সমধারা

অক্টোবর ১৫, ২০২৬ , ১০:০৬ অপরাহ্ণ

ভেজাল শিশুখাদ্য: আজরাইলের বংশধরদের হত্যাযজ্ঞ

ড. মাহবুব হাসান

কেন এ শিরোনাম লিখেছি, তার ব্যাখ্যা দরকার। বাংলাদেশ প্রতিদিনের একটি রিপোর্ট ছাপা হয়েছে। শিরোনাম : সর্বগ্রাসী ভেজালে বিপন্ন জীবন। এ শিরোনাম পড়েই আমার শ্বাসনালি বন্ধ হওয়ার জোগাড় হলো। রিপোর্ট পড়ে মনে পড়ল আমার তো নাতনি আছে, সে তো শিশুখাদ্যের নামে বিষ খাচ্ছে। রিপোর্টের কিছু অংশ তুলে দিই, তাহলেই কেন শিরোনামে আজরাইলকে ডেকে আনলাম, তা বোঝা যাবে।

বাবা-মা আদর-ভালোবাসা থেকে সন্তানের হাতে যে চকলেট, জুস, ললিপপ কিংবা আইসক্রিম তুলে দিচ্ছেন, তার বড় অংশই বিষাক্ত পদার্থ দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। এগুলো তৈরি হচ্ছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে, নিম্নমানের কাঁচামাল ও ক্ষতিকর রাসায়নিক দিয়ে। কোনো ক্ষেত্রে কাপড়ের রং দিয়ে তৈরি হচ্ছে শিশুখাদ্য, আবার কোনো ক্ষেত্রে ডিটারজেন্ট, তেল ও অন্যান্য রাসায়নিক মিশিয়ে তৈরি হচ্ছে নকল দুধ। শুধু তাই-ই নয়, এগুলোর অনুমোদন না থাকলেও পণ্যের মোড়কে বসিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিএসটিআইয়ের লোগো। ফলে এরকম খাবার হয়ে উঠেছে জীবনের জন্য গুরুতর হুমকি। এসব খাওয়ার কারণে নষ্ট করে দিচ্ছে কিডনি, লিভারসহ শরীরের নানা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। একই সঙ্গে এগুলো কমিয়ে দিচ্ছে শিশুদের বুদ্ধিমত্তা ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাও। রাজধানীর বিভিন্ন মুদি ও মনোহরি দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ম্যাংগো পুডিং, লিচি পুডিং, লিচি জেলি, লিচি ড্রিংকস, আইবল, চকোচকোসহ হরেকরকম শিশুখাদ্য বিক্রি হচ্ছে।

একটি মাফিন কেকের মেয়াদ আট মাস, আবার কোনো খাবারের মেয়াদ আজীবন। দেখা গেছে, অনেক পণ্যে নেই উপকরণের তথ্য, উৎপাদনের মেয়াদ বা উৎপাদনকারীর পরিচিতি। আবার কিছু পণ্যে কোম্পানির ঠিকানা থাকলেও বাস্তবে তার অস্তিত্ব নেই। ভ্যানে ফেরি করে দোকানে দোকানে এসব বিপজ্জনক ক্যাডবেরি, ডেইরি মিল্ক, কিটক্যাটসহ বিদেশি সব ব্র্যান্ডের চকলেট সরবরাহ করা হচ্ছে। স্বাদ ও আকর্ষণীয় ডিজাইনের কারণে সহজেই শিশুরা এসব জিনিসপত্রের প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাজধানীর অলিগলিতে গড়ে উঠেছে ভেজাল শিশুখাদ্য তৈরির কারখানা। ভেজাল পণ্যের একটা বড় অংশ আসে পুরান ঢাকা ও টঙ্গী এলাকা থেকে। চকবাজার, লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, সোয়ারীঘাট, কেরানীগঞ্জ, সাভার, গাবতলী, ডেমরা এলাকায় গড়ে উঠেছে শত শত নকল খাবারের কারখানা। সবচেয়ে বেশি ভেজাল ও নকল হচ্ছে শিশুখাদ্য। মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে এসব অসাধু ব্যবসায়ীকে ধরে নামমাত্র জরিমানা বা কারাদণ্ড দেওয়া হলেও পরে তারা আবারও একই কাজে লিপ্ত হচ্ছে। গত মাসের ৫ থেকে ১৮ তারিখ পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে সারা দেশে মাত্র ২০টি প্রতিষ্ঠানকে আর্থিক জরিমানা করা হয় বলে জানা গেছে। যার মধ্যে ১১টিই খাদ্যপণ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান।

