সন্তান কথা বলছে–আমরা কি তার কথা মন দিয়ে শুনছি! নাকি তার কথা শেষ হওয়ার আগেই বলে দিচ্ছি, কী করতে হবে, কী করা উচিত ছিল, কোথায় তার ভুল! অনেক পরিবার আছে যেখানে সন্তানের সঙ্গে কথা বলা হয়, কিন্তু সন্তানের কথা শোনা হয় না। সন্তানের সঙ্গে কথা বলা আর সন্তানের কথা শোনার পার্থক্য কখনো কখনো শিশুর আত্মবিশ্বাস, নিরাপত্তাবোধ ও ভবিষ্যতে সাহায্য চাওয়ার সাহসকে প্রভাবিত করে।
সম্প্রতি এক আন্তর্জাতিক গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, শিশুর সঙ্গে responsive relationship বা সাড়া দেওয়া সম্পর্ক শিশুর বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হার্ভার্ডের Center on the Developing Child বলছে, শিশুর কথা, অঙ্গভঙ্গি, কান্না বা অনুভূতির প্রতি বড়দের মনোযোগী ও যথাযথ সাড়া দেওয়া শিশুর মস্তিষ্কের বিকাশ, ভাষা ও সামাজিক দক্ষতার ভিত্তি তৈরি করে।
Organisation for Economic Co-operation and Development (OECD) শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে চিহ্নিত করেছে–শিশু তার বাবা-মায়ের সঙ্গে সহজে কথা বলতে পারে কি না, পরিবার তাকে কতটা সমর্থন করে, সে মনে করে কি না যে বাবা-মা তার কথা শোনেন এবং পারিবারিক সিদ্ধান্তে তার অংশগ্রহণ আছে কি না।
OECD-এর সাম্প্রতিক এক গবেষণার বিশ্লেষণও বলছে, বাবা-মায়ের আবেগীয় সমর্থন শিশুর কোনো বিষয়ে পারদর্শিতা এবং জ্ঞানমূলক সাফল্যের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণভাবে সম্পর্কিত।
অর্থাৎ আগ্রহ নিয়ে সন্তানের কথা শোনা এবং তাতে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া কোনো ‘ভালো বাবা-মা হওয়ার অতিরিক্ত গুণ’ নয়, এটা শিশুর সুস্থ বিকাশের স্বাভাবিক অংশ।
World Health Organization (WHO)-এর এক রিসার্চ রিপোর্টে দেখলাম, ২০১৮ সালে যেখানে ৭৩ শতাংশ শিশু তাদের পরিবারের আগ্রহী মনোযোগ পেয়েছে সেখানে ২০২২ সালে শিশুর প্রতি পারিবারিক মনোযোগ নেমে এসে হয়েছে ৬৭ শতাংশ। একই গবেষণায় দেখা গেছে, পরিবার ও বন্ধুদের শক্তিশালী সমর্থন পাওয়া শিশুর মানসিক সংগঠন তুলনামূলকভাবে ভালো।
শিশুর কথা আগ্রহ নিয়ে শোনার অর্থ বলতে আমরা কী বুঝব!
প্রথমত, শিশুর কথা শেষ করতে দেওয়া। সে পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফলাফল করতে পারেনি, বন্ধুর সঙ্গে ঝামেলা হয়েছে কিংবা কোনো ভুল করেছে–সঙ্গে সঙ্গে বিচার না করে আগে জানা দরকার, শিশু কী বলতে চাইছে।
দ্বিতীয়ত, সমাধান দেওয়ার আগে শিশুর অনুভূতি বোঝা। যুক্তরাষ্ট্রের Centers for Disease Control and Prevention (CDC) বাবা-মাকে সব সময় ‘active listening’-এর পরামর্শ দিয়ে থাকে। বাধা না দিয়ে সন্তানের কথা শোনা, তার উদ্বেগ সম্পর্কে প্রশ্ন করা এবং নিয়মিত কথোপকথনের সুযোগ সৃষ্টি করা। CDC বলছে, এ ধরনের যোগাযোগ শিশুর স্বাস্থ্য ও কল্যাণে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
তৃতীয়ত, সব কথার উত্তর সঙ্গে সঙ্গে দিতে হবে–এমন নয়। UNICEF Parenting-এর পরামর্শ হলো, সন্তান কোনো কষ্টের কথা বললে প্রথম প্রতিক্রিয়া যেন উপদেশ না হয়ে সহমর্মিতা হয়। অনেক সময় সন্তান সমাধান নয়, প্রথমে চায়–কেউ তার কথা বুঝুক। এমনকি পরামর্শ দেওয়ার আগে তাকে জিজ্ঞাসা করা যেতে পারে, ‘তুমি কি চাও আমি কেবল তোমার কথা শুনব, নাকি আমরা মিলে কী করা যায় তেমন কিছু আলাপ করব?’
