সমধারা

অক্টোবর ১১, ২০২৬ , ৬:৩৬ অপরাহ্ণ

আলেয়া মান্নানের ১০ কবিতা

সমধারা রিপোর্ট

আমার মেয়ে

এ যুগে দেখিনি আর, এমন একটি মেয়ে,
সহজ-সরল মন তার, চলে শান্ত পায়ে।
চলা-ফেরাও খুব সাধারণ,
সৃষ্টি যেনো প্রভুর হাতে, সাদামাটা জীবন।
মা-বাবার বাধ্য সে, শান্ত তার মন
ভাইদের স্নেহ করে, ভাবে খুব আপন।
নামাজ-রোজা করে আর চলে সৎ পথে,
থাকে সে নির্বেজাল সবারই সাথে।
কারো সঙ্গে তর্কে, জড়ায় না সে কভু।
সে ভাবে তার জন্য, সদয় আছে প্রভু।
এ যুগে এমন মেয়ে, কমই পাওয়া যায়।
ভাগ্যগুণে এই মেয়ে, বিধি দিছে আমায়।
শুকরিয়া করি এই প্রভুর দরবারে,
এমন সন্তান দেয় যেন সবার ঘরে ঘরে।

মেঘলা দিনে

মেঘলা দিনে বিলের পাড়ে।
মৃদু বাতাসে শীতল করে।
গরু মহিষ আছে মাঠে।
চলছি মোরা ঝিলের বাটে।
বিলের জলে শাপলা ফোটে।
কমলি ফুলও আছে তটে।
ডিঙি নৌকা নদীর পাড়ে।
জেলে ভাই মাছ ধরে।
বাদল নামার আগেই সবাই।
আপন বাড়ি ফিরে যাই।
চাষীর দলে ধান কাটে।
গান গায় মধুর কণ্ঠে।
জারি সারি, ভাটিয়ালি গান।
সুরে ভাসে বাংলা মাটির টান।
এমন দৃশ্যে মন কাড়ে, চোখ জোড়ায় বেশ
অপরূপ চিত্র যেনো আমার এই দেশ।

মানুষ হও

জন্মিলেই মানুষ নয়,
কাজে হতে হয়।
থাকে যদি শিক্ষা শক্তি,
প্রভুর প্রতি ভক্তি।
আদর্শ মানুষ হয়ে গড়ে উঠবে যেদিন,
প্রকৃত মানুষ তো হবে তুমি সেদিন।
বড়দের সম্মান করো ছোটদের স্নেহ,
তবেই তো মানুষ হবে, ঘৃণা করবে না কেহ।
দ্বীনের পথে চলো নামাজ কায়েম করো।
সবকিছু ছোট ভেবে প্রভুকে মানো বড়।
তবেই যে মানুষ হবে সবার কাছে তুমি,
বিপদেও রক্ষা তোমায়, করবে অন্তর্যামী।
সত্য কথা বলো সদা, সৎ পথে চলো।
দুর্যোগে পড়েও যেন, প্রভুর নামটি বলো।
কভু করিও না, কারও ক্ষতি,
সদয় থাকিও সদা, অন্যের প্রতি।
তবেই মানুষ হবে তুমি একদিন
ন্যায় অন্যায় নিজ থেকে বুঝিবে যেদিন।
মানুষ রূপে না থেকে সঠিক মানুষ হও,
শক্ত শৃঙ্খলে থেকেও,
আল্লাহর নামটি কও

পাখির বন্ধুত্ব

আমার বাড়ির পূর্বকোণে।
রৌদ্র ছায়ার খেলা বুনে।
দক্ষিণ উঠোনে গাছের ডালে।
পাখিরা সব দলেদলে।
রোজ সকালে জোড়ায় আঁখি।
কতো পাখির ডাকাডাকি।
কিচিরমিচির মধুর সুরে।
মন আনন্দে খেলা করে।
সব সাথীরা রই তাকিয়ে।
কখনো আবার যাই হাঁকিয়ে।
আয় রে পাখি খেতে দেবো,
ফোঁকলা দাতের হাসি দেখবো।
পাখি তুমি বন্ধু হবে?
আমার গাছের ফল খাবে!
তুমি আমি দুজন মিলে।
কথা বলবো মন খুলে!