নিশ্চয়ই বোঝানো গেল কেন শিরোনামে আজরাইল এলো? আর সেই আজরাইল তো ওপরে উল্লেখিত নকল শিশুখাদ্য উৎপাদকরা। তারা মানুষ। তবে তারা নকল মানুষ। মানুষের মতো দেখা গেলেও যে তারা আসল মানুষ, তা নয়। তারা আকারেপ্রকারে মানুষ হলেও দিলদরিয়ায় আজরাইলের সন্তান। জান কবচ করার জন্য তারা শিশুদের খাদ্যদ্রব্যকে অস্ত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। কেননা, ওই শিশুরা এ দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিক। তারাই নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলবে।

প্রথম প্রশ্ন রাজধানীর অলিগলিতে কীভাবে অবৈধ শিশুখাদ্যের কারখানা গড়ে উঠল? কারা তাদের মদত দিয়ে গড়ে তুলেছে। যারা নকল শিশুখাদ্যের নামে বিষখাদ্য উৎপাদনের দরজা-জানালা খুলে দিয়েছে, তারা যে আজরাইল সমান অপরাধী, সে কথা কি এ রিপোর্টে আছে? না, নেই। সরকারের অফিসগুলোতে তারা মহাধুমধামের সঙ্গে চাকরি করছে। তারা বাজারের শিশু খাদ্যপণ্য ভালো কি মন্দ, তা পরীক্ষা করেন। ভেজাল দেখলে জরিমানা করে টাকা আদায় করেন। কিন্তু কারখানা সিলগালা করেন না। তাদের আইনের আশ্রয়ে এনে প্রকৃত শাস্তির ব্যবস্থা করেন না। বরং তারা বিষ উৎপাদনকারীদের কাছে থেকে মাসোহারার মতো ঘুষ নিয়ে ওই ব্যবসার দুয়ার উন্মুক্ত করে দেন। এ দুর্নীতির সুতো ধরে আরেকজন অবৈধভাবে শিশুখাদ্য উৎপাদনের নামে বিষখাদ্য তৈরি করে চলেছে। এভাবে বাড়ছে বিষ উৎপাদনের কারখানা। দেশের শিশু খাদ্যপণ্য উৎপাদনের নামে এই যে রমরমা বিষ উৎপাদন চলছে, তা প্রতিহত, প্রতিরোধের কোনো শক্ত উদ্যোগ নেই। আইনের খাতায় তারা যে অপরাধী, তারা যে জাতির ভবিষ্যৎ নাগরিকের জীবনকে ধ্বংস করে দিচ্ছেন, সেই চিন্তাটাও কর্তাব্যক্তিদের নেই। সরকারের প্রশাসনের লোকেরা যে এ অসৎ অপরাধের হোতা, সেটা বোঝার মতো ক্ষমতা দেশের প্রান্তিক এলাকার সরকারি-বেসরকারি সচেতন মানুষের নেই। বরং তারাও শিশুখাদ্য হিসেবে ওই পণ্যগুলোই কেনেন, বিদেশি সিল দেখে আনন্দিত হন এবং ভাবেন ওই শিশু খাদ্যপণ্যে কোনো ভেজাল নেই। তারা জানতেও পারেন না যে তার শহরেরই একটি নোংরা-পচা গলিতে তৈরি হচ্ছে চটকদার ভিনদেশি পণ্য, যা বিষের বড়ি।

শিশুখাদ্যের নামে এ হত্যাযজ্ঞের পরিণতি বন্ধে সরকারের কী করা উচিত? সমাজপতিদের দায় ও দায়িত্ব কী, যারা রাজনীতি সচেতন ও দেশ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করেন, তাদের কর্তব্য কী?

বিএসটিআই ও কিছু প্রতিষ্ঠান তো নিয়মিতই মনিটরিং করে, কিন্তু কোনো কাজ হয় না কেন? অবৈধ ও বিষ উৎপাদক হিসেবে তাদের কারখানা তো বন্ধ হয় না, যৎসামান্য ফাইন করে বা ছয়-নয় মাসের জেলজরিমানা হয়। কিন্তু তারা বেরিয়ে এসেই আবার সেই মুনাফার শিকড় গেড়ে বসে। সেই শিকড় কেটে দিতে হলে কী করতে হবে, সেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে রাজনৈতিক ও নির্বাচিত সরকারকে। শিল্পের দোহাই দিয়ে, ক্ষুদ্র শিল্পের দোহাই দিয়ে, অর্থনীতির দোহাই দিয়ে তো আর আমরা হত্যার কারবারকে বৈধ করতে বলতে পারি না। আমরা বাঁচাতে চাই বৈধ, অনুমোদিত ও ভালো উৎপাদকদের। বাঁচাতে চাই আমাদের নয়া প্রজন্মের শিশুদের এবং তাদের বাঁচাতে চাইলে ওই সব শিশুখাদ্য উৎপাদকের শিকড় উপড়ে ফেলা ছাড়া গত্যন্তর নেই। আমি বলতে চাই, মনিটরিং করে যাদের লাইসেন্স নেই তাদের তাৎক্ষণিকভাবে কারখানা বন্ধ করতে হবে। বিচার করতে হবে তাদের হত্যাকারী হিসেবে। তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। মনে রাখতে বলি, ধর্ষণের বিরুদ্ধে আইনি রায় মৃত্যুদণ্ড হওয়ায় এখন আর সেই ধর্ষণকাণ্ড হচ্ছে না। জানের ভয় তো আছে। ঠিক এরকম বিধানই চালু করতে হবে শিশুখাদ্যপণ্য তৈরিতে বিষ ব্যবহারকারীদের জন্য। ব্যবসা আর মানবতার নামে শিল্প আর অর্থনীতির দোহাই দিয়ে এ হত্যাকারীদের সুযোগ দেওয়ার কোনো মানে নেই।

কেরানীগঞ্জের জিনজিরা, কালিন্দী, রোহিতপুর, শাক্তা, ইকুরিয়া ও পারগেন্ডারিয়া এলাকায় বসতঘর ও টিন শেড স্থাপনায় তৈরি হচ্ছে চকলেট, জুস, ললিপপ, সুজি, ট্যাং, গ্লকোজ, পুডিং, ক্যান্ডি, আচার, পাপড়ি, চিপসসহ নানা পণ্য। ক্ষতিকর কেমিক্যাল ব্যবহার করে তৈরি এসব পণ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে ভুয়া মেয়াদ, লাইসেন্স নম্বর ও বিএসটিআইয়ের লোগো। কেরানীগঞ্জ থেকে এসব পণ্য প্রথমে চকবাজার ও অন্যান্য পাইকারি বাজারে যায়। পরে ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে।

পাইকারি বাজার চকবাজারে অভিযান চালালে নকল ও ভেজাল পণ্যগুলো দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় যেতে পারবে না। দ্বিতীয়ত, ভেজাল পণ্যের ব্যবসার দায়ে চকবাজারের হোলসেলাররা সচেতন হবে। তারাও ওই পণ্য আর রাখবে না, বাজারে যেতে দেবে না। আর উৎসের কারখানাগুলো শুধু সিলগালাই নয়, জড়িতদের আটক করতে হবে। এভাবেই বন্ধ করা যেতে পারে আজরাইলের বংশধরদের হত্যাযজ্ঞ।

আপনারা কী জানেন, দেশের এসব অপকর্ম-অপরাধের সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে স্বেচ্ছাচারী লোকেরাও জড়িত থাকতে পারে। তারা তদবির করে আজরাইলের সন্তানসন্ততিদের বাঁচাতে উঠেপড়ে লাগবে। সরকার যদি শিশুদের প্রাণ রক্ষা করতে চায়, তাহলে অপরাধীদের ব্যাপারে কঠোর ভূমিকা নিতে হবে। সমাজে অপরাধীর সংখ্যা কমলেই একটি সুস্থ স্বাভাবিক সমাজ ও দেশ নির্মাণ সম্ভব। আমরা কি তা চাইতে পারি না?

ড. মাহবুব হাসান : কবি ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

প্রিন্ট/ডাউনলোডঃ ,

© স্বত্ব দৈনিক সমধারা ২০২৫

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি

প্রিন্ট করুন

সেভ করুন