত্থানের পুঁথি, ‘ভাষা দিবসের পুঁথি, ‘স্বাধীনতার পুঁথি’, ‘বিজয়নামা পুঁথি’ প্রভৃতি গ্রন্থ তারই দৃষ্টান্ত।

এখানে তাঁর সাহিত্যিক উদ্যোগের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক লক্ষ করা যায়, তিনি পুঁথিকে জাদুঘরের বস্তু বানিয়ে রাখেননি; বরং সমকালীন জীবন ও ইতিহাসের সঙ্গে তার যোগ ঘটিয়েছেন। অর্থাৎ পুরোনো আঙ্গিকের ভেতরে নতুন বিষয়বস্তুর প্রবেশ ঘটিয়েছেন। ‘পুঁথিকাব্যে সাত বীরশ্রেষ্ঠ’ গ্রন্থে পুঁথির ১৫টি ছন্দের ব্যবহার তাঁর ঐতিহ্যসচেতনতার পাশাপাশি ছন্দগত অনুসন্ধিৎসারও পরিচয় বহন করে। পুঁথির প্রচলিত সুর ও ছন্দের সঙ্গে নতুন সুর ও ছন্দের সন্ধান তাঁর সৃষ্টিশীল মানসের একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য। এই জায়গাতেই তিনি নিছক পুঁথি-অনুসারী নন; পুঁথির সম্ভাবনাকে সমকালীন পাঠের উপযোগী করে তোলার একজন পরীক্ষকও।

তাঁর পুঁথিচর্চার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক গবেষণা। ‘বাংলাদেশের পুঁথিকাব্য’, ‘আমাদের বাংলা পুঁথিসাহিত্য : অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ’ এবং ‘মধ্যযুগ ও আধুনিক যুগের পুঁথি’ গ্রন্থগুলো থেকে বোঝা যায়, তিনি শুধু পুঁথি রচনা করেই থেমে থাকেননি; পুঁথির ইতিহাস, স্বরূপ, বিবর্তন ও ভবিষ্যৎ নিয়েও ভাবতে চেয়েছেন। ‘লোককবি ইউসুফ খান : নির্বাচিত পুঁথিকাব্য সমগ্র’ সম্পাদনার মধ্য দিয়ে নিজের পিতার সাহিত্যিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। ফলে তাঁর সাহিত্যকর্মে স্রষ্টা ও গবেষকের দুটি ভূমিকা পাশাপাশি ক্রিয়াশীল।

তবে জালাল খান ইউসুফীর সাহিত্যিক পরিচয়ের আরেকটি স্বতন্ত্র অধ্যায় হলো পথকবিতা। নব্বইয়ের দশকে হাটে-বাজারে তাঁর রচিত ও প্রকাশিত শতাধিক পথকবিতা পাঠ ও বিক্রি হতো। ‘৮৮’র বন্যার কবিতা’, ‘রোকেয়া বিবির করণ কাহিনি’, ‘মনির খুকুর ফাঁসি’, ‘এরশাদের পতন’, ‘এরশাদ শিকদারের ফাঁসি’, ‘আফগানিস্তান আমেরিকার যুদ্ধ’, ‘ইরাক আমেরিকার যুদ্ধ’, ‘চিত্রনায়ক সালমান শাহর রহস্যময় মৃত্যুর করুণ কাহিনি’, ‘মিয়ানমারে গণহত্যার কবিতা’ প্রভৃতি রচনার বিষয়বৈচিত্র্য থেকে বোঝা যায়, তাঁর পথকবিতা ছিল মূলত সমকালীন ঘটনার তাৎক্ষণিক সাহিত্যিক প্রতিক্রিয়া। সংবাদ, জনজীবন, সামাজিক ঘটনা, অপরাধ, রাজনীতি, প্রেম ও ধর্মীয় অনুভূতি—সবই তাঁর পথকবিতার বিষয় হয়েছে।