পাখির মেলা

আমার গায়ে অনেক পাখি,
রূপ দেখে জুড়ায় আঁখি।
সকাল-বিকেল পাখির দলে,
কিচিরমিচির কথা বলে।
বাবুই, টিয়ে, চড়ুই, ময়না,
ধরে দিতে করি বায়না।
দোয়েল, কোয়েল, শ্যামার দলে,
বুলবুলি, শালিক গাছের ডালে।
ঝাঁকে ঝাঁকে আসে যায়,
দেখে আমার মন জুড়ায়।
কাঠঠোকরা আর ঘুঘু পাখি,
আমার গায়ে অনেক দেখি।
সাদা বক, গাঙচিল,
মাছরাঙা হাসে খিলখিল।
হলদে পাখি দেখতে বেশ,
কোড়া পাখির বড় কেশ।
আরও কত পাখি রে ভাই,
নাম আমার জানা নাই।

দূরন্ত শৈশব

নৌকায় চড়ি নদীর বুকে,
ডাঙায় এসে দিই টুকে।
রাখালের সাথে বাঁশির সুরে
পায়ে পায়ে বহু দূরে।
সময় পেরোতো মাছ ধরে,
পরে যাই আবার ধপাস করে।
সঙ্গীরা সব উঠে হেসে,
আনন্দটা যেনো যায় ভেসে।
খেলা হতো গোল্লাছুট,
তৈরী যেনো দাড়িয়াবান্ধার কূট।
পড়ার সময় দেওয়া ফাঁকি,
অনেক কাজ আছে বাকি।
চুরি করতে বাগানের ফল,
গাছের গোড়ায় দিই জল,
এটাই যে চুরির কৌশল।
সহপাঠিরা ছিলাম একদল
সন্ধ্যা হলে পড়ার নামে,
ফিসফিস কথার আসর জমে।
জোনাকী ধরে বোতলে ভরে,
ম্যাজিক দেখাই খেলা করে
ওমনি করে দিন শেষ,
সহপাঠীদের মনোনিবেশ।

আকাশ নিয়ে

আমি যখন দেখি আকাশ,
মনে জাগে প্রশ্নের আবাস।
আকাশের এত কিসের দুখ?
বর্ষাতে কেঁদে ভাসায় বুক!
তোমার এমন কান্না দেখে,
আমিও ভাবি খুব দুখে।
ইচ্ছে করে ছুটে যাই,
তোমাকে একটু হাত বোলাই।
সান্ত্বনা আমি দিই কিসে!
তুমি তো দূর আকাশে।
আবার যখন হেমন্ত কালে,
মুচকি হাসি তোমার গালে।
আমিও তখন খুব খুশি,
তোমার মুখে দেখে হাসি।
মুক্তা ঝরে রাশি রাশি,
আকাশ তোমায় খুব ভালোবাসি।

রূপসী বাংলা

রূপসী বাংলা আমার এদেশ,
অপরূপ দৃশ্য, মনোরম পরিবেশ।
শ্যামল-সবুজ আছে নানান রূপ,
রূপসী বাংলা দেখতে অপরূপ।
মাঠে মাঠে সোনালি ধান,
গাছে পাখির কলতান।
জেলেদের কণ্ঠে গায় গান,
এসবই রূপসী বাংলার টান।
হাটে-ঘাটে জনকোলাহল,
খেলার মাঠে কিশোরের দল।
খালে-বিলে মাছের ঝাঁক,
শস্য ক্ষেতে তোলে শাক।
শহরে শুধু দালান-বাড়ি,
রাস্তায় দেখি দামি গাড়ি।
ব্যাস্ততায় জীবন পার করি,
যে যার অফিস-বাড়ি।
কৃষক, জেলে, রাখাল, মাঝি,
বিয়ের মণ্ডপে সাজে কাজি।
রূপসী বাংলা এই দেশ,
সে যে আমার বাংলাদেশ।

তোমার লোভে

এবার না হয় বৃষ্টি নামুক।
আনবে যখন কুড়িয়ে শামুক।
আমি না হয় রুমাল হবো,
ভেজা চুল মুছে দেবো।
বৃষ্টি না হয় আসুক এবার
অপেক্ষাটা ফেরোক আমার
দেখতে ভিষণ লাগে ভালো,
চুল তোমার এলোমেলো।
এবার না হয় নামুক বৃষ্টি,
দেয় যদি কেউ কূদৃষ্টি।
আমি না হয় ছাতা হবো,
তোমার মাথায় তুলে ধরবো।
ভালোবাসার প্রতীক জেনে,
বকুল ফুলের মালা বুনে।
আমার না হয় লোভ জাগোক,
যে যায় বলার বলুক।
তোমার জন্য হৃদয় কাঁদোক।
আমার না হয় যায় হোক।