চতুর্থত, শুধু মুখের কথা নয়, শিশুর নীরবতাও শুনতে হবে। ব্রিটিশ National Society for the Prevention of Cruelty to Children (NSPCC)-এর শিশু সুরক্ষা-সংক্রান্ত গবেষণা ও চর্চার নির্দেশনায় বলা হয়েছে, শিশুর ‘voice’ মানে শুধু তার বলা কথা নয়, শিশুর আচরণ, অঙ্গভঙ্গি, নীরবতা ও পরিবর্তিত আচরণও তার যোগাযোগের অংশ। তাই ‘সে তো কিছু বলেনি’ বলে দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না। শিশুর নীরবতাকেও বুঝতে হবে।
তবে আমরা খেয়াল রাখব, শিশুকে শোনা মানে তার সব সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া নয়। বাবা-মা অবশ্যই সীমা নির্ধারণ করবেন, নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সিদ্ধান্তও নেবেন। তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে শিশুর মতামত জানা এবং শিশুর বয়স ও ম্যাচিউরিটি অনুযায়ী তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। এটা এখন শিশু অধিকারেরও আন্তর্জাতিক স্বীকৃত নীতি। জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ১২ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, নিজের বিষয়ে মত গঠনের সক্ষমতা থাকা শিশুর মতামত প্রকাশের অধিকার আছে এবং সেই মতামতকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।
WHO ২০২৩ সালের parenting guideline-এ শিশুর সঙ্গে সম্পর্ক বৃদ্ধি করা, নেতিবাচক কঠোর ও ক্ষতিকর parenting বন্ধ করা এবং শিশুর মানসিক ও আচরণগত সমস্যার ঝুঁকি কমাতে প্রমাণভিত্তিক parenting intervention-এর ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
আমাদের দরকার আজ থেকেই ঘরের কথোপকথনের আচরণে পরিবর্তন আনা। শিশু যখন কিছু বলবে তখন বড়দের হাতে মোবাইল ফোন বা টেলিভিশনের রিমোট থাকলে তা নামিয়ে রেখে শিশুর প্রতি মনোযোগ দেওয়া।
শিশুর চোখের দিকে তাকানো। শিশু কথার মাঝপথে কখনোই তাকে থামিয়ে দেওয়া যাবে না। কোনো কথা শুনে বা শিশুর কোনো আচরণে সঙ্গে সঙ্গে তার বিচার করা যাবে না। শিশুকে জিজ্ঞাসা করতে হবে, ‘তারপর কী হলো?’ শিশুর কাছে এই ছোট প্রশ্নের অর্থ অনেক বড়। সে বুঝতে পারে তার কথা গুরুত্ব দিয়ে শোনা হচ্ছে। শিশু ভাবতে থাকে, ‘আমার কথাও তবে গুরুত্বপূর্ণ। আমার কথা কেউ শুনতে চায়।’ নানান নিয়ম আর রীতিনীতির আড়কাঠের গণ্ডির ভেতর থেকে শিশুকে বড় করার আগে শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা জরুরি।
মন্তব্য করুন
খবরের বিষয়বস্তুর সঙ্গে মিল আছে এবং আপত্তিজনক নয়- এমন মন্তব্যই প্রদর্শিত হবে। মন্তব্যগুলো পাঠকের নিজস্ব মতামত, কর্তৃপক্ষ এর দায়ভার নেবে না।