পথকবিতার শক্তি মূলত তার সহজবোধ্যতা, মৌখিকতা, ছন্দময়তা এবং জনসম্পৃক্ততায়। এই বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেই জালাল খান ইউসুফী সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছাতে চেয়েছেন। আধুনিক সাহিত্যের অভিজাত পাঠকগোষ্ঠীর বাইরে হাট-বাজারের শ্রোতা ও পাঠকের কাছে সাহিত্য পৌঁছে দেওয়ার এই প্রয়াসকে বাংলা লোকসাহিত্যের ধারাবাহিকতার মধ্যেই দেখতে হবে। তাঁকে তাই কেবল ‘পথকবিতার কবি’ বললে তাঁর কাজের ব্যাপ্তি যেমন ধরা পড়ে না, তেমনি তাঁর সাহিত্যিক ভূমিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক দিকও আড়ালে থেকে যায়।

তাঁর বহুমাত্রিকতার আরেকটি পরিচয় তাঁর অন্যান্য গ্রন্থে। উপন্যাস, কিশোরগল্প, ছড়া, প্রেমের কবিতা, ইসলামি কবিতা, প্রবন্ধ—বিভিন্ন শাখায় তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ রয়েছে। ‘নির্বাচিত পাঁচটি উপন্যাস’, ‘একাত্তরের কিশোর যোদ্ধা’, ‘বৃষ্টি গিয়েছিলো পরীর দেশে’, ‘জলপরী ও জিন্নিয়া’, ‘যামদো ও রামদো ভূতের গল্প’, ‘জেলে ও ডাকাতের গল্প’ প্রভৃতি কিশোরসাহিত্যের গ্রন্থ তাঁর পাঠক-পরিসরকে আরও বিস্তৃত করেছে। শিশু-কিশোরদের জন্য ‘নীল সবুজের পাল’, ‘ভম ভম ভমকে’, ‘চিরিপ চিরিপ কিরিপ কিরিপ’, ‘শুভ্র তুলোর নাও’ প্রভৃতি ছড়াগ্রন্থ তাঁর সৃষ্টিশীলতার অন্য একটি দিক উন্মোচন করে। আবার ‘কবিতা সুন্দরী’ প্রেমের কবিতার এবং ‘সিরাতুল মুস্তাকিম’ ইসলামি কবিতার ভিন্ন অভিজ্ঞতা বহন করে।

তবে তাঁর সাহিত্যকর্মের মূল্যায়নে সংখ্যার বিষয়টি যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুণগত বিচারও জরুরি। পঞ্চাশের অধিক গ্রন্থ এবং শতাধিক পুঁথিকাব্য তাঁর বিপুল সৃজনশীল শ্রমের প্রমাণ; কিন্তু সাহিত্যিক মূল্য কেবল গ্রন্থসংখ্যায় নির্ধারিত হয় না। তাঁর রচনার একটি বড় শক্তি বিষয়কে দ্রুত গ্রহণ করে সহজ ছন্দ ও পরিচিত লোকরীতির মাধ্যমে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ক্ষমতা। তাঁর সীমাবদ্ধতা কোথায়—তা নির্ণয়ের জন্য তাঁর বিপুল রচনার একটি প্রতিনিধিত্বশীল অংশ নিয়ে আরও নিবিড় পাঠ, পাঠভেদ, ছন্দবিশ্লেষণ, ভাষাশৈলী ও নন্দনতাত্ত্বিক বিচার প্রয়োজন। বিশেষ করে পুঁথি ও পথকবিতার ক্ষেত্রে তাঁর রচনার কতখানি ঐতিহ্যনির্ভর, কতখানি মৌলিক এবং কোথায় তিনি নতুন রীতি সৃষ্টি করেছেন—এ নিয়ে পৃথক গবেষণার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।

