সমধারা

অক্টোবর ১৭, ২০২৬ , ১১:৪৭ অপরাহ্ণ

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জাতীয় ঐক্য

অদিতি করিম

সারা বিশ্বে এখন চলছে অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের মধ্যে সৌদি আরবে হুতি বিদ্রোহীদের হামলা গোটা বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছে।

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি আরবের মধ্যকার সংঘাত বাড়ায় তেল সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থায় অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের বাজারে। বেশির ভাগ দেশেই পেট্রল ও ডিজেলের দাম দ্রুত বেড়েছে। একই সঙ্গে ঘরবাড়িতে ব্যবহার ও বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের পাইকারি দামও বেড়েছে।

জুলাইয়ের তুলনায় যুক্তরাজ্য ও ইউরোপে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে বিশ্ব অর্থনীতিতে নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। জ্বালানির দাম দীর্ঘ সময় বেশি থাকলে সুদের হার বাড়তে পারে, বাড়তে পারে ঋণ ও বন্ধকের খরচ। একই সঙ্গে খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্যের দামও বাড়তে পারে।

বৈশ্বিক এই সংকটের ঢেউ আছড়ে পড়ছে বাংলাদেশেও। এমনিতেই বাংলাদেশ এখন এক সংকটকালীন পরিস্থিতি পার করছে। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে এক ধ্বংসস্তূপের মধ্যে। বিগত ১৭ বছরের দুর্নীতি, লুটপাট এবং অপশাসনের কারণে এমনিতেই অর্থনীতি ছিল বিপর্যস্ত, এরমধ্যে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণের পরপরই শুরু হয় ইরান যুদ্ধ। এতো প্রতিকূলতার মধ্যেও তারেক রহমান দেশকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

সরকার ক্ষমতায় আসার সঙ্গে সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানিসংকট সরকারের জন্য অন্যতম চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশই এই সময়ে তাদের স্থানীয় বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়িয়েছে। এমনকি অনেক দেশে তা প্রায় ৩৩ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে, যদিও বাংলাদেশে দাম বেড়েছে ১০ শতাংশের কাছাকাছি।

সংকটের স্থায়ী ও টেকসই সমাধানে সরকার নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও নিজস্ব জ্বালানি উৎসের সন্ধানের দিকেও মনোযোগ দিয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবও অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে সরকার এসব চাপ মোকাবেলায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানির মূল্য সমন্বয়ের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ যতটা সম্ভব সীমিত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার মূল্যায়নে দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতি ও মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার ঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, অতীতের দীর্ঘস্থায়ী মূল্যস্ফীতির কারণে দেশে প্রায় ৮০ লাখ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে গেছে।সরকারের ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি তাদের দুর্ভোগ লাঘব ও দারিদ্র্য হ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ)। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে যাওয়া মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার পাশাপাশি নতুন করে মানুষের দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়া ঠেকানো সম্ভব হবে।

সরকার যখন অর্থনীতিকে সঠিক পথে আনার চেষ্টা করছে তখনই সৌদি আরবের হুতি বিদ্রোহীদের হামলা শুরু হলো। এর ফলে বাংলাদেশ নতুন করে সংকটে পড়েছে। দেশে রেমিট্যান্সপ্রবাহ ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল সবচেয়ে বেশি আসে সৌদি আরব থেকে। সেখানে হুতিদের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও এর পরিপ্রেক্ষিতে দেশটির সঙ্গে আকাশপথে যোগাযোগ থমকে যাওয়ায় বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য নতুন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবে প্রায় ৩৫ লাখ বাংলাদেশি থাকেন। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসে সেখানকার প্রবাসীরা ১ দশমিক ৯৫ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন, যা দেশের মোট রেমিট্যান্স প্রবাহের ১৯ দশমিক ২ শতাংশ। গত অর্থবছরে সৌদি থেকে রেমিট্যান্স এসেছিল প্রায় ৫ দশমিক ৮৫ বিলিয়ন ডলার, যা ছিল ওই বছরের মোট প্রবাহের প্রায় ১৬ দশমিক ৪ শতাংশ। সম্প্রতি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবের অর্থনীতিকে তেলনির্ভর থেকে বাণিজ্য ও পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তরের যে পরিকল্পনার কথা জানান, তাতে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক অদক্ষ শ্রমিকের জন্য আশার আলো তৈরি হয়েছে।

জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য বলছে, সৌদি আরব এখনো বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির বৃহত্তম গন্তব্য। শুধু সেপ্টেম্বরেই ৩২ হাজার ৯১৫ কর্মী নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। বিমানবন্দরসহ সৌদি আরবের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা যদি দীর্ঘসময় ধরে চলতে থাকে, তাহলে তা হবে বাংলাদেশের প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহের জন্য চরম দুঃসংবাদ। হুতি হামলার পর সৌদির সিভিল অ্যাভিয়েশন কর্তৃপক্ষ রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত ফ্লাইট কার্যক্রম স্থগিত করেছে। দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সীমিতভাবে চালু আছে। এতে চরম উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন বাংলাদেশের অসংখ্য প্রবাসীকর্মী। যে প্রবাসীকর্মীদের কাজে যোগ দেওয়ার নির্দিষ্ট সময়সীমা রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে ফ্লাইট মিস করাটা তাদের চাকরি টিকিয়ে রাখার ঝুঁকি তৈরি করেছে। অন্যদিকে ভিসার মেয়াদ নবায়ন ও নতুন করে ফ্লাইটের টিকিট করার খরচ সামলাতেও তাদের সমস্যায় পড়তে হতে পারে। যদিও, এখন পর্যন্ত রেমিট্যান্স প্রবাহে তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব পড়েনি, তবে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব পড়তে পারে।

তাই সৌদিআরবে সংঘাত অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশ তো বটেই সারা বিশ্ব এক কঠিন অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে। এই পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য প্রয়োজন জাতীয় ঐক্য ও সংহতি। এইসময়ে সকল রাজনৈতিক দলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। সরকারের উচিত সকল রাজনৈতিক দলের সাথে চলমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে সৃষ্ট সংকট এবং তার সমাধানের উপায় নিয়ে বিরোধী দলের সঙ্গে আলাপ আলোচনা শুরু করা। বিরোধীদলের পরামর্শ বিবেচনায় নেওয়া। আবার বিরোধী দলের উচিত এখন ঢালাও ভাবে সরকারের সমালোচনা না করে সংকট থেকে উত্তরণে সরকারকে সহযোগিতা করা। সরকারকে পরামর্শ দেওয়া।

শুধু রাজনৈতিক দল নয়, সকল শ্রেণী পেশার মানুষের এখন সরকারের পাশে দাঁড়ানো উচিত। যার যা দক্ষতা এবং অভিজ্ঞতা, সেটা নিংড়ে দিতে হবে দেশের জন্য। বর্তমান সংকট মোকাবেলার জন্য। বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা দক্ষ ও অভিজ্ঞ তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ করে দিতে হবে সরকারকে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশ এই সংকট কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবে বলে আশা করি। কিন্তু যদি এই কঠিন সময়ে আমরা বিভক্ত হয়ে যাই, একে অপরকে দোষারোপ করি, এই সুযোগে সরকারকে বেকায়দায় ফেলার চেষ্টা করি, তাহলে সরকারের চেয়েও ক্ষতি হবে জনগণের এবং বাংলাদেশের। তাই আমাদের সামনে কঠিন সময়, মতপার্থক্য ভুলে এখন দরকার ঐক্যবদ্ধ হওয়ার।

লেখক ও নাট্যকার
ইমেইল : auditekarim@gmail.com

প্রিন্ট/ডাউনলোডঃ ,

© স্বত্ব দৈনিক সমধারা ২০২৫

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি

প্রিন্ট করুন

সেভ করুন