ভালো থেকো

আমি চাই আমাকে যেনো কখনো মনে না পড়ে।
পৃথিবীর সকল সুখ যেনো তোমায় রাখে ঘিরে।
নিস্তব্ধতায় তুমি ছিলে, নিঃসঙ্গতায় পাশে রবে।
আমি যখন শূন্যতায় থাকবো ভবে।
উদাস মনে চলা তোমার, মন রয় না ঘরে।
আমি অতিষ্ঠ এই বিড়ম্বনার শিকারে,
চলে এলাম আমি কাখৈই পাড়ার চরে।
ভালো থেকো তুমি, পিছু নাহি ফিরে।
সুখ যেন বসত করে তোমার জীবন নীড়ে।
চাই আমি প্রতিটা মুহূর্ত গুলো।
বিধাতা যেনো তোমায় রাখে ভালো।
পৃথিবীর সকল সুখে তুমি সুখী হও।
বলবো না আমার অন্ধকারে তুমি আলো জ্বালাও।
ভালো থেকো তোমার মতো করে।
ফিরব না আমি এই জীবনের তরে।
মনের আকাশে মেঘেদের ভিড় হলো।
মাঝেমাঝে বিজলির চমকায় আলো।
ঝরেপড়া বৃষ্টির ধারাগুলো।
মনের আকাশ ভীষণ কালো।
আমি চাই কখনো যেনো আমাকে মনে না পড়ে।
পৃথিবীর সকল সুখ যেনো তোমায় রাখে ঘিরে।

কবি আলেয়া মান্নানের জাতীয় পরিচয়পত্রে নাম মোসাঃ আলেয়া খাতুন। তিনি বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলার কলমাকান্দা উপজেলার এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম ইমাম হোসাইন এবং মাতা মোসাঃ জুবাইদা খাতুন। বর্তমানে তিনি ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে বসবাস করছেন।

ব্যক্তিজীবনে আলেয়া মান্নান একজন মা, সংসারী, চাকরিজীবী ও জীবনসংগ্রামী মানুষ। সংসার ও কর্মজীবনের নানা ব্যস্ততার মধ্যেও সাহিত্যের প্রতি তার ভালোবাসা অটুট। দিনের ব্যস্ততা শেষে রাতের নীরবতায় তিনি ডুবে যান সাহিত্যভাবনায়, মনের অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে রূপ দেন লেখায়।

শৈশবে দুরন্ত স্বভাবের আলেয়া মান্নান ভ্রমণ করতে ভালোবাসেন। ইতিমধ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ঘুরে দেখেছেন তিনি। ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ও জীবনের নানা অনুষঙ্গ তাঁর ভাবনার জগৎকে সমৃদ্ধ করে।

সাহিত্যচর্চায় তাঁর পথচলা বেশ প্রাণবন্ত। প্রায় তিন বছর আগে তার একটি যৌথ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এ ছাড়া তাঁর শতাধিক কবিতা দেশের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, অনলাইন সংবাদমাধ্যম ও সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে। কবিতার পাশাপাশি ভবিষ্যতে গল্প লেখারও আগ্রহ রয়েছে তার।

সন্তানদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা আলেয়া মান্নানের জীবনের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। পাশাপাশি তিনি মানুষের সুখে-দুঃখে, বিপদে-আপদে পাশে থাকার চেষ্টা করেন। সাধারণ জীবনযাপন, দায়িত্ববোধ ও মানবিক মূল্যবোধ তাঁর জীবনচর্চার গুরুত্বপূর্ণ দিক।

সংসার, চাকরি ও ব্যক্তিগত দায়িত্ব সামলে সাহিত্যের পথে এগিয়ে চলা আলেয়া মান্নানের কাছে লেখালেখি কেবল শখ নয়, বরং নিজের অনুভূতি ও জীবনবোধ প্রকাশের একটি মাধ্যম। একজন দায়িত্বশীল মা, কর্মজীবী নারী ও সাহিত্যপ্রেমী মানুষ হিসেবে নিজেকে গড়ে তোলাই তার পথচলার পরিচয়।

প্রিন্ট/ডাউনলোডঃ ,

© স্বত্ব দৈনিক সমধারা ২০২৫

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি

প্রিন্ট করুন

সেভ করুন