তাঁর স্বীকৃতিও কম নয়। ১৯৯২ সালে ইউনিসেফ বাংলাদেশ থেকে পুঁথিকাব্যের জন্য প্রশংসাপত্র অর্জন, ২০১৪ সালে ‘পুঁথিসম্রাট’ উপাধিতে ভূষিত হওয়া এবং পরবর্তীকালে ময়মনসিংহ সাহিত্য উৎসব ও কক্সবাজারের উখিয়ায় পুঁথিসম্রাট হিসেবে সংবর্ধিত হওয়া তাঁর দীর্ঘ সাহিত্যচর্চার সামাজিক স্বীকৃতির পরিচায়ক। তবে যেকোনো উপাধির চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তাঁর দীর্ঘস্থায়ী সাধনা। একটি প্রায় বিস্মৃত সাহিত্যধারাকে নিজের সৃষ্টিশীলতার কেন্দ্রে রেখে কয়েক দশক ধরে কাজ করে যাওয়া নিঃসন্দেহে এক ধরনের সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার পরিচয়।

জালাল খান ইউসুফী সাহিত্যচর্চার পাশাপাশি সংগঠক ও সম্পাদক হিসেবেও সক্রিয়। কাব্যকথা প্রকাশনীর প্রকাশক, মাসিক ‘কাব্যকথা’র সম্পাদক এবং কাব্যকথা সাহিত্য পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তিনি নিজের সাহিত্যকর্মকে ব্যক্তিগত সৃষ্টির গণ্ডি ছাড়িয়ে একটি সাংস্কৃতিক পরিসরে বিস্তৃত করেছেন। বিশেষ তাৎপর্যের বিষয়, তাঁর সম্পাদিত পত্রিকার সম্পাদকীয়ও পুঁথির মাধ্যমে রচিত হয়। এটি নিছক অভিনবত্ব নয়; বরং তাঁর পুঁথিচর্চার প্রতি গভীর দায়বদ্ধতার একটি প্রতীকী প্রকাশ।

সব মিলিয়ে জালাল খান ইউসুফীকে বাংলা সাহিত্যে একটি স্বতন্ত্র ধারার সাধক হিসেবে মূল্যায়ন করা যায়। তিনি হয়তো মূলধারার আধুনিক কবিতার প্রচলিত নন্দনতত্ত্বের কবি কিনা সে সম্পর্কে শিল্প বিচারের দাবি রাখে। তাঁর সাহিত্যিক প্রকল্পের কেন্দ্র অন্যত্র—লোকজ স্মৃতি, মৌখিক ঐতিহ্য, পুঁথির সুর-ছন্দ এবং সাধারণ মানুষের জীবন ও সময়। তাঁর সবচেয়ে বড় অবদান এখানেই যে, তিনি বিস্মৃতপ্রায় পুঁথিকে শুধু স্মরণ করেননি, তাকে আবার লিখেছেন, পরিবেশন করেছেন এবং সমকালীন বিষয়বস্তুর সঙ্গে যুক্ত করেছেন।

তাঁর সাহিত্যকর্মের পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়ন হয়তো আরও সময় ও গবেষণার দাবি রাখে। কিন্তু এতটুকু বলা যায়, বাংলা লোকসাহিত্যের দীর্ঘ প্রবাহে জালাল খান ইউসুফী এমন একজন সৃষ্টিশীল কর্মী, যিনি ঐতিহ্যের নিভে আসা প্রদীপে নতুন করে আলো জ্বালানোর চেষ্টা করেছেন। তাঁর হাতে পুঁথি কেবল অতীতের স্মৃতি নয়; তা হয়ে উঠেছে বর্তমানকে বলার একটি ভাষা। আর এই কারণেই তাঁকে শুধু পুঁথিকবি হিসেবে নয়, বাংলার পুঁথিসাহিত্যের পুনর্জাগরণের একনিষ্ঠ কারিগর হিসেবে স্মরণ করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।

প্রিন্ট/ডাউনলোডঃ ,

© স্বত্ব দৈনিক সমধারা ২০২৫

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি

প্রিন্ট করুন

সেভ